খাদ্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

হাওয়াই মেঠাই বা বুড়ির চুল

দীপক দাস

হাওয়াই মেঠাই খাওয়ানো এত রোমান্টিক হতে পারে! সুযোগ পেলেই এখন ভিডিয়ো দেখি। অনেকেই দেখেন। পড়ার থেকে দেখাতেই আগ্রহ বেশি মানুষের। বরাবরের। সিনেমা জগতের দিকে তাকান। সাহিত্য নিয়ে বহু জনপ্রিয় সিনেমা হয়েছে। কিন্তু সে গল্প বা উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে সিনেমা হয় সেগুলো ক’জন পড়েন! অন্তত সিনেমার দর্শক আর বইয়ের পাঠকের তুলনায়? যেমন সুবোধ ঘোষের ‘জতুগৃহ’। এই উপন্যাসিকা থেকে বাংলা এবং হিন্দি, দু’টো সিনেমা হয়েছে— ‘জতুগৃহ’ এবং ‘ইজাজত’। বা ‘ন হন্যতে’ থেকে ‘হাম দিল দে চুকে সনম’। হিসেব মেলানো যাবে না। সিনেমার লাভের কড়ি দেখলে ক্যালকুলেটরে সংখ্যা আটবে না। মানুষের এই আগ্রহকেই নগদে রূপান্তরিত করেছে ইউটিউব। আমিও সেই ফাঁদের শিকার।

‘ডান্স প্লাস’এর টুকরো টুকরো ভিডিওগুলো বেশ লাগে। বিশেষ করে রাঘব জুয়াল (এই উচ্চারণই শুনেছি) আর শক্তি মোহনের খুনসুটি। ‘স্লো মোশন কিং’ রাঘবের নানা উপায়ে শক্তির মন জয়ের চেষ্টা উপভোগ্য। একটি ভিডিয়োয় দেখলাম, রাঘব শক্তিকে হাওয়াই মেঠাই খাওয়াচ্ছে। বেশ যত্ন করে। ভিডিয়োয় অবশ্য হাওয়াই মেঠাই কথাটা বলেনি রাঘব। বলেছিল, ‘বুড়িয়া কি বাল’। মানে বুড়ির চুল। হাওয়াই মেঠাইয়ের আরেক নাম।

ভিডিয়োটা দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়েছিল। কত হাওয়াই মেঠাই খেতাম! টিফিনের পয়সায় হাওয়াই মেঠাই খাওয়ার একটা বিপদ ছিল। বাড়িতে ধরা পড়তে হত। মেঠাইয়ের লাল রঙ জিভে লেগে থাকত। ভিডিয়ো দেখার কয়েকদিনের মধ্যেই একদিন ঘণ্টা নাড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে কেউ যাচ্ছেন উঁকি মেরে দেখি, কাঁধে বাঁক নিয়ে এক হাওয়াই মেঠাইওয়ালা চলেছেন। বহুদিন পরে এমন দৃশ্য দেখা। ইচ্ছে হল ছোটবেলাটাকে একটু ঝালিয়ে নিতে। ভাইপো ছিল কোলে। বাবাকে ডাকতে বললাম। মেঠাইওয়ালা এলেন। তাঁর বাঁকে হাওয়াই মেঠাইয়ের সঙ্গে নলি পাঁপড়ও ঝুলছে। সাবু দিয়ে তৈরি পাঁপড়। তেলে ভাজা। ছোটবেলায় এগুলো আঙুলে গলিয়ে খেতাম। মেঠাইওয়ালার পাঁপড়গুলো অবশ্য আকারে কিছুটা ছোট।

বনবনিয়ে ঘুরছে চাকতি। তৈরি হচ্ছে হাওয়াই মেঠাই।

কেনা হল পাঁপড় আর হাওয়াই মেঠাই। কিনতে কিনতে কিছু গল্পগাছা। এখন কিছু দেখলেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে। কবে? কোথায়? কী ভাবে? ইত্যাদি। সেই সব প্রশ্নের মিলিত উত্তর দাঁড়াল, মেঠাইওয়ালা হাওড়ার বাসিন্দা নন। মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর থেকে এখানে এসেছেন। থাকেন বড়গাছিয়া লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে। হাওয়াই মেঠাই কী ভাবে তৈরি হয় জানা ছিল। একবার দেখার ইচ্ছে হল। মেঠাইওয়ালাকে বললাম, ‘‘একবার যাব দেখতে।’’ দু’টো গ্রাম পরেই তো!

ইচ্ছে ছিল দলবল নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু মঙ্গলবার কাউকে পেলাম না। বাবলার জ্বর। দীপুর সল্টলেকে কাজ আছে বলল। ইন্দ্র বহুদিন নিখোঁজ। অগত্যা সন্ধেবেলা লড়ঝড়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া। সকালের দিকে একবার লেভেল ক্রসিংয়ে গিয়ে খোঁজ নিয়েছিলাম। সঠিক অবস্থানটা জানতে। এক দোকানদার জায়গাটা বুঝিয়ে দিলেন। জায়গাটা পাতিহাল আর বড়গাছিয়ার মাঝামাঝি। পাতিহালে সাপুড়িয়া মাল পাড়ার কাছে। আর জানালেন, হাওয়াই মেঠাই তৈরি করা হয় সন্ধেবেলা। দিনের বেলা ফেরি করতে বেরিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে পৌঁছনো গেল। পাঁচিল ঘেরা লম্বাটে পাকা বাড়ির বসত। অনেকগুলো ঘর। একজন বেরিয়ে আসছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, হাওয়াই মেঠাই তৈরি হয় কিনা এখানে? হলে দেখা যাবে কিনা? ভদ্রলোক নিয়ে গেলেন এক বাড়ির বারান্দায়। সেখানে এক তরুণ সামনে গোলাকার যন্ত্র নিয়ে বসে। ঘরের ঢোকার মুখে হাওয়াই মেঠাইয়ের প্যাকেট ডাঁই করে রাখা।

তরুণকে অনুরোধ করলাম, হাওয়াই মেঠাই তৈরি হওয়া দেখাতে। তিনি অনুরোধ রাখলেন। ওই তরুণের নাম প্রসেনজিৎ। তিনি যন্ত্রটি চালু করতেই এসে বসলেন এক তরুণী। বিবাহিতা। সম্ভবত প্রসেনজিতের স্ত্রী। একটা বাচ্চাও এসে বসল কাছে। প্রসেনজিৎ হাওয়াই মেঠাই তৈরি করলে তরুণী সেগুলো প্যাকেটে ভরছেন। তার পর সেই প্যাকেট লম্ফের আগুনে ধরে প্যাকেটের মুখ বন্ধ করছেন। লম্বা উঠোনে একজন মাটির উনুনে রাতের রান্না করছেন দেখলাম। আমার হাওয়াই মেঠাই দেখতে আসা এবং প্রশ্ন করার আরেকজন এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনিও তরুণ। তাঁর কোলে একটা বাচ্চা। নামটা আর জিজ্ঞাসা করিনি। এমনিতেই হাওয়াই মেঠাই তৈরি দেখতে আসাতেই তাঁরা যথেষ্ট অবাক হয়েছেন।

প্রসেনজিৎ চাকতি থেকে তুলেছেন মেঠাইয়ের দলা। পাশে প্যাকেটে ভরছেন তরুণী।

হাওয়াই মেঠাই তৈরির পদ্ধতি খুব জটিল কিছু নয়। একটা অ্যালুমিনিয়মের বড়সড় গোলাকার কানা উঁচু পাত্র। এটির মাঝ বরাবর একটা লোহার চাকতি লাগানো। চাকতির মাঝে একটা লোহার নলাকার পাত্র মাথা উঁচু করে রয়েছে। এই লোহার নলের ভিতরে চিনি দেওয়া হয়। চিনি দেওয়ার পরে অ্যালুমিনিয়মের গোলাকার পাত্রের নীচে দু’টো স্পিরিট ল্যাম্প জ্বেলে গরম করা হয়। গরম হলে চিনি গলে যায় নলের ভিতরে। এবার লোহার চাকতি আর নল যন্ত্রের সাহায্যে প্রবল ঘোরানো হয়। ঘোরানোর ফলে গলিত চিনি তন্তুর মতো ওই লোহার চাকতির চারপাশে জড়ো হয়। পরিমাণ মতো জড়ো হলে পাকিয়ে গোল আকার দিয়ে প্যাকেটে ভরে ফেলা। মেঠাই তৈরিতে লাগে শুধু চিনি আর রং। গোলাপি রঙেই বেশি সাজে হাওয়াই মেঠাই। বুড়ির চুল হাওয়াই মেঠাইয়েরই আরেক নাম। রং না দিলেই মেঠাই বুড়ির চুলের মতো সাদা।

প্রসেনজিতেরা জানালেন, তাঁরাও মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের বাসিন্দা। বছর চারেক হল বড়গাছিয়া এলাকায় এসেছেন। আগে তাঁরা থাকতেন লেভেল ক্রসিং এলাকায়। এখানে তাঁরা খান কুড়ি ঘর মেঠাই তৈরি করেন। হাওয়াই মেঠাই তাঁদের মরসুমি ব্যবসা। শীতকালেই তৈরি হয়। গরমকালে হাওয়াই মেঠাই প্যাকেটে বেশিক্ষণ থাকে না। এই নভেম্বরের গোড়াতে মেঠাই একদিন পরেই চুপসে যায়। শীত ভাল পড়লে দু’দিন রাখা যাবে প্যাকেট। মেঠাইয়ের সঙ্গে প্রসেনজিতেরা সাবুর পাঁপড়ও ভাজেন। এই দু’টো খাবার নিয়েই তাঁরা পাড়ায় পাড়ায় ঘোরেন। ছোটবেলায় আরেকটা জিনিস দেখতাম। সেটাও চিনির তৈরি। বাঁশের মাথায় লাগানো থাকত। বিক্রেতা বাঁশের মাথা থেকে কিছুটা নিয়ে টেনে, লম্বা করে, ঘুরিয়ে প্যাঁচালো করে নানা আকার দিতেন। হার, আংটি, কানের দুল। নামটা ভুলে গিয়েছে। আমাদের এলাকায় আর দেখতে পাই না। প্রসেনজিৎ জানালেন, তাঁরা এটা তৈরি করেন না। তবে বিহারে নাকি এর বেশ চল আছে, এখনও।

ডাঁই করে রাখা হাওয়াই মেঠাই।

হাওয়াই মিঠাই তৈরি তো জানা হল। এবার এর উৎপত্তি। নামকরণে একটা সহজ সূত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। হাওয়া ভরা মিঠাই তাই হাওয়াই মেঠাই। কিন্তু মিষ্টিটা কি বাংলার? বোধহয় নয়। তাহলে হিন্দিতে ‘বুড়িয়া কি বাল’ হল কী করে? বাংলা থেকে যদি হিন্দিভাষী এলাকায় যায় তাহলে রসগোল্লা থেকে ‘রসগুল্লা’ উচ্চারণের মতো কিছু বিকৃতি সম্ভব। পুরোপুরি আলাদা হবে কী? প্রাচীন মিষ্টি, যা সারা ভারতে প্রচলিত, হলে উচ্চারণে কিছুটা সাম্য অন্তত বজায় থাকত। যেমন লড্ডুক থেকে লাড়ু বা নাড়ু। তাহলে? এটা কি পুরনো যুগের মিষ্টি? যখন মিষ্টির প্রধান উপকরণই ছিল চিনি বা গুড়। সেই সময়ে তো গুড় থেকে চিনি তৈরি হত। তাতে একটা সমস্যা হবে। সেই যুগে কি এমন তীব্র গতির ঘূর্ণন যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব ছিল? যা থেকে চিনির তন্তু তৈরি হবে? উত্তর জানা নেই আমার।

আরেকটা বাধাও আছে। সেটা হল এর সঙ্গে মেঠাই শব্দটা যুক্ত হওয়া। সদ্য প্রয়াত প্রণব রায় তাঁর ‘বাংলার খাবার’এ বলছেন, ‘মিঠাই কথাটি সংস্কৃত মিষ্টান্নের সমার্থক’। মিষ্টান্ন মানে চিনি বা গুড়ের সঙ্গে অন্ন জাতীয় খাবার পাক তৈরি খাদ্যদ্রব্যই মিষ্টান্ন। যা ‘পরিপূর্ণ খাদ্য’। ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ও বলছে, মিঠাই বা মেঠাই হল মিষ্টান্ন। সেই সঙ্গেই বলছে, ডাল থেকে তৈরি নাড়ু বিশেষ, মোদক, পক্বান্ন বিশেষ। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় পক্বান্নের যে বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রামের একটা মিষ্টির মিল আছে। বেসনের ঝুরি ভাজা চিনির রসে পাক করে গোল্লা করে পাকানো। কেউ বলেন ‘টানা নাড়ু’। কারও মত, সিড়ির নাড়ু’। আবার চলন্তিকা বলছে, মিঠাই হল ডাল থেকে তৈরি নাড়ু বিশেষ। এছাড়াও মিষ্টান্ন, মোদক, লাড্ডু অর্থেই ব্যবহার হয়। কিন্তু হাওয়াই মেঠাই এর কোনওটাই নয়? তাহলে? অজ্ঞানতা আমার ক্ষমা করো পাঠক।

আবার ফেরা যাক, প্রসেনজিৎদের কাছে। হাওয়াই মেঠাই যদি শীতের ব্যবসা হয়, তাহলে অন্য সময়ে কী করেন? প্রসেনজিতেরা জানালেন, তাঁরা ৫০ টাকার জুতো ফেরি করেন। বা বাজার এলাকায় জুতো নিয়ে বসেন। বাচ্চা নিয়ে যে তরুণটি এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি বললেন, ‘‘আমরা পড়াশোনা জানি না। কী করে পেট চালাব? কিছু তো করতে হবে!’’

এই পাঁপড়ও ভাজেন প্রসেনজিতেরা।

কথাটা শুনে শাহরুখ খানের এবারের দেওয়ালির বিজ্ঞাপনটা মনে পড়ে গেল। ক্যাডবেরির বিজ্ঞাপনটিতে ‘কিং খান’ অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে ঘরের কাছের দোকান থেকে মিষ্টিও কিনতে বলছেন। যাতে মিষ্টির দোকানদারের দেওয়ালিও মিষ্টি হয়। কিন্তু ঘরের কাছের দোকানগুলোয় কি আর স্থানীয় জিনিস পাওয়া যায়? সেখানে তো ঝোলে বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত টক-ঝাল-মিষ্টির নানা প্যাকেট। বহুজাতিক সংস্থার। ‘আন হাইজিনিক’এর দোহাই দিয়ে কত কিছুর জায়গা দখল করেছে বহু সংস্থা। টিকটিকি লজেন্স (মৌড়ি লজেন্সও বলেন অনেকে), মাছ লজেন্স, লটারির পাতায় মোড়া চাটনি, কত কিছু। ছোট ছোট কত ব্যবসায়ীকে পেশা বদল করতে হয়েছে বিজ্ঞাপনের কবলে পড়ে। তাদের দেওয়ালি কি মিষ্টি হয়েছে?

হাওয়াই মেঠাইয়ে রং ব্যবহার করা হয়। অনেকেই বলেন, এই রং অস্বাস্থ্যকর। বহুজাতিক সংস্থার প্যাকেটের টক-ঝাল-মিষ্টিগুলো স্বাস্থ্যকর? যেগুলো পাড়ার দোকান দখল করেছে? মন ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।

ছবি- লেখক

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *