বেলিয়াতোড়
অন্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

কষ্ট দিল যামিনী রায়ের স্মৃতি

দীপক দাস

স্মৃতিপথে একবার ফেরা উচিত। ভাল স্মৃতিপথে। কী মিলবে আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তবুও একবার পরখ করা দরকার। যেমন করলাম ১৫ অগস্টের দিনে। বাঁকুড়া যাত্রা করেছিলাম একা। এই প্রথম এত দূরে একাকী সফর। কারণ সঙ্গীরা বড়ই ব্যস্ত।

সফরে নানা দুর্ভোগ আমাদের সইতে হয়। সে সব হাসি মুখে নিজেদের মধ্যে তুমুল রসিকতা করে উপভোগ করি। একা একা উপভোগ করা বেশ চাপের বিষয়। যখন সফরের শুরু থেকেই দুর্ভোগ। ভোর সাড়ে চারটের সময় উঠে তৈরি হওয়ার কথা। ঘুম থেকে উঠতেই সাড়ে পাঁচটা হয়ে গেল। কোনও মতে পৌঁছলাম বড়গাছিয়া লেভেল ক্রসিং। সেখানে কোনও গাড়ি নেই। অগত্যা একটা টোটোয় জাঙ্গিপাড়া যাত্রা। সময় লাগল। তবে বাসটা পেয়ে গেলাম সঙ্গে সঙ্গে।

বাস থেকে দেখা জঙ্গলপথ।

নামব হুগলির গজার মোড়। সেখান থেকে বাঁকুড়ার বাস ধরব। দীপ্তেন্দুবিকাশ জানা, আমাদের গ্রুপের না দেখা শুভানুধ্যায়ী, ব্যানার্জি নামে একজনের নম্বর দিয়েছিল। গজার মোড়ে পৌঁছে ফোন করে বাসটা কোথায় আছে জেনে নিতে বলেছিল। কিন্তু জাঙ্গিপাড়ার বাসটা রাস্তায় ইচ্ছে করে দাঁড়িয়ে রইল। গজার মোড়ে ব্যানার্জিদের বাসে ফোন করতে জানা গেল, মিনিট পাঁচেক আগে বাস বেরিয়ে গিয়েছে।

অভিব্যক্তিতে গিয়েছিলাম তখন।

বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আরামবাগের বাস পেলাম। আরামবাগ থেকে বাঁকুড়ার বাসও পেলাম সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার। বাসে বাবার ভক্তদের প্রচুর ভিড়। বসার জায়গা মিলল না। যাব বেলিয়াতোড়। এ বাস সরাসরি সেখানে যাবে না। দীপ্তেন্দু জানিয়েছিল, কেরানিবাঁধের বাইপাসে নেমে বেলিয়াতোড় যেতে। আবার বাসে পরিচয় হল এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে। তিনি জানালেন, বিষ্ণুপুর থেকে বেলিয়াতোড়ের বাস পাওয়া যায়। ভদ্রলোক পুলিশ আধিকারিক। একসময়ে বিষ্ণুপুর থানায় পোস্টিং ছিল। তিনি কাকে যেন ফোন করে জেনে দিলেন, ১১.১০ নাগাদ বেলিয়াতোড়ের একটা বাস আছে।

দেখা হয়েছিল উৎপলবাবুর সঙ্গে।

বিষ্ণুপুর থেকে বেলিয়াতোড়ের বাস পেলাম। বসতে জায়গাও পেলাম। ভেবেছিলাম, বেলিয়াতোড় থেকে ঘুরে এসে পাঁচাল সংগ্রহশালা দেখব। রাতে থাকব। অনেকদিন পরে জঙ্গলবাস হবে। সেই মতো লেখক সনৎ বন্দ্যোপাধ্যায়দাকে ফোন করলাম। যদি একটা ঘরের ব্যবস্থা হয়। উনি ওঁর শ্যালকের নম্বর দিলেন, টোটনদা। টোটনদা জানালেন, কাজ মিটিয়ে চলে আসুন। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

যামিনী রায়ের বাড়ির গ্রিলের গেট। এভাবেই ঢুকেছিলাম আমরা।

বাস ছাড়ল আর আমার স্মৃতিপথে যাত্রা শুরু হল। বিষ্ণুপুরে আগে এসেছি। পথে জয়পুরের জঙ্গল পড়ে। এই জঙ্গলে তো আমাদের প্রচুর স্মৃতি। দল বেঁধে দু’দিন দারুণ কাটিয়েছিলাম। আবার দেখলাম সেই জঙ্গল। বাস থেকে। বর্ষার জলে ধোয়া জঙ্গল অসাধারণ রূপে সরে সরে যাচ্ছে।

এ পথেই পড়ে ছান্দার। এক অসাধারণ শিল্পগ্রাম। এসেছিলাম ছান্দারে। আসলে ‘অভিব্যক্তি’ নামে এক প্রতিষ্ঠান দেখতে। এটির প্রতিষ্ঠাতা উৎপল চক্রবর্তী। স্থানীয় আদিবাসী চিত্রকলা, সংস্কৃতির সংরক্ষণ, প্রসারের কাজ করে ‘অভিব্যক্তি’। দেখা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির প্রাণপুরুষ উৎপল চক্রবর্তীর সঙ্গে। অনেক কথা হয়েছিল। স্থানীয় বিএড কলেজের শিক্ষকতা করতে কলকাতা থেকে ছান্দারে এসেছিলেন উৎপলবাবু। আর ফিরে যাননি। এখানকার মানুষকেই আপন করে নিয়েছিলেন। এলাকায় তাঁকে ভালবেসে ‘ছোটদা’ নামে ডাকতেন সকলে। আদিবাসীদের মধ্যে শিল্পীসত্তা খুঁজতেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ দিতেন। লালন করতেন।

যামিনী রায়ের বাড়ির গেটের এখনকার অবস্থা।

ছান্দার ঘুরে যাওয়ার কয়েক বছর পরে খবর পেয়েছিলাম উৎপলবাবু মারা গিয়েছেন। কষ্ট হয়েছিল। তাঁর প্রতিষ্ঠানটি টিকবে তো! এবারও ‘অভিব্যক্তি’র সঙ্গে দেখা হল। বাসের জানলা দিয়ে দেখলাম, অভিব্যক্তি নামের সঙ্গে বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জুড়ে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণ করেছে উৎপলবাবুর ‘অভিব্যক্তি’। স্মৃতিপথে ফেরার এ এক দারুণ অনুভূতি।

সেই অনুভূতি পুরো পাল্টে গেল বেলিয়াতোড়ে গিয়ে। যামিনী রায়ের বাড়ি এখানে। আগেরবার দল বেঁধে সফরের সময়ে গ্রিলের গেট টপকে ঢুকেছিলাম বাড়ির ভিতরে। তা-ও অনেক কসরত করে। এলাকায় শুনেছিলাম, শিল্পীর বাড়ির চাবি পাশের একটি পরিবারকে নাকি দেওয়া থাকে। শিল্পীর বাড়িতে ঢোকার ব্যবস্থাটি একটু অন্যরকম। ঢোকার পথটি শুরু হচ্ছে রাস্তার কাছ থেকে। কিন্তু সেই পথের দু’পাশে পাঁচিল তোলা। ফলে একটা গলিমতো পথ তৈরি হয়েছে। সেই পথ পেরিয়ে কারখানার মতো বড় একটি গেট। সেটা খুললে তবেই যামিনী রায়ের বাড়ি দর্শন করা যাবে। কিন্তু সেই পর্যন্ত পৌঁছনোই মুশকিল। কারণ পথের পাশে, পাঁচিলের গলি শুরুর মুখেই গ্রিলের গেট। সেই গেটে তালা দেওয়া। যাঁর কাছে চাবি থাকে তাঁকে খুঁজে এনেদিয়েছিলেন এক ভদ্রলোক। তাঁর নাম ভোলা। ভোলা জানালেন, তাঁর কাছে চাবি নেই। ভিতরে ঢুকলে নাকি শিল্পীর ছেলে রাগ করেন।

যামিনী রায়ের বাড়ি তখন যেমন দেখেছিলাম। এখন কী রকম অবস্থা জানি না।

তবে চাবি না পেলেও শিল্পীর বাড়িতে ঢুকেছিলাম। গ্রিলের বেড়া টপকে। আমি, বাবলা আর ইন্দ্র। এবার দেখলাম, সেই গ্রিলের গেট পুরো জঙ্গলে ঢাকা। গলিপথে আবর্জনা জমেছে। দূরে কারখানার মতো সেই গেটটার বাইরেও জঙ্গল। এক ভদ্রলোক বসেছিলেন গ্রিলের গেটের কাছের এক বাড়ির সিঁড়িতে। তিনি জানালেন, এখন আর কেউ দেখভাল করেন না বাড়িটি।

শিল্পীর বাড়ি জঙ্গলে ঢেকেছে। সাধে কী বলে, বাঙালি ইতিহাস বিস্মৃত জাত। কোনও কিছু রক্ষা করতে তার বড় অনীহা। ভুবন বিখ্যাত শিল্পীর স্মৃতি হলেও।

কভারের ছবি— যামিনী রায়ের বাড়িতে ঢোকার পথ

ছবি- যথা ইচ্ছা তথা যা

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *