জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল।
খাদ্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

জন্মাষ্টমীর মিষ্টি বা তালের দিনগুলো

দীপক দাস

তালের টাল হত বাড়িতে। নিজেদের গাছের নয়। কেতাবি ঢংয়ে বললে, সংগ্রহ করা। চালু কথায়, কুড়োনো। তা নিয়ে গাছমালিকের গোসা যে হত না, তা নয়। তবে তিল থেকে তাল হত না। এত তালে তাল কেটে যাচ্ছে? বেশ সোজাসুজিই বলা যাক।

সে ছিল গড়মসির যুগ। তখন সকালে উঠে নিজ নিজ পাঠে মন দেওয়ার পরেও কিছুটা সময় বাঁচত ছেলেপুলেদের। স্কুল যাওয়ার আগে সেই টুকরো সময়ে পুকুরে চার টোপ ছিপ ফেলে নেওয়া যেত। স্কুল থেকে ফিরে পাড়ার মাঠে বল পেটানো। সন্ধেয় উঠোনে চাটাই পেতে বসে স্কুলের পড়া। সুযোগ পেলে বাবার থেকে টর্চ হাতিয়ে নারকেল গাছের ডগায় মেরে বিস্মিত হওয়া। খণ্ড খণ্ড অবসর ছিল ছেলেমেয়েদের। মা-বাবারও। দুপুরে পাড়ার পিসি-কাকিমাদের সঙ্গে মায়ের আসন বোনা, রুমালে নকশা করা। ছুটির দিনে বাবার পাড়ার ক্লাবে বা বন্ধুর বাড়িতে আড্ডা।

জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল।
তালের ফুলুরি। বাঁ পাশে মালপোয়া। শ্রীহরিতে।

গত শতকের আশির দশক। তখন শরতে ঘাসের আগায় শিশিরের রেখা দেখার সময় ছিল। মাঠে ‘হেমন্তলক্ষ্মী’কেও চেনা যেত। ভাদ্র মাসে হত তাল কুড়োনো। পাড়ায় হালদারদের গাছ। ভোর ভোর উঠলে একটা দু’টো ঠিক জোগাড় হয়ে যেত।চলত প্রতিযোগিতাও। ধপাস আওয়াজ হলে গাছমালিকের আর পড়শির বাচ্চা একসঙ্গে গাছতলায়। স্কুল থেকে ফেরার সময়ে কোনও বন্ধু হয়তো দিল একখানা। পাড়াতুতো এক ঠাকুমার ঘরের পাঁদাড়ে ছিল গাছ। টিনের চালে দুমদাম পড়া শুরু হলে নিশ্চিত হতাম, একটা ঠিক আসবে আমাদের বাড়ি। থালার উপর ঝুড়ি উপুড় করে তাল চাঁচত মা। আমরা দুই ভাই মাঝে মাঝে ঝুড়ি তুলে দেখতাম কতটা ক্ষীর জমা হল। নিজেরাও মাঝে মধ্যে বসে যেতাম তাল চাঁছতে।

কালো পাকা তালগুলো ছিল বেশি মিষ্টি। হাঁড়ি তাল বলতাম। মাটির হাঁড়ির পিছনটা উনুনের জ্বালে যেমন কালো হয়ে যায় সেই রকম দেখতে লাগত বলে মনে হয় এমন নাম। কালো তালের ছাল ছাড়ানোর পর আঁটি তো গেল ক্ষীরদান করতে। ছালগুলোও ছিল দানি। তার গা থেকে আঁশ ছাড়িয়ে মা গোল করে পাকিয়ে দিত। মুখে রেখে একটু একটু করে চুষে চিবিয়ে খেতে যে কী সুখ ছিল!

জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল।
নারকেল নাড়ু। গুড়ের। মহাপ্রভু আদি দোকানে।

তালের ক্ষীরের তো হাজারো ব্যবহার। ফুটিয়ে নিয়ে জলখাবারে মুড়ি দিয়ে খাও। রাতে রুটি দিয়েও চলতে পারে। এর পর তালের রুটি, পরোটা, লুচি তো রয়েছেই। তালের পিঠেও কী কম উপাদেয় ছিল! আর অবশ্যই তালফুলুরি বা তালের বড়া।

মাটির রান্নাঘরের পিছনের ছাঁচে বাঁশের একটা মাচা করা থাকত। তাতে টাল হত তালের আঁটি। সে আঁটি থেকে যাবে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত। কেটো আঁটি কেটে আমরা বার করতাম ফোঁপরা। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় দেবীর অন্যতম ভোগ। আর কেটো আঁটি শুকিয়ে নিয়ে হত জ্বালানি। তখন সব বাড়িতেই একটা করে কাঠের উনুন থাকত।

জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল।
ক্ষীরের নাড়ু। শ্রীহরিতে।

তার পর গড়িমসির যুগ গেল। দম দেওয়া পুতুলের মতো গতি এল জীবনে। মায়েদের আসনের নকশা বন্ধ হল। বাবার আড্ডাও। পাড়ার কাকিমাদের জটলাও কমল। বাড়ির লোকজনও। সবাই তখন নিজেদের নিয়ে একা। কিংবা একক। ভাদুরে তালের দিনও ফুরোল। কে চাঁছবে? কখন চাঁছবে? তার পর তো ফুলুরি, লুচি, পরোটা।

সময় বদলেছে। সময়ের অভাবও বড় বেশি। কিন্তু বাঙালির জীবনে তাল প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। না হারানোর একটা কারণ আচার পালনের ঐতিহ্য। পুজো-অর্চনার রীতি আচারের মধ্য দিয়ে অনেক কিছু বেঁচে থাকে। বিশেষ করে খাবারদাবার। মিষ্টির উদাহরণই দেব। কারণ ওটায় একটুআধটু আগ্রহ আছে। নকুলদানা, চিনির সন্দেশ, গুজিয়া আর বাতাসা বেঁচে আছে শুধু পুজোর জন্য। তাল যেমন অনেকটা জন্মাষ্টমীর জন্য।

জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল।
ক্ষীরের পায়েস। শ্রীহরিতে।

ভাবনাটা হঠাৎই মাথায় এল সে দিন। মানে জন্মাষ্টমীর দু’দিন আগে। পাড়ার এক কাকিমা এসেছিল রান্না পুজোর নেমন্তন্ন করতে। রান্নাপুজো মানে অরন্ধনও কিন্তু এক অসাধারণ আচার। এই আচার অনেকরকম পুরনো খাবারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। সে কথা অন্য দিন হবে। তাল বজায় থাকুক এখন। কাকিমা আমাদের বড়গাছিয়া বাজারের এক মিষ্টির দোকানে নারকেল নাড়ু বিক্রি হতে দেখেছে। দোকানে নারকেল নাড়ু বিক্রি আমিও দেখেছি। সে সব তেমন পদের নয়। প্যাকেটে পাওয়া যায়। ছোট ছোট, খুব শক্ত। গুলতির গুলিতে অনায়াসে ব্যবহার করা যেতে পারে। ওগুলো সব আউটসোর্সিং করানো। মানে মিষ্টির দোকানে তৈরি হয় না। যেমন জরির কাজ, কানের দুল ইত্যাদি বাড়ির মেয়েরা ঘরে বসে করেন, নাড়ুও তেমনই। কাকিমা অবশ্য বলল, দোকানদার বলেছেন, জন্মাষ্টমীর নাড়ুগুলো তাদের দোকানেই তৈরি।

পরদিন দুপুরবেলা বড়গাছিয়া যেতে হয়েছিল। ফেরার সময়ে দই আনতে হত। ঢুঁ মারলাম শ্রীহরি মিষ্টান্ন ভান্ডারে। দোকানের শোকেসে নানা নতুন মিষ্টি সাজানো। শোকেসের ছাদেও। ছাদের দু’টো ট্রেতে তালের ফুলুরি আর মালপোয়া। শ্রীহরির মালিক রবিন বন্ধুলোক। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, জন্মাষ্টমী স্পেশাল নাকি রে? হ্যাঁ বলল রবিন। জানাল, কী কী মিষ্টি করেছে। মালপোয়া, তালের ফুলুরি, গুড়ের নারকেল নাড়ু, ননি, ক্ষীরের নাড়ু, ক্ষীরের পায়েস। রাবড়িও বিক্রি হয় জন্মাষ্টমীতে। তবে এটা সারা বছরই পাওয়া যায় বলে বাদ রাখলাম।

জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল।
মালপোয়া। আদি মহাপ্রভু দোকানে। তখন শেষের পথে।

জন্মাষ্টমীর স্পেশ্যাল মিষ্টিগুলোকে দু’টো ভাগে ভাগ করা যায়। একেবারে ঘরোয়া আর পুজো স্পেশ্যাল। একেবারে ঘরোয়া তালের ফুলুরি আর নাড়ু। মালপোয়া বাড়িতে তৈরি হয়। বাংলার মিষ্টির দোকানে এর খুব বেশি চল নেই। তবে বিক্রি হয় কিছু কিছু দোকানে। তাল আর নারকেলজাত মিষ্টি দু’টো কেন দোকানে এল? ওই রান্নাঘরের ছাঁছে তালের আঁটির তাল যে কারণে উধাও হল। সময় ও লোকবলের অভাব। জন্মাষ্টমীর পুজোয় এমনিতেই জোগাড়ের ঝামেলা থাকে। তার উপর তাল চেঁছে ক্ষীর করে ফুলুরি করাটা বেশ ঝক্কির। সে ঝক্কি সামাল দিচ্ছে মিষ্টির দোকান। নারকেল নাড়ুর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। এখন নারকেলের দামও বেশি। নাড়ু তৈরিও বেশ সময়সাপেক্ষ। বেশি সময়সাপেক্ষ। তালের চাঁছা। নারকেলের কোরা। অতিরিক্ত হল সেই কোরা গুড়ের সঙ্গে পাক করা। তার পর গরমাগরম পাকানো। এত ঝক্কির মুশকিল আসান মিষ্টির দোকান।

তালের ফুলুরির কথা বলতে পারি না। তবে নারকেল নাড়ুর বিষয়টাকে ফেরা বলতে পারি। মিষ্টির দোকানে ফেরা। একসময়ে নারকেলের নানা মিষ্টি বিক্রি হত দোকানে। মানে ছানার মিষ্টির বহুল প্রচলনের আগে। চন্দ্রপুলি নারকেলের তৈরি সন্দেশ। পাক আলাদা। আবার রসকরাকে নারকেল নাড়ু বলা যায়। তফাৎ হল, রসকরা তৈরি হয় নারকেল বাটা আর চিনি মিশিয়ে (শব্দের মৃগয়ায় মিষ্টান্ন— বিজনবিহারী ভট্টাচার্য)।

নারকেল নাড়ু। শ্রীহরিতে।

ক্ষীরের নাড়ুকে আধা ঘরোয়া আধা দোকানে বলা যেতে পারে। মা-ঠাকুমারা বাড়িতে ক্ষীরের নাড়ু তৈরি করতেন। সুকুমার রায়ের গল্পে সে প্রমাণ রয়েছে। ‘পেটুক’ গল্পে হরিপদর বড়মামা জানিয়েছিল, দিদির সঙ্গে বসে টেঁপির ক্ষীরের নাড়ু পাকানোর কথা। ছানার বাহুল্য শুরুর আগে ক্ষীরের মিষ্টির ব্যাপক চল ছিল। দোকানেও নানা রকম ক্ষীরের মিষ্টি মিলত। ক্ষীর এখন কোণঠাসা হয়ে গিয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আবার স্বমহিমায় আসতে দেখে খারাপ লাগেনি।

ননির বিষয়টি ঠিক জানি না। এর বেশি প্রচলন বোধহয় হিন্দি বলয়ে। মহাভারত, পুরাণের গল্পে কৃষ্ণের সঙ্গে ননির অঙ্গাঙ্গি যোগের কথা পড়েছি। কিন্তু দেখেনি কখনও। ওই পড়া থেকে আন্দাজ, সেখানে ননি ঘরেই তৈরি হত। পরে হয়তো দোকানে আসে। এখন হয়তো দোকানেও মেলে। বাংলায় দেখিনি। সম্ভবত কৃষ্ণের ক্ষীরচোরা, ননীচোরা নামের কারণেই দোকানে এই দু’টো মিষ্টি জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দোকানে তৈরি হয়েছে। ক্ষীরের পায়েসের বিষয়টা ঠিক বলতে পারি না। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ে ক্ষীরের পায়েস তৈরির কথা রয়েছে। সেটি ঘরোয়া পদ্ধতিতে তৈরির জন্য। দোকানে বিক্রি হত কিনা নিশ্চিত নই। বইপত্রে ক্ষীরের পায়েস পড়েছি বলে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল।
ননি। ভাঁড়ে উপস্থাপনাটা বড় সুন্দর।

বড়গাছিয়ার আরও কয়েকটি মিষ্টির দোকানে খোঁজ করেছিলাম। তবে সেটা জন্মাষ্টমীর দিনে। যেমন, স্টেশন রোডের মুখে যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারে। মালিক পক্ষ তন্ময় জানাল, তারা রাবড়ি রেখেছে। লকফ্যাক্টরি রোডে মহাপ্রভুর দোকানে জানা গেল, জন্মাষ্টমী উপলক্ষে তাঁরা নারকেল নাড়ু তৈরি করেছিলেন। তবে সব শেষ হয়ে গিয়েছে। এই দোকানটির কথাই বলেছিল কাকিমা। গেলাম মহাপ্রভুর আদি দোকানে। মিলল নারকেল নাড়ু আর মালপোয়া।

এমনিতেই জন্মাষ্টমীর পুজোয় আট রকমের মিষ্টি লাগে। এটা মনে হয় বাংলার গৃহিণীদের তত্ত্ব। অষ্টম গর্ভের সন্তান কৃষ্ণ। এই তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভবত এমন অষ্টমিষ্টান্ন তত্ত্ব। তালের ফুলুরি বা নাড়ু কিন্তু সেই আটের হিসেবের বাইরে। এগুলো জন্মাষ্টমীর স্পেশালের স্পেশ্যাল।

রবিন বলছিল, তারা বছর আট-দশ বছর হল দোকানে জন্মাষ্টমী স্পেশ্যাল করছে। বড়গাছিয়ার দোকানগুলোয় ঢুঁ মেরে উপলব্ধি, সঠিক ভাবনা। প্রতিটি দোকানে স্পেশ্যালের ভালই বিক্রি। দেখেশুনে খুশিই। বাংলার ঐতিহ্য রক্ষা তো হচ্ছে! দোকানে হলেও। হারিয়ে যাওয়ার থেকে টিকে থাকা ভাল।

কভারের ছবি— শ্রীহরির ননি

ছবি— লেখক

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *