খাদ্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

জেলায় জেলায় জিলিপির জালে

দীপক দাস

প্যাঁচালো মানুষ রসাল হয়! হয় না বোধহয়। প্যাঁচের কষে মনের রস কষ হয়ে যায়। জিলিপি প্যাঁচালো। সরু প্যাঁচ মোটা প্যাঁচ। আড়াই প্যাঁচ, সাড়ে তিন প্যাঁচ। সবই রসাল। অত কথার মারপ্যাঁচে না গিয়ে পাঁচমেশালি প্যাঁচের রসাস্বাদন হোক।

কত ছোটবেলায় জিলিপি খেয়েছিলাম আর কেমন তার স্বাদ ছিল, ভুলেছি। কিন্তু জিলিপির কথা উঠলেই কচুরির এসে যায়। আর জোড়া খাদ্যে মনে পড়ে ‘বাদশা’ সিনেমার কথা। ‘লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া ধরেছে সে বায়না’ গানের সেই সিনেমাটা। সে বোধহয় প্রাথমিক স্কুলের কাল। গ্রামের এক ক্লাবের উন্নয়ন কল্পে চ্যারিটি শোয়ে দেখেছিলাম ‘বাদশা’। কালী ব্যানার্জি নামচরিত্রে। তাতে জিলিপি কচুরি খাওয়ার একটা দৃশ্য ছিল। কচুরি আর জিলিপি একসঙ্গে খাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক বড়বেলায়। আমাদের এলাকায় একই দোকানে কচুরি আর জিলিপি পাওয়া যেত না। এখনও যায় না। আর জিলিপি পাওয়া যায় এমন দোকান প্রায় নেই।

মেলার জিলিপি।

জিলিপি প্রথম স্বাদ বোধহয় মেলাতেই। গ্রামে তিনটি মেলায় জিলিপির দোকান বসে। পঞ্চানন্দের পুজোর মেলায়। খুব ছোট্ট মেলা। একটা দু’টো দোকান। জিলিপি ভাজত একজনই। সেই আবার রায়বাড়ির দোলের মেলায় দোকান দিত। আর মেলা বসে মণ্ডলা পুজোয়। এই তিন জায়গার কোনও একটায় কেনা জিলিপিতেই প্রথম প্যাঁচালো রসের পরিচয়। আর সে জিলিপি ছিল গুড়ের। তখন গ্রামের মেলায় গুড়ের জিলিপিই ছিল বেশি। ধীরে ধীরে চিনির জিলিপি এল। তার পর জিলিপি সাম্রাজ্যে চিনিই সম্রাট হয়ে বসল। কোন পথে চিনি প্যাঁচ কষেছিল সেটা আর মনে নেই।

মেলার কথায় মনে পড়ল। কর্ণগড়ে রাবণপোড়া মেলা ছিল সেটি। আমাদের দল রানি শিরোমণির গড় দেখে ফেরার পথে জিলিপি খেয়েছিল সেখানে। দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমীর দিনে রাবণবধ হয়। মেলাও বসে। কর্ণগড়ের মেলাটি ছিল একেবারেই ছোটখাটো। গুটিকয়েক দোকান। এখানকার জিলিপি রং রূপ একটু আশ্চর্যই লেগেছিল। ঘোরতর প্যাঁচালো সে জিলিপি। আড়াই প্যাঁচ ছাড়িয়ে সাড়ে পাঁচ প্যাঁচের মতো। কিন্তু প্যাঁচগুলো ভারী রোগাভোগা। পরীক্ষার জন্য রক্ত নেওয়ার সময়ে হাতে যে ইলাস্টিক বাঁধে তার থেকে একটু স্বাস্থ্যবান। রসভরা নালিকা। কিন্তু খেতে মুচমুচে ছিল না।

কলকাতার ফুটপাতের জিলিপি। গাজিপুর না মেচেদা মনে নেই।

সাড়ে পাঁচ প্যাঁচের জিলিপি আরেক জায়গায় খেয়েছি। কলকাতার ফুটপাতে। হাতের থাবার মতো বড়। দোকানটা কচুরি শিঙাড়ার আর অবাঙালির। দোকানের মালিক থেকে কর্মচারী, সকলেই বিহারের। স্বাভাবিক ভাবেই জিলিপিতে বাঙালি ছাপ নেই। হলদেটে রং। রস আঠালো। মানে বেশ চটচটে। তবে খেতে ভাল। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে দোকানটা। সম্ভবত এই দোকানেই প্রথম কচুরি আর শিঙাড়া একসঙ্গে খেয়েছিলাম। বাদশা সিনেমার মতো। অফিস থেকে বেরিয়ে আমি আর গুরুস্থানীয় সহকর্মী অরণিদা টিফিন করতে ঢুঁ মারতাম। অরণিদা অবশ্য খাস্তা কচুরি আর শিঙাড়া খেতে বেশি পছন্দ করতেন।

বাঙালি জিলিপি কিন্তু কলকাতার ফুটপাতে পাওয়া যায়। ছোট ছোট মুচমুচে। রং বেশ গাঢ়। রস পাতলা বলে জিলিপি রং গা চটচটে নয়। মেলে ধর্মতলার কাছে এল আইসি বিল্ডিংয়ের পাশের গলির ফুটপাতে। এখানে দুই জেলার জিলিপির স্বাদ নেওয়া যাবে। হাওড়া ও পূর্ব মেদিনীপুরের। পাশাপাশিই বসেন তাঁরা। একজনের বাড়ি হাওড়ার আমতায় কাছে গাজিপুরে। অন্যজন মেচেদার। মন জিলিপি জর্জরিত হলে অফিস থেকে যাই মাঝে মাঝে। বেশ লাগে খেতে।

‘যথা ইচ্ছা’রা দল বেঁধে বহুবার ঝাড়গ্রামে গিয়েছি। আবার পারিবারিক সফরেও। জিলিপি প্যাঁচেও পড়া হয়েছে। একবার তো আন্তঃরাজ্য জিলিপি চক্রে মজে ছিলাম। প্রথমে পারিবারিকটা কয়ে নিই। খুদে ভাইপোর সঙ্গে মোলাকাতে মাঝে মাঝে ঝাড়গ্রাম যেতে হয়। সান্ধ্য জলখাবার হয় শিঙাড়া, জিলিপিতে। সাবিত্রী মন্দিরের কাছে একটা দোকান থেকেই নেওয়া হয় জিলিপি। বেশ প্যাঁচালো। দেখতে কিছুটা থ্যাবড়া মতো। নালিকা মোটা। খেতে কিন্তু বেশ। ভাজাটা যথাযথ হয়। রসও পাতলা। ফলে গায়ে চটচটে ভাবটা নেই।

কর্ণগড়ের রাবণপোড়ার মেলার জিলিপি। প্রচুর প্যাঁচ।

আন্তঃরাজ্য জিলিপি চক্রের শুরুটা ছিল ঝাড়গ্রামে। ঠিক ঝাড়গ্রামে কি বলা যাবে? দোকানটা ছিল ওড়িশায়। একটু খোলসা করা যাক। সে বার দল বেঁধে হাতিবাড়িতে রাত কাটাতে গিয়েছিলাম। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে এই জায়গাটি তিন রাজ্যের কাছাকাছি। হাতিবাড়ি ঝাড়গ্রাম জেলায়, পশ্চিমবঙ্গ। এখান থেকে কয়েক পা বাড়ালেই জামসোলা। সেটি ওড়িশায়। আবার কাছের বাহিরগড়া নামে জায়গাটি ঝাড়খণ্ডে। হাতিবাড়ি থেকে বেরিয়ে জামসোলায় একটা ঝুপড়ি জলখাবারের দোকান ছিল। তাতে মিষ্টি হিসেবে ছিল জিলিপি আর মালপোয়া। আমরা খেয়েছিলাম। মোটামুটি স্বাদ। তার পর দিন সফর শুরু হল ওড়িশার দিকে। ওড়িশার কুলিয়ানার দিকে যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছু জলখাবারের দোকানে জিলিপি মিলেছিল। সঙ্গী মালপোয়া। বোঝা গিয়েছিল জিলিপি আর মালপোয়া খেতে বেশ ভালবাসেন এই এলাকার বাসিন্দারা।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের মজার দেশে জিলিপিরা নাকি তেড়ে এসে কামড় দিতে চায়। আমরা জেলায় জেলায় বিস্তর ঘুরেছি। যাওয়া হয়েছে কত মেলায়। জিলিপি দেখলে আমরাই তেড়ে গিয়েছি। কচুরি আর রসগোল্লা ধরে জলখাবারের সঙ্গে কত জিলিপি যে জঠরে চালান হয়েছে! কাঁসার থালায়, বারকোশে, গামলায়, স্টিলের থালায়, আঢাকা, হলুদ পলিথিনে ঢাকা, বোলতা বসা,  প্যাঁচালো, প্যাঁচালোতর, প্যাঁচালোতমদের অধিষ্ঠান। ফর্দ মিলিয়ে সব স্বাদ স্মরণ করলে জিলিপিনামার চেহারা স্থূল হবে। জিলিপিনামা এমনিতেই বেশ জটিল। পণ্ডিতেরা অনেক কাল ধরে ঠিকুজি কুলজি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। করছেনও। মোটামুটি সিদ্ধান্ত, জিলিপি ভারতীয় নয়। কারণ হিন্দি জলেবি বা জিলিপি যাই হোক না কেন শব্দটির উৎপত্তি ‘জলব’ থেকে। সুকুমার সেন জানাচ্ছেন, শব্দটি ফারসি। এ দিকে জিলিপির একটি সংস্কৃত প্রতিশব্দ রয়েছে, ‘কুণ্ডলিনী’। এটি পেয়েছিলাম প্রণব রায় থেকে। প্যাঁচের কারণেই কুণ্ডলিনী। মজার বিষয় হল, ‘জলব’ শব্দটির মানেও কুণ্ডল। নামকরণে এমন মিলের কারণ কী? হতে পারে, বিদ্বানেরা একই রকম ভাবনাচিন্তা করেন। একই সময়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বসে। আরেকটা কারণও হতে পারে। ফারসি ভাষীদের হাত ধরে ভারতে জিলিপির আগমন ধরে নেওয়া যেতে পারে। যখন জিলিপি ভারতে এসেছিল সেই সময়ে হয়তো এ দেশে সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল। ফলে ‘জলব’এর প্রতিশব্দ হয়েছে কুণ্ডলিনী।

রথের মেলার জিলিপি। কলকাতার ফুটপাতে।

কুলজি হল। এ বার উপকরণজি। সুকুমার সেন ‘শব্দের মৃগয়ায় মিষ্টান্ন’ প্রবন্ধে জানিয়েছেন, পানিফলের গুঁড়ো দিয়ে ভাল জিলিপি হয়। আমরা কোনও দিন খাইনি। আমাদের জিভ বহুল প্রচলিত ময়দা আর সফেদা বা সবেদার জিলিপির স্বাদই পেয়েছে। তবে ছানার, মুগের, বিরির ডালের জিলিপির স্বাদসম্ভব হয়েছে। কিন্তু এগুলো এখন বাদ থাকবে। সাধারণ জিলিপির কথা হবে। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘মিষ্টান্ন পাক’এ জিলিপি আছে। সে জিলিপি সবেদা আর সুজির খামির। বিপ্রদাসের হিসেবে ভাগটি হল, এক সের সবেদায় লাগে এক পোয়া সুজি। মানে এখনকার হিসেবে এক কেজি চালের গুঁড়োয় (সবেদা) মেশাতে হবে ২৫০ গ্রাম সুজি। তা উত্তম রূপে ফেটিয়ে নিতে হবে। না হলে স্বাদে ভাল হবে না। বিপ্রদাস ডিমের জিলিপির পাকপ্রণালীও দিয়েছেন। সে কী আর সহজলভ্য!

মিসেস জে হালদার ইংরেজিতে লিখেছিলেন ‘বেঙ্গল সুইটস’। ইনি সম্ভবত স্বাধীনতা সংগ্রামী জীবনতারা হালদার।  ‘বেঙ্গল সুইটস’এ জিলিপির পাকপ্রণালী আছে বেশ বিস্তারে। ইনি আবার ময়দা আর সফেদা, কেউ সবেদাও বলেন,দিয়ে জিলিপ  তৈরি শিখিয়েছেন। এই বইয়ে কিন্তু খামি গাঁজিয়ে নেওয়ার (ফার্মেন্টেশন) কথা রয়েছে। ময়দা খুব পাতলা বা খুব ঘন করে না মেখে তা একটি পাত্রে মুখ বন্ধ করে ১২-১৪ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। খামিতে আঙুল ডুবিয়ে দেখে নিতে হবে ঠিকঠাক গেঁজিয়েছে কিনা। আঙুল তোলার সময়ে খামি ঝরে না পড়ে লম্বা হয়ে উঠলেই বোঝা যাবে ঠিকঠাক গেঁজিয়েছে। এর পর এই গোলার সঙ্গে মেশাতে হবে সফেদা।

রথের মেলার জিলিপি। বড়গাছিয়ায়।

‘বেঙ্গল সুইটস’এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২১ সালে। এখন কি ময়দা মেখে গেঁজিয়ে নেওয়া হয়? সপ্তাহখানেক আগে রথের মেলা গিয়েছে। আমাদের হাওড়া জেলার বড়গাছিয়ায় রথের দু’টো দিনে মিষ্টির দোকানে জিলিপি ভাজা হয়। আগে কিন্তু মেলা ছাড়াই অনেক মিষ্টির দোকানেই জিলিপি ভাজা হত। বিভিন্ন জেলায় আমরা মিষ্টির দোকানের জিলিপি খেয়েছি। এখন আমাদের গ্রাম পাতিহালের একটা দোকানে বিকেলে নিয়মিত জিলিপি ভাজা হয়। খেতে ভালই। ভিড় হয় জিলিপি রসিকদের। রথের মেলায় বাড়িতে দু’টো মিষ্টির দোকান থেকে জিলিপি এসেছিল। একটা শ্রীহরি। আরেকটা যশোদা। শ্রীহরির মালিক রবিনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, খামি গেঁজিয়ে নেওয়ার বিষয়টি। ওদের দোকানে ময়দা আর সফেদা দিয়েই জিলিপি ভাজা হয়েছিল। রবিন বলল, খামি গেঁজিয়ে নেওয়ার মতো অত সময় এখন কেউ দেয় না। আর সুজি দিলে জিলিপি বেশিক্ষণ মুচমুচে থাকে না।

মুড়ি-জিলিপি। ঝাড়গ্রাম।

উপকরণের মতো জিলিপির স্বাদগ্রহণেও ভিন্নতা রয়েছে। আমরা বাঙালিরা মুড়ি-জিলিপি ভালই খাই। রাতে রুটি দিয়েও খান অনেকে। অরণিদা একদিন বলছিলেন, তিনি দুধে জিলিপি ফেলে খেতে ভালবাসেন। এই স্বাদবাহার নাকি বিহারের দিকে বেশ প্রচলিত। বিহারের ঝাঁঝায় অরণিদার ছোটবেলা কেটেছিল। কোনও কোনও রাজ্যে জিলিপির সঙ্গে রাবড়ি খাওয়ার চল আছে।

আমার রক্তে মিষ্টি। জিলিপি আর রাবড়ির ধ্রুপদী যুগলবন্দি সইতে পারবে কিনা কে জানে! কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। কোথায় যেন পড়েছিলাম, বনফুল এক হাতে ইনসুলিন নিয়ে অন্য হাতে মিষ্টি খেতেন!

কভারের ছবি- ঝাড়গ্রামের জিলিপি

ছবি- দীপশেখর দাস ও লেখক

সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *