বোলপুর, বীরভূম
অন্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

সাঁজের আলোয় রবিতীর্থে

সৌগত পাল

বীরভূম জেলায় থাকা শুরু হল ২০১৮ সালে। বীরভূম জেলায় না বলে বলা উচিত রামপুরহাট। এখান থেকে কাজের সুবিধা হয়। রামপুরহাট থেকে ট্রেনের ডিউটি পড়ে বর্ধমান, মালদা। বর্ধমানের রাস্তায় আসা যাওয়ার পথে বোলপুর স্টেশন দেখি। এখানেই তো কবির শান্তিনিকেতন। মেসের বন্ধুদের প্রস্তাব দিলে সকলে উৎসাহিত হয়। কিন্তু আমাদের চাকরির সমস্যা একসঙ্গে সবাইকে পাওয়া। দু’জন থাকল তো তিন জন বাইরে। তার পর সময় সুযোগ পেলে বাড়ি ঘুরে আসার তাড়া। এ সব করে দিন কেটে যাচ্ছিল।

মিলের ডাক। রামকিঙ্কর বেইজের শিল্পকর্ম।

২০১৮ শেষ হয়ে ২০১৯ সাল এল। ২০১৯ সালে দোলের দিন ভোর রাতে বাড়ি ফেরার পথে দেখলাম বোলপুর স্টেশনকে। সে এক অন্যরূপ। গোটা প্ল্যাটফর্মে শুধু মানুষ। শান্তিনিকেতনের দোলযাত্রায় অংশ নিতে এসেছেন। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। তাই প্ল্যাটফর্মেই আশ্রয়। সম্ভবত এই বছর বা পরের বছর থেকে বিশৃঙ্খলার কারণে আশ্রম চত্বরে দোলযাত্রায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়।

ঘণ্টাতলা। কৃত্রিম আলোয় তার অন্য রূপ।

দোলযাত্রা আর পৌষমেলা এই দুই সময়ে বোলপুর-শান্তিনিকেতনে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। আগে থাকার জায়গা অপ্রতুল ছিল। এখন সেই অসুবিধা নেই। হোম স্টে থেকে রিসর্ট— রেস্ত অনুযায়ী সব রকম ব্যবস্থা বর্তমান।

২০১৯ সালের পৌষমেলা শুরু হয়ে গেল। মেসের বন্ধুদের উৎসাহ তত দিনে অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। অবশেষে দুপুরে ডিউটি শেষ করে দু’জন মেসবাসিন্দা রওনা দিলাম বোলপুর স্টেশনের উদ্দেশ্যে।

আলো আঁধারিতে আম্রকুঞ্জ।

শীতের বেলা। সে দিন আবার মেঘলা। বামদেব প্যাসেঞ্জার ধরে রামপুরহাট থেকে বোলপুর যখন নামলাম তখন বিকেল ৪টে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরের বৃষ্টিতে ভেজার কোনও ইচ্ছা ছিল না। তাই স্টেশনে অপেক্ষা করতে হল। বৃষ্টি থামার পর যখন বিশ্বভারতীর দিকে চলা শুরু করলাম তখন সন্ধ্যা নামছে। সন্ধ্যা হওয়ার জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার অন্ধকারে ছাতিমতলা ঘুরে দেখলাম। দূর থেকে কাচঘর আর উপসনালয় দেখে নিতে হল। রামকিঙ্কর বেইজের শিল্পকলা দেখে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে বেরোলাম। হাঁটা দিলাম মেলার মাঠের দিকে। সন্ধ্যায় অন্ধকারে রবিতীর্থ দেখে মন ভরল না।

ইতিহাস ছড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতনের পথে-প্রান্তরে।

মেলার মাঠে পৌঁছে দেখলাম ভিড় যেমন হওয়া উচিত তেমন হয়েছে। কিন্ত আমার দেখা মেলার থেকে এই মেলা অনেকটাই আলাদা। মেলায় জিলিপি বাদাম খেলনার চিরাচরিত পসরা নয়। এই মেলা সাজানো নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পসরা নিয়ে। শোনা যায়, কবি এই মেলা শুরু করেন যাতে গ্রামীণ মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য অনেক দূরে না যেতে হয়। শীতের পোশাক, জামাকাপড়, লোহার আসবাবপত্র, গেরস্থালির হাজার জিনিস। সঙ্গে পিঠেপুলির দোকান।

নান্দনিক তীর্থ। রবিতীর্থ।

মেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে সে বারের মতো ফিরে এলাম রামপুরহাট। তার পরের বছর শুরু হল করোনা অতিমারি। দু’বছর শান্তিনিকেতন বন্ধ থাকল। সব কিছু স্বাভাবিক হলেও শান্তিনিকেতন সাধারণের জন্য এক রকম বন্ধ হয়েই গেল। বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট হতে হল।

এর পর আরও দু’তিন বার গেছি শান্তিনিকেতন। কিন্ত বিশ্বভারতীর ভিতরে ঢুকতে পারিনি। সোনাঝুরি হাট বা মেলা দেখে চলে এসেছি। পৌষ মেলাও তার জৌলুস হারিয়েছে। এক মাস ব্যাপী চলা মেলা আজ এক সপ্তাহের জন্য বসে।

পৌষমেলার এক ঝলক।

এখন শুনতে পাচ্ছি টিকিট কেটে বিশ্বভারতীর অন্দরে ঘোরার জন্য ‘ঐতিহ্য পদচারণা’ (হেরিটেজ ওয়াক) চালু হয়েছে। আশা আছে, কোনও একদিন উপযুক্ত সময়ে বিশ্বভারতীর অন্দরে ঘুরে বেড়াব। ততদিন অপেক্ষা চলুক।

কভারের ছবি- কাচঘর

ছবি- লেখক

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *