জলযাত্রা বিশেষ ভ্রমণ

ইছামতীর পারে অ্যানাকোন্ডা সিনেমার জোঁক

দীপশেখর দাস

এখন ব্যস্ততার সময়। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর কর্মজীবন শুরুর সন্ধিক্ষণে শুধু ছুটে চলা। সেই ব্যস্ততার রেশেই অনেকদিন বেরনো হয়নি। ‘যথা ইচ্ছা’র কয়েকজন সদস্য প্রায় স্বেচ্ছাবসর নিয়েছে। গার্ডবাবু আর ছোটা ডনের এখন ব্যস্ততার জোয়ার। সেখানে ভাটার দেখা পাওয়া সম্ভব নয় প্রায়। অগত্যা বর্তমান এক বুড়ো, এক আধবুড়ো আর এক শিশু নিয়েই আমাদের ভ্রমণ গ্রুপ হেলতে দুলতে, ঢেউ সামলে এগিয়ে চলছে।

টাকি, উত্তর ২৪ পরগনা।
মিনি সুন্দরবনে ঢোকার পথে।

বুড়ো ক্যাপ্টেনের একটু সাহস কমেছে। আগের মতো আর সহজে প্রপেলারে জোর দিতে চায় না। রেডারে হাত দেওয়ার আগেই কত কী যে সব হিসেব করে কে জানে! আবার লেখায় টান পড়লে কাউকে কিছু না বলেই একটা ‘এইচএমএস বিগল’ ধরে একা একাই কোনও ‘গ্যালাপাগোসে’র খোঁজে পাড়ি জমায়।

আধবুড়ো আমি এখন একটু জটিলতায়। নিজের নতুন কর্মকাণ্ডের সাম্রাজ্য সামলাতে প্রায় নাস্তানাবুদ অবস্থা। স্কুলে পরীক্ষা চললে তবেই আমার ছুটি। নয়তো গ্রামের বাইরে পা দেওয়া মানা। মাঝে মাঝেই মায়ের থেকে শমন পাচ্ছি। সে সব উপেক্ষা করেই ক্যাপ্টেনের ‘বিগল’এ পাড়ি জমানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।

টাকি, উত্তর ২৪ পরগনা।
স্ত্রী গোলপাতা গাছ।

শিশুটার সমস্যাটা ঠিক বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। অনেকদিন কোনও খবর থাকে না। আবার হঠাৎ একদিন হয়তও বা দেখা পাওয়া গেল। কোনও প্রশ্ন করলেই আবার বেপাত্তা। কিছু জিজ্ঞাসা করলে কী সব ইঙ্গিত করতে থাকে। মনের ইচ্ছা মুখে প্রকাশ করতে না পারলে যা হয় আর কী! একদিন হাবভাবে বুঝলাম বেরোতে চায়।

সুযোগও এল। স্কুলে স্কুলে পরীক্ষা। মাস্টারদের কয়েকদিনের কাজের চাপ তাই কম। ছোট একটা প্ল্যান ছকে নিয়ে শিশুটাকে বগলদাবা করে এক মঙ্গলবারে বুড়ো আর আধবুড়ো শরীরের জং ছাড়াতে বেরিয়ে পড়লুম টাকির উদ্দেশ্যে। অনেকদিন আগে একবার টাকি যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। এবারে দৃঢ় সংকল্প। ভোরের বাস ধরে হাওড়া। সেখান থেকে বাসে শিয়ালদহ। তার পর ৭:৪০-এর হাসনাবাদ লোকাল ধরা। সরাসরি টাকি যায়নি। হাড়োয়ায় যাত্রা বিরতি নিয়েছিলাম। তার পর আবার ট্রেনে চেপে টাকি রোড স্টেশন।

মিনি সুন্দরবন। টাকি।
ম্যানগ্রোভ অরণ্য বেশ ঘন।

টাকি সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দু’টো। বাংলাদেশ সীমান্ত আর মিনি সুন্দরবন দেখা। সেই দু’টি উদ্দেশ্যই যে একই জায়গায় সফল হয়ে যাবে সেটি আমরা বুঝতে পারিনি। মিনি সুন্দরবন যেতে টাকি রোড স্টেশনে নেমে টোটোর খোঁজ করলাম। স্টেশনের পাশে যে টোটো স্ট্যান্ড সেখানে গিয়ে দেখি বড় বড় পোস্টার লাগানো। টাকি রোড স্টেশনে বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গার নাম সেখানে ছবি-সহ উল্লেখিত। বেশিরভাগই পুরনো জমিদার বাড়ি বা তাঁদের তৈরি করা মন্দির, ঘাট ইত্যাদি। 

মিনি সুন্দরবন, টাকি
বাঁচার কৌশল। গাছের শ্বাসমূল।

সেই সব পোস্টারে এ পর্যটকদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা আপনি কোথায় কোথায় যেতে চান এবং সেই সেই জায়গায় যেতে গেলে কত করে টাকা ভাড়া গুনতে হবে। এক একটা সাইটে তিন বা চারটে করে জায়গা দেখতে গেলে ৩৫০, ৩০০ বা ৫৫০ করে টাকা লাগবে। সব জায়গাগুলো একসঙ্গে ঘুরে দেখতে গেলে মোট লাগবে ১১০০। একটি টোটো ভাড়া করলে সারাদিনে ১১০০ টাকা খরচ করতে হবে। আমরা ভুটভুটি ভ্যান ভাড়া করে ঘোরা লোক যে! তা ছাড়া সব কিছু তো দেখতে চাই না আমরা। দু’টো জায়গা ওঁদের ভাগ অনুযায়ী দু’টো রুটে পড়ে। তাই আমাদের দু’টো জায়গা দেখলেও ওই দু’টো রুটের সব ক’টি জায়গাই দেখতে হবে। ইচ্ছা বা সময় কোনওটাই ছিল না।

মিনি সুন্দরবন, টাকি
গেঁও গাছের ফল। সেই যে গরান, গেঁও…।

আমরা স্টেশনের টোটো স্ট্যান্ড ছেড়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটে চলে এলাম টাকির প্রধান সড়কে। সেখানে একটি ফলের দোকানে কথা বলে জেনে নিলাম মিনি সুন্দরবন যাওয়ার পথের খুঁটিনাটি। ফলের দোকানের ভদ্রলোক কিছুটা সস্তায় একটা টোটো ঠিক করে দিলেন। টাকি গেস্ট হাউসে দুপুরের আহার সেরে নিয়ে আমরা রওনা দিলাম মিনি সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে।

টাকি শহরতলির অলিগলি পেরিয়ে ৪০-৫০ মিনিটের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মিনি সুন্দরবনের চেক পয়েন্টে। বিএসএফের একটা চৌকি রয়েছে। সেখানে আমাদের তিনজনের সচিত্র পরিচয়পত্র দেখিয়ে নাম নথিভুক্ত করাতে হল।

মিনি সুন্দরবন
ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা জঙ্গলের মাথা।

চেক পয়েন্ট পেরিয়েই দেখলাম এক বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁর প্যাডেল ভ্যানে বসে আছেন। আমাদের ডেকে বললেন, “চলুন বাবু। মাথা পিছু সওয়ারি ১০ টাকা দেবেন।’’ আমরা ইতস্তত না করেই উঠে পড়লুম। তাঁর বেশভূষা এবং শরীরের অবস্থা দেখে সওয়ারি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলুম। ভ্যানে যেতে যেতেই কথা কথাবার্তা চলল। এই ভ্যান চালিয়ে দুই মেয়েকে মানুষ করেছেন। তাঁদের বিয়ে দিয়েছেন। এখন সংসারে তিনি আর তাঁর স্ত্রী। ভ্যান নিয়ে বেশি দূর আর যেতে পারেন না। তাই এটুকুর মধ্যেই সওয়ারি টানেন। সারাদিনে যে ক’জন পর্যটক পান তাই দিয়েই কোনও রকমে সংসার চলে। তাঁর মতো আরও একজন ওখানে ভ্যান চালান। তিনি একটু আগেই নাকি পর্যটক নিয়ে ভিতরে গেছেন। এখন মরসুম নয়। তাই পর্যটক কম। শীতের সময় পর্যটক বেশি হলে আয় একটু বেশি হয়। তাঁর জীবনের কথাবার্তা শুনতে শুনতে ছোট একটা গ্রাম পেরিয়ে পৌছলুম মিনি সুন্দরবনে।

মিনি সুন্দরবন
উভচর প্রাণী মাডস্কিপার। বাদা অঞ্চলে দেখা যায়।

জঙ্গলে প্রবেশের আগে একটা খাল। খালের উপর দিয়ে একটি হাঁটার জন্য কংক্রিটের সেতু। সেই সেতুটিই জঙ্গলের মধ্যে চলে গিয়েছে একভাবে। জঙ্গলের ভিতরে পথ চলার যেমন ‘ট্রেইল’ থাকে কতকটা ঠিক সেরকমই ভাবেই সেতুটি বানানো হয়েছে। সেতুর পথটি ছায়া ঘেরা। বিভিন্ন রকম পাখিদের কলকাকলি মুখর। সেতুটি কৃত্রিম হলেও এখানকার প্রকৃতি অকৃত্রিম অনন্য।

মিনি সুন্দরবন স্থানীয়দের কাছে গোলপাতার জঙ্গল নামে পরিচিত। নারকেল গাছের মতো পাতাওয়ালা ছোটখাটো গাছ গোলপাতা। কিন্তু, নারকেল গাছের মতো এর কাণ্ডটা মাটির উপরে উঠে আসে না। এর কাণ্ডটা মূলত গ্রন্থিকাণ্ড, যা মাটির নীচেই থেকে যায়। উপরে উঠে আসে লম্বা লম্বা পাতাগুলো। এই রকম গরমিলের গঠনাকৃতির জন্যই সম্ভবত এর এমন নাম। এই গাছটির আধিক্য এখানে অনেকটাই। সেতুপথ ধরে জঙ্গলে প্রবেশ করে প্রথম এই গাছটিই চোখ টানে। ফলও হয়েছে কয়েকটা গাছে।

মিনি সুন্দরবন, টাকি।
কাঁকড়ার বসত এই কাদামাটি।

গোলপাতা গাছ জঙ্গলের বেশ কিছুটা দখল করলেও আরও অনেকগুলো ম্যানগ্রোভ এবং ম্যানগ্রোভ সহযোগী গাছ এখানে দেখতে পেলুম। কালাবাইন, সাদা বাইন, কাঁকড়া, হরকচ, গেঁওয়া, কেওড়া এই সমস্ত গাছের সংখ্যাও এখানে ভালই। সব মিলে মিনি সুন্দরবন নামটা জায়গাটার সঙ্গে বেশ মানানসই। 

ট্রেইলটা জঙ্গলের একটু ভিতরে গিয়ে দু’দিকে ভাগ হয়েছে। একটা দিক চলে গিয়েছে নদীর দিকে। আর একটা দিক গিয়েছে ওয়াচ টাওয়ারে। সেতুর নিচের মাটি বেশ কর্দমাক্ত। বেশ বোঝা যায় জোয়ারের সময় এখানে জল উঠে আসে। সেতুটা যেখানে দু’ভাগ হয়েছে সেখান দিয়ে একটা ছোট নালা বয়ে গেছে। নালার অল্প জলে কয়েক ধরনের ছোট মাছও দেখতে পেলুম। অনেকগুলো মাডস্কিপার জলকাদায় ছুটে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ হয়ত সঙ্গিনীকে খুঁজছে। দেখতে পেলুম কয়েক প্রকার ছোট কাঁকড়া। তার মধ্যে কয়েকটা গাছ কাঁকড়াও ছিল।

মিনি সুন্দরবন
ভারতের পতাকা লাগানো মালবাহী নৌকা।

প্রথমে ওয়াচ টাওয়ারে ওঠা হল। উপর থেকে জঙ্গলের ঘনত্বটা বোঝা যায়। নেমে এসে নদীর পথ ধরলুম। ইছামতী নদী। এপারে বাংলা, ওপারে বাংলাদেশ। সীমান্ত দেখতে এসেছিলুম। এখানেই সেই আকাঙ্ক্ষা মিটে গেল। বেশ খানিকক্ষণ সেখানে থেকে বাংলাদেশ উপভোগ করলুম। ওপারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ছাউনি দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় এক যুবক বাপন সরকার সেখানে ঠান্ডা লেবুর জল বিক্রি করেন। ঝাল ঝাল লেবুর ঠান্ডা লেবুর জল খুব ভাল লাগল। বাপন একটা অফার দেন। লেবুর জলের সঙ্গে দূরবীন দিয়ে বাংলাদেশ দর্শন বিনামূল্যে। দূরবীনটা ফেরতযোগ্য যদিও। বাপন আমাদের গাছ আর প্রাণী চেনাচ্ছিলেন। কেওড়া ফল দেখালেন। চেনালেন একটা জোঁক। কাদামাটির মধ্যে মিশে আছে। খুব ধীর গতিতে যাচ্ছে। বাপন জানালেন, এই জোঁক মানুষের চামড়ায় এমন ভাবে ধরে যে একবার ধরলে নাকি চামড়া চেঁছে ছাড়াতে হয়। এই জোঁকের কীর্তি আছে অ্যানাকোন্ডা-২ সিনেমায়। শুনে শিহরণ জাগল।

মিনি সুন্দরবন
গ্লাসের বাঁ পাশেই জেগে সেই অ্যানাকোন্ডার জোঁক।

আমরা তিনজনে অনেকক্ষণ সেখানে সময় কাটালুম। দূরবীন দিয়ে ইছামতীর মাঝিদের মাছধরা দেখলুম। ঠান্ডা হাওয়ায় প্রাণ জুড়োলুম। ইট নিয়ে যাওয়া নৌকার যাতায়াত দেখলুম।

সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। ফিরতে ইচ্ছা না করলেও ফিরতে হবে। রাতে থাকার ব্যবস্থা এখানে নেই। রাত কাটাতে হলে ফিরতে হবে টাকি শহরে। রাত কাটানোর প্ল্যান আমাদের ছিল না। তবে রাত কাটাবার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু, আমরা বাড়ি ফেরাই স্থির করলুম। পরেরদিন সবারই কর্মস্থলে নিয়োজিত হবার ছিল। মনের ক্লান্তি অনেকটাই দূর হয়েছিল। তাই সেদিনই বাড়ি ফিরে নিশ্চিন্ত নিদ্রা স্থির হল।

মিনি সুন্দরবন
ছেঁকে ফল এসেছে কালো বাইন গাছে। এও এক ম্যানগ্রোভ।

মিনি সুন্দরবন থেকে বেড়িয়ে এলাম। দেখলুম সেই ভদ্রলোক ভ্যান নিয়ে তখনও অপেক্ষা করছেন। আমরা ভ্যানে উঠে বসলুম। তিনি প্যাডেলে চাপ দিলেন। আমাদের নিয়ে ফিরে চললেন নতুন এক পথ ধরে। আমাদের ফিরিয়ে দিয়ে তিনিও বাড়ি ফিরবেন। আগামীকাল আবার তাঁর অপেক্ষা শুরু হবে।

পশ্চিমে সূর্য তখন লজ্জাবতী বধূ। ইছামতীর আড়ালে মুখ লুকাতে চায় সে!

কভারের ছবি— পুরুষ গোলপাতা গাছ

ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ ও লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *