দাশনগরে।
ইতিহাস ছুঁয়ে বিশেষ ভ্রমণ

ব্যবসায় উজ্জ্বল এক বাঙালির স্মৃতি-পথে

দীপক দাস

বেরোচ্ছিলাম ‘অমৃতি কুম্ভের সন্ধানে’। রংবেরঙের অমৃতি ভাজা হচ্ছে খিলার এক জায়গায়। অমৃতি একরঙা। সেই ছোট থেকেই দেখে আসছি কমলা। হলদে, সবুজ, গোলাপি, এত রংদার হয় জানা ছিল না। সরেজমিন দেখতে হয় ব্যাপারটা।

জায়গাটা হাওড়া জেলাতেই। উদয়নারায়ণপুরের খিলা। পিতৃদেব খিলা শুনিয়াই কহিলেন, ওইখানে নাকি আলামোহন দাশের বাড়ি। আলামোহন দাশকে বহু বছর থেকেই চিনি। কিন্তু তিনি তো দাশনগরের! বাসে করে হাওড়া যেতে পড়ে দাশনগর। এই নগরটি যে ব্যক্তির নামে তিনিই আলামোহন। তিনি জেলার এত প্রান্তিক থেকে উঠে আসা ব্যক্তিত্ব!

অমৃতি কুম্ভে সুলুকসন্ধান সেরে আলামোহন দাশ নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। দোকানদার কিছু বলতে পারেননি। ক্রেতা এক ভদ্রমহিলা জানালেন, আরেকটু যেতে হবে। ভিতরের দিকে বাড়ি। জায়গাটা খিলা-বারুইপুর। সরাসরি টোটো যায় না। তবে বললে নিয়ে যাবে। কথা মতো এক টোটোওয়ালাকে দাঁড় করানো গেল। বয়স্ক ভদ্রলোক। চেনেন আলামোহন দাশের বাড়ি। টোটোয় চেপে বসার পরে বুঝতে পারলাম, আমাদের সেই চালক ভাগ্য আবার ভর করেছে। আমরা ঘুরতে গিয়ে বহু জায়গায় এমন এমন চালক পেয়েছি যে তাঁদের কথাই সাতকাহন হতে পারে। ইনিও সারা রাস্তা ধারাবিবরণী দিতে দিতে চললেন। আলামোহন দাশের কথা, নিজের কথা, মেয়ে-জামাইয়ের কথা, ছেলের কথা। পুরো কথাকাকলি। শুনতে শুনতেই যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হল, টোটোচালক কিঞ্চিৎ রসস্থ। ভরদুপুরে সেই রসই তাঁর মুখ ও মস্তিষ্ক চালনা করছে।

টোটোয় আরেক বয়স্কা ছিলেন। তিনি খিলা বাজারের কাছে নেমে গেলেন। বাজারে এক সেলুনওয়ালাকে কিঞ্চিৎ জিজ্ঞাসাবাদ করে আলামোহন দাশের বাড়িটি জেনে নিলেন টোটোচালক। একটা স্কুল পার করে বাঁক নিল টোটো। এলাকায় তাঁর পরিচিত আছে। ফলে চেনা লোকজন পেলেই টোটো দাঁড় করিয়ে জেনে নিচ্ছিলেন। ছোট ছোট পুকুর, ডোবার পাড়ের ঢালাই রাস্তা, মোড় পার করে হরিসভাতলায় এসে পৌঁছল টোটো। রাস্তার পাশে নলকূপে চান করছিলেন এক তরুণ। তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে দেখিয়ে দিলেন বাড়িটি। টোটোচালকের মুখে তখন যুদ্ধজয়ের হাসি। সেই হাসি আর অনর্গল ধারাবিবরণী কাজের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। থামালাম টোটোচালককে। কী তাঁর বক্তব্য? একগাদা বক্তব্য। আলামোহন দাশ সম্পর্কে যা জানেন সব বললেন। সেই সঙ্গে ধ্রুবপদের মতো একটাই বাক্য, ‘‘ঠিক জায়গায় এনেছি তো?’’

খিলা-বারুইপুর।
আলামোহন দাশের পৈতৃক ভিটা।

খিলা গ্রামে আলামোহন দাশের বাড়িটি পরিত্যক্ত। নীচের তলার দরজা জানলা অটুট রয়েছে। উপরের তলায় জানলাগুলো উধাও। তবে বাড়িটির রং খুব বেশি চটেনি এখনও। স্নান করা তরুণটি জানালেন, এখন আর কেউ এ বাড়িতে আসেন না। খিলা গোপীমোহন স্কুলের কোনও বার্ষিকীতে আলামোহন দাশের ছেলে এসেছিলেন। গোপীমোহন ছিলেন আলামোহনের বাবা। সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে বাবার নামে গ্রামে স্কুল করে দিয়েছিলেন আলামোহন দাশ।

কেন আলোচ্য আলামোহন? কেনই বা তাঁর বাড়ি দেখতে যাওয়া উচিত বলে মনে হল? এর উত্তর অনেক রকম ভাবে দেওয়া যায়। অনেক রকম শিরোনামে ধরা যায় তাঁর জীবন-কথা। ‘লড়াইয়ে অপর নাম আলামোহন’, ‘এ ভাবেও ফিরে আসা যায়’, ‘বাঙালি উদ্যোগপতিদের জ্যোতিষ্ক’, ‘ঘুচিয়েছিলেন ব্যবসা অক্ষম বাঙালির দুর্নাম’ ইত্যাদি। কেন? জানতে হবে তাঁর জীবন-কথা।

বাবা গোপীমোহন ছিলেন দরিদ্র কৃষক। তাঁর ছেলে সুরেন্দ্রমোহন। এখনই খিলা-বারুইপুর হাওড়া শহর থেকে বেশ দূরে। এই দূর কিলোমিটারের হিসাবে নয়, যানবাহনের প্রেক্ষিতে। এখন দ্রুতগামী বাস চলে। ১৩০১ বঙ্গাব্দে যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের তুলনায় কল্পনা করাটা কষ্টের। সুরেন্দ্রমোহনের জন্ম ওই বঙ্গাব্দেই। মাত্র দু’বছর বয়সে সুরেন্দ্রমোহন পড়লেন কঠিন অসুখে। গ্রামের কবিরাজের পক্ষে সে রোগ সারানো সম্ভব হল না। একদিন সুরেন্দ্রমোহন মারা গিয়েছে ধরে নিয়ে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। দাহ করার আগে এক কাকা খেয়াল করেন, ভাইপোর চোখ নড়ছে। ফিরিয়ে আনা হল বাড়িতে। একসময়ে সুস্থ হয়ে গেলেন সুরেন্দ্রমোহন। কিন্তু পিতৃদত্ত নামটি হারাতে হল তাঁকে। গ্রামের সকলে, এমনকি নিজের ঠাকুমা ডাকতে শুরু করল ‘এলা ছেলে’ নামে। গ্রামীণ ‘এলা’ শব্দটির অর্থ, যার প্রাণ নেই। সুরেন্দ্রমোহন হলেন এলামোহন। তা থেকে আলামোহন।

দাশনগর, হাওড়া
দাশনগরে আলামোহন দাশের মূর্তি।

স্কুলে যেতে শুরু করলেন আলামোহন। কিন্তু আবার বিপর্যয়। গ্রামে মহামারির প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ল। বাবা ও কয়েকজন ছাড়া গোটা পরিবার মারা গেল মহামারিতে। বাবাকে সারাতে মা বিরাজময়ীকে জমি-জায়গা এমনকি ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে হল। গোপীমোহন বেঁচে ফিরলেন। কিন্তু পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেল। খিলা ছেড়ে বাবা-মা চলে গেলেন কলকাতায়। সেখানে আলামোহনের এক কাকা থাকতেন। আলামোহনের বয়স তখন মাত্র আট বছর। আট বছরের ছেলে গ্রামে রয়ে গেলেন।

থেকে যাওয়াতেই ভাগ্য ফিরল। একদিন আলামোহন লক্ষ্য করলেন, ঘরের কোণে ইঁদুরের তোলা মাটির মধ্যে একটা কাঁসার ঘটি দেখা যাচ্ছে। সেই কলসির মধ্যে অনেক পুরনো মুদ্রা। কোনও পূর্বপুরুষ রেখে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে বাবা-মা কলকাতা থেকে খিলায় ফিরলেন। গোপীমোহন শুরু করলেন ছোটখাটো ব্যবসা। আবার স্কুলে যেতে শুরু করলেন আলামোহন। কিন্তু পড়াশোনা ভাল লাগছিল না আলামোহনের। তিনি ১১ বছর বয়সে গ্রাম ছাড়লেন। চলে গেলেন কলকাতায়। উঠলেন ১১ নম্বর গালিব স্ট্রিটে। রতিকান্ত দে-র বাড়িতে। রতিকান্তের ধান-চালের ব্যবসা ছিল। সেখানেই কাজে লাগলেন আলামোহন। কাজ হল মাথায় করে ধান-চাল লোকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত কাজ। একসময়ে পাকা বিক্রেতা হয়ে উঠলেন। নিজেই একটা দোকান করলেন। পরে সেই দোকান নিয়ে গেলেন শিকদার বাগানে ১১ কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে। দোকান ভাল চলতে শুরু করল। লোক রাখলেন আলামোহন।

পড়াশোনা খুব বেশি শেখেননি। তাই নিজের সীমাবদ্ধতার কথা জানতেন। নিজেই পড়াশোনা শুরু করলেন। প্রভাবিত হলেন স্বদেশি আন্দোলনে। ব্যবসায়ী পি এন দত্তের সঙ্গে পরিচয় ছিল আলামোহনের। দত্তমশাই তাঁকে ব্যবসায় উৎসাহ দিতেন। তাঁর কারখানাতেই পরিচয় হয়েছিল শিখরচন্দ্র হাজরার সঙ্গে। তিনিও উৎসাহ দিতেন। আলামোহনের কারখানা খোলার ইচ্ছে হল। তখন তাঁর দোকানে ২০ জন কর্মীর। কিন্তু তিনি কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট থেকে চলে এলেন হাওড়ার ৬৪ নম্বর খুরুট রোডে। শিখরচন্দ্রের সঙ্গে মিলে খুললেন হাওড়া কেমিক্যাল ওয়ার্কস। ১৯১৮ সাল সেটি। কিন্তু কারখানায় তৈরি অ্যাসিডে গন্ধ ছাড়ে। কারখানা সরিয়ে আনতে হল শানপুরের মাকড়দহ রোডে। এর পরেই উন্নতির শিখরে উঠতে শুরু করলেন আলামোহন। প্রতিষ্ঠা করলেন বেঙ্গল ওয়েয়িং স্কেলস। ওজন-যন্ত্রের এই কারখানা সারা ভারতে নাম করল।

এর পর পাল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস। এখানে এখানে কাপড়, ছাপাখানার যন্ত্র তৈরি হত। তৈরি হত লেদ ও ড্রিল যন্ত্র। প্রতিষ্ঠা হল ভারত জুট মিলের। ১৯৩৭ সালে উদ্বোধন করলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। হাজার বিঘা জমি কিনে তৈরি করলেন ‘দ্য ইন্ডিয়া মেশিনারি’। তার পর আরতি কটন মিল। শুরু করেছিলেন হাওড়া ইনসিওরেন্স কোম্পানি, এশিয়া ড্রাগ কোম্পানি, দাশ সুগার কোম্পানি। তাঁর দাশ ব্যাঙ্কের শাখা ছিল অবিভক্ত বাংলা জুড়ে। কিন্তু দেশ ভাগে দাশ ব্যাঙ্কের পতন হল। কারণ শাখার বেশির ভাগ চলে গেল এখনকার বাংলাদেশে।

সমাজসেবামূলক বহু কাজ করেছিলেন আলামোহন দাশ। খিলা গ্রামে বাবা গোপীমোহনের নামে তৈরি করেছিলেন স্কুল। সেগুলো আজও রয়েছে। বিধায়কও হয়েছিলেন আলামোহন। ১৯৫১ সালে দেশের প্রথম নির্বাচনে আমতা বিধানসভা কেন্দ্রের নির্দল প্রার্থী ছিলেন তিনি।

দাশনগর, হাওড়া
আরতি কটন মিল, দাশনগর।

এখন কি অবস্থা আলামোহনের সাম্রাজ্যের? একদিন যাওয়া হল তাঁর সেই ‘তীর্থক্ষেত্র’গুলোর অবস্থা দেখতে। দাশনগর থানার পিছনে সিটিআই-এর দিকে যেতে আরতি কটন মিল। ভারত সরকারের ন্যাশনাল টেক্সাইল কর্পোরেশন অধিগ্রহণ করেছিল আগেই। সুতো তৈরি হত। কিন্তু করোনা অতিমারির লকডাউনে বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। নিরাপত্তারক্ষীদের ঘরে একজনকে বসে থাকতে দেখলাম।

হাওড়া-আমতা রোডে দাশনগর বাসস্টপের আগেই রাস্তার ধারে ইন্ডিয়া মেশিনারির খণ্ডহর। বিবর্ণ চেহারায় বিগত সুদিনের সাক্ষী দিচ্ছে। অনেকে বলেন, ‘মৌচাক’ সিনেমায় এই কারখানায় শ্যুটিং হয়েছিল। কাছেই একটা পেট্রোল পাম্প। এটির মালিক আলামোহন দাশের সন্তান চন্দ্রকুমার। কিছু তথ্য পাওয়ার আশায় পেট্রোল পাম্পে ঢুকেছিলাম। কিন্তু ম্যানেজার ভদ্রলোক বেশ ব্যস্ত ছিলেন। বিরক্তই হলেন। পালিয়ে এলাম। চপলাদেবী স্কুলের পাশে আলামোহনের বাসভবন। সেখানে আর যাইনি। দুপুর হয়ে গিয়েছে। পেট্রোল পাম্পের মতোই তাড়া খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু ইচ্ছে ছিল। একটা তথ্য নিয়ে সংশয় কাটানোর জন্য। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান জানাচ্ছে, ১৫ বছর বয়সে মুড়ি বিক্রি দিয়ে ব্যবসায়ী জীবন শুরু আলামোহনের। প্রফুল্লচন্দ্র লিখছেন, ‘প্রথম জীবনে ৭-৮ বৎসর কলিকাতার রাস্তায় রাস্তায় খৈ-মুড়ি বিক্রয় করিয়া কর্মজীবন শুরু করিয়াছিল’। কেউ কেউ দাবি করেন, মায়ের ভাজা মুড়ি বিক্রি করতেন। কিন্তু ‘টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা বলছে, ধান চালের ব্যবসা দিয়ে জীবন শুরু।

দাশনগর, দক্ষিণ-পূর্ব রেল।
দাশনগর। আলামোহন দাশের প্রতিষ্ঠিত নগরের নামে স্টেশন।

বাসে ওঠার আগে ছবি তুললাম আলামোহনের। দাশনগর বাসস্টপের কাছেই শহিদ স্মরণে উদ্যানে রয়েছে আলামোহনের পূর্ণাবয়ব মূর্তি। উল্টোদিকে দাশনগর স্টেশন। আলামোহন দাশের প্রতিষ্ঠিত নগরীর নামেই। এখনকার বাসযাত্রীরা কি মূর্তি দেখে আগ্রহী হন? জানতে চান কার মূর্তি? কী তাঁর কীর্তি? বা স্টেশনের নাম এমন কেন, জানতে?

হয়তো কিংবা নয়। ব্যবসায়ে উদ্যমহীনতার সঙ্গেই তো বাঙালির আরেক অভিধাও রয়েছে। বিস্মৃতিপ্রবণ বাঙালি!

তথ্যসূত্র: ১। এ নগর নেমড আফটার হিম (দ্য টেলিগ্রাফ)- অনুপম মুখার্জি, ২। ‘মরণোন্মুখ’ বাঙালিকে শিল্প ও বাণিজ্যমুখী করতে পরিবর্তন চাই (আনন্দবাজার)- মোহিত রায়, ৩। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (প্রথম খণ্ড)

ছবি- লেখক

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *