হামিরহাটি বিট, বাঁকুড়া।
জঙ্গল যাপন বিশেষ ভ্রমণ

সাউলিয়ার জঙ্গলে টোটো-সাফারি

দীপক দাস

এক ফরাসি ইতিহাসকার ও সাহিত্য সমালোচক নাকি ঘোরাঘুরির বাতিক যাঁদের রয়েছে তাঁদের মোটামুটি ছ’ভাগে ভাগ করেছেন। একদল পথ চলতে পারলেই খুশ। আরেক দল হোটেলের জানলা দিয়ে ‘সাইট সিয়িং’ করে। ঘুরতে গিয়ে ভাত ঘুম দিয়ে, খবরের কাগজও পড়ে। দল ছাড়া বেরোতে চায় না আরেক দল। অচেনা খাবার মুখে তোলে না, টেনেটুনে খরচ করে দলটি। অন্য দল ঘোরে দুর্লভ গাছপাথর ইত্যাদির খোঁজে। বাকি দলের ব্যামো ক্রিকেটে কপিবুক শটের মতো গাইড বুক মাফিক ঘোরাফেরা। তাতে যে হোটেলের কথা থাকে সেই হোটেলেই ওঠে। আবার খাবারের দাম গাইড বুকে লেখা থেকে বেশি নিলে ঝগড়াও করে।

এমন ষড়স পর্যটকদের কথা জানা ইস্তক মাপজোক শুরু হয়েছিল মাথায়। আমাদের কোন দলে আঁটা যায়। চিন্তা ভাবনার উত্তাপে মাথার অনেকখানি ঘিলু গলিয়েও তেমন সুবিধে হল না। নিজেদের কেমন যেন তিনমেশালি চারমেশালি ঘুরিয়ে বলে মনে হল। ছয়মেশালি নয়, কারণ গাইড বুক দেখে ঘুরি না। কিন্তু পথ চলাতে আমাদের ভারী আনন্দের। আমরাও দলবল নিয়েই বেরোই। কিন্তু অচেনা খাবারে নাক সিঁটকাই এমন বদনাম বিশ্ব কুচুটে বন্ধুও দিতে পারবে না। গাইড বুক? সদ্য মহালয়া গিয়েছে। উত্তরে মহিষাসুরের যুদ্ধ শুরুর আগের হাসির আওয়াজ বসিয়ে নিন— হা…হা…হা।

সোনামুখি রেলস্টেশন। দারুণ লেগেছিল।

ঘুরিয়েদের এই ভাগযোগ যাঁর থেকে শেখা তাঁকে চিনি। আমাদের প্রিয় যুধাজিৎ দাশগুপ্ত। তিনি ২০১৮ সালে ‘দেশ’ পত্রিকার ছুটি সংখ্যায় ‘ডোন্ট প্যানিক’ নামে একটা লেখায় এ সব উল্লেখ করেছিলেন। দেখা হলে তাঁর কাছ থেকে আমাদের দল নিয়ে সংশয় দূরের চেষ্টা করব। প্রাথমিক ভাবে বেরিয়ে পড়ায় আনন্দ দলে ঢুকে পড়া যাক।

এই তো গত অগস্টের কথা। অনেকদিন পরে বেরনোর সুযোগ হয়েছিল। দীপুবাবুর ব্যস্ততা কমায় ঘুরতে বেরনো। মঙ্গলবারের সফর। যেদিক তাকাই কিছুটা দূর পর্যন্ত ঘোরা। সব বাতিল হল। তখনই মনে পড়ল, মশাগ্রাম-বাঁকুড়া মেমু ট্রেনের কথা। এখন হাওড়া থেকে পরিষেবা শুরু হয়েছে। ঠিক হল, ওই ট্রেনে চড়ে বসা যাক। তার পর লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে ঠিক একটা গন্তব্য বার করে নেওয়া যাবে। না হলে ওই রুটটা একটু চকিত-দর্শন করে নেওয়া। যেমন করেছিলাম, রামপুরহাট থেকে দুমকা পর্যন্ত।

নাম ভুলে যাওয়া জঙ্গলের সেই তেমাথা।

ট্রেনের খোঁজখবর নেওয়া হল। কিন্তু হাওড়া থেকে তেমন সুবিধে হল না। ট্রেন বিকেল ৪টে ১৫তে। পুরো দিনটা নষ্ট। ঠিক হল যে কোনও ট্রেনে মশাগ্রাম চলে যাব। টিকিট বাঁকুড়া পর্যন্ত থাকবে। পথে তেমন কোনও জায়গার সন্ধান পেলে নেমে যাওয়া হবে। ভোর ৪টের সময়ে বেরনোর সিদ্ধান্ত হল।  হাওড়ায় না গিয়ে বালি স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠব। কিন্তু বেরনোর সময়েই অশনি সঙ্কেত। সঙ্গে টিপ টিপ বৃষ্টি। দু’কিলোমিটার হাঁটতে হবে। আমি আর দীপু কিলোমিটার খানেক যেতে না যেতেই তুমুল বৃষ্টি আর ‘গরজে গরজে গগনে’। শুনেছি চলন্ত লোকের উপরে বাজ পড়ে না। কিন্তু চারপাশে প্রচুর গাছপালা। সেগুলোর একটাতে পড়লেই…। শোনা কথায় বিশ্বাস না রেখে একটা নির্মীয়মাণ বাড়ির ছাওয়ায় গিয়ে দাঁড়ানো গেল।

রাস্তার মাঝের সেই কালভার্ট।

একসময়ে আকাশ শান্ত হল। আবার হেঁটে দু’জনে বড়গাছিয়ায়। কিন্তু ইন্দ্র বাড়ি থেকেই বেরোয়নি। আমরা নাকি না বেরিয়েই মজা করছি ভেবে ও আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রচুর গালমন্দ করে আনা হল বাস স্টপে। ততক্ষণে সময় কমেছে অনেকখানি। একটা বাস ছাড়তে হয়েছে। রাগায়িত নয়নে ইন্দ্রর দিকে চেয়ে রইলাম। ও ভয়ে অনেকক্ষণ কথা বলেনি।

শলপ সেতুর মাথায় বাস থেকে যখন নামলাম তখন আবার তুমুল বৃষ্টি। এখান থেকে বালি যাব। লোকের বেশ ভিড়। কিন্তু বাস নেই। একটা ভাড়ার গাড়ি এসে থেমেছিল সেতুর নীচে। বালি দিয়েই যাবে। তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই সেঁধিয়ে গেলাম তিন জনে। দৌড়তে দৌড়তে স্টেশনে। দীপু টিকিট গাড়িতে বসেই মোবাইলে কেটে নিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন এসে গেল। যথাসময়ে মশাগ্রামও। বৃষ্টি আমাদের পিছু ছাড়েনি তখনও। আমরা ৮.০৫টার মেমু ধরেছিলাম। এর পরের ট্রেন সেই ১২.২০টা। সকালের ট্রেনটা না পেলে পরিকল্পনাটাই থাপ্পড় খাওয়া মশার মতো মারা যেত। সেই জন্যই ইন্দ্রর উপরে এত রাগ হচ্ছিল।

জঙ্গলের মধ্যে একটি পাড়া।

মশাগ্রাম-বাঁকুড়া মেমু ধরতে গেলে মূল স্টেশন থেকে খানিকটা বাইরের দিকে যেতে হয়। সময় ছিল না বেশি। দ্রুত ট্রেনের কাছে পৌঁছে গেলাম। ফাঁকাই ছিল ট্রেন। জায়গা পেতে অসুবিধা হল না। ইন্দ্র তো তখন সকালের দোষটা খানিকটা কাটিয়ে উঠেছে। আমাদের রাগও তখন পড়ে গিয়েছে অনেকখানি। সেটা বুঝতে পেরেই ওর খিদে পেয়ে গেল। স্টেশনে লুচি-ঘুগনি বিক্রি হচ্ছিল। ওঠার সময়েই দেখে নিয়েছিল। দু’হাতে দু’টো শালপাতা নিয়ে হাজির হল কিছুক্ষণের মধ্যে। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। সক্কালবেলা ভাজাভুজি কিছু খেতে ইচ্ছে করল না। দু’টো শালপাতা ইন্দ্রই শেষ করল। আমরা খেলাম ঝালমুড়ি। তাও টেস্ট করল ও।

এ বার কোথায় নামা যায় ঠিক করতে হবে। মেমু ট্রেনের দরজার কাছটা বেশ প্রশস্ত। মালপত্র নেওয়ার সুবিধের জন্য বোধহয়। ওখানে বেশ কয়েকজন মাছওয়ালা বসেছিলেন। বাঁকুড়ার দিকে মাছের পোনা বিক্রি করতে চলেছেন। ওঁদের সঙ্গে ভাব জমালাম। সুন্দর জায়গা, জঙ্গলের খোঁজখবর। ওঁরা বেলিয়াতোড়, ছান্দারের নাম বলছিলেন। সে সব ঘোরা আমাদের। এক জন বললেন তা হলে ধানসিমলা নেমে যান। ওখান থেকেই জঙ্গল শুরু হচ্ছে।

সেই সব শিয়ালেরা।

ইন্দাসে নেমে ধানসিমলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছিল। ইন্দাসে অন্য একটা কাজে নেমেছিলাম। সে অন্য সময়ে বলা যাবে। ওখানে ঘোরার সময়ে টোটোচালক দাদা জানালেন, ধানসিমলার থেকে সোনামুখি স্টেশন ভাল। স্টেশনটাই জঙ্গলের ভিতরে। জঙ্গলের মধ্যে স্টেশন, স্টেশন থেকে পাহাড় বড় রোমাঞ্চকর।

ইন্দাসে ঘণ্টাদুয়েকের জন্য বিয়েবাড়ির লজের একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। চানটান করে সামান্য একটু ‘পাওয়ার ন্যাপ’ নেওয়া। চান হল বটে। কিন্তু ইন্দ্রর জ্বালায় ঘুম আর হল না। যতবার ঘুম আসে ততবার প্লাস্টিকের কিছু নিয়ে খচমচ করে। নয়তো ধপ করে কিছু রাখে। ট্রেনের সময় হতে টোটোচালক দাদাকে ডেকে নিয়ে ইন্দাস স্টেশনে। সেই মশাগ্রাম মেমু। ১২.২০টা।

অরণ্য ও এক অরণ্যবাসিনী। জ্বালানির খোঁজে।

সোনামুখি স্টেশনে নেমে মন ভাল হয়ে গেল। আপ প্ল্যাটফর্মের পাশেই জঙ্গল। ওভারব্রিজে উঠলে জঙ্গল, রেললাইন, স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া ট্রেন মিলিয়ে অসাধারণ একটা চিত্রকল্প তৈরি করে। সোনামুখি নামা সার্থক।

স্টেশন থেকে বেরিয়েই একটা টোট পেয়ে গেলাম। চালকদাদাকে বুঝিয়ে বলা হল, আগে একুট খাওয়াদাওয়া, তার পর ঘোরা। তিনি নিয়ে গেলেন বাজারের একট হোটেলে। বেশ ভাল খাওয়াদাওয়া। দামেও শস্তা। তার পর শুরু হল আমাদের সারা দিনের সফর। ফেরার ট্রেন সন্ধেয়। এই সোনামুখি থেকেই। জঙ্গল ছাড়া আর কোথায় ঘোরা হবে সে সব ছকে নেওয়া হয়েছে।

প্রথমে সোনামুখি বাজার থেকে কাছের একটা জঙ্গলে যাওয়া হল। জায়গা ও জঙ্গলের নাম লিখে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। মূল রাস্তার চারপাশেই জঙ্গল ছিল। সেখান থেকে ডান দিকের রাস্তা ধরে এই জঙ্গলের দিকে আসা। ডান দিকের রাস্তাটা পাকা ছিল। আমরা যেখানে গিয়ে থামলাম সেখানে সব কাঁচা রাস্তা। সব বললাম, কারণ এখানে একটা তিন মাথার মোড় রয়েছে। কাঁচা রাস্তার মোড়। জঙ্গলের ভিতরে কাঁচা রাস্তার মোড় বেশ ভাল লাগছিল।

হাতি টাওয়ার।

আবার যাত্রা শুরু হল। কাঁচা ও অতি খারাপ রাস্তা। গর্তে ভরা। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টিতে সে সব গর্ত সজল। আমাদের টোটো গর্তে পড়ে উঠে এমন ভাবে চলছিল যেন মনে হচ্ছিল নৌকায় যাত্রা করেছি।  ঢেউয়ের দুলুনিতে কাত-সোজা-কাতের চলন নৌকার। এক এক করে পার হচ্ছিলাম কোচডিহি, ভুলাগ্রাম, পাথরা। এই নিয়ে পাথরা নামের তিনটে গ্রামের সন্ধান পেলাম। একটা মেদিনীপুরের কাছে। বিখ্যাত মন্দিরময় পাথরা। আরেকটা ঝাড়গ্রামে। এটা বাঁকুড়ায়।

জঙ্গলমহলের গ্রামের দৃশ্যগুলো চেনা। জঙ্গলের পাশে চাষের জমি। জঙ্গলের মধ্যে কয়েকঘর বসত। রাস্তার মাঝে কালভার্ট। দু’একটা সাইকেল, পোষা রোগাটে মুরগি, রাস্তার পাশে আড্ডা দেওয়া গ্রামবাসী এ সব দেখতে দেখতেই সাউলিয়ায় পৌঁছলাম। এই জঙ্গলটা পর্যটকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। রাস্তার পাশে বোর্ড লাগানো দেখলাম, সাউলিয়ায় হোটেল ও রেস্তরাঁ আছে। হাতি টাওয়ার আছে।

হাতি টাওয়ার পর্যন্ত যাওয়া হবে ঠিক হল। বৃষ্টিতে ভেজা লালমাটির রাস্তা, ভেজা জঙ্গল মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি এনে দেয়। জঙ্গলে কোনও প্রাণী আছে কিনা জানা নেই। হাতি আসে মাঝে মাঝে। বলছিলেন টোটোচালক দাদা। একজনকে নাকি মেরেছে কিছুদিন আগে। যেতে যেতে দূরে তিন চারটে কুকুরের মতো প্রাণী দেখা গেল। আমাদের আলোচনা শুরু হয়ে গেল, হুড়াল নয় তো? হুড়াল মানে ভারতীয় নেকড়ে। সে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে এগুলো শিয়ালই মনে হচ্ছিল। কাছে যেতে বোঝা গেল শিয়াল। ঢুকে পড়ল রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে।

বন দফতরের সেই বোর্ড।

হাতি টাওয়ারের কাছে পৌঁছলাম। এখানে জঙ্গল বেশ ঘন। টাওয়ারে ওঠার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সিঁড়ির কাছে গ্রিলের গেটে তালা দেওয়া। তা হলে টাওয়ার তৈরি করা! রাগ হচ্ছিল খুব। রাগ সামলে ছবি তোলা শুরু হল। বন দফতরের একটা বোর্ড চোখে পড়ল। বন ও বন্যপ্রাণ রক্ষা বিষয়ক। তাতে জরিমানার কথাও উল্লেখ রয়েছে। বোর্ড থেকে কিছু তথ্য মিলল। যেমন, জঙ্গলটি ভুলা এফপিজি-র অন্তর্গত। এর পুরো নাম জানতে পারিনি। আর জানলাম, হামিরহাটি বিট এলাকার মধ্যে পড়ে সাউলিয়া। বোর্ডে থাকা ছবি দেখে মনে হল, হুড়াল নেই এই জঙ্গলে। আছে হাতি, শিয়াল, খরগোশ আর ময়ূর।

ছবি তুলতে তুলতেই একদল লোকের সঙ্গে দেখা। তাঁরা সাইকেল চড়ে চা খেতে চলেছেন জঙ্গল পার করে। জায়গাটার নাম বলেছিলেন। কিন্তু লিখে নিতে ভুলে গিয়েছি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে গল্প জোড়া আমাদের স্বভাব। শুরু হয়েছিল স্বাভাবিক ভাবেই। হাতি টাওয়ার বন্ধ কেন জানতে চাইলে তাঁরা বললেন, নোংরা কাজ হতে শুরু হয়েছিল। ফরেস্টারদের বলে বন্ধ করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে আর কথা বাড়াইনি। আলোচনা হচ্ছিল অন্য বিষয় নিয়ে। সে অরণ্যবাসী মানুষগুলোর দুঃখের বারোমাস্যা। তাতে অনেক কিছু জড়িয়ে। লোকগুলো পেষাই হয় নানা দিক থেকে। সে সব ভ্রমণকথায় উল্লেখ করা উচিত নয়। ভ্রমণ সুন্দর অনুভবের।

লোকগুলো সাইকেলে চড়ে চা খেতে চলে গেলেন। আমরাও বৃষ্টির জলে নরম লালমাটি, চান করে আরও সবুজ হয়ে ওঠা জঙ্গলের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ফিরতে লাগলাম। ওদের দুঃখের কথা ভুলে গিয়ে।

ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ ও দীপশেখর দাস

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *