সারান্ডার জঙ্গল।
পাহাড়িয়া বাঁশি বিশেষ ভ্রমণ

চললাম তবে চাইবাসা— আতঙ্ক পর্ব

দীপক দাস

জায়গার নাম শুনে চমকে উঠেছিলেন ভদ্রলোক, ‘‘ওরে বাবা, সারান্ডা!’’ পরের প্রশ্ন, ‘‘কেন যাবেন?’’ এ প্রশ্ন শুনেছিলাম চাইবাসা স্টেশনে এক আরপিএফ কর্মীর মুখেও। তিনি চমকাননি। তাঁর ‘‘কেন যাবেন?’’ প্রশ্নে সাবধানবাণী ছিল। তাতে অযথা ঝুঁকি না নেওয়ার পরামর্শও ছিল বোধহয়।

স্টেশনে নেমে আমরা একপ্রস্থ জিজ্ঞাসাবাদ চালাই। সেই অভ্যাসে জানতে চেয়েছিলাম, ঝিঁকপানি নামে জায়গাটায় থাকার ঘরটর আছে কিনা? চাইবাসায় থাকার জায়গা কেমন? সারান্ডার জঙ্গলে যেতে হলে কী করতে হবে? ইত্যাদি।

আরপিএফ কর্মীর কাছে যা জানা গিয়েছিল, তার মর্মার্থ, ঝিঁকপানিতে থাকার জায়গা মিলবে না। ওই জায়গায় এই সন্ধের দিকে না যাওয়াই ভাল। আজ চাইবাসায় থেকে কাল ঘুরতে বেরনোর সময়ে ঝিঁকপানি দেখে নেওয়া যাবে। আমরা সেই পরামর্শ মতো একটা টোটোয় উঠে ঘর খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলাম।

সিরিংগসিয়া ঘাঁটির শহিদ স্মারক স্থল। প্রকৃতি অসাধারণ।

বাজারের কাছে খানদুয়েক হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলেন টোটোচালক। আমরা এক ঘরে চারজন থাকতে চাইছিলাম। এসি ছাড়া ঘর। প্রথমটায় একেবারে ছাদে ঘর মিলেছিল। ইন্দ্রর পছন্দ হয়নি। দ্বিতীয়টার শৌচালয় ব্যবস্থা পছন্দ হয়নি দীপু আর ইন্দ্রর। প্রথমটায় ফিরে এলাম। সেই ভোর ৩টে থেকে ছুটন্ত শরীর থামতে চাইছিল। হয়তো আমার বয়স হয়েছে বলে। দলের নবীনতম সদস্য হিসেবে দাবি করা মহাপুরুষটির অবশ্য এলাকার আরও কয়েকটি হোটেলে ঢুঁ মারার ইচ্ছে ছিল। সে ইচ্ছেয় ভেটোর জল দিয়ে প্রথমটার ঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। এসি ঘর। তবে তা বন্ধ করা থাকবে। চানটান করে সামান্য বিশ্রাম। তার পর গাড়ি খুঁজতে বেরনো।

রাস্তায় অটোচালক, দোকানদারদের আরেক প্রস্ত জিজ্ঞাসাবাদ। গাড়ি কোথায় মিলবে? নির্দেশিত জায়গায় গিয়ে প্রথম গাড়িটাকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি আঁতকে উঠেছিলেন। পরে কাছেই এক মাঠের কাছে গাড়ি মিলেছিল। গাড়িচালকদাদা আপত্তি করেননি। ঠিক কোথায় যাব সেটা জানতে চেয়েছিলেন। সারান্ডার জঙ্গল বিশাল। ঝাড়খণ্ড থেকে ওড়িশার সীমানা ছোঁয়া। আমরা আগেই লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে মূল লক্ষ ঠিক করে নিয়েছি, কিরিবুরু আর মেঘাহাতাবুরু। তার পর পথে যদি কিছু খোঁজ মেলে।

শহিদ স্মারক স্থল।

সকাল ৮টায় রওনা দিয়েছিলাম সারান্ডার দিকে। আমরা যে দিকে যাচ্ছি সেদিক থেকে মাঝে মাঝেই ম্য়াটাডর, ছোটা হাতিতে করে লোকজন আসছিলেন। চালকদাদা জানালেন, চাইবাসায় বিশাল একটা হাট হয়। যদি তাড়াতাড়ি ফেরা যায় তা হলে হাট দেখাতে নিয়ে যাবেন। চাইবাসা শহর ছাড়িয়ে আমাদের গাড়ি জঙ্গলের রাস্তা ধরেছে।

জঙ্গলপথে ছোট ছোট গ্রামগুলো পার করতে করতে গাড়ি এগোচ্ছিল। গল্প করছিলেন চালকদাদা। জঙ্গলবাসী মানুষগুলোর জীবন, পাথর খাদান, সিমেন্টের কারখানার কর্মীদের কথা। শুনতে শুনতে এসে পৌঁছেছিলাম সিরিংগসিয়া ঘাটিতে। এখানে একটি শহিদ স্মারক হয়েছে। একদল বীর হো সন্তানের স্বাধীনতার লড়াইয়ের স্মারক। ১৮৩৭ সালে পোটো হো বা পোটো সর্দারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন আদিবাসী মানুষজন। এই সিরিংগসিয়া ঘাঁটিতে তুমুল যুদ্ধ হয় ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে। অসম লড়াই ছিল। তবুও তির-ধনুক নিয়ে প্রতিরোধ গড়েছিলেন হো জনজাতি। ১০০ জনের বেশি ইংরেজ মারা গিয়েছিল সেই প্রতিরোধে। শহিদ হয়েছিলেন ২৬ জন আদিবাসী যুবক। বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশরা ধরপাকড়, গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিতে শুরু করে। সিরিংগসিয়া ঘাঁটিতে গ্রেফতার হন পোটো হো। তার আগে গ্রেফতার হয়েছিলেন তাঁর বাবাও। ১৮৩৮ সালের এক জানুয়ারি জগন্নাথপুরে এক বটগাছে ফাঁসি দেওয়া হয় পোটো হো-কে। তাঁর সঙ্গেই ফাঁসি দেওয়া হয় বুড়ই হো তথা নারা হো-কে। পরদিন সিরিংগসিয়া ঘাঁটিতে ফাঁসি হয় বোরো হো-র। এই শহিদ স্মারক সেই বীর ভারতীয় সন্তানদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।

বিদ্রোহের খণ্ডচিত্র। বোঝাই যায়, কী অসম লড়াইয়ে প্রবল বীরত্ব দেখিয়েছিলেন মানুষগুলো।

সিরিংগসিয়া গ্রামটা পশ্চিম সিংভূম জেলায় পড়ে। শহিদ স্মারক তৈরি হয়েছে ১৯৮২ সালে। জায়গায় সুন্দর। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। দু’জন সিআরপিএফ জওয়ান পাহারায় রয়েছেন। তবে দরজায় তালা দেওয়া। শহিদ স্মারকে শ্রদ্ধা জানানোর কোনও উপায় ছিল না। তবে ভিতরটা প্রচুর আগাছা হয়েছে। হয়তো পোটো হো-র শহিদ হওয়ার দিনে সাফসুতরো করা হয়। আমাদের দেশ যাঁদের জন্য স্বাধীন তাঁদের জন্য বরাদ্দ একটি করে দিনই।

গাড়ি আবার ছুটল। এলাম জগন্নাথপুর নামে একটা জায়গায়। একটু জমজমাট। একটা দুর্গাপুজো হচ্ছে। বাজার এলাকায় ভাল দোকানপাটও রয়েছে। বাঙালি খুব বেশি আছেন বলে মনে হল না। অবাঙালিরাই দুর্গাপুজোর আয়োজক। জগন্নাথপুরের রাজাবাসা গ্রামে জন্ম হয়েছিল বীর শহিদ পোটো হো-র। এটাই কি সেই জগন্নাথপুর? সেটা হওয়াই সম্ভব। এখানকার কোনও বুড়ো বটের ডালে ব্রিটিশরা ঝুলিয়ে দিয়েছিল তাঁর দেহ। অন্যের গোলামি থেকে নিজেদের গোষ্ঠীকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন ভারতের বীর সন্তানটি।

কিরিবুরুতে আমরা নামছি উপত্যকার দিকে।

রাস্তায় পড়ল নোয়ামুন্ডি। রাস্তার পাশে বড় বড় আবাসন নজরে এল। এটা আসলে টাটাদের শহর। এখানে প্রচুর লৌহ আকরিকের খনি রয়েছে টাটাদের। সংস্থার কর্মীদের জন্যই আবাসন তৈরি করা হয়েছে। আবাসনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শহর। আগে নাকি কর্মীদের পাহাড়ের উপরে ঘরবাড়িতে রাখা হত। এখন এ দিকে চলে এসেছে।

একটু টিফিন করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ হয়নি। দোকানপাট চোখে পড়েনি তেমন। তবে গোটা রাস্তায় মাঝে মাঝেই একটা জিনিস চোখে পড়েছে। একটা করে পলিথিনের ছাউনি আর অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি। হাঁড়িয়া বিক্রির জায়গা। কোথাও সার সার ছাউনি। বিশেষ দিনে নাকি প্রচুর হাঁড়িয়া বিক্রি হয়। চালকদাদা একটা চায়ের দোকান দেখে গাড়ি থামালেন। এটা বড়া জামদা। কাছেই স্টেশন। প্রবল বিলম্বের কারণে জনশতাব্দী আর বরবিল যেতে না পেরে এখানেই যাত্রা সাঙ্গ করছে বেশির ভাগ দিন। স্টেশনটা কাছেই। খনি এলাকা বলে প্রচুর ধুলো। আগে নাকি আরও ছিল। এখন কিছু খনি বন্ধ হওয়ায় বড়া জামদার হাল খারাপ হয়েছে। লোকের কাজ গিয়েছে। দোকানপত্র বন্ধ হয়েছে। বড়া জামদাতেও একটা দুর্গাপুজো হচ্ছে।

কিরিবুরুর হিল টপ থেকে।

অবশেষে এসে পড়লাম কিরিবুরু। মুন্ডারি ভাষায় কিরিবুরু শব্দের অর্থ হল, হাতিদের জঙ্গল। কিরি মানে হাতি আর বুরু হল জঙ্গল। যখন গিয়েছিলাম তখন এই নাম জানা ছিল না। তবে সারা রাস্তায় হাতির ভয় কেউ দেখাননি। পাহাড়-জঙ্গল মিলিয়ে প্রকৃতি অসাধারণ। এখানে হিল টপ নামে একটা জায়গা আছে। সেখান থেকে নীচের উপত্যকা বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায়। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের মাথা। গাছগাছালিতে সবুজ। আমরা নীচের দিকে কিছুটা নামলাম। এ সব জায়গায় ছবি তোলার শেষ থাকে না। অনেকটা সময় কাটালাম।

ঝিকরা ঝরনায় যাওয়ার পথ।

কাছেই একটা খাবারের দোকান ছিল। আমরা তখনও খাচ্ছি। ইন্দ্র খাওয়াদাওয়া দ্রুত সেরে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল। ফিরে এল কিছুটা উত্তেজিত অবস্থায়। হাওয়া নাকি গরম এখানে। জঙ্গলপথে কিছুটা গেলে ওড়িশা। করমপদা নামে একটা জায়গা আছে। জায়গাটা খুব সুন্দর। কিন্তু কিছু একটা ঘটেছে। গাড়ি চেকিং করছে বাহিনী। ইন্দ্র সেখানে যেতে যায়। আমি প্রথমেই নাকচ করলাম। যেখানে ঝুঁকি রয়েছে সেখানে অকাজের বীরত্ব দেখানোর কোনও মানে নেই। আমরা বন্ধুরা হয়তো কেরামতি কাহিনিতে (অ্যাডভেঞ্চারের বাংলা এমনই করেছিলেন সুকুমার সেন) মাতলাম। তার পর বিপদে পড়লাম। তাতে চালকদাদাও বিপদে পড়বেন। দীপু, বাবলাও বারণ করল।

পাহাড়ের মাথায় খনিজ উত্তোলনের ব্যবস্থা।

গাড়ি ঘুরিয়ে চললাম মেঘাহাতাবুরু। পথে আরেকবার জিজ্ঞাসাবাদ। ইন্দ্র এই এলাকায় আগে ঘুরে গিয়েছে। ওকে গাইড মেনেছিলাম। কিন্তু যথারীতি ভুলক্কর স্বভাব। হঠাৎ মনে পড়ছে এখানে কোথাও ঝরনা দেখেছিল। তাই জিজ্ঞাসা পথের পাশে বাইক থামিয়ে গল্প করা দু’জনকে। তাঁরা বললেন, ফেলে এসেছি। কিছুটা টানাপড়েন শুরু হল। যে দিকে ঝরনা সে দিক থেকে চাইবাসার দূরত্ব বেশি নয়। আবার হঠাৎ দেখা গাইড দু’জন জানাচ্ছেন, মেঘাহাতাবুরু দেখতে হলে সন্ধে নামার আগে হলে ভাল। সূর্য ডোবার সময়ে নাকি অসাধারণ দৃশ্য তৈরি হয়। আর ভাগ্য ভাল থাকলে যদি তার আগে এক পশলা বৃষ্টি হয় তা হলে সোনায় সোহাগা। রামধনু ওঠে পাহাড়ের মাথায়।

আপন ছন্দে বেগে চলেছে ঝিকরা।

এমন দৃশ্য দেখতে কার না মন চায়। কিন্তু দূরত্ব হবে দ্বিগুণ। এই পথেই আবার ফিরতে হবে। চালকদাদা আমাদের ভালর জন্যই বললেন, আগে মেঘাহাতাবুরু দেখে নিতে। কাছাকাছি এসে গিয়েছি। কিন্তু দীপু রাজি হল না। ও গোধূলির পাহাড় দেখতে চায়। গাড়ি ঘোরানো হল। চালকদাদা খুব ভাল মানুষ। নাম তৌসিফ। কিন্তু গতকাল নম্বর নেওয়ার সময়ে ইন্দ্র নাম সেভ করেছিল কৌশিক। আমরা সারা রাস্তা কৌশিক বলেছি। উনি সাড়াও দিয়েছেন। কিন্তু কয়েকটি কথায় সংশয় হয়েছিল। তাই নাম আবার জিজ্ঞাসা। সংশয় নিরসন।

ঝরনার আরেক রূপ।

অসাধারণ দৃশ্যপট দেখতে দেখতে, দু’টি সিআরপিএফ পোস্ট পেরিয়ে ঝরনার কাছে পৌঁছলাম। ঝরনার নাম ঝিকরা। জায়গার নাম বোলানি। এটা কিন্তু ওড়িশায়। বাবলা এ বার সফর শুরু থেকে ওড়িশা ওড়িশা করছিল। ‘সিদদত সে’ চেয়েছিল বোধহয়। তাই ‘পুরি কায়নাত’ ওর হয়ে কাজ করেছে। এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ একে অপরের পা টানাটানি হল।

গাড়ি থেকে নেমে ঝরনা পর্যন্ত যাওয়ার পথটি অসাধারণ। ঝরনার জঙ্গলে ঢোকার আগে পাহাড়ের মাথায় আলো জ্বলতে দেখেছিল বাবলা বা দীপু। ভাল করে নজর করতে দেখা গেল, সেখানেও বোধহয় কোনও খনি আছে। এক চুড়ো থেকে আরেক চুড়োয় যাওয়ার ঝুলন্ত পথও দেখা গেল। একটা ভিজে জঙ্গুলে জায়গা। অনেক উপর থেকে ঝরনা সবেগে নেমে আসছে। তার পর পাথরের উপর দিয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলেছে। বাতাসে অনবরত উড়ছে জলের কণা। বেশিক্ষণ মোবাইল বার করে রাখলে কাচের উপরে জলবিন্দু জমছিল। লোকজনের ভালই যাতায়াত আছে। একটা ছাদহীন ঘেরাটোপ মতো করা রয়েছে। মেয়েদের পোশাক ছাড়ার জায়গা। হয়তো কেউ কেউ ঝরনার জলে চান করেন। ছেলে মেয়ের একটা দল নানা যন্ত্রপাতি নিয়ে রিলস বানাচ্ছিলেন। ঝরনার সামনে জঙ্গুলে মৌতাতও বসে। একটা ডাস্টবিন ভর্তি মদের বোতল দেখলাম। এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছুক্ষণ থাকলে এমনিতেই নেশার মতো লাগে। এর পর নেশা করলে অন্য কোনও চোখ খোলে বোধহয়।

পাহাড়ের স্নেহধারা।

আবার মেঘাহাতাবুরুর পথ ধরা হল। সেই সব সিআরপিএফের পোস্ট পার করতে করতে এগনো। মেঘাহাতাবুরু মানে হল মেঘের পাহাড়। হো ভাষায় সারান্ডার অর্থ হল, সাতশো পাহাড়ের দেশ। সেটা বোঝা যায়, মেঘাহাতাবুরুর ভিউ পয়েন্ট থেকে নীচের দিকে তাকালে। ঢেউ খেলানো সবুজ প্রান্তর কোথা থেকে কোথায় যেন চলেছে। গুনে দেখলে হয়তো হাজার পাহাড়ও হতে পারে। তখন রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছিল। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছিল না। সেই রোদেও দেখি, পাহাড়ের মাথায় কুয়াশার মতো জমেছে। সেই হঠাৎ গাইডটি ঠিকই বলেছিলেন। গোধূলির আলোয় আর বৃষ্টিস্নাত দিনে সাতশো পাহাড়ের দেশ তার সব রূপ উন্মুক্ত করে ধরা দেয়। আমরা ভাগ্যহত। দেখতে পেলাম না সে রূপ।

মেঘাহাতাবুরু। ওই মাঝের ক্ষতটা কীসের? বুঝতে পারিনি।

এ বার ফেরার পালা। দুপুরে খাওয়া হয়নি। পথে মিললে হবে। না হলে চাইবাসায় ফিরে। একটা কথা বলা হয়নি। কিরিবুরুর দু’কিলোমিটার আগে থেকে বাবলা একটা দড়ির সেতুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। অপরিসর সেতু। রাস্তার একপাশের গাছ থেকে আরেক পাশের গাছ পর্যন্ত বাঁধা। কী এগুলো? গাড়ি থামিয়ে দেখা হল। লেখা আছে রোপ ক্যানোপি। এগুলো নাকি বন্যপ্রাণীদের রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থা। এখানে কয়েক জায়গায় বাঁদর দেখেছি। তাদের হয়তো সুবিধা হয়। কিন্তু শিয়াল, খরগোশ ইত্যাদির মতো স্থলচর প্রাণীরা কী করে? তারা জঙ্গলের মধ্যে তৈরি করা এই রাস্তা পার হয় কী করে? উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

আসলে মানুষের কারবার এমনই। ঘা খেয়ে যায় প্রকৃতি আর মানুষ। ইংরেজরা বনজ সম্পদ লুট নির্বিঘ্ন করতে চেয়েছিল। তাই পোটো হো-দের শহিদ হতে হয়। এই জঙ্গলের ভিতর পাকা রাস্তায় কত গাছ আর বন্যপ্রাণ শহিদ হয়েছে, কে জানে! আবার একদল মানুষ স্বাধীন দেশের জনগণকে মেরে জনগণের উপকার করতে উদগ্রীব। তাদের ঠেকাতে রাষ্ট্রও একই পথ নেয়।

অফুরান অপূর্ব প্রকৃতির মাঝে এসব ভয়ের কথাও ঘাই মারতে থাকে। গাড়ি এগোতে থাকে চাইবাসার দিকে।

কভারের ছবি— মেঘাহাতাবুরু

ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ, দীপশেখর দাস, বিভাস বাগ

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *