সপ্তপর্ণা ভট্টাচার্য্য

ছাদে আড্ডা দেওয়ার বেশিরভাগ সময়ই একটা ভাল দিক থাকে। কখনও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ভীষণ ভাল ঘটনাও ঘটে যায়। মুর্শিদাবাদে ফুডকা টিমের প্রথম দিনের ফুড ইভেন্টে অংশ নিয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা লিখেওছিলাম। ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ীর সঙ্গে ছোটে নবাবের ছাদে প্রথমদিনের আড্ডা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাল ঘটনাটা ঘটিয়ে দিল।
ফুডকার দু’জন সদস্য হীরাঝিলে অন্য সদস্যদের নিয়ে শ্যুট করতে গিয়েছিল। বিশেষ কারণে একটু দেরিই হচ্ছিল ফিরতে। আমরা ছোটে নবাবের বাড়িতে। বাড়ি থেকে গঙ্গার দূরত্ব খুব জোর দেড়শো মিটার। গঙ্গার ধারে ছোট নবাবের বাড়ির এক্কেবারে সোজাসুজি লাঞ্চের জায়গা ঠিক করা হয়েছে। ছাদ থেকে সুন্দর দৃশ্য ধরা দিল। এক দিকে গঙ্গা আর অন্য দিকে সেই দেড় দুশো বছরের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য। সুব্রতদা ফারুক আর আমি ছাদে চলে এলাম সেই দৃশ্য আস্বাদনের নেশায়। তিনজনের ইতিহাস বর্তমান আর ভবিষ্যতের গল্প আড্ডায়। হঠাৎ ইন্দ্রজিৎদা এসে যোগ দিলেন। প্রাণখোলা গল্পের আসর জমে উঠল। এক পর্যায়ে ইন্দ্রজিৎদা বললেন, পরের দিন বড়ে কোঠিতে ওঁর শুটিং আছে। ফারুকের আগে থেকেই যাওয়া ঠিক ছিল। সুব্রতদা আর আমাকেও ফারুকের সঙ্গে যেতে আমন্ত্রণ জানালেন দাদা। আমন্ত্রণটা সুব্রতদা আর আমার জন্য সত্যিই অপ্রত্যাশিত ছিল।

রাজা ছিলেন না তাঁরা। কিন্তু তাঁদের বাসস্থান ছিল রাজকীয়।
যাত্রারম্ভে
বড়ে কোঠি আজিমগঞ্জে। শহরটা গঙ্গার ওপারে। লালবাগ নামে বেশি পরিচিত শহরটা। আমরা তিনজন থাকি তিন দিকে। ইভেন্টটা শুরু হবে সন্ধ্যে ৬টায়। অতএব আবার পরিকল্পনা শুরু। প্রথমে ঠিক হল, আমার আর ইন্দ্রজিৎদার গাড়িতে ভাগাভাগি করে সকলে যাব। আজিমগঞ্জ দু’ভাবে যাওয়া যায় মুর্শিদাবাদ শহর থেকে। নৌকোয় গঙ্গা পার করে আর বহরমপুর দিয়ে। ইন্দ্রজিৎদা বহরমপুরে ছিলেন। তাই বহরমপুরের উপর দিয়েই যাওয়া ঠিক হল প্রথমে। ঠিক হল, ফারুক আর সুব্রতদা আমার বাড়ি আসবে। কিন্তু পরের দিন সকালে জানতে পারলাম ওঁদের আরও কিছু পরিকল্পনা আছে দুপুরে। আমরাও ঠিক করলাম, ওরা দু’জন আমার বাড়ি আসবে। আর আমরা নৌকা করে গঙ্গা পেরিয়ে যাব। তাতে সময় বেশকিছুটা কম লাগবে। মুর্শিদাবাদে নৌকায় নদী পার হওয়ার এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আছে। তার উপর যদি গাড়ি থাকে। বাঁশের পাটাতনে গাড়ির চাকা যখন মচমচ করে আওয়াজ তুলে নৌকোয় ওঠে সে এক অভিজ্ঞতা হয়।

বড়ে কোঠির সৌন্দর্যময় ছাদে দুই বন্ধু।
ওদের একটু তাড়াতাড়ি আসতে আসতে বললাম। স্যান্ডউইচ আর কফি খেয়ে বেরোনো যাবে। পরের দিন দু’জন আসতে বেশ দেরি করে ফেলল। এর পর আমরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রওনা দিলাম। বেশ দেরি করে ফেলেছি।
সদর ঘাটে এসে দেখি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হবে। নৌকো ওপার থেকে আসতে সময় নিচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সুব্রতদার বাণী কানে এল। বলল, একটু অতীতে ফিরে গেলে ওই মুহূর্তে আমরা নাকি মাঝ গঙ্গায়। নদীর প্রবাহ আমাদের উপর দিয়ে। মানা যায়? নিজে অতীতে ডুবে এখন সাঁতার না জানা মানুষকে গঙ্গায় ডোবানোর চেষ্টা? নৌকা এসে সে যাত্রা ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে বর্তমানে ফেরাল। গাড়ি সমেত নৌকায় উঠলাম। আমি আর সুব্রতদা গল্প করছি। ফারুক একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। বুঝলাম, আবার পড়া মুখস্থ করতে শুরু করেছে। ওকে আবার ক্যামেরার সামনে কিছু বলতে হবে। গঙ্গা পেরিয়ে ওপারে গিয়ে আবার গাড়িতে উঠলাম। এবার আমাদের ড্রাইভার গাড়িটাকে মোটামুটি পক্ষীরাজ বানিয়ে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে চলল। অজিমগঞ্জ খুব পুরনো শহর। রাস্তা খুব একটা চওড়া নয়। তাই একটু দেরি হচ্ছিল।
অন্দরমহল অভিজ্ঞতা
একটা পুরনো সরু রাস্তার উপর একটা ততোধিক পুরোনো চাকচিক্যহীন দরজার সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াল। সেই দরজা দিয়ে তিন জনে অন্দরমহলে প্রবেশ করলাম। ঢুকেই গোলাপ জল সুগন্ধি আর সিঁদুর চন্দনের ফোঁটা দিয়ে আমাদের বরণ করে নিলেন ওখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন মহিলা। ঢুকতে ঢুকতেই ভাললাগায় মনটা ভরে গেল। সোফায় ইন্দ্রজিৎদা আর ওখানকার ম্যানেজার অভিরূপবাবু বসে আছেন। আমরা ঢোকা মাত্র বুঝলাম আমাদের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছিল। ইন্দ্রজিৎদা অভিরূপবাবুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমরা সোফায় ভাগাভাগি করে বসলাম। দেখলাম ফারুককে অভিরূপবাবু ভালভাবে চেনেন। অভিরূপবাবুই ইন্দ্রজিৎদার কাছে ফারুকের প্রশংসা করে চললেন। আমাদের ভীষণ ভাল লাগছিল।

(বাঁ দিক থেকে) ইন্দ্রজিৎদা, অভিরূপবাবু, ফারুক, সুব্রতদা আর আমি।
একপর্যায়ে অনুভব করলাম ইন্দ্রজিৎদা আমার দিকে বা বলা ভাল আমার হাতের দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছেন। আমি হাত দু’টো কোলের উপর রেখে সোফায় বসেছিলাম। অনুভূতিটা সত্যি কিনা বোঝার জন্য তাকালাম। আর সেটা সত্যি হল। আমি প্রমাদ গুনলাম। নিশ্চয়ই ওঁর মনে আবার কিছু চলছে। আজ নিশ্চিন্ত ছিলাম আমার আর সুব্রতদার দর্শক ছাড়া কোনও ভূমিকা নেই। ছাড় পেলাম না। ইন্দ্রজিৎদা বললেন, ‘‘আপনার হাতগুলো বেশ ম্যানিকিওর করা, হাতের শুটিং হবে। বেশি কিছু করতে হবে না। পিয়ানোর সাদা কালো পর্দায় একবার একটু হাত বোলানো, ব্যাস।’’

খিরা কচৌরি। সঙ্গে কুটে মির্চ কা আচার।
আমার সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে দেখি তারা মজা পাচ্ছে আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে। আমিও ভাবলাম, এ আর এমন কী ব্যাপার? মুখ দেখাতে হবে না, এক্সপ্রেশন নেই। আর পিয়ানো এমনিতেই আমার ভীষণ আদরের। যদিও জীবনে কোনওদিন ম্যানিকিওর করাইনি তবুও ওই হাতই চলবে দেখে খুশি হয়ে গেলাম। এ দিকে অভিরূপবাবু চায়ের বন্দোবস্ত করতে উঠে গেলেন। আর তার মাঝে আমার হাতের শুটিংটা সেরে নেওয়া হল। খুব আলগোছেই ব্যাপারটা সারা হল। তার পর ইন্দ্রজিৎদার শুটিং দল অন্য শুটে ব্যস্ত হয়ে গেল। আমরাও ছাড়া পেয়ে অন্দরমহল দর্শন করতে গেলাম।

ভেতরে কোঠির সাজসজ্জা দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। সমস্ত পুরনো আমলের জিনিস রুচিসম্মত ভাবে যথাস্থানে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। কোনও আধুনিকীকরণের চেষ্টা নেই। যে সব জিনিস ব্যবহার যোগ্য নয় সেগুলোও খুব সুন্দর ভাবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরনো গন্ধটাকে ধরে রাখার যে আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে সেটা বেশ ভাল ভাবে বোঝা গেল। বেশ কিছু বিদেশি পর্যটককে দেখতে পেলাম। তাঁরা যে জায়গা, পরিবেশ, আতিথেয়তা, খাবার উপভোগ করছেন সেটা ওঁদের নিজেদের মধ্যে খোশগল্প আর হাসি খুশি মুখ দেখে বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছিল।
একটা খোলা চত্বর পেরিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। বিশাল বড় ছাদ, সাজানো গোছানো বিভিন্ন কক্ষ। অসম্ভব মনকাড়া সৌন্দর্য বার বার টানছিল আমাদের। তবে সময় ভীষণ অল্প। আর চা ডাকছিল। সবটুকু দেখে ওঠা সম্ভব হবে না বুঝতে পারছিলাম। কিছুক্ষণ গল্প করে ফটো তুলে আমরা নীচে নেমে এলাম। ইন্দ্রজিৎদাদের ততক্ষণে চা খাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। আমরা চা খেতে খেতে অভিরূপবাবুর গল্প শুনছিলাম। ভদ্রলোকের বয়স খুবই কম। কিন্তু ভীষণ দক্ষ এবং বিচক্ষণ। মার্জিত কথাবার্তা। অল্প বয়সেই অত বড় একটা জায়গা সামলাচ্ছেন। ওখানে অনেকে কাজ করেন। বেশিরভাগই স্থানীয় আদিবাসী মহিলা ও পুরুষ। সকলের সঙ্গে ভীষণ সুন্দর করে মানিয়ে সব কিছু সামলাচ্ছেন।

চা খাওয়া শেষে ইন্দ্রজিৎদার ডাক। দেখলাম, আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন। বুঝলাম আবার বিপদ আসন্ন। মানলাম ভদ্রলোককে বেশ ভাল লেগেছে। ওঁর আমন্ত্রণে এত সুন্দর একটা জায়গার অভিজ্ঞতা হচ্ছে। তাই বলে এ রকম অত্যাচার! মুখ না দেখিয়ে আগের বার শুটিং করে বেঁচে যাওয়ার ফল পেলাম এবার। আমাকে বলা হল ওই খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ভীষণ অবাক আর খুশি হয়ে চারপাশের সাজসজ্জা দেখছি, এই অভিব্যক্তিটা ক্যামেরা বন্দি হবে।
বলির পাঁঠাকে মাঠে নামানো হল। আর বন্ধু দু’জন পাশে দাঁড়িয়ে আমার অবস্থা উপভোগ করতে লাগল। সুব্রতদার সেকি উৎসাহ দেওয়া! মনে হচ্ছিল, বাড়ি থেকে বহুবার এই শটটার জন্য আমাকে রিহার্সাল করিয়ে নিয়ে এসেছে। ফারুক আমার অবস্থা ক্যামেরা বন্দি করার জন্য তৈরি।

শুটিংয়ের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁদের একজন আমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। এবার আমার এক্সপ্রেশন দেওয়ার পালা। কিন্তু দু’বার শ্যুট করেও ঠিক মনের মতো হচ্ছিল না। হবেই বা কী করে? একটু আগে এই জায়গায় ঘুরে এসে যা অবাক হওয়ার তো হয়ে গিয়েছি! এর পর ইন্দ্রজিৎদা মাঠে নামলেন। পেশাদারি ভঙ্গিমায় আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে কতটুকু কী করতে হবে। ব্যাস! তার পর একবারেই সব ওকে। ভীষণ খুশি হলেন দাদা। আমাকে ভিডিওটা দেখিয়ে বললেন খুব সুন্দর হয়েছে। আর আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। রাজ্য জয় করে আসার ভঙ্গিতে দুই সাথীর কাছে এসে দেখি দু’জনেই বেশ প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ফারুক আর সুব্রতদা দু’জনেই বেশ পোক্ত ফটোগ্রাফার। ওদের কাছ থেকে প্রশংসা আমার জন্য ভীষণ দামী।

সময় বেশ দ্রুত চলে যাচ্ছিল। অনেক কাজ বাকি। পুরো টিম আবার দোতলায় উঠে এল। ইন্দ্রজিৎদার কিছু শুটিং ছিল। আমরাও যে যার মতো বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে ফটো তুলতে লাগলাম। মন ভরে যাচ্ছিল সব কিছু দেখে দেখে। আবার আমার ডাক। এবার আর ঘাবড়ালাম না। জানি, ইন্দ্রজিৎদা ঠিক করিয়ে নেবেন আমাকে দিয়ে। ছোট্ট করে হেঁটে এসে একটা তানপুরায় হাত দিয়ে চারপাশটা উপভোগ করার মুহূর্ত। ভালভাবেই উতরে দিলাম। মোটামুটি সব কিছুর শুটিং শেষ হল। ভীষণ ভাবে সময়টা উপভোগ করছিলাম।

এর পর ডাইনিং হল। আরেক প্রস্ত শুটিং শুরু হবে।
অন্যরকম খাবারের গল্প
শেহেরওয়ালি সম্প্রদায় নিয়ে কিছু বলা দরকার। এঁরা রাজস্থান থেকে আসা জৈন সম্প্রদায়ের। এঁদের খাবারদাবার একটু অন্য রকম। মাটির নীচের কোনও সবজি ওঁরা খান না। সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবারের সম্ভার। লম্বা টানা বিশাল একখানা রাজকীয় ডাইনিং টেবিলে খাবার আয়োজন করা হয়েছে। ১৫ জন একসঙ্গে বসে খেতে পারবে। একদিকে সবরকমের খাবার সাজানো হচ্ছে, অন্যদিকে ক্যামেরার সামনে ফারুক শেহেরওয়ালি সম্প্রদায় আর তাদের খাবারদাবারের ইতিহাস, মুর্শিদাবাদে তাঁদের আগমন এবং এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের ঐতিহ্যকে নতুন রূপে উপস্থাপন করার ইতিহাস বলতে শুরু করল। ফারুক ভীষণ ভাল বক্তা। সুব্রতদা আর আমি মন দিয়ে ওর সব গল্প শুনলাম। জানতাম ও যতটা ক্যামেরার সামনে বলছে, ততটা প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয়। ভিডিও অনেক বড় হয়ে যাবে। তাই ওখানেই ওর গল্প মন দিয়ে শুনলাম।

খাবার সাজানো হল সুন্দর করে। নাম, স্বাদ কোনও কিছুর সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। টেবিলের একপ্রান্তে ইন্দ্রজিৎদা খাবারের সম্ভার নিয়ে বসেছেন। ওঁর ডান দিকে অভিরূপবাবু বসেছেন প্রতিটা খাবারের নাম, কী ভাবে খেতে হয় সেগুলো বুঝিয়ে দেবেন বলে। টেবিলের অপর প্রান্তে ইন্দ্রজিৎদার একবারে সোজাসুজি উল্টো দিকে আমি। আমার ডানপাশে ফারুক আর বাঁ দিকে সুব্রতদা। ইন্দ্রজিৎদা ওঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে প্রতিটি খাবার সুন্দর করে ক্যামেরার সামনে উপস্থাপন করে চললেন।
খাবারগুলোর বিশেষত্ব হল, দল বেঁধে স্বাদ আনে। মানে একা একটা খাবারের সে রকম কিছু বৈচিত্র নেই। কিন্তু কয়েকটা খাবার একসঙ্গে মিলে জিভে অন্যরকম স্বাদ আনে। সবচেয়ে আগে খেলাম খিরা কচৌরি। যার ভেতরে থাকে শসা আর দইয়ের পুর। সেটা মাঝ বরাবর ভেঙে একটু কুটে মির্চ কা আচার মানে লঙ্কার আচার এবং লেবু দিয়ে খেতে হয়। মুখের মধ্যে দিলে জিভ স্বাদে ভরে যায়।
পরের খাবার খাট্টে কি পাকোড়ি। যেটা হালকা মিষ্টি তেতুঁল জলের মধ্যে বেসনের ছোট ছোট বড়া আর ভাসমান বুটের ডাল। বেশ ভাল খেতে। পরের খাবার মোয়েন কা পুরী। অনেকটা ঘিয়ের ময়ান দিয়ে বানানো পুরী যার উপর কাঠবেল কা পাচক নামের মশলা ছড়ানো। পরেরটা কাচ্চে কেলা কা সামোসা। শিঙাড়া যার পুরটা কলার কোফ্তার মতো করে বানানো। পরের কম্বিনেশন গোবি রোটি। লুচির সাইজের একটা মোটা রুটি যার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ঘি ঢেলে তার উপর ডাল, মসালা পাত্তা গোবি (হালকা মশলা দিয়ে ভাপানো বাঁধা কপি) কেলা আখরা বা কলার চিপস্ সব কিছু দিয়ে একসঙ্গে মুখে পুরে তার স্বাদ নিতে হবে। এটার স্বাদ বর্ণনা করার থেকে পাঠক তাঁদের কল্পনা শক্তি প্রয়োগ করলে বেশি ভাল বুঝতে পারবেন। বেশ অন্যরকম স্বাদ।

একটা খিচুড়ির কম্বিনেশন ছিল। যেটায় একদম হালকা খিচুড়ির সঙ্গে একটা পাতলা ডাল, মসালা পাত্তা গোবি আর পটলের চিপস্ মিশিয়ে খেতে হয়েছিল। আলাদা করে খিচুড়ির কোনও স্বাদ নেই। কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে একেবারে অন্য রকম স্বাদ। পরেরটা সালোনি মেওয়া কা খিচড়ি। এটা একটা মিষ্টি খিচুড়ি। মেওয়া দিয়ে বানানো হয়। আগের নোনতা খিচুড়ি খেয়ে এই মিষ্টি খিচুড়ি খেতে হয়। পাপড়েও নতুনত্ব। পাপড়ের উপর ঘিয়ের প্রলেপ এবং তার উপর লঙ্কা গুঁড়ো ছড়ানো। একদম অন্যরকম স্বাদ।
এরপর চলে এল মুখ মিষ্টির পর্ব। প্রথমেই ক্ষীর। চাল কম দেওয়া ঘন দুধের পায়েস। যার মধ্যে গোলাপ জল, কেওড়া জল, কেশর, পেস্তা, আমন্ড কুচি করে মেশানো। পরের মিষ্টিগুলো হল, চুহারে কে গোলি। যা কিছুটা গুজিয়ার মতো। সাকলি যেটা কিছুটা নিমকির উপর চিনির প্রলেপ বা বলা যেতে পারে নিমকির মতো দেখতে মিষ্টি গজা। জৈন ধর্মে মাটির নীচের জিনিস খাওয়া যায় না। কিন্তু বড়ে কোঠীতে আসা অতিথিদের কথা মাথায় রেখে একটা আলুর দমের বাটিও রাখা ছিল।
সব খাবারের নিয়ম যখন অভিরূপবাবু ইন্দ্রজিৎদাকে বলছিলেন আমি একেবারে উল্টো দিকে বসে মন দিয়ে শুনে সেগুলো মেনে খাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। নিয়ম না জানলে খাবারের স্বাদ ঠিক মতো পাওয়া যাবে না। ফারুক এর আগেও এসেছে। তাই খাবারের নিয়ম জানে। ওর খেতে অসুবিধে হচ্ছিল না। সুব্রতদা দেখলাম খাচ্ছে আর খুব মনোযোগ দিয়ে শুটিং দেখে যাচ্ছে মুখে সুন্দর একখানা হাসি নিয়ে। এই মনোযোগ দিয়ে শুটিং দেখা আর হাসির পিছনে যে একটা গল্প আছে সেটা পরে শুনেছিলাম। সুব্রতদা নাকি আমার খাওয়া অনুসরণ করছিল। আমার আগে দাদাকে খাবার দিলে দাদা শুটিং দেখে সময়টা পার করছিল যাতে আমি খাওয়া শুরু করতে পারি। টুকলিবাজির চরম পর্যায়। তবে ভীষণ রকম উপভোগ্য টুকলিবাজি।
ফেরার পালা
রাত অনেকটা হয়ে গিয়েছিল। সকলের বাড়ি দূর। তাই আমরা ইন্দ্রজিৎদা, ফুডকার বাকি সদস্য এবং অভিরূপবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির রাস্তা ধরলাম। আমাদের ড্রাইভার সাইন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছিল। গাড়িতে ওঠার পর জানতে পারলাম, নৌকা পারাপার বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমাদের বহরমপুর দিয়ে ফিরতে হবে। বুঝতে পারলাম বাড়ি পৌঁছতে আরও একটু বেশি রাত হবে। সব থেকে বেশি সমস্যা হবে ফারুকের। কারণ ওর বাড়ি বেশ অনেকটা দূরে। ফেরার রাস্তাটা বেশ জনবিহীন অন্ধকার মাটির রাস্তা। দু’পাশে ঘন গাছপালা। এই অবস্থায় একমাত্র ভূতের গল্প ছাড়া আর কিছু আসেই না। সুব্রতদা যথারীতি আবার আসরে নামল। আমাকে ভূতের ভয় দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলতে লাগলো। সত্যি বলতে এই দু’দিন আমি এত ভাল সময় কাটিয়েছি যে ফেরার সময়ে ভীষণ খারাপ লাগা মনের মধ্যে কাজ করছিল আমার।

আমাদের বাড়িতে সুব্রতদার স্কুটি রাখা ছিল। যেহেতু বহরমপুরের উপর দিয়ে এলাম তাই দাদা বাড়ির কাছে নেমে গেল। পরের দিন স্কুটি নিয়ে যাবে। ফারুকও বহরমপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে গেল। ওকে অনেকটা কষ্ট করে অনেকটা বেশি রাতে বাড়ি পৌঁছতে হয়েছিল সেদিন।
আমি বাড়ি ফিরলাম অন্যরকম ভাললাগা, অনুভূতি নিয়ে। সব কিছু লিখে রাখলাম অনেক বছর পর স্মৃতি রোমন্থনের জন্য।
ছবি— লেখিকা
(সমাপ্ত)




