দীপক দাস

আটকে গেলাম যে জায়গায় সেখানকার নাম উচ্চারণই মুশকিল। বাসে টিকিট কাটা বা তার আগে বসার জায়গা নিয়ে কথাবার্তাতেও নামটি উচ্চারণ করতে পারিনি। বাস থেকে নেমে যাত্রী প্রতীক্ষালয়ের লেখা দেখে আরও সঙ্কোচ। ‘বড়’ শব্দ যোগে জায়গার নাম আরও খোলতাই হয়েছে। কিন্তু আমরা তিন জনে ‘শরম কে মারে পানি পানি হয়ে যাচ্ছিলাম’। না না, অতটা লাজুক আমরা নই। হাসাহাসি করছিলাম আর ছবি তুলছিলাম। রঙ্গ রসিকতার মধ্যে এটাও বুঝতে পারছিলাম, তিন মাথার মোড়ে আটকে গিয়েছি তিন জনে।
এ বারের বাৎসরিক পুজো সফর শুরু হয়েছিল সপ্তমীর ভোরে। সাধারণ রাতেই বেরনো হয়। ট্রেন সফর সংক্ষিপ্ততম। তাই প্রাতঃযাত্রা। তবে ডক্টর ঘাসপুস ষষ্ঠীর রাতেই বেরনোর জন্য বারবার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছিল। ইদানীং ওর রাতবিরেত অভিযানে মন হয়েছে। আমি আর ইন্দ্র প্রভাবিত হইনি। খড়্গপুরে নামব। সে জন্য রাত জেগে দৌড়াদৌড়ির মানে হয় না। তা ছাড়া এখন অনুপ্রেরণার জোর বা মহিমা, যা-ই বলা হোক না কেন, কমেছে।

ভোরের বাস, মাকড়দহ থেকে উল্টো দিকে যাওয়া টোটো ঘুরিয়ে অঙ্কুরহাটি, সেখান থেকে বাসে সাঁতরাগাছি অবাধ যাত্রা। যে ট্রেন আগে আসবে সেটাতেই চড়ে বসব, সিদ্ধান্ত হয়েছিল। স্টেশন চত্বরে ঢোকার আগে ঘোষণা ও প্রদর্শ বোর্ডে বোঝা গেল ‘রূপসী বাংলা’ আজ সঠিক ছন্দে রয়েছে। লোকাল ট্রেন আগে নির্ধারিত হলেও রূপসী তার ছন্দোময়তায় মাঝপথেই তাকে হারিয়ে দেবে। প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখি, রূপসী বাংলা অপেক্ষমাণ। এতটাই ফাঁকা যে আমরা জায়গা বাছার সুযোগ পেয়েছিলাম। দু’টো জানলার ধার।

খড়্গপুর বাসস্ট্যান্ডে অল্প জিজ্ঞাসাবাদেই নয়াগ্রাম যাওয়ার বাসের সন্ধান মিলল। এ বারের দলের ইচ্ছে, জঙ্গলবাসের। আর সংলগ্ন ওড়িশায় ঢোকার। দল আর কোথায়! ঠেকেছি তো মাত্র তিন জন। বাকিরা ব্যস্ত…জীবনের ধর্মে। বাসে বসার জায়গা পেয়েছিলাম। চালকদাদার কেবিনে। সুবিধেই হল। আমাদের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের। বেরিয়ে পড়েছি। কিন্তু কোথায় থাকব ঠিক নেই। নয়াগ্রামে জঙ্গলকন্যা সেতু পেরিয়ে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে কোনও হোম স্টে বা গেস্ট হাউস আছে। এইটুকু তথ্য আমাদের কাছে ছিল। বাসচালক ও কন্ডাক্টরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জঙ্গলকন্যা সেতুর পরে থাকার জায়গা আছে। কিন্তু সে জায়গা আমাদের পছন্দ হল না। ফাঁকা এলাকা। জঙ্গল তেমন নেই। আমাদের খড়িকামাথানি নেমে যেতে বললেন চালকদাদা। বাস যাবে বালিগেড়িয়া। সেখানে থাকার সমস্যা আছে। খড়িকামাথানি থেকে আরেকটা বাস ধরে গেলে জঙ্গল পড়বে। আবার খড়িকামাথানি থেকে ওড়িশাও কাছে।
খড়িকামাথানি বাজার এলাকা। জমজমাটই। একটা পুজোও হচ্ছে। এ বার একটু খাওয়াদাওয়া দরকার। প্রায় ১১টা বাজে। প্রথমবার আমরা খাওয়াদাওয়া হীন ট্রেন সফর করেছি। ঝালমুড়ি ইত্যাদি উঠেছিল। কিন্তু অত ভোরে কিছু খেতে ইচ্ছে করেনি। এ বার দানাপানি না দিলেই নয়। মুড়ি ঘুগনির খোঁজ করে মিলল না। একটা রেস্তরাঁয় গেলাম। দক্ষিণি খাবার। ইডলি-ধোসা দিয়ে পিত্ত রক্ষা হল। রেস্তরাঁর লোকজনকেও আমাদের চাহিদার কথা বলা হয়েছিল। দোকানে খেতে এসেছিলেন এক তরুণ। তিনি রামেশ্বরের দিকে যেতে বললেন। জঙ্গল মিলবে। থাকার জায়গাও রয়েছে। রামেশ্বর মন্দিরের আগেই টিয়াকাটির জঙ্গলে একটা রিসর্টও হয়েছে। রেস্তরাঁর লোকজন সামনের একটা বাস দেখিয়ে দিলেন। এখনই ছাড়বে। কোথায় নামতে হবে সেটাও বলে দিলেন।
বাসে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল। এক কিশোরী জানলার ধারটা ছেড়ে রেখেছিলেন। জানলার ধারে যেতে বললে তিনি পাল্টা জানতে চাইলেন, আমরা কোথায় নামব। মুখটা গম্ভীর করে কোনও রকমে উচ্চারণ করলাম। শুনে কিশোরী জানালেন, তিনি আগে নামবেন। আমি আর দীপু পিছনের লম্বা সিটে চলে গেলাম। ইন্দ্রকে বসানো হল অন্য সিটে। আমাদের পাশে এক প্রবীণ বসেছিলেন। তিনি সব শুনে জায়গা মতো নামিয়ে দেবেন বললেন।
গাড়ি ছাড়ল। একে একে পার হতে লাগলাম পাঁচকাহানিয়া, বড় নিগুই খাস জঙ্গল, গোখুর পাল, চাঁদাবিলা গ্রাম পঞ্চায়েত, নারঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদাবিলা রেঞ্জ, মুরাকাটি। খড়িকামাথানির পরে কোথা থেকে জঙ্গল শুরু হয়েছিল মনে নেই। কিন্তু জঙ্গলের মাঝে রাস্তাটি বেশ মনে আছে। অসাধারণ দৃশ্য। সুবজের সমারোহ। মাঝে মাঝে এক একটা গ্রাম। দু’চারটে দোকানপাট। আর মাঝে মাঝে বাসস্টপের নাম জানানো পূর্ত দফতরের ফলক। এমন জায়গাই তো পছন্দ আমাদের। শুধু যদি একটু থাকার জায়গা মিলত! পরে ইন্দ্রও বলেছিল, এই রাস্তাটা অসাধারণ। দীপু কিছু বলেনি। ওর আসলে একটু সর্দি করে গিয়েছিল। তার উপর সকাল থেকে চা পায়নি। বর্তমানে ও ক্যাফিন আসক্ত। সময় সময়ে চা না পেলে ও স্নায়ুতন্ত্র নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

জঙ্গলের অসাধারণ সৌন্দর্য, জঙ্গলমহলের অপূর্ব গ্রামের ঝলক দেখতে দেখতে কশিয়া, বরপাট পার করলাম। তার পর সেই জায়গা। নেমে দেখি, জায়গাটির ছোট বড় আছে। ছোটটির আগে ‘ছোট’ লেখা নেই। কিন্তু প্রতীক্ষালয়ে বড় বড় করে জায়গার নামের আগে ‘বড়’ লেখা। সত্যি কি কামড় থেকে এমন নামের উৎপত্তি? তা হলে বেশ বেদনাদায়ক উৎপত্তি। কিন্তু বড় কেন?
নিজেদের মধ্যে এ সব আলোচনা করে সামনের চায়ের দোকানে গেলাম। কথা বলে যা বুঝলাম, গোপীবল্লভপুর থেকে আসবে টেম্পো। অথবা বাস। কিন্তু কখন আসবে বলা শক্ত। তবে আসবে। তবে পৌঁছতে পারলে থাকার জায়গা মিলবে। মিনিট চল্লিশেক অপেক্ষা ছিল। তার আগে বেশ কয়েকটি টোটোকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। কেউ রাজি নয়। তাঁরা সোজা পথের যাত্রী। কেউ তেমাথা থেকে বাঁক নিতে চান না। একটা বাড়ির সামনে ছোটা হাতি ছিল। দীপু বলছিল, কিছু না পেলে এটাই ভাড়া করে যেতে হবে। ইন্দ্র ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে চলে গিয়েছিল। আমাদেরও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভাল লাগছিল না। আবার বড় রাস্তার উপরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই দূর থেকে একটা অটো দেখা গেল। আর সেটা বাঁক নেওয়ার সঙ্কেতও দিল। ‘আসছে আসছে’ বলে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কিন্তু জায়গা নেই। চালকদাদা আশ্বাস দিলেন, জায়গা একটা। তবে কিছু দূরে ফাঁকা হবে। ইন্দ্রকে অটোর ভিতরে গুঁজে দিয়ে অটোর পিছনের পাদানিতে দাঁড়িয়ে পড়লাম দু’জনে।

দাঁড়িয়ে তো পড়লাম। কিন্তু রাস্তার অবস্থা মারাত্মক। পিচ নয় খানাখন্দ দিয়েই তৈরি বলে মনে হল। দাঁড়িয়ে থাকা দায়। ঝাঁকুনির চোটে যে কোনও সময়ে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা। দীপু বলল, ‘‘কেন কোনও টোটো এই রাস্তায় আসতে চাইছিল না বুঝতে পারা যাচ্ছে।’’ ঝাঁকুনির সঙ্গে ছিল শুঁটকি মাছের গন্ধের ঝাপটা। টেম্পো বা অটোর চালে শুঁটকি মাছের বস্তা বাঁধা। এত ঝাঁঝাল গন্ধ যে দীপুর ঠান্ডা লাগা নাকও টের পাচ্ছিল। বস্তাটা ছিল ওর দিকেই।
চালকদাদার আশ্বাস অনুযায়ী ফাঁকা হল জায়গা। দু’জনে ভিতরে বসলাম। বসেও কি শান্তি আছে? মনে হচ্ছিল অটোর ভিতরে বসেই আহত হয়ে যাব। আলাপ হল এক সহযাত্রিনীর সঙ্গে। বাচ্চাকে গোপীবল্লভপুরে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সঙ্গী শ্বশুরমশাই। আমরা কোথায় যাচ্ছি জানতে চেয়েছিলেন। জঙ্গলের মাঝে রাত কাটাতে এসেছি শুনে একচোট হেসে ছিলেন। আরেক মহিলাও হেসে উঠেছিলেন। প্রথম সহযাত্রিনী কিন্তু সারা রাস্তা এলাকা সম্পর্কে অনেক কিছু জানিয়েছিলেন। বালির লরিতে রাস্তা খারাপ, জঙ্গলের মাঝে সিবিএসই স্কুল, সরকারি স্কুল-ছাত্রাবাস, সুবর্ণরেখার অবস্থান কোন জায়গা থেকে কাছে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। এলাকার পরিবেশ বেশ সুন্দর। রাস্তাটা একটু সুসহ হলে যাত্রাটা মনোরম হত। সব ভাল বোধহয় ভাল নয়।

এক সময়ে টেম্পো বাঁক নিল বাঁ দিকে। সেই রাস্তাটা কিছুটা ভাল। সহযাত্রিনী একটা আশ্চর্য তথ্য দিলেন। এই যে বাঁক নিল আমাদের যান এটি আবার ফিরে আসবে মূল রাস্তায়। তার পর যাবে রামেশ্বরের দিকে। এমন এগিয়ে গিয়ে আবার পিছিয়ে আসার রুট আমার অভিজ্ঞতায় ছিল না। দীপু জানাল, পাহাড়ে নাকি এ ভাবেই আগে পিছে করে ওঠে গাড়ি।
সহযাত্রিনীর কথাই সত্যি হল। গাড়ি পৌঁছল উপর পাতিনা গ্রামের হাটের কাছে। তাঁরা নেমে গেলেন। গাড়ি আবার ফিরল। একটা জায়গায় দুর্গাপুজোর তোরণ দেখলাম। আরেক সহযাত্রিনীও নেমে গেলেন। নামলেন এক সহযাত্রীও। জানলাম, শুঁটকির বস্তা সহযাত্রীর। গোপীবল্লভপুরের হাট থেকে কিনে আনছেন। নিজে কিছু খাবেন। বাকি বিক্রি করবেন।

গাড়ি আবার ছাড়ল। সেই রিসর্টের দেখা মিলল। জঙ্গলের মধ্যেই। কিন্তু খুব সাজানো গোছানো। আমরা মন্দিরের দিকে এগোলাম। এক হোম স্টের সামনে দাঁড় করালেন চালকদাদা। নীচে কারখানা। উপরে হোম স্টে। নাম, ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো’। সে আহ্বানে উদ্বাহু হয়ে সাড়া দিলাম তিন জনে। হোম স্টে মালিক সুধাংশু ঘোষ। কারখানার ঘরের খাটিয়ায় আমাদের বসতে দিয়ে তিনি গেলেন উপরে। ঘর পরিষ্কার করতে। অনেক দিন অতিথি আসেননি।
চমৎকার ঘর। জানলা দিয়ে সুধাংশুবাবুর বাগান দেখা যাচ্ছে। ড্রাগন ফলও হয়ে রয়েছে। বাগানে মুরগি চরছিল। দীপু দেখাল ইন্দ্রকে। খুশিতে উদ্ভাসিত হয়েছিল ইন্দ্রর মুখ। তখন দেড়টা বেজেছে। আমরা খাবার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। সুধাংশবাবু ‘দেখছি’ এবং ‘আজ নিরামিষ’ বলে গিয়েছিলেন। ফিরলেন ছয় ব্যঞ্জনের আহার নিয়ে। সঙ্গে ওমলেট। ইন্দ্রর জন্য ডবল ডিমের। ও অল্পেতে খুশি নয়। কিছুতেই।

খেয়েদেয়ে একটু পাওয়ার ন্যাপ নিয়ে এলাকা টহলের জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল।
ছবি— দীপশেখর দাস ও ইন্দ্রজিৎ সাউ
(সমাপ্ত)




