দীপক দাস

ঝাঁ ঝাঁ রোদের দুপুর। দু’দিন ধরে যখন তখন মেঘ-বৃষ্টির দাপটে সূর্যদেবের মুখ ম্লান ছিল। আজ সুযোগ পেয়ে সতেজ। চলন্ত-চেনা এক স্টেশনে আমাকে নামিয়ে দিয়ে মেমারি লোকাল গন্তব্যের দিকে চলে গেল। খুব বেশি লোকজন নেই প্ল্যাটফর্মে। স্টেশনটাও যে খুব জনজমাট এলাকায় তা নয়। ব্যান্ডেলের দিকের অংশকে প্ল্যাটফর্মের লেজ ধরলে সে দিকে একটা পাড়া, ছোটখাটো বাজার রয়েছে। মুড়োর দিকে একপাশে ধানজমি। আরেকপাশে জলা জায়গা। বসতি চোখে পড়ছিল না। স্টেশনের নামে গ্রামটা কোন দিকে? ল্যাজা না মুড়োর দিকে? জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

তার আগে বলা যাক তালাণ্ডুতে নামা কেন? সে কি ইতিহাসখ্যাত গ্রাম? পুরনো কোনও মন্দির রয়েছে? বিখ্যাত কোনও ব্যক্তিত্বের জন্মস্থান? সে কিছুই জানা নেই। শুধু নামটাতেই পছন্দ হয়েছিল। মেন লাইন বর্ধমানে যেতে প্রথম দেখেছিলুম স্টেশনটা। সে দিন থেকেই নামে মুগ্ধ। তার পরেও অনেকবার গিয়েছি। চলন্ত ট্রেন থেকে দেখেছি আশ্চর্য নামের স্টেশনটি। নামা হয়নি কোনও দিন। এক মঙ্গলবার হঠাৎ মনে এসেছিল তালাণ্ডুর কথা। ওঠে পড়লাম ট্রেনে। সোলো ট্রিপ।
স্টেশনেই একপ্রস্ত জিজ্ঞাসাবাদ সারা গেল। দু’টো জিজ্ঞাসা ছিল। তালাণ্ডু নামের গ্রামটিতে ঢোকা যাবে কোন দিক থেকে। দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা, খাবার দোকান কিছু মিলবে? স্টেশনে বসে থাকা এক তরুণ, এক যাত্রী এবং যাত্রীর পরামর্শ মতো এক ছানাওয়ালার বক্তব্য থেকে সারসংক্ষেপ হল, মুড়োর দিকে রেললাইন বরাবর গেলে গ্রামটি মিলবে। ভাতটাত কিছু মিলবে না। স্টেশন চত্বরেও নয়। গ্রামের ভিতরে তো প্রশ্নই নেই। ল্যাজার দিকে বাঁ পাশে একটা ছোট্ট বাজার আছে। ওখানে একটা মিষ্টির দোকান মিলবে। ওই দিকটা ভরতপুর। ওখান থেকেই মিলবে টোটো। রেললাইন থেকে ভরতপুরের দিকে নেমে টোটোদের জিজ্ঞাসা করতে জানালেন, তালাণ্ডুর টোটো রেললাইনের আন্ডারপাস পার করে উল্টোদিকে। সে দিকে যাওয়ার আগে মিষ্টির দোকানে ঢুকে পিত্তরক্ষা করা গেল। গরম শিঙাড়া আর রসগোল্লা।…

কোনও এলাকার তথ্য সংগ্রহে আমরা দু’টি সূত্র প্রয়োগ করি। প্রথমে স্কুল বা গ্রন্থাগারের খোঁজ। তার পর লোকজনের সঙ্গে কথা বলা। তালাণ্ডুর টোটোচালক দাদা জানালেন, স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই মাত্র দিদিমণি, মাস্টারমশাইয়েরা চলে গেলেন। মিষ্টির দোকানে একদল শিক্ষক শিক্ষিকাকে দেখেছিলাম। হয়তো তাঁরাই। গ্রামে গ্রন্থাগার আছে। সেটা খোলা আছে কিনা টোটোচালকদাদা জানেন না। টোটো চলছিল মেঠো পথ ধরে। একপাশে ধানজমি। আরেক পাশে জলাশয়। একটু পরেই টোটো বাঁক নিল। পাকা রাস্তা ছেড়ে ঢালাই পথে। গ্রামে ঢোকার পথটি বেশ সুন্দর। গাছগাছালিতে ঘেরা। এক বৃদ্ধ ছাগল চরাচ্ছেন। টোটো থামল গ্রন্থাগারের সামনে। ত্যালাণ্ডু সিদ্ধেশ্বরী সাধারণ পাঠাগার। স্টেশনের আর গ্রন্থাগারের নামফলকে গ্রামের নামের বানানের পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু গ্রন্থাগারটি বন্ধ। দ্বিতীয় সূত্র প্রয়োগ করতে হবে। তার আগে টোটোকে ছেড়ে দেওয়া গেল।

গ্রন্থাগারের পাশে একটা বেদি। তাতে সারাইয়ে কাজ চলছে। বেদির উল্টো দিকে পুকুর। পাড়ে একটা বড়সড় গাছ। তার মূলের চারপাশটা বাঁধানো। সেই চাতালে বসেছিলেন এক প্রবীণ। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, গ্রামে কোনও শিক্ষক রয়েছেন কিনা। জানালেন, রয়েছেন। তবে অবসরপ্রাপ্ত। গ্রন্থাগার পার করে একটুখানি। কিন্তু অবস্থান বুঝতে না পেরে একটু বেশি চলে গিয়েছিলাম। এক বাড়ির কাকিমাকে দিকনির্দেশে আবার ফেরা। শিক্ষকের নাম দেবাশিস নিয়োগী। কিন্তু তাঁর বাড়ির দরজা বন্ধ। বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ে একজন ভাঙা ইটের টুকরো ভ্যানে বোঝাই করছিলেন। তিনি জানালেন, দেবাশিসবাবুর কাকা ৪টে নাগাদ দোকান খুলবেন। তখন পৌনে ৪টে বাজে। ভ্যানে ইটের টুকরো বোঝাই করা লোকটি কলিং বেল বাজাতে বলেছিলেন। বাজাইনি। বাড়ির লোকজন হয়তো দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। মিনিট ১৫ অপেক্ষা করা যায়।…

দোকান খুলল ৪.১০ নাগাদ। দোকানদার তথা দেবাশিসবাবুর কাকাকে আসার উদ্দেশ্য জানাতে গিয়ে বুঝলাম, বয়সজনিত কারণে তাঁর শ্রবণ সমস্যা রয়েছে। মুশকিল আসান হলেন দেবাশিসবাবুর মা। আমাদের কথাবার্তার মাঝেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। জানলাম, দেবাশিসবাবু মগরায় কোনও কাজে গিয়েছেন। এতক্ষণ ফিরে আসার কথা। ফোনে ধরিয়ে দিলেন ছেলেকে। আমার বিশেষ কিছু জানার ছিল না। তালাণ্ডু নামের উৎপত্তিটা আপাতত জানলেই হবে।
দেবাশিসবাবুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তালাণ্ডু গ্রামে সদগোপ সম্প্রদায় সংখ্যাধিক। যাঁদের জীবিকা ছিল চাষবাস। সরস্বতী নদীর তীরে সপ্তগ্রাম সেই সময়ে বিখ্যাত বাণিজ্য বন্দর। দেশ বিদেশ থেকে বণিকেরা বাণিজ্যতরী ভেড়াতেন সেই বন্দরে। তালাণ্ডু গ্রামের সদগোপেরা বন্দরে তণ্ডুল অর্থাৎ চাল সরবরাহ করত। তণ্ডুলের গ্রাম লোকমুখে বিকৃত হয়ে তালাণ্ডু হয়েছে। বেশির ভাগ গ্রামনামের উৎপত্তি আসলে যুক্তিগ্রাহ্য কিছু অনুমান। তালাণ্ডু নামে সেই যুক্তি রয়েছে। চাষাবাদ এখানে ভালই হয়। সেটা গ্রামে ঢোকার সময়েই দেখেছি। আর সপ্তগ্রামও খুব দূরে নয়। ব্যান্ডেলের পরে আদিসপ্তগ্রাম স্টেশন। তার পর মগরা। মগরার পরে তালাণ্ডু।

পরে যোগাযোগ করব জানিয়ে দেবাশিসবাবুর মাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসছিলাম। তখনও ভ্যানে ইটের টুকরো বোঝাই করছিলেন সেই ব্যক্তিটি। জিজ্ঞাসা করলেন, গ্রামের ইতিহাস জানতে চান? চলুন একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। সেই পুকুর পাড় ধরেই ফিরছিলাম। গাছতলায় বসে থাকা প্রবীণটি জানতে চাইলেন, দেবাশিসবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে কিনা। তাঁকে ছাড়িয়ে আরেকটু এগিয়ে ভ্যানওয়ালা এক বৃদ্ধের সঙ্গে পরিচয় করালেন। তিনি রতনকুমার ঘোষ। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী। বসেছিলেন পুকুরপাড়েই। আরেক বৃদ্ধের সঙ্গে তাস খেলছিলেন। কথায় কথায় জানা গেল, তাঁরাই ছিলেন তালাণ্ডুর জমিদার। রতনবাবুর দাদুর বাবা দীননাথ ঘোষ জমিদার ছিলেন। এখন অবশ্য বহু শরিক।

রতনবাবুর সঙ্গে পুকুরপাড়ে একটা সিমেন্টের বিদ্যুতের খুঁটির উপর বসে অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও এসে পড়েছিল। তার মাঝে মাঝে তালাণ্ডুর কথাও। রতনবাবু গ্রামের নামের উৎপত্তি বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি। তাঁর সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, গ্রামটি হঠাৎ তৈরি হয়নি। মানে কোনও জমিদারের নেওয়া পত্তনি নয় তালাণ্ডু। রতনবাবু এ গ্রামে তাঁর ১১ পুরুষের নাম বলতে পারবেন। গ্রামটি সমৃদ্ধ ছিল। এখনও রয়েছে। গ্রামে ঢুকতে পাকা এবং বড় বাড়িই চোখে পড়েছে। তবে বদলে গিয়েছে আর্থ-সামাজিক পরিবেশ। চাষ প্রধান এলাকা। কিন্তু অন্য সব গ্রামের মতোই এ গ্রামেও নতুন প্রজন্মের চাষাবাদে আগ্রহ কমেছে। গ্রামে ছুটির দিন ছাড়া নবীন প্রজন্মকে পাওয়া মুশকিল। কারণ তাঁদের বেশির ভাগই চাকরিজীবী। গ্রামে পাশাপাশি একটি জুনিয়র হাই স্কুল এবং একটি প্রাথমিক স্কুল রয়েছে।

গ্রামের দেব-দেবী নিয়েও জানতে চেয়েছিলাম। রতনবাবু জানালেন, সিদ্ধেশ্বরী তাঁদের গ্রামদেবী। বছরে তিন বার পুজো হয়। পুরনো গ্রামগুলোতে একটা করে শিবমন্দির থাকে। তালাণ্ডুতেও রয়েছে। মন্দিরের গায়ে একসময়ে পোড়ামাটির কাজ ছিল। কিন্তু সংস্কারের পরে সেগুলোর অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। রতনবাবু আরেকটি তথ্য দিলেন। গ্রামের পাশেই মালিপাড়া। সেই গ্রামটি তালাণ্ডু মালিপাড়া বা মালপাড়া নামে পরিচিত। বামপন্থী নেতা তথা লোকসভার স্পিকার প্রয়াত সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ি মালিপাড়ায়। তাঁদের বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়। সেই দুর্গাপুজোয় সোমনাথবাবু আসতেন।
ফেরার সময় হয়ে গিয়েছে। টোটোয় আসার সময়ে বুঝতে পেরেছিলাম স্টেশন থেকে খুব দূরে নয় গ্রামটি। হেঁটে যাওয়া যাবে। রতনবাবুও তাতে সায় দিলেন। আমাকে সিদ্ধেশ্বরীর একবারের পুজো হয় দুর্গাপুজোর নবমীর দিন। আমাকে নেমন্তন্ন করলেন। সারাদিনের নেমন্তন্ন। আসার চেষ্টা করব জানালাম।

পাড়া থেকে বেরিয়ে এক জলাশয়ের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথাই মনে হচ্ছিল। বাংলার গ্রামগুলোর মূল সুর এখনও অনেক জায়গায় নষ্ট হয়নি। নিজের গ্রামকে বহু মানুষ এখনও ভালবাসেন। গ্রামের কথা জানতে চাইলে খুশিই হন তাঁরা। একে অপরের দিকে আড়চোখে চাওয়ার সময়ে আন্তরিকতার অভাব নেই অনেকের মধ্যেই। কতক্ষণেরই বা পরিচয়। রতনবাবু নেমন্তন্ন করলেন। বলেছিলেন চান না করেই চলে আসার। সব ব্যবস্থা করে দেবেন।
সূর্য তখন অনেকটা লাল। দুপুরে খাওয়াই হয়নি প্রায়। গরমে অবসন্ন। এই সব ভাল ভাবনাগুলো সব কষ্ট দূর করে দিচ্ছিল।
ছবি— লেখক
(সমাপ্ত)




