সপ্তপর্ণা ভট্টাচার্য্য

অজানা পথ, অচেনা গন্তব্য, অদেখা সহযাত্রী। গতানুগতিক জীবনে যদি হঠাৎ করে এই সমন্বয় এসে উপস্থিত হয় তা হলে তার স্বাদ চেটেপুটে উপভোগ করার যে অনুভূতি তা সারা জীবনের জন্য স্মৃতির খাতায় মূল্যবান সম্পদ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়ে যায়।
সে স্বাদই পেয়েছিলাম জোড়া সফরে। গঙ্গাটিকুরি জমিদারবাড়ি দেখেছিলাম প্রথমে। সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম সোনারুন্দি রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে।
মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার একদম দক্ষিণ প্রান্তের একটি প্রাচীন গ্রাম সোনারুন্দি। বনওয়ারিবাদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নিত্যানন্দ দালাল। নিত্যানন্দের বাবা জগমোহন সোনারুন্দি গ্রামে বাস করতেন। ১৭৫০ খ্রিস্টাবেদ সোনারুন্দিতেই নিত্যানন্দের জন্ম হয়। অল্প বয়সেই তিনি আরবি ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এক সময় বাদশাহ শাহ আলমের সুনজর পড়ে নিত্যানন্দের উপরে। নিত্যানন্দের পাণ্ডিত্য দেখে বাদশাহ তাঁকে রাজধানী দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে মুন্সি পদে নিযুক্ত করে দানেশবন্দ উপাধি দেন। পরে মহারাজা উপাধি দিয়ে সাত হাজারি মনসবদার পদে নিয়োগ করেন। নিত্যানন্দের নাম হয় মহারাজা নিত্যানন্দ দানেশবন্দ আমীর উল-মুলক, আজমাতউদ্দৌলা সাফদার জং।

মহারাজ নিত্যানন্দ বাহাদুর সোনারুন্দি গ্রামের পূর্ব প্রান্তে প্রায় ৫৪ বিঘা জমির উপর রাজবাড়ি ও মন্দির তৈরি করেছিলেন। সোনারুন্দি রাজবাড়ির চার দিক উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। চারদিকে চারটে বিশাল রাজকীয় তোরণ ছিল। বিশাল চত্বরের তিন দিকে ছিল দোতলা দালান। উত্তর দিকে বনয়ারীজীর প্রকাণ্ড মন্দির। মন্দিরে বংশীধারী বনওয়ারীজী (বনমালী) ও শ্রী রাধিকার মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের পাশেই পুকুর কেটে ঘাটে স্নানাগার ও গোপেশ্বর শিবের মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল।
রাজবাড়ির বাইরে বৃন্দাবনের অনুকরণে কুঞ্জ নির্মাণ করা হয়েছিল। এগুলো ‘বন’ বলা হত। বৃন্দাবনের মতোই ৮৪টি বন বনওয়ারিবাদে স্থাপন করা হয়েছিল। যাতে রাস বা ঝুলন উৎসবের সময় বনওয়ারিলালজি যেতে পারেন। প্রত্যেক বনে একটি করে পুকুর ও মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। মহরাজা নিত্যানন্দ সোনারুন্দিকে দ্বিতীয় বৃন্দাবন হিসেবে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। বনওয়ারিজীর নাম থেকে সোনারুন্দির এই অংশের নাম হয় বনওয়ারিবাদ।
গ্রামের প্রধান রাস্তার পশ্চিম দিকে একটি দোতলা তোরণের পর বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রাজবাড়ির নানা মহলের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। কথিত, এক সময় মূল প্রাসাদে প্রায় ১০০টির বেশি ঘর ছিল। দাস-দাসিদের থাকার জন্য পৃথক মহলও ছিল।

রাজবাড়ি ঢোকার প্রধান দরজার সামনে এসে টোটো দাঁড়াল। জরাজীর্ণ ফটক মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে তা এক নজরেই বোঝা যায়। ঢুকে পড়লাম আকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের মুখোমুখি হতে। প্রথমে চলে এলাম রাজবাড়ির মন্দির দর্শনে। মন্দিরের ভেতরটা এতটাই বিশাল যে ঢুকে মনে হল এটাই একটা জমিদারবাড়ি। মাঝে বিশাল বড় একটা চত্বর বা নাটমন্দির। তার চারপাশ ঘিরে দোতলা সারি সারি ঘর। এক প্রান্তে মন্দিরের মধ্যে রাখা আছে বিগ্রহ। বংশীধারী বনওয়ারীজী (‘বনমালী’) ও শ্রী রাধিকা এখানে পূজিত হন। এক প্রান্তে একটা ছোট কামান অবহেলায় পড়ে আছে।
মন্দিরের লাগোয়া একটা বড় পুকুর। প্রচুর মাছ দেখলাম। স্থানীয় মানুষজনদের দেখা গেল মাছদের খাবার দিচ্ছেন। খাবার খেতে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ পুকুরের পাড়ের দিকে এসে জমা হচ্ছে। রাজবাড়ির কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তবে মন্দিরের পাশে যেটুকু অংশ এখনও টিকে আছে সেখানে একটি অনাথাশ্রম আছে। একটা স্কুলও আছে। প্রচুর বাচ্চা পড়াশুনো করছে। রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখে আন্দাজ করা যায় কী বিশাল তার ব্যাপ্তি ছিল এক সময়। ইট বার করা প্রাচীর, বিশাল বিশাল স্তম্ভ, দৈবক্রমে একটুআধটু বেঁচে যাওয়া রাজবাড়ির অংশ যেন নিজের উপর নিজেই করুণা করে চলেছে। নিজের টিকে থাকার জন্য নিজেকেই অভিশাপ দিয়ে চলেছে।

পুকুরের একপ্রান্ত থেকে রাজবাড়ির বেঁচে থাকা দোতলার অংশটুকুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অদ্ভুত কিছু একটা আকর্ষণ অনুভব করছিলাম। গরম লাগছিল, রোদের তেজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবুও পা দু’টো যেন জমে গিয়েছিল ওই জায়গায়। হয়তো সেই অতীতেই হারিয়ে যেতে শুরু করেছিলাম। হঠাৎ একজনের ডাকে বাস্তবে ফিরে এলাম। দেখলাম অতি সাধারণ প্যান্ট শার্ট পরা এক ভদ্রলোক হাতে ব্যাঙ্কের কিছু কাগজপত্র নিয়ে আমাকে ডাকছেন। বয়স মোটামুটি ৫৫/৬০ এর কাছাকাছি। আমি ওঁর দিকে তাকাতে উনি জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে এসেছি? বললাম নিজের পরিচয়, আসার উদ্দেশ্য। এবার তাঁর নিজের পরিচয় দেওয়ার পালা। নাম বলেন ‘ডি এন স্কোয়ার’। অদ্ভুত লাগল বেশ। কারণ নিজের নাম কেউ এ ভাবে কখনও বলেন না। ভদ্রলোককেও বেশ চমকপ্রদ মনে হলো। সুন্দর একখানা নাম অবশ্যই ওঁর আছে। তা হল ‘দেবো নারায়ণো নন্দী’। ওঁর উচ্চারণে দেবনারায়ণ নন্দী নামটা এমনই শোনাল। পেশায় স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক।
দেবো নারায়ণোবাবু নিজেই নিজের ও রাজবাড়ির কিছু কিছু ইতিহাস বলতে শুরু করলেন। ওঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উনিই নাকি এই রাজবাডিঁর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। সময়ের ফেরে উনি বঞ্চিত হয়েছেন। এখন যিনি উত্তরাধিকারী, তাঁর উপর প্রচুর অভিযোগ। আমাকে বার বার বলছিলেন যেন ওঁকে গিয়ে আমি বলি যে ‘ডি এন স্কোয়ার’ই প্রকৃত উত্তরাধিকারী। মন্দিরের দেবতার উপর অগাধ ভরসা, আস্থা ও ভক্তি। বুঝতে পারলাম, রাজবাড়ির ইতিহাস ও বর্তমানের সঙ্গে উনি নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছেন। অনেকক্ষণ কথা বলার পর উনি নিজের কাজে বেরিয়ে পড়লেন। আমিও আবার ওই রহস্যময় দোতলার কোণায় ডুবে গেলাম।

সবেমাত্র দোতলার বারান্দায় কিছু ছায়ামূর্তির আনাগোনা দেখতে শুরু করেছি, আমাকে আবার ওই দৃশ্য থেকে টেনে বের করে আনা হল। একটু বিরক্তই হলাম। দেখি, আবার সেই ভদ্রলোক। এবার তিনি এসেছেন অন্য প্রসঙ্গে বলার জন্য। বনওয়ারিজীকে নিয়ে তিনি একটা গান গেয়ে শোনালেন। আর নাচও দেখালেন। রাস্তার মাঝে এক বৃদ্ধের ভক্তিতে ডুবে গিয়ে দু’হাত তুলে নেচে নেচে গান গাওয়া আপাতদৃষ্টিতে ভীষণ হাস্যকর মনে হলেও অনুভব করলাম কী ভীষণ সরলতা ভদ্রলোকের মধ্যে। সমস্ত বিরক্তি উধাও হয়ে গেল। অদ্ভুত এক ভাললাগা কাজ করতে শুরু করল। আমি মনোযোগ দিয়ে ওঁর গান, নাচ দেখলাম। অবশেষে নিজের মনের সব দুঃখ, কষ্ট, অভিযোগ আমার কাছে প্রকাশ করে তিনি বিদায় নিলেন। আমি জানিনা কে আসল উত্তরাধিকারী, কে যোগ্য। তবুও কেন জানি না ভদ্রলোকের জন্য মায়া হল। কষ্ট অনুভব করলাম।
প্রতিটা রাজবাড়ির ইতিহাসে বহু অস্বাভাবিক ঘটনা লুকিয়ে থাকে। হতে পারে এটাও হয়তো সে রকম কোনও একটা ইতিহাস। ওঁর আচরণ খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না। তবুও ওঁর বলা প্রতিটা শব্দে নিজের বংশমর্যাদা, হারিয়ে যাওয়া গৌরব, আর প্রতিষ্ঠার কথা প্রতিফলিত হচ্ছিল। যা মোটেও অস্বাভাবিক বলে মনে হয়নি আমার। সত্যি বলতে এর পর সোনারুন্দি রাজবাড়ী গেলে আমার মনের কোনও একটা অংশ হয়তো ওঁকে খুঁজবে। ওঁর কথা শোনার আশায়।

অতীত থেকে বেরিয়ে এসে এবার রাজবাড়ির প্রধান দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ভেঙে পড়া বিশালাকার দরজাটির উপর নহবতখানার উপস্থিতি স্পষ্ট বোঝা যায়। ইটের দাঁত বার করা জঙ্গল উপেক্ষা করে বসে বসে নহবতখানার সুরের কাল্পনিক মূর্ছনায় কিছুক্ষণ ডুব দিলাম। মোটা মোটা ইটের দেওয়াল জায়গাটাকে ঠান্ডা করে রেখেছিল। শরীর মন জুড়িয়ে গেল। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে বেরোলাম বাকি থেকে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ দেখার উদ্দেশ্যে। তবে বুঝলাম পুরোটা দেখা সম্ভব না। বেশিরভাগ অংশই জঙ্গলে ঢেকে আছে। যেখান পর্যন্ত পৌঁছনো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যেটুকু অব্দি পৌঁছতে পেরেছিলাম তার সৌন্দর্যে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এতো বড়, এত বিশাল যার ব্যাপ্তি ছিল তার গরিমাও না জানি কেমন ছিল। মন ভারাক্রান্ত হয় পড়ছিল বার বার। ভাঙা মন নিয়ে রাজবাড়ি চত্বর থেকে বেরিয়ে এলাম। টোটো ধরে সোজা এসে পৌঁছলাম গঙ্গাটিকুরি স্টেশন। প্রায় ১২.৪৫ নাগাদ। ফেরার পালা।
আসার সময় স্টেশনগুলোর নিস্তব্ধতা ভীষণ মন টেনেছিল। তাই ঠিক করেছিলাম কোনও একটা ফাঁকা স্টেশনে কিছুক্ষণ বসে থাকব। নিজের মনের সঙ্গে একান্ত সময় কাটাব। ট্রেন ১.১৯ মিনিটে। হাতে বেশ কিছুটা সময়। একটা শখ পূরণ করলাম। যেটা এর আগে কোনও দিন করিনি। স্টেশনের সিঁড়িতে বসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা। বসে বসে অন্য ট্রেনের আনাগোনা দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।

হঠাৎ একটা ডাকে পাশে ফিরে তাকালাম। দেখলাম একটি ২২-২৪ বছর বয়সি ছেলে আমাকে ডাকছে কথা বলার জন্য। কোথায় যাচ্ছি, কোথায় এসেছিলাম, কেন এ সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। বেশ মজা লাগছিল। বুঝলাম সেও সময় কাটানোর জন্যই আমার সঙ্গে ভাব জমাচ্ছে। তার পর সে শুরু করল তার নিজের কথা। পাশের একটা গ্রামে সে থাকে। প্রচুর জমিজমা আছে। আজিমগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়ি। তার সদ্যোজাত সন্তানকে দেখতে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। কিছুক্ষণ কথা বলার পর বুঝতে পারলাম ছেলেটি তার স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালবাসে। স্ত্রীয়ের ভূরি ভূরি প্রশংসা শুরু করল। যতক্ষণ বসেছিল, শুধু স্ত্রীয়ের কথাই বলে চলল। নিজে স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। অথচ তার স্ত্রী বিএ পাস। আজিমগঞ্জেই থাকে, ওখানেই চাকরি করে। স্ত্রী এত শিক্ষিত অথচ স্বামী ক্লাস ফোরের গণ্ডি না পেরনো সত্ত্বেও সে মেয়ের মনে কোনও অহংকার নেই। স্বামীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়। সে স্বীকার করল, তার ভাগ্য ভীষণ ভাল। তাই শহরের ভাল মেয়ে তাকে বিয়ে করেছে। অবশেষে স্ত্রীয়ের একখানা ছবিই দেখিয়ে ফেলল ফোন বের করে। জিজ্ঞেস করল, তাদের দু’জনকে একসঙ্গে কেমন মানাচ্ছে?
ভীষণ ভাবে উপভোগ করছিলাম, ছেলেটির স্ত্রীকে নিয়ে পাগলামি। যেখানে এখনও মেয়েরা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে হিংসার শিকার হয়, সেখানে এই ছেলেটির স্ত্রীয়ের জন্য এত যত্ন দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠল। ভাগ্যবতী ছাড়া স্বামীর এত আদর যত্ন পাওয়া যায় না। কথা শুনতে শুনতে ট্রেন চলে এল। ছেলেটির একটি ফটো তুলে রাখব ভেবেও ভুলে গেলাম। সারাজীবন ছেলেটির মুখ আমার মনের কোণে গভীর ভাবে আঁকা হয়ে রয়ে গেল।

আমার গন্তব্য খাগড়াঘাট। বসে পড়লাম একটা সিট দখল করে। ফাঁকা স্টেশনের নিস্তব্ধতা উপভোগ করার ইচ্ছে নিয়ে। পরের স্টেশন চৌরিগাছাতে নেমে পড়লাম। একদম ফাঁকা স্টেশনে। কিছু শ্রমিক মধ্যাহ্নভোজ সারছিলেন নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল হয়ে। কিছুক্ষণ একা বসে থেকে পরের ট্রেনে করে পৌঁছলাম কর্ণসুবর্ণ স্টেশন। সেখানেও প্ল্যাটফর্ম এতটা ফাঁকা না হলেও বেশ খালি খালি। সত্যি বলতে ভীষণ ভাললাগা কাজ করছিল এ ভাবে কিছু সময়ের জন্য নাম পরিচয়হীন হয়ে হারিয়ে যেতে। বহু মানুষ, বহু ঘটনা, বহু অভিজ্ঞতা এই ভাবেই জন্ম নেয়। কর্ণসুবর্ণ থেকে পরের ট্রেনে করে পৌঁছলাম খাগড়াঘাট। তখন বিকেল প্রায় ৫.৩০। সারাদিন সে ভাবে কিছু খাওয়া হয়নি। ভাবলাম প্ল্যাটফর্মের কোনও দোকান থেকে একটু কিছু খেয়ে বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে বেরিয়ে পড়ব। সারাদিনে অভিজ্ঞতার ঝুলি প্রায় ভর্তি করে ফেলেছি। এবার বাড়ি ফিরে সে সব রোমন্থন করতে হবে।
একটি দোকানে গেলাম। রমজান মাস চলছে, একটু পরেই ইফতার হবে। দোকানে খাবার আর জল কিনতে গিয়ে দেখলাম এক যুগল নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে খাবার কিনছে। বুঝলাম রোজা আছে, হয়তো বাড়ি পৌঁছতে পারেনি, তাই স্টেশনে বসে ইফতার সেরে নেবে। দু’জনের চোখে মুখে দু’জনের জন্য এক আকাশ মুগ্ধতা অনুভব করলাম। বেশ গুছিয়ে সামান্য কিছু খাবার কিনে দোকানটির সামনের বসার জায়গায় গিয়ে বসল। কৌতূহলবশত আমিও ওদের পাশে গিয়ে বসলাম। ততক্ষণে ইফতারের সময় হয়ে গিয়েছে। ওরা খেতে শুরু করলো। পরম মমতায় ছেলেটি মেয়েটিকে আগে খাবার এগিয়ে দিচ্ছিল, তারপর নিজে মুখে তুলছিল। তাদের ভালবাসার গভীরতা মন ছুঁয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দোকানদার ছেলেটি ওই ছেলেটিকে ডাকল। ছেলেটি উঠে গিয়ে একটা স্টিলের বাটি নিয়ে ফিরল। তার মধ্যে একটু ফল আর শিমায় এর পায়েস। এই আতিথেয়তা এবং আত্মীয়তাটুকু পেয়ে দু’জনেই কী রকম বিহ্বল হয়ে পড়ল। নিজেদের সঙ্গে সে ভাবে কিছুই আনেনি। তার মধ্যেই কিছু একটু ছেলেটি উঠে গিয়ে দোকানের ছেলেটিকে দিতে গেল। তাদের সারাদিনের ক্লান্তির পর উজ্জ্বল মুখ আর মানবিকতা দেখলাম। বুঝলাম, অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ হতে কিছুটা বাকি রয়ে গিয়েছিল। আমি আমার খাওয়া শেষ করে একরাশ ভাললাগা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

অনেকটা সংকোচ, কিছুটা নিজের উপর আস্থা, অনেকটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় আর নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করার জন্য বেড়িয়েছিলাম নিজের একটি বিশেষ দিনে। অদৃশ্য সর্বময় শক্তি যে আমার জন্য এত ভাল ভাল উপহারের ঝুড়ি সাজিয়ে রেখেছিলেন তা সত্যিই আমার ভাবনার বাইরে ছিল।
স্মরণীয় হয়ে রয়ে গেল দিনটা আমার জীবনে।
ছবি- লেখিকা
(সমাপ্ত)




