কাখরা পিঠা, ওড়িশা।
খাদ্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

রাজধানীর ফুটপাতে কাখরা পিঠার স্বাদ

দীপক দাস

কলকাতার ফুটপাতগুলো খাদ্য-সংস্কৃতির মহামিলন ক্ষেত্র। দেশ-বিদেশের খাবার নবকান্তিতে নজর কাড়ে এখানে। আবার জেলারও মিলনস্থল। পাহাড়-রাঢ়-গাঙ্গেয় সব খাদ্য সংস্কৃতি এসে মিলেছে রাজধানীর ফুটপাতে।

কলকাতায় কর্মসূত্রে যাতায়াত। কাজের ফাঁকফোকরে মাঝে মাঝে ফুটপাতে ঢুঁ মারার অভ্যাস রয়েছে। বিশিষ্ট ও বরিষ্ঠ সহকর্মী অরণি বন্দ্যোপাধ্যায় দাদা ফুটপাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন। প্রচুর ঘুরেছেন। খাদ্যরসিক মানুষটির সঙ্গে হাঁটলে নানা জায়গার খাবারদাবার আর ইতিহাসের কথা জানা যেত। তাঁর সঙ্গে হেঁটেই এসপ্ল্যানেডের কাছে তিব্বতি চায়ের সন্ধান মিলেছিল। আসলে তিব্বতি নয়। বিশাল একটা সামোভারে চা তৈরি হয়। ঠিক চা তৈরি নয়। সামোভারে চায়ের জল গরম করা হয়। তার পর চা। রসিক মানুষটি সেই চায়ের নাম দিয়েছিলেন তিব্বতি চা।

সামোভার।
সামোভারে ফুটছে গরম জল।

অরণিদা অবসর নিয়েছেন অনেক বছর। এখন একাই মাঝে মাঝে ফুটপাতে হাঁটি। কখনও কখনও সঙ্গী হয় সহকর্মী তথা গল্পকার প্রসেনজিৎ সিংহদা। একদিন একা হাঁটতে হাঁটতেই দোকানটা চোখে পড়েছিল। যদি দোকান বলা যায় সেটিকে। উপরের তাকে সিগারেটের দোকান। তার নীচের খোঁদলে একটা স্টোভ, দু’চারটে ডেকচি, কড়া নিয়ে বসে একজন। বড়া ভাজছিলেন। বিউলির ডাল, পিঁয়াজের সেই বড়া দারুণ সুস্বাদু। শুধু বা মুড়ি দিয়ে বেশ ভাল লাগে। সেই বড়াই আমার আর দোকানদারের পরিচয় বাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে।

কিছুদিন যাতায়াতে নামটা জেনেছিলাম। ত্রিনাথ সাহু। আদতে ওড়িয়াবাসী। বালেশ্বরে বাড়ি। ঔড্র দেশীয় নানা রকম নোনতা খাবার তৈরি করেন প্রৌঢ় ত্রিনাথ। সে সব কথা অন্যখানে বলা যাবে। ত্রিনাথের একটাই মুশকিল, মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যান। জিজ্ঞাসা করলে কখনও বলেন, বিক্রি কমে গিয়েছে। কখনও খুব গরম পড়েছে। লোকে ভাজা খাচ্ছে না। কখনও বলেন, দেশে গিয়েছিলাম। একবার অনেক দিন আসেননি। টিফিন খেতে বেরিয়ে অফিসের পিছনের দিকের রাস্তায় উঁকি দিয়ে ফিরতে হয়েছে বারবার। তিব্বতি চায়ের মোড় থেকে উঁকি দিয়েই দেখতে পেতাম, সিগারেটের দোকানের নীচটা ফাঁকা। ফুটপাতে কোনও স্টোভ, ডেকচি নেই। মানে ত্রিনাথও নেই। হঠাৎ একদিন আবির্ভাব। কোথায় ছিলেন? উত্তর, ‘‘বাইকে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গিয়েছিল।’’

আবার যাতায়াত শুরু হল মাঝে মাঝে। একদিন দেখি, নতুন কিছু ভাজছেন। ‘‘কী গো এটা?’’ কাখরা। নামটা শোনা মনে হল। স্মৃতিতে হালকা চাপ দিতেই বেরিয়ে এল, ঝাড়গ্রামের হাতিবাড়ি থেকে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলা কুলিয়ানায় ডোকরা শিল্পীদের গ্রামে গিয়েছিলাম দল বেঁধে। সেই সফরে ওড়িশার এক মিষ্টির দোকানে তিন ধরনের মালপোয়া খেয়েছিলাম। তিনটির একটি মালপোয়ার নাম দোকানদার বলেছিলেন, কাকরা। কিন্তু ত্রিনাথ তো বলছেন পিঠা। সেই দোকানের কাকরা মালপোয়া আর ত্রিনাথের কাখরা পিঠার মধ্যে বহিরঙ্গেও মিল নেই। মালপোয়া হোক বা পিঠা, খাবার তো! নতুন ধরনের খাবার। কিনে নিলাম। সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া যাবে।

খাওয়া হল। এ বার কাখরার চরিত্র বিশ্লেষণ। প্রথম কাজ গোত্র নির্ধারণ। শরণ নেওয়া গেল কোনও দিন চোখে না দেখা বন্ধু তথা গবেষক তরুণ সিংহ মহাপাত্রের। পশ্চিমবঙ্গবাসী তিনি। তবে পূর্বপুরুষের শিকড় ওড়িশায়। কাখরা পিঠা না মালপোয়া? তরুণবাবু জানালেন, পিঠা। তাঁরা রসে ডোবানো কাখরা খাননি কখনও। আমরা ওড়িশার দোকানে শব্দটা কাকরা শুনেছিলাম। শোনার ভুলও হতে পারে। তবে আন্তর্জালে সন্ধান করে কাকরাও পাচ্ছি। সেটাও পিঠা। ওড়িশার দোকানের রসে ডোবানো মালপোয়া নয়। তরুণবাবু বললেন, শব্দটা কাকরা নয়, কাখরা।

ময়ূরভঞ্জ জেলা।
ওড়িশার দোকানের মালপোয়া। মাঝের সারিতে। সাদাটা বোধহয় কাকরা বলেছিলেন দোকানদার।

কী দিয়ে তৈরি হয় কাখরা পিঠা? ত্রিনাথের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, উনি তৈরি করেছেন সুজি দিয়ে। সুজি, চিনি দিয়ে মণ্ড তৈরি করে তার ভিতর ছানার পুর দিয়ে বানিয়েছেন। কেউ কেউ সবেদা মানে চালের গুঁড়ো দিয়েও কাখরা করেন। ছানার বদলে নারকেলের পুরও ব্যবহার হয়। কেউ পুর দেন দুধের সরছাঁচি। ত্রিনাথের দোকানে আমি শুধু ভাজতে দেখেছিলাম। তৈরির পদ্ধতি দেখা হয়নি। আন্তর্জালে খুঁজে কয়েকটি ভিডিয়ো দেখে নেওয়া গেল। বোঝা গেল, মূল উপকরণ চালের গুঁড়ো বা সুজি, উভয়ই হতে পারে। ছানা, ছাঁচি, নারকেল পুর হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। পুরে মেশানো যেতে পারে কিসমিস, কাজুও।

তরুণবাবু কাখরা রহস্যভেদে আরেকটু সাহায্য করলেন। একটা লেখা পাঠালেন হোয়াটসঅ্যাপে। বাঁকুড়া বিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন ‘বাঁকুড়ার খেয়ালী’তে সংকলিত বিজয় পাণ্ডার লেখা। ‘বাঁকুড়া জেলার উৎকল ব্রাহ্মণদের খাদ্যাভাসে পিঠা-লাঠা’য় কাখরা সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছেন বিজয়বাবু। প্রক্রিয়া ভেদে কাখরা পিঠা তিন ধরনের হয়— সাধারণ কাকরা, ছেনার কাকরা ও সাদা কাকরা। তিনি কিন্তু কাকরা লিখেছেন। কাখরা নয়। কাকরা পিঠের প্রাথমিক উপাদান আতপচালের গুঁড়ি। অর্থাৎ সবেদা। তিনি চিনি নয়, গুড় দিয়ে তৈরি কাখরা বা কাকরার উল্লেখ করেছেন। পদ্ধতিটি এ রকম, পাত্রে গুঁড়ির পরিমাণ মতো জল দিয়ে গরম করতে হবে। জল গরম হলে দিতে হবে গুড়। অল্প একটু নুনও দেওয়া প্রয়োজন। ফুটতে শুরু করলে ওই জলে একটু একটু করে গুঁড়ি ঢেলে নেড়ে নেড়ে মণ্ড তৈরি করে নিতে হয়। ভাল করে সিদ্ধ করে নিতে হয় মণ্ডটি। আঞ্চলিক ভাষায় মণ্ডটিকে খৈল বলে। মণ্ড ঠান্ডা হলে লেচি কেটে লুচির মতো বেলে নিয়ে ঘিয়ে ভাজতে হয়।

কাখরা পিঠা।
কাখরা ভাজছেন ত্রিনাথ। কলকাতার ফুটপাতে।

তিন রকমের কাকরার বৈশিষ্ট্যও বলেছেন লেখক। সাধারণ কাকরায় কোনও পুর থাকে না। এবং এগুলো জোড়া নয়। ছানা-ছাঁচি মিশিয়ে পুর তৈরি করে মাঝে দিয়ে ভাজা কাকরা হল ছানার কাকরা। চালের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি কাকরা সাদা কাকরা। ছানার কাকরায় পুর ও দু’টি লেচিকে সমমাপে তৈরি করতে নিপুণ হাতের প্রয়োজন হয়।

আরেক ধরনের কাখরার সন্ধান দিয়েছেন আশিসকুমার দত্ত। ‘এবং জলঘড়ি’ পত্রিকার ২০২০ সালে অগস্ট-নভেম্বর সংখ্যায় মিষ্টি ক্রোড়পত্র করেছিল। এই সংখ্যায় আশিসবাবু লিখেছিলেন, ‘বাঁকুড়া-বর্ধমানের মিষ্টি কথা’। তাতে তিনি দু’পাশ মোড়া কাখরা পিঠের কথা জানিয়েছেন। দু’টি লেচির মাঝে পুর দিয়ে পাশগুলো মুড়ে দেওয়া হয়। তার পর ভাজা হয়। আন্তর্জালে খোঁজ করেও এ রকম খাঁজকাটা কাখরা দেখিনি। তবে পাশগুলো মুড়ে দেওয়ায় মনে হচ্ছে, গোল মিষ্টান্ন বা পিঠেটি অনেকটা ক্ষীরকান্তির মতো লাগবে। ক্ষীরকান্তি অর্ধ চন্দ্রাকার হয়। গোলও হয়। আমি দু’টি লেচি মোড়া কাকরা খাইনি। ত্রিনাথ সম্ভবত মণ্ডের একটি লেচির ভিতরে পুর দিয়ে সেটি হাত দিয়ে চেপে তৈরি করেছিলেন। ওড়িশার সেই দোকানে আমরা কি তবে সাদা কাকরা খেয়েছিলাম!

কাকরা দেবভোগ্য। বিশেষ কোনও দেবতার ভোগে অন্য পিঠের সঙ্গে দেওয়া হয়। অতিথি আপ্যায়নে কাখরা পিঠা অতি আবশ্যিক পরিবেশন। কাকরা পিঠার স্বাদ নাকি মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও পেয়েছিলেন। তিনি বাঁকুড়ার হিরবাঁধ থানার বনগোপালপুরে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধনে এসেছিলেন। সেই সময়ে তাঁকে ছানার কাকরা খাওয়ানো হয়েছিল। বিজয়বাবু জানিয়েছেন, জামাই, বেয়াই এবং অতি নিকটজন বাড়িতে এলে রাতে তাঁকে খাবারের সঙ্গে অবশ্যই ছানার কাকরা খাওয়ানো প্রথা। কাকরা পিঠা না খাইয়ে যদি চালের রুটি খাওয়ানো হত তা হলে আত্মীয়েরা ব্যঙ্গ করে বলতেন, রাঙ্গা-ধলা খাওয়ালো।

জামাই আদরে কাকরা আরও কড়া। অন্য আত্মীয়ের বেলায় কাকরা একদিন দিলেই চলে। কিন্তু জামাই যতদিন থাকবে ততদিন রাতে তাকে ছানার কাকরা আর মাসকলাইয়ের বড়া খাওয়াতে হবে। একসময়ে নাকি উৎকল সমাজে অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, শ্রাদ্ধে ব্রাহ্মণ ভোজনে সাধারণ কাকরা একটা দু’টো দিতেই হত। তার সঙ্গে দিতে হত পায়েস। তবে তা ‘উত্তম ভোজ’ হয়ে উঠত।

একটা বিষয় বোঝা গিয়েছে, কাখরা ওড়িয়া খাদ্য সংস্কৃতির অঙ্গ। সেই সঙ্গে বাঙালি-ওড়িয়া খাদ্য সংস্কৃতির সমন্বায়ক অর্থাৎ আদানপ্রদানের নিদর্শন। আশিসবাবুর মতে, মেদিনীপুর সংলগ্ন বাঁকুড়ার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বাড়িতে তৈরি ‘মিষ্টি/পিঠে’ কাখরার আভিজাত্য রয়েছে।

ওড়িশার কাখরা পিঠা।
ভাজা চলছে কাখরা। কলকাতার ফুটপাতে।

কাখরা পিঠার কিছু সহখাদ্য রয়েছে। বিজয়বাবু জানাচ্ছেন, আলুপোস্ত, মাছ বা মাংসের ঝোল মাখিয়ে কাখরা খেতে ভাল লাগে। অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী সম্পাদিত ‘বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া’ সংকলনে রামামৃত সিংহ মহাপাত্রের ‘বাঁকুড়ার মেলা, পথ ও হাটের খাবার’ সংকলিত। এই লেখায় লেখক জানিয়েছেন, কাখরা পিঠার সঙ্গে হাঁসের মাংস নাকি জামাই আর কুটুমদের আপ্যায়নের সর্বোত্তম আপ্যায়ন।

অফিসে আর হাঁস-মাছ কোথায়! আমরা তো এমনি এমনি খেলাম। সহকর্মীরাও শুধুতেই সাধু সাধু করেছিলেন।

ছবি- লেখক ও যথা ইচ্ছা তথা যা

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *