বোরিরা, কুলটি।
অন্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

এক আঁধার পর্যটনে অকস্মাৎ

দীপক দাস

ঘোরাঘুরির তালিকায় ছিল না জায়গাটা। এ রকম অনেকবারই হয়েছে। গিয়েছি একটা জায়গায়। স্থানীয় গাইড, তাঁরা বেশির ভাগ সময়েই আমাদের যান চালক, নিয়ে গিয়েছেন মনোমুগ্ধকর জায়গায়। বেনাপুর সফর কোনও মুগ্ধতার সফর ছিল না। ছিল ডার্ক টুরিজমের। তার বহু আগেই অবশ্য আঁধার পর্যটনে আমাদের সফর-খড়ি হয়ে গিয়েছিল। ভূতুড়ে স্টেশন বলে একসময়ে নাম করা বেগুনকোদর সফরের সময়ে ডার্ক টুরিজমের নামটাই শুনিনি। এবার কুলটি স্টেশনে নেমে পর্যন্ত জানতাম না, এক আঁধারতর সফর আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।

কুলটির বেনাপুর নাকি ভূতুড়ে গ্রাম। বহুদিন থেকে শুনে আসছিলাম। সময় সুযোগ হতে এক মঙ্গলবার ভোরে বেরিয়ে পড়া তিনমূর্তিতে। দীপু, ইন্দ্র আর আমি। কুলটি স্টেশনে নেমে খোঁজখবর করছিলাম। গাড়ির সন্ধানও ছিল তার মধ্যে। হিন্দিভাষী এক লটারির টিকিট বিক্রেতা বললেন, অল্প দূরত্ব। টোটোতেই হয়ে যাবে। তিনিই হাঁক পেড়ে এক টোটোচালককে ডাকলেন। কথাবার্তা হল। এ দিকে তখন রেলগেট পড়ে গিয়েছে। টোটোচালক দাদা আলম বললেন, আমরা এই সুযোগে একবার খাদানটা দেখে আসতে পারি। সেখান থেকে বেনাপুর যাওয়া যাবে।

বোরিরা, কুলটি
রাস্তায় ফাট ধরেছে।

খাদান দেখার কী আছে? অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে। প্রকৃতির বুক থেকে তার সম্পদ খাবলেখুবলে নেওয়ার দাগ ছাড়া? এটুকু সত্য। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সেই ক্ষতের মধ্যে আলাদা সৌন্দর্য তৈরি হয়। কয়েকটি খাদান ঘুরে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে আমাদের। বহু বছর আগে আমি আর ইন্দ্র বরন্তি থেকে মাইথনের দিকে গিয়েছিলাম গাড়িতে। পথে এক কয়লা খাদান পড়েছিল। গাড়ি থামিয়ে নেমেছিলাম তাতে। একটা পাথরের চাঁইকে অরণ্যদেবের খুলিগুহার মুখের মতো মনে হচ্ছিল। পুরুলিয়ার মার্বেল লেকও আসলে একটা খাদান। গত পুজোয় ঝাড়খণ্ডের চাইবাসায় গিয়ে ঝিঁকপানির আগে একটা পাথরের খাদান দেখেছিলাম আমরা। পরিত্যক্ত খাদান। সেই খাদানে জল জমে অনন্য রূপ তৈরি করেছে। এবারের সফর অবশ্য কয়লা খাদানের।

জায়গাটার নাম বোরিরা। আমরা টোটোয় গল্প করতে করতে এগোচ্ছি। এলাকাটার গায়ে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতার ভাব। সেটা কেন বুঝে উঠতে পারছিলাম না। টোটো এগোচ্ছিল। উল্টো দিক থেকে মাঝে মাঝে একটা একটা সাইকেল আসছিল। ক্যারিয়ারে, ফ্রেমের মাঝে বস্তা বোঝাই। চালিয়ে আনার উপায় নেই। ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলেছেন চালক। একটা দু’টো মোটরবাইকও গেল। তাতেও বস্তা। সেগুলো ঠেলা নয়, চলা। আলমদা জানালেন, বস্তায় কয়লা আছে। খনি থেকে নিয়ে আসছে চোরাই কয়লা। এটা এখানকার অনেকের জীবিকা। কারণ এলাকায় তেমন কাজ নেই।

বোরিরা, কুলটি।
খাদানের পাশের ইটভাটা

এক জায়গায় দেখলাম, রাস্তার পাশে ডাঁই করে রাখা কয়লা। সেগুলোতে আগুন দিয়ে তদারক করছে একটা লোক। আসলে কাঁচা কয়লা পুড়িয়ে তা ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। কিছুটা এগোতে দেখা গেল রাস্তার মাঝে ফাট ধরেছে। নদী তীরে বাসে যেমন ভাবনা থাকে খনি এলাকাতেও তাই। কখন যে ধস নামে! কোথায় যে নামে! খবরের কাগজে পড়েছিলাম, এরকম একটা ফাটলে আস্ত বাড়ি ঢুকে গিয়েছিল।

টোটো আরেকটু এগোতেই বসতি একেবারেই হালকা হয়ে গেল। গাছপাল অল্পবিস্তর বাড়ল। রাস্তার পাশে প্রচুর কুলগাছ দেখলাম। কুলও হয়ে আছে ঝেঁকে। কয়েকটা বাচ্চা কুল পাড়ছিল। সে সব দেখে ভাল লাগছিল। খনির কাছাকাছি এসে পড়েছি। জিজ্ঞাসা করলাম, আলমদা খনিতে ধস নামে না? তিনি জানালেন, কয়েক মাস আগেই নেমেছিল। অনেকজন চাপা পড়ে গিয়েছিল। যে সংখ্যাটা বললেন, সেটা সত্যিই অনেক। কত ঘরে হাহাকার নেমে এসেছিল! শুনে মনটা দমে গেল।

বোরিরা, কুলটি।
জল জমেছে খাদানে।

আসলে এই খাদানটা একটা খোলা মুখ কয়লা খনি। কিন্তু পরিত্যক্ত। সরকারি ভাবে কয়লা তোলা হয় না। তবে এলাকার মানুষজন ইঁদুর-গর্ত প্রক্রিয়ায় (র‌্যাট হোল মাইনিং) খুঁড়ে খুঁড়ে কয়লা বার করেন। মানে ছোট ছোট গর্ত খুঁড়ে কয়লা বার করা হয়। আর তা করতে গিয়েই কখনও ধস নামে। জীবন চালাতে গিয়ে জীবন দিয়ে দেন হতভাগ্যরা।

টোটো থেকে নেমে খাদানের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম তিন জনে। সত্যি বলছি, তখন ওই চাপা পড়া হতভাগ্যদের কথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম। সেই রুক্ষতার মধ্যে তৈরি হওয়া রূপই ভুলিয়েছিল। কয়লা তুলে তুলে বিশাল খাদ তৈরি হয়েছে অনেকটা এলাকা জুড়ে। গভীরও অনেকটা। খাদে একটা ট্রাক ছিল। কয়েকজন লোকও। কিন্তু সবই খেলনার মতো লাগছিল। খাদের কিছুটা অংশে গুঁড়ো গুঁড়ো কয়লার আস্তরণ। কিছু জায়গায় জল জমেছে। কয়লা কাটার ধাপগুলো খাদের গা বরাবর এসে মিশেছে খাদানে। পাড়ে অল্পস্বল্প গাছ। সব মিলিয়ে কালছে প্রেক্ষাপটে ঊষর সৌন্দর্য তৈরি হয়েছে।

বোরিরা, কুলটি।
বস্তা ভরা কয়লা কি?

আমরা পাড় বদল করলাম। মানে এগিয়ে গেলাম কিছুটা। খাদের উল্টোদিকে রাস্তার পাশে একটা ইটভাটা। কিছু ইট রোদে শুকোতে দেওয়া। এক পাশে ভাটাকর্মীদের ঘরগেরস্থালি। আমরা খাদানের আরেকটু পাশে গেলাম। দীপু আর ইন্দ্র ক্যামেরা জুম করে করে দেখছিল। দেখতে দেখতে একটা গর্তের খোঁজ মিলল। সেটাই কি ধসের জায়গা? আমাদের ছবি তুলতে দেখে এক ভাটাকর্মী এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি জানেন না। ঝাড়খণ্ড থেকে কাজ করতে এসেছেন।

আমরা ঘুরতে ঘুরতে আরেক পাড়ে গেলাম। সেটা যে পাড় দিয়ে শুরু করেছিলাম তার ঠিক উল্টোদিকে। এখানে একটা ডাঙা দিয়ে খাদানের কাছাকাছি যাওয়া যায়। মাটিতে বেশ ফাটলের চিহ্ন। কিছুক্ষণ থেকে পালিয়ে এলাম। মন থেকে মানুষগুলোর চাপা পড়ে যাওয়ার ঘটনাটা কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না।

বোরিরা, কুলটি।
এমনই ঊষর রূপ।

ডার্ক টুরিজমে সবসময়েই নৈতিকতার একটা প্রশ্ন ওঠে। আসলে ডার্ক টুরিজম হল, সেই সব ঐতিহাসিক জায়গায় ভ্রমণ যেগুলোর সঙ্গে দুঃখজনক ঘটনার যোগ রয়েছে। এই স্থানগুলো ঐতিহাসিক। যেমন ভারতের জালিয়ানওয়ালাবাগ, জার্মানির ইহুদি নিধনের হলোকস্টের স্মারক সফর। তবে এখন ডার্ক টুরিজম বা আঁধার পর্যটনের সংজ্ঞার বিস্তার হয়েছে। ইতিহাসের ছোঁয়া না থাকলেও চলে। ঘটনা হলেই হল। প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে রয়েছে এমন জায়গায় যাওয়াও ডার্ক টুরিজম। আবার প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত তখন তার সাক্ষী হওয়ার গোঁ আঁধার পর্যটনের ভাগে পড়ে। ভূতের ভয়ে গাঁ উজাড় হওয়ার ঘটনা দলে দলে দেখতে যাওয়াও আসলে আঁধারপ্রিয়তা।

নীতির প্রশ্নটা এখানেই। যেখানে অনেক মানুষের দুঃখ জমে রয়েছে সেখানে ঘুরতে যাওয়া কেন? সেখানে নিজেরা দাঁড়িয়ে ছবি তোলাটা কতটা সঙ্গত? ইতিহাস খ্যাত জায়গাগুলো হলে এক কথা। তাও কি জালিয়ানওয়ালা বাগে গিয়ে নিজস্বী তোলা যায়?

বোরিরা, কুলটি।
এটাই কি ইঁদুর গর্ত খনন?

এর কোনও উত্তর আমাদের কাছে নেই। একটাই কৈফিয়ৎ, ভূতুড়ে গ্রাম দেখতে নিজেদের ইচ্ছায় এসেছিলাম। কিন্তু বোরিরা খনিতে বিপর্যয়ের কথাটা টোটোতে বসার আগে পর্যন্ত জানতাম না।

ছবি— দীপশেখর দাস ও ইন্দ্রজিৎ সাউ

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *