দীপক দাস

থমকে যাওয়া সময়ের আলো। সে আলো দেখেছি আমরা। দেখেছি বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী হাতের কাজের পাড়ায়। সেখানকার শিল্পীরা যেন এক একটি সময়কে আগলে রেখেছেন হাতের আঙুলের শিল্পকলায়। হাওড়া জেলার কুমোর পাড়া, পুরুলিয়ার দুয়ারসিনিতে বাবুই ঘাসের দড়ি, ওড়িশার কুলিয়ানা গ্রামের ডোকরা শিল্প। কবেকার সব শ্রাবস্তীর কারুকার্য!
এই রকমই এক ঐতিহ্যের আলো দেখতে পেয়েছিলাম কিছুদিন আগে। গড়বেতার বগড়ির বনকাটিতে। এই গ্রাম কাঠের খেলনার পাড়া বলা যেতে পারে। কাঠের মূর্তিও তৈরি হয়। গ্রামটির সন্ধান দিয়েছিলেন তরুণ সিংহ মহাপাত্র। ইনি লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ইতিহাস বিশারদ। আমাদের নানা ভাবে সাহায্য করেন। কিন্তু লিখতে বললেই যোগাযোগ ছিন্ন করে দেন কিছুদিনের জন্য।

বনকাটি গ্রাম। বড় সুন্দর।
গড়বেতায় বগড়ির মন্দির দেখে গিয়েছিলাম বনকাটি। দেখা করব শান্তিনাথ দে-র সঙ্গে। শিল্পীর খোঁজ তরুণবাবুই দিয়েছিলেন। আমাদের সারথি টোটোচালক দাদা নিয়ে গেলেন গ্রামে। গাছপালা, বাঁশবাগান ঘেরা সুন্দর গ্রাম। জিজ্ঞাসা করতে করতে খোঁজ মিলল শিল্পী শান্তিনাথ দে-র বাড়ির। তিনি বেরিয়ে এলেন। বছর ৬৫-৭০ বয়স। শুরু হল কথা।
বনকাটিতে ঘরে ঘরে কাঠের খেলনা তৈরি হয়। এঁদের পদবি দে। মানে সকলেই একটি পরিবার থেকে ছড়িয়ে পড়া শাখাপ্রশাখা। খেলনা পুতুলের শুরুটা কী ভাবে? তাঁদের কি বগড়ির রাজাদের কেউ নিয়ে এসে গ্রামে বসিয়েছিলেন? শান্তিনাথবাবু সেই তথ্য দিতে পারেননি। তাঁর কথা অনুযায়ী, তাঁরা আদতে বর্ধমানের বাসিন্দা। তবে কোন সময়ে এই বগড়ি পরগনায় এসেছিলেন তা জানা নেই। ঠাকুরদা গোপেশচন্দ্র দে, বাবা ভুবনমোহন এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন। তাঁদের আগের খবর জানা নেই শান্তিনাথ দে-র। তবে রাজাদের বদান্যতায় আগমনের সম্ভাবনাই বেশি। সম্ভবত নবশায়ক সম্প্রদায়কে রাজত্বে স্থান দেওয়ার যে রীতি সেই পথেই এই সূত্রধর পরিবারের পূর্বপুরুষদের বর্ধমান থেকে মায়তায় আগমন। তরুণবাবুও তাই বললেন।

অসমাপ্ত জগন্নাথ মূর্তি হাতে শান্তিনাথ দে। মাটিতে রাখা খেলনা হাওয়া গাড়ি, সুভদ্রা আর রাজা-রানি।
বগড়িতে দে পরিবারের আদি বাস্তুভিটা ছিল মূল মন্দিরের কাছে। সেই বাস্তুভিটা শিলাবতী নদীর গর্ভে চলে গিয়েছে বহু বছর আগে। বাস্তুহারা হওয়ার পরে পরিবার নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ চলে আসেন বনকাটির এই দিকে। কেউ অন্য প্রান্তে। কেউ কেউ চলে গিয়েছেন হুমগড়।
দে পরিবার আগাগোড়া কাঠের কাজ করত। সেই সঙ্গে মাটির কাজও। প্রতিমা বানাতেন তাঁরা। শান্তিনাথবাবুর ভাষায়, বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকেই। শান্তিনাথবাবুর বাবা ভুবনমোহনের কাঠের কাজের নামডাক ছিল। জানলা, দরজা ইত্যাদি তৈরি করতেন। সেই সঙ্গে তৈরি করতেন গরুর গাড়ির চাকা। নামডাকের জন্য তাঁর হাতের জিনিসপত্রের দাম তাই অন্য কারিগরের তুলনায় বেশি হত। সেই সময়ে কাঠের খেলনা গাড়ি, পুতুলও তৈরি করতেন। তরুণ সিংহ মহাপাত্র আমাকে তারাপদ সাঁতরার ‘বাংলার দারু ভাস্কর্য়’ বইয়ের একটা অংশ পাঠালেন। তা থেকে জানা গেল, মায়তার দে পরিবারের অনেকে রথ তৈরিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। মায়তা ও মেদিনীপুরের নানা স্থানের রথ নির্মাণ করেছিলেন তাঁরা। তারাপদ সাঁতরা কালীপদ দে ও গোপাল দে-র নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা ছিলেন দুই ভাই। দে পরিবারের হুমগড় শাখার গোপালচন্দ্র দে-র কাছ থেকে তারাপদ সাঁতরা রথ নির্মাণের আর্যা পেয়েছিলেন। অর্থাৎ রথ তৈরির মাপজোকের সূত্র।

মৃণ্ময়বাবুদের দাওয়ায় কাঠের ঢেঁকি। দীপু পাড় দিয়ে দেখছে। সামনে অসমাপ্ত রাজা-রানি।
দারিদ্রের কারণে শান্তিনাথবাবু মাধ্য়মিকের পরে আর পড়তে পারেননি। দাদাদের সঙ্গে কাঠের কাজে লেগে যান। তখন মজুরি ছিল চার টাকা। তবে তিনি গরুর গাড়ির চাকা তৈরি করেননি। কাঠের খেলনা গাড়ি, পুতুল ইত্যাদি তৈরি করতেন। পরিবারিক ধারাতেই হাতেখড়ি হয়। তৈরি খেলনা বিক্রি হত বিভিন্ন মেলায়। বগড়ি-মায়তার দোলমেলা, রথমেলা তো ছিলই। রসকুণ্ডুর গাজন, কান্তোড়ের শিবের মেলায় যেতেন খেলনা আর পুতুল নিয়ে। পুতুল করতেন রাজা-রানি। তৈরি করতেন ঠেলাগাড়ি, পালকি ইত্যাদি।
শান্তিনাথবাবুর তৈরি কাঠের জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম মূর্তির নাম আছে। তবে এই মূর্তিগুলো তিনি বেশিদিন তৈরি করছেন না। চার-পাঁচ বছর আগে থেকে কাজ শুরু করেন। সেই সময়ে পুরী গিয়েছিলেন দু’বার। ওখানে দেখেছেন প্লাস্টিকের জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা বিক্রি হচ্ছে। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি যদি তিন ভাই বোনের কাঠের মূর্তি তৈরি করেন তা হলে কি দোষ হবে? তাঁরা জানান, হবে না। বরং প্রচার হবে।

ঢেঁকি আর পালকি হাতে মৃণ্ময় দে ও তাঁর স্ত্রী।
আমরা যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন খেলনা বা পুতুল কিছু সম্পূর্ণ তৈরি ছিল না। শান্তিনাথবাবু তাঁর ঘরে নিয়ে গিয়ে আধা কাজ হওয়া মূর্তি আর খেলনা দেখাচ্ছিলেন। রাজা-রানি, আর জগন্নাথ-সুভদ্রার অবয়বে কিছুটা রংয়ের কাজ হয়েছিল সবে। শান্তিনাথবাবু জানালেন, আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। তিনি কাঠের খেলনা, লরি ইত্যাদিও তৈরি করেন। সে দিন একটা ঠেলে নিয়ে চলা বাচ্চাদের পাখা লাগানো হাওয়া গাড়ি ছাড়া কিছু ছিল না। সে গাড়ির কাঠের হাতলে চাকা লাগানো। চাকার উপরে পাখা। হাতল ধরে ঠেললে চাকা ঘোরে। সেই সঙ্গে ঘোরে পাখাও।
পাশেই বাড়ি শান্তিনাথবাবুর ভাইপোদের। মানস, মৃণ্ময় ও মৃণাল দে-র। তাঁরাও কাঠের কাজ করেন। তৈরি করেন নানা রকম খেলনা। মৃণ্ময়বাবুর বাড়ির দাওয়ায় সে সব রাখা ছিল। কাঠের ঢেঁকি, পালকি। তৈরি করেন পুতুলও। কাঠ কুঁদে অবয়ব তৈরি করা হয়েছে এমন রাজা-রানি দেখলাম। ঢেঁকিটা বেশ তৈরি করেছেন। বাঙালি জীবনের একটা ঐতিহ্য তো হারিয়ে যেতে বসেছে। এখনকার প্রজন্ম ঢেঁকি দেখেছে কিনা সন্দেহ। ঢেঁকির ক্ষুদ্র সংস্করণে তাদের ঐতিহ্য-দর্শন হতে পারে। মৃণ্ময়বাবু ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে দেখালেন।

মৃণালবাবুর দাওয়ায় কাজের জন্য কেটে রাখা কাঠের টুকরো।
হাতের কাজে কিছু সমস্যা থাকে। বনকাটির কাঠের কাজের পাড়াতেও রয়েছে। এখানকার থমকে থাকা ঐতিহ্যের আলো ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। এর অনেক কারণ। প্রথমত, চাহিদা কমেছে। দেশ-বিদেশের অনুকরণে নানা পুতুল ও খেলনা বাজারে সহজলভ্য। কাঠের প্রাচীন রীতির খেলনায় বাচ্চাদের আগ্রহ কম। এই বিষয়ে আমার নিজস্ব একটা মত রয়েছে। আগ্রহটা বাচ্চাদের কম নাকি অভিভাবকদের কম? লক্ষ্য করে দেখেছি, বাচ্চারা খুব সামান্য উপকরণকে নিজেদের মতো করে খেলনা ভেবে নেয়। কোনও ওষুধের বাক্সই হল তাদের ট্রেন, বাস, লরি। গাড়িতে বাচ্চাদের স্বাভাবিক আগ্রহ থাকে। কাঠের গাড়ি পেলে তারা কি সেগুলোতে খুশি হবে না? আসলে অভিভাবকেরা নিজেরা আধুনিকতা দেখাতে চান। তাই তাঁরাই কিনে দেন না। দিলে হয়তো বাচ্চারা অপছন্দ করবে না।
কাঠের খেলনার পাড়ার আরেকটি সমস্যা, কাঁচামালের সহজলভ্যতা কমে যাওয়া। এখানকার শিল্পীরা শিমুল, আমড়া, গামার, কাচমোলা গাছের কাঠে কাজ করেন। শান্তিনাথবাবু বলছিলেন, শিমুল কাজের পক্ষে ভাল। পেরেক ঠুকলে ফাটে না। এ সব গাছ তাঁরা জঙ্গল থেকেই সংগ্রহ করতেন। কিন্তু এখন বন দফতর কাজ কাটায় বেশ কড়াকড়ি করেছে। ফলে শিল্পীদের কাঠের মিল থেকে উপকরণ কিনতে হয়। মনের মতো কাঠ মেলে না অনেক সময়।
তৈরি সামগ্রী বিক্রির জন্য বাজারের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন মেলার উপরেই নির্ভর করতে হয় শান্তিনাথ, মানস, মৃণ্ময়, মৃণালদের। সরকারি উদ্যোগের অভাবও রয়েছে। তবুও বনকাটির দে পরিবার বংশ পরম্পরার শিল্প ধরে রেখেছেন। ঐতিহ্যের আলো জ্বলছে। ম্রিয়মাণ হলেও।

কাঠের ট্রাক্টর হাতে কাঞ্চন দে।
আমাদের দুঃখ ছিল, খেলনা বা পুতুলের একটা নমুনাও কি সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে পারব না? কারও কাছে যে নেই সম্পূর্ণ তৈরি কোনও শিল্পসামগ্রী। মুশকিল আসান হলেন কাঞ্চন দে। তিনিও শান্তিনাথবাবুর জ্ঞাতি ভাইপো। একটু খুঁত ধরা ট্রাক্টর এনে দিলেন। দাম নিতে চাইছিলেন না। মূল্য না দিলে শিল্পের অমর্যাদা হয়। অনুরোধ করতে রাজি হলেন। অল্প দামেই।
বনকাটির সেই ট্রাক্টর নিয়েই বাসে উঠেছিলাম। গড়বেতা বাসস্ট্যান্ড থেকে। ব্যাগে জায়গা ছিল না বলে লরি ছিল হাতে। এক সহযাত্রী কিনতে চেয়েছিলেন। বলেছিলাম, দ্বিগুণ দাম দিলেও দেব না।
এর মানে তো কিছু জনের কাছে চাহিদা রয়েছে? বাচ্চারা ট্রাক্টর দেখলে আনন্দ পায়, দেখেছি। তা হলে কি পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না?
কারও যদি কাঠের খেলনা বা মূর্তি প্রয়োজন হয় যোগাযোগ করতে পারেন এই নম্বরগুলোয়—
শান্তিনাথ দে— 6296861575
মৃণাল দে— 8348029537
কাঞ্চন দে— 6297589512
কভারের ছবি— কাঠের ট্রাক্টর
ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ, দীপশেখর দাস
(সমাপ্ত)




