দীপক দাস

ইতিহাসের সামনে পড়লে বড় ঘাবড়ে যাই। যাওয়ারই কথা। সাল-তারিখ মনে থাকে না। এঁর যুগ, তাঁর যুগ মিশে যায়। শাসন ব্যবস্থা, সামাজিক অবদানও ঐ ঐ ঐ…। বেড়াচাঁপা গিয়ে তো ইতিহাসে চাপা পড়ার দশা হয়েছিল। কী বিস্তৃতি তার সময়কালের! পরিচয় ফলকের সামনে দাঁড়িয়েই ঘাবড়ানোর শুরু। লিখতে হবে তো আমাকেই। সঙ্গী দু’জন নানা অজুহাতে পাশ কাটাবে। এত ইতিহাস লিখব কী করে!
অনেক দিন পরে তেমাথা এক হয়েছিল। বাকিরা সংসারে মাথা গলিয়েছে। তাদের স্বাভাবিক কারণেই সময় হবে না। ইন্দ্র অনেক দিন চন্দ্রকেতু গড় যাওয়ার কথা বলছিল। গড়ের ইতিহাসে মুগ্ধ ও। সে মুগ্ধতা কখনও লেখায় প্রকাশ পাবে না। কিন্তু দলের ছেলের মন ভোলানো হবে। তাই রাজি হওয়া। দীপু বিস্তর খোঁজখবর করে জানল, চন্দ্রকেতু গড় থেকে সহজেই টাকি চলে যাওয়া যায়। এ তো একেবারে প্যাকেজ ট়্যুরের মতো ব্যাপার।

এক মঙ্গলবার সকালে উঠে পড়া গেল হাসনাবাদ লোকালে। ফাঁকাই ছিল ট্রেন। শুধু পাতিহাল থেকে ভোর রাতে উঠে শিয়ালদহ পৌঁছনোটাই যা ঝক্কির। বাকিটা বেশ আরামেরই ছিল। নতুন নতুন স্টেশন দেখতে দেখতে, ঝিমোতে ঝিমোতে নেমে পড়লাম হাড়োয়া। এখান থেকেই সুবিধা হয় চন্দ্রকেতু গড়ে যাওয়া। স্টেশনের বাইরে থেকে অটো ছাড়ছে। বেড়াচাঁপা বাজারে নামিয়ে দিল আমাদের। জিজ্ঞাসা করতে করতে পৌঁছে গেলাম গড়ে। প্রায় বাজারের মধ্যেই বলা যায়। পৃথিবা রোডের উপরে অবস্থিত। প্রত্নস্থলটার ছবি বহুবার দেখেছি। দেখে চিনতে পারলাম। কিন্তু অবস্থানটা আমাকে মোটেও আনন্দ দিল না। বড় জনবহুল এলাকায়। প্রত্নস্থলের নির্জনতা বা গাম্ভীর্য পেলাম না।

কিন্তু প্রত্নস্থলের পরিচয় জানানো বোর্ডটা দেখে বেশ রোমাঞ্চই হল। যার মর্মার্থ হল, বরাহমিহিরের ঢিপি বা খনামিহিরের ঢিপি নামে পরিচিত এই জায়গাটি আসলে একটি দুর্গ ঘেরা নগরের অংশ ছিল। সে দুর্গ ছিল বিশাল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালা ১৯৫৬-৫৭ সালে এখানে প্রথম খনন কাজ শুরু করে। এই তথ্য রোমাঞ্চকর নয়। রোমাঞ্চকর হল, মৌর্য যুগের আগে থেকে পাল যুগ পর্যন্ত এক বিশাল সময় পর্বের ইতিহাসের চিহ্ন ধরে রেখেছে এই স্থান। বাংলার সমৃদ্ধ এক বা একাধিক যুগপর্বের সাক্ষীর সামনে দাঁড়িয়ে রোমাঞ্চ না জেগে কি পারে? ফলক থেকে জানলাম, এখানকার গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল একটি উত্তরমুখী বহুভুজ ইটের মন্দির। মন্দিরটিকে আগে গুপ্তযুগের বলে ভাবা হত। পরে নকশা ও স্থাপত্যশিল্প দেখে ধারণা করা হয়, এটি পাল যুগের। এ ছাড়াও মাটির নীচ থেকে বুদ্ধের প্রতিমূর্তি, ভাঙা বৌদ্ধস্তূপ, বুদ্ধ ও জাতকের কাহিনি বলা পোড়ামাটির ফলকও পাওয়া গিয়েছিল। মুদ্রা, পোড়ামাটির সিলমোহর, প্রাচীন পুথি ইত্যাদি পাওয়া যায়। ১৯৬৩ সালে এই প্রত্নস্থলকে ‘গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সৌধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

আমরা মন্দিরটি কোথায় বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তেমন সুবিধা করতে পারিনি। এক কেয়ারটেকার দাদার দেখা মিলেছিল। কিন্তু তিনিও জানালেন, ঠিক কোন অংশটি মন্দির তা বলা মুশকিল। চন্দ্রকেতু গড়ের ইতিহাস, সময়পর্ব এবং চন্দ্রকেতু কে ছিলেন তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাইনি আমরা।
চলে এসেছিলাম বাজারে। কিন্তু তার আগে স্থানীয় ও কেয়ারটেকার ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, গড়ের আরেকটা অংশ রয়েছে কিছু দূরে। সেখানেও যাওয়া স্থির হল। তার আগে একটু রসদ জোগাড় করা দরকার। বাজারে একটা হোটেলে পরোটা-তরকারি খাওয়া হল। তার পর দীপু আর ইন্দ্রর চা তেষ্টা পেল। বড় রাস্তা থেকে হেঁটে এসে আরেকটা দোকানে ঢুকলাম। প্রত্নস্থলের খানিক তফাতে। চায়ের দোকানে মাটির গ্লাসে চা দিচ্ছে। গ্লাসের শিল্পকর্মটি বেশ পছন্দ হল। দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, ডাইসে তৈরি। তবুও অলংকরণ পছন্দ হওয়ায় গ্লাস ধুয়ে ব্যাগে ভরে নিয়েছিলাম আমি আর দীপু। চায়ের দোকানেই জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গিয়েছিল, গড়ের অন্য অংশে যেতে গেলে টোটো ভাড়া করতে হবে। সেটা আমরা যে দিক থেকে এসেছি সে দিকেই। তবে পথের মাঝে বাঁক রয়েছে।

দোকান থেকে নেমে টোটো ভাড়ার চেষ্টাই করছিলাম। কিন্তু তার আগেই একটা ভুটভুটির দেখা মিলল। তিনি যেতে রাজিও হলেন। চেপে বসলাম তিন জনে। যেতে যেতে বুঝলাম, ভুটভুটি হলেও এটা তেলে চলে না। ব্যাটারি চালিত। ভুটভুটির মতো কাঁপতে কাঁপতে আর সওয়ারিদের ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চলে না। বেশ আরামদায়ক যাত্রা। চালকদাদার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। তাঁর হেঁশেলের খবরও দিতে লাগলেন আমাদের।
গল্প করতে করতে একটা ঝোপঝাড়ওয়ালা জায়গায় পৌঁছেছিলাম। রাস্তা থেকে খানিক ঢুকে দু’পাশে বনপালা রেখে পৌঁছনো গেল গড়ের অংশে। এই জায়গাটিকে দেখে বেশ পছন্দ হল। নির্জন, গাছপালায় ঘেরা একটা জায়গা। প্রত্নস্থলের গাম্ভীর্য পেলাম যেন। কিন্তু এখানকার অসুবিধাটা হল, একটা পরিচয় বোর্ড ছাড়া আর কিছুতে জায়গাটিকে গড় বলে মনে হবে না। বরং মনে হবে একটা সুন্দর বাগান।

বোর্ডে জায়গাটিকে গড় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা ভুটভুটি চালকদাদাকে ঢোকার মুখে রেখে আরও গভীরে গেলাম। যেতে যেতে নানা কল্পনা তিন জনের। যে বাঁধের মতো অংশের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম সেটাকে মনে হল গড়ের পাঁচিল। মাটির নীচে চাপা পড়ে গিয়েছে। ডান পাশে বৃষ্টির জল জমে রয়েছে। সেই জায়গাটিকে মনে হল, গড়ের পাশের পরিখা। বাঁ পাশে চাষের জমি। একজন ধান রুইছিলেন। একটা জমিতে ট্রাক্টর দিচ্ছিল। ঢোকার মুখে দু’জন কলাপাতা কাটছিলেন। এখানেই হয়তো ঘরবাড়ি ছিল গড়ের ভিতরের বাসিন্দাদের। বোর্ডে এ সবের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু কল্পনা করতে খারাপ লাগছিল না। অনেকক্ষণ কাটিয়েছিলাম জায়গাটায়। ভাল লাগছিল পরিবেশটা।

আরও কিছু জায়গায় যেতে হবে। বেরিয়ে আসতে হয়েছিল চন্দ্রকেতু গড় থেকে। আসতে আসতে পরিচয় বোর্ডের একটা শব্দ খুব খোঁচাচ্ছিল। খনা-মিহিরের ঢিপির আগেও লেখা ছিল পৌরাণিক শব্দটি। এখানে দেখলাম, চন্দ্রকেতুকে পৌরাণিক রাজা বলা হয়েছে। পৌরাণিক চন্দ্রকেতু কে? বাড়ি ফিরে সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান নিয়ে বসা গেল। অভিধানে এক চন্দ্রকেতুকে পাওয়া যাচ্ছে। তিনি লক্ষ্মণের ছোট ছেলে। ভরতের কথায় রাম তাঁকে উত্তর দিকের চন্দ্রকান্তদেশ দান করেন। সেই চন্দ্রকেতুই কি এই বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন? তোলা ছবিগুলো ভাল করে দেখলাম। হিন্দিতে খনা-মিহিরের ঢিপিকে প্রাচীন বলা হয়েছে। ইংরেজিতে অ্যানসিয়েন্ট। আবার চন্দ্রকেতু গড়কে হিন্দিতে পৌরাণিক রাজার গড় বলা হয়েছে। ইংরেজিতে মিথিক্যাল কিং।
মুশকিলে পড়া গেল। লক্ষ্মণ-পুত্র এখানে আসেননি নিশ্চয়? খনা-মিহিরের ঢিপিতে অ্যানসিয়েন্টের বাংলা করতে গিয়ে ভুলবশত হয়তো পৌরাণিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গড়ে তো চন্দ্রকেতু হিন্দি ও ইংরেজিতে পৌরাণিকই। কী মুশকিল!
সাধে কি বলেছিলাম, ইতিহাসের সামনে পড়লে আমার ঘাবড়ে যাওয়া অনিবার্য!
ছবি— দীপশেখর দাস ও ইন্দ্রজিৎ সাউ
(সমাপ্ত)




