দীপক দাস

ইচ্ছে ছিল নেগুয়ায় যাওয়ার। ‘সাহিত্য সম্রাট’এর স্মৃতি বিজড়িত স্থান। নেগুয়া মহকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। সমুদ্র তীরবর্তী এই এলাকাবাসের অভিজ্ঞতা ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসে রয়েছে। নেগুয়া মহকুমা এখন আর নেই। কাঁথি মহকুমা হয়েছে। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতি রয়েছে এখনও। নেগুয়া এখনকার পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় পড়ে।
যাওয়া হয়নি কাঁঠালপাড়াতেও। তবে গিয়েছিলাম হুগলির চুঁচুড়ায়। ২০১৯ সালে। সঙ্গী ছিল আমাদের দলের দীপু, গার্ডবাবু আর দীপুর সতীর্থ দেবপ্রিয়া। ঘাট সংলগ্ন একটা বাড়িতে থাকতেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর ব্যবহৃত একটা আরামকেদারা ছাড়া কিছু দেখতে পাইনি। এই ঘরে বসেই বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘বন্দে মাতরম’। কালজয়ী সৃষ্টির আতুঁড়ঘরটি দেখে বেশ আপ্লুত হয়েছিলাম।

তার পর বহু বছর কেটেছে। চলতি বছরে মানে ২০২৬ সালে গেলাম বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ জীবনের আবাসের সন্ধানে। এ বারে একাই। কলেজ স্ট্রিটে গিয়েছিলাম। রাস্তার উপরেই একটা গলির মুখে পুরসভার বঙ্কিম লাইব্রেরি বোর্ডটা দেখি। ঢুকে পড়লাম একদিন। জায়গাটা ঠিক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের উল্টো দিকের গলি। মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রসিংয়ের কাছেই। কিছুটা হাঁটলেই গলিটা ডানহাতি বাঁক নেবে। আর কয়েক পা হাঁটলেই বাঁহাতি গ্রিলে ঘেরা বাড়িটা বঙ্কিম-স্মৃতি ধরে রেখেছে। গলিটা ‘৫, প্রতাপ চ্যাটার্জী লেন’। এই বাড়িতেই তৈরি হয়েছে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থাগার।

দুপুরে গিয়েছিলাম। বন্ধ ছিল গ্রন্থাগার। ইতিউতি তাকিয়ে গ্রন্থাগারের গায়ে দু’টো ফলক দেখতে পেলাম। একটা সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি ভবনের। আরেকটা সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারের। বাঁদিকে রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের মূর্তি। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে এই বাড়িটি কিনেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কলকাতায় বসবাস শুরু করায় নবীন সাহিত্যিকদের তাঁর সান্নিধ্য পেতে সুবিধা হল। এই বাড়িতে সাহিত্য আলোচনায় আসতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। আসতেন সুরেশচন্দ্র সমাজপতি।

বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুও হয়েছিল এই বাড়িতেই। শেষ দিকে শরীর মোটেও ভাল যাচ্ছিল না। বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল তাঁর প্রয়াণ ঘটে। তার পর এই বাড়িতে থাকতেন বঙ্কিমচন্দ্রের স্ত্রী রাজলক্ষ্মী দেবী এবং তাঁদের তিন কন্যা শরৎকুমারী, নীলাব্জকুমারী এবং উৎপলকুমারী।
প্রতাপ চট্টোপাধ্যায় লেনের বঙ্কিমচন্দ্রের বসতবাড়িটি কিন্তু এখন আর আস্ত নেই। অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায় সেটি ভেঙে ফেলতে হয়েছে। সেই জায়গায় ২০০৪ সালে নতুন ভবন তৈরি হয়। পাঠাগারের উদ্বোধন হয় ২০০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি।

আমি মোট দু’দিন গিয়েছিলাম। কিন্তু একদিনও গ্রন্থাগার খোলা দেখিনি। এখন সরকারি গ্রন্থাগারগুলোর অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। একজন গ্রন্থাগারিক বা সহায়কের উপরে একাধিক গ্রন্থাগারের দায়িত্ব দেওয়া থাকে। শুনেছি, গ্রন্থাগারটি সপ্তাহে দু’দিন খোলা থাকে।
তথ্যসূত্র: ১। বঙ্কিম রচনাবলী ২। ফলকে আটকে ঐতিহ্য, ধুঁকছে পাঠাগার— আর্যভট্ট খান, আনন্দবাজার
(সমাপ্ত)




