রোরো নদী। ঝাড়খণ্ড।
অন্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

চললাম তবে চাইবাসা— শক্তি স্মৃতি সন্ধানে

দীপক দাস

কারণ বোধহয় সেই বালকটি। যে রোরো নদীর ধার থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল রঙিন বুকের পালক। ওই বালকই অনেক বছর ধরে কানে ‘আসছো কবে? আসছো কবে?’ গুনগুনটা জাগিয়ে রেখেছিল। তার পর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বেরিয়ে পড়া পূজাবকাশে।

এ বছর চাইবাসা যাওয়ার প্রস্তাবটা দীপুর ছিল। যদিও প্রস্তাবটা পুরনো। সেই প্রস্তাব ছিল আমারই। নানা কারণে সেই সফর সম্ভব হয়নি। কিন্তু কেন চাইবাসা বেছেছিলাম? একটা কারণ অবশ্যই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের নানা গল্পস্বল্প। আকাঙ্ক্ষাটা বেড়েছিল চাইবাসার প্রকৃতির সঙ্গে বাঙালির তারুণ্যের প্রতিভূ কবিকুলের নানা কীর্তিকলাপের পঞ্চরঙ্গে। চাইবাসা সুনীলের থেকে অনেক বেশি শক্তির। শোনা যায়, প্রকৃতি মুগ্ধতা শুধু নয়, শক্তির বছর তিনেকের বিজনবাসের কারণ কোনও পরমাও ছিলেন। আমরা অবশ্য পরমা প্রকৃতি আর কবিকুলের স্মৃতিচিহ্নগুলো ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা ইচ্ছাতে গিয়েছিলাম।

চাইবাসা অবশ্য আরেকটা কারণেও বিখ্যাত। আসলে কুখ্যাত। লালুপ্রসাদ যাদবের পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি মামলার সুবাদে। চাইবাসা ট্রেজারি থেকেই টাকা সরিয়েছিলেন ‘গরিবো কা মসিহা’ ভারতীয় রাজনীতির বর্ণময় চরিত্রটি। দীপু, ইন্দ্র, বাবলার এই তথ্য জানা ছিল না। তখন ওরা খুবই ছোট।

শরতের আকাশ আর দোকাটা তালাব।

সপ্তমীতে পৌঁছে ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা ঘুরে শেষ দিনের জন্য বরাদ্দ ছিল চাইবাসা। সেই মতো গাড়ি ঠিক করা ছিল। ঘুরেটুরে ফেরার ট্রেন ধরব। এবারের পুজো সফরে একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল। বাবলা সাধারণত তেমন মাথা ঘামায় না কোথায় ঘোরা হবে, কী দেখা হবে নিয়ে। এবার ওড়িশা যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছিল। চাইবাসায় নেমে দেখি, সে একটা ঘোরাঘুরির ভিডিও ডাউনলোড করে রেখেছে। গাড়িচালক শাহিদদাদার সঙ্গে কথা বলার সময়ে ভিডিও দেখে নামগুলো বলছিল টপাটপ। তাতে সুবিধাই হয়েছিল। ঘোরার মানচিত্র এবং গাড়ির ভাড়াটা ঠিক করে নেওয়া গিয়েছিল সহজেই। কিন্তু মুশকিল হল শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের চাইবাসা খোঁজায়।

সেই বুড়ি তেঁতুলগাছ আর ইন্দ্র।

সত্যি বলতে কি চাইবাসায় প্রথমে পা রেখে মনটা একটু দমেই গিয়েছিল। স্টেশন থেকে বেরিয়ে কিছুটা যেতেই একটা উড়ালপুল। বাজার এলাকা যথেষ্ট ভিড়। মানে একটা ছোটখাটো শহর। আমরা শহরে রাত কাটাতে চাই না। একটু খোলামেলা, নির্জন হলে ভাল লাগে। কিন্তু বাইরে কিছু খোঁজার সময় ছিল না। শহরের মাঝেই হোটেলে থাকতে হয়েছিল। চাইবাসা এখন মোটামুটি রুংটাদের শহর বললেই ভাল। তাঁরা খনির মালিক। এখন নির্মাণ শিল্পেও নেমেছেন। চাইবাসা থেকে কিছুটা দূরে তাঁদের উপনগরী হয়েছে। আছে কারখানাও। এমন একটা জায়গা কেন পছন্দ হয়েছিল শক্তির?

উত্তরটা পেলাম পরদিন সকালে। চায়ের দোকানে। এলাকার লোকজনের সঙ্গে ভাব জমালে কিছু তথ্য মেলে। নতুন জায়গা জানা যায়। সেই উদ্দেশ্যেই কথা জুড়েছিলাম দোকানদারের সঙ্গে। তাঁর কথার সারমর্ম হল, গত ৩০ বছরে শহর আমূল বদলে গিয়েছে। আমরা যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে, গত শতকের ষাটের দশক, চাইবাসায় এত লোক ছিল না। এই বাজার অঞ্চলেই প্রচুর গাছ ছিল। আর বাঙালিরা ধীরে ধীরে চাইবাসা ছেড়েছেন। কেউ চাকরি সূত্রে, কেউ ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার কারণে। তবে বাঙালি এখনও আছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের কথা তিনি কখনও শোনেননি। তবে সেনটোলা, মধুটোলার কথা বলতে পারলেন। সেটা শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে। শাহিদদাদা সেনটোলার রাস্তাটা দেখিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু আমরা আর নামিনি। সেই সেনটোলা আর নেই, সেটা বোঝা যাচ্ছিল স্পষ্ট।

কুজু। নানা নির্মাণ বেঁধে ফেলেছে জায়গাটি।

হেসাডির জঙ্গলে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। শক্তিদের পছন্দের জায়গা। কিন্তু অনেকটা দূর শাহিদদা বললেন, সময়ে কুলোতে পারা যাবে না। শাহিদদা নিজেই একটা জায়গায় নিয়ে গেলেন। জায়গাটার নাম দোকাটা। আমরা দেখলাম দোকাটা তালাব। আসলে এটা এসিসি সংস্থার খাদান। এখন পরিত্যক্ত। তাই জলে ভরে গিয়েছে। পাঁচিল ঘেরা জায়গার ভিতরে আছে জলাশয়টি। পাঁচিল টপকে ঢুকে গেলাম ভিতরে। ইন্দ্র রয়ে গেল পাঁচিলের ওপারে। ও নিজের ভার পাঁচিলে তুলতে পারবে নাকি পাঁচিল ওর ভার সহ্য করতে পারবে সেই মীমাংসা করতে পারেনি বোধহয়। পাঁচিলের কাছে একটা বুড়ি তেঁতুলগাছের নীচে বসে রইল।

নিজের খেয়ালখুশির জগতে।

আমিও পাঁচিল টপকাতে পারছিলাম না। যদিও পাঁচিলের গায়ে পা রেখে ওঠার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আমি ভুল ধাপে পা দিয়ে ফেলেছিলাম। সে আর কবেই বা ঠিক করেছি! শেষ পর্যন্ত হাত দিয়ে পা চাগিয়ে পাঁচিলের উপর তুলতে হল।

জায়গাটা অসাধারণ। জলাশয়ের জলটা পুরো নীল। আসলে পাথুরে পুকুরের শ্যাওলা আর শরতের আকাশের নীলের ছায়া মিলে অপরূপ হয়ে উঠেছিল। দূরে একটা চিমনি দেখা যাচ্ছে। ওটা সিমেন্ট কারখানার। তালাবে চান করছিল একটা ছেলে। তার নাম অঙ্কিশ খান্ডালিয়া। কাছের খন্দপি গ্রামের বাসিন্দা। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। অঙ্কিশ জানাল, এই তালাবে দোকাটা আর খন্দপি গ্রামের বাসিন্দারা মাছ ছাড়েন। দুই গ্রামের অধিকার এই মাছে।

গাড়িতে উঠে শাহিদদাদাকে ধন্যবাদ জানালাম। এটা তো আমাদের তালিকায় ছিল না। উনিই এনেছেন। আরেকটা জায়গাতেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সেখানেও একটা তালাব ছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে নাকি সেই তালাবে দেহ মিলেছে। তাই পুলিশ ও গ্রামের লোকজন ওখানে কাউকে যেতে দেন না।

কাশীদা জলাধারে চানে, মাছ ধরার আনন্দে।

আমাদের গাড়ি গেল ঝিঁকপানির দিকে। জায়গাটার নাম পেয়েছিলাম শুভঙ্কর ওরফে টুবলাইয়ের সৌজন্যে। টুবলাই একসময়ের ছাত্র। রেলে চাকরি করে। ওর চক্রধরপুরে পোস্টিং ছিল তখন। টুবলাইয়ের ফেসবুক পোস্ট থেকে ঝিঁকপানির নামটা জানি। ভারী পছন্দ হয়েছিল নামটা। আর জায়গাটাও। এখানে একটা স্টেশন আছে। সেই স্টেশন থেকে পাহাড় দেখা যায়। রেলগাড়ি এক আকর্ষণের বিষয়। তার উপর স্টেশন থেকে পাহাড় দেখা গেলে ভারী ভাল লাগে। তবে গিয়ে তেমন ভাল লাগেনি। এসিসি কারখানার এলাকা। পাথর গুঁড়ো করার ধুলোয় ভরা। রাস্তা খারাপ। কেমন যেন বিষণ্ণ। যদিও স্টেশনের ওভারব্রিজে উঠে দূরে তাকালে খারাপ লাগে না। আরেকটা ভাল লাগা, স্টেশনের কাছেই একটা দুর্গাপুজো হচ্ছিল। ঝিঁকপানি মানে কী? ওখানকার লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। বলতে পারেননি।

সঙ্গী পাহাড়দের নিয়ে কাশীদা জলাধার।

শাহিদদাদা বলছিলেন, কুজুতে নাকি একটা ড্যাম আছে। রাস্তার ধারের একটা হোটেলে খাওয়াদাওয়া করে চললাম সেদিকে। কুজুতে একটা তিরতিরে নদী বয়ে চলেছে। একটা উড়ালপুল চলেছে কোনও দিকে। কতকগুলো বাচ্চা নদীতে চান করছিল। এ ছাড়া তেমন কিছু দেখার ছিল না।

চোখ ভরে গেল কাশীদা গিয়ে। কুজু থেকে কিছুটাই। এটা একটা জলাধার। অনেকগুলো পাহাড় রয়েছে জলাধার ঘিরে। এখানেও কতকগুলো বাচ্চা চান করছিল। মাছ ধরছিল কেউ কেউ। তাদের শিকারের থলিতে একবার উঁকি দেওয়া গেল। স্থানীয় কোনও মাছ দেখার আশায়। ওরা পুঁটিমাছ ধরছিল। আমার পাহাড়গুলোর নাম জানতে ইচ্ছে করছিল। নিশ্চয় কোনও নাম আছে। এক তরুণ চান করতে এসেছিলেন। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন, দূরের একটা পাহাড়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে জানালেন, ওটা চাওড়া। তার পর ধনুটি, কাশীদা, বরকুলি। জলাধারটা তাহলে কাশীদা পাহাড়ের নামে!

লুপুংগুটুতে। কাছের বাঁকের বাঁদিকেই ছিল সেই স্রোত।

একটা কথা বলা হয়নি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিনলিপিতেও কিন্তু চাইবাসার কথা উল্লেখ রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে দল বেঁধে এসেছিলেন। লুবুংগুটু গিয়েছিলেন তিনি। আমরা যেটাকে লুপুংগুটু বলছিলাম। রোরো নদীর তীরে। বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন, ‘অর্জুন গাছের ছায়ায় একটা ভ্যালি দিয়ে জল পড়ছে’। আসলে একটা স্রোত রয়েছে। সেটা অর্জুন গাছের নীচ দিয়ে বইছে। এলাকার লোক এই স্রোতের জল পান করেন। অনেকেই বোতলে ভরে নিয়ে যান। আমরা দেখলাম দূর থেকে। কাছে যাওয়া হল না।

প্রকৃতি এখনও উদার এখানে। কিন্তু জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেখলাম, মদের আসর বসেছে নদীর তীরে। একটা দল তো থার্মোকলের পেটিতে করে বরফ নিয়ে এসেছে। বরফের চাদরে শুয়ে থাকা ঠান্ডা বোতলে ছুটি উদযাপন করছে।

রোরো নদী। লুপুংগুটুতে।

রোরো নদীর উপরে একটা ড্যাম আছে। লুপুংগুটু থেকে কিছুটা দূরে। আহামরি কিছু নয়। দেখলাম, ড্যামের উপরে স্থানীয় ছেলেরা ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে। উঁচু পাড় থেকে নীচে নামা, তার পর শ্যাওলা ধরা সিমেন্টের বাঁধ ধরে হেঁটে এসে ছিপ ফেলা বেশ ঝুঁকির মনে হল। জলাশয়ের লক গেটের কাছে মায়াজাল পাতা আছে। তাতে একটা মাছ আটকেছে। এখানে একটা মজার ঘটনা হল। মায়াজাল যাঁরা পেতেছিলেন তাঁদের একজন হাজির হলেন। মাছটা দেখে বললেন, ‘‘সড়া হুয়া।’’ মানে পচে গিয়েছে। তাঁর সঙ্গে এলাকার বিষয়ে জানতে হিন্দিতে বাতচিত শুরু করেছিলাম। দু’চারটে বাক্যের পরে তিনিই আমার কষ্ট দূর করে দিলেন। দিব্যি বাংলায় বললেন, ‘‘বাংলায় বলুন, বুঝতে পারব।’’ শুনে খানিকটা লজ্জা পেলাম। একটু আনন্দও হল। চাইবাসায় বাঙালিটোলাগুলোর প্রভাব এখনও রয়েছে!

এবার ফেরার পালা। ট্রেনের সময় হয়ে আসছে। রোরো নদী, লুপুংগুটুর অর্জুন গাছের ছায়া দিয়ে বয়ে চলা স্রোতকে পিছনে ফেলে যেতে হবে। কিন্তু কেমন লাগল এই ভ্রমণ? চাইবাসা শহরের কথা আগেই বলেছি। এটি এখন বাণিজ্যকেন্দ্র। যে রোরো নদী নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেটি তেমন মুগ্ধ করতে পারল না। তার কারণ হতে পারে ওই অবাঞ্ছিত মদের আসর। মন আগে থেকেই নেতিবাচক হয়ে গিয়েছিল। অথবা হতে পারে ঝাড়খণ্ড থেকে ওড়িশা পর্যন্ত টানা তিন দিন একই প্রাকৃতিক রূপ দেখছি সেই জন্য। কুজুর কাছে নদীর তীরে কারখানা মাথা তুলেছে। সেটা প্রকৃতিকে বাধা দিচ্ছে। শক্তি, সুনীল, সন্দীপনদের সময়ে চাইবাসা, রোরো এমন ছিল না নিশ্চয়। বিভূতিভূষণ লুপুংগুটুতে কয়েকটা ছেলেকে পিকনিক করতে দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁরা নদীর পারে মদের বোতলের ছড়াছড়ি দেখেননি। ওই ছেলের দল তাঁদের খাইয়েছিল। আমরাও অনেক ছেলেকে দেখেছি রোরো নদীর পারে। কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছা করেনি।

রোরো ড্যাম। ওই যে জলের পাঁচিলে মাছ ধরার দল।

মনে কিছুই কি হয়নি সঞ্চয়? শক্তির বালকটি রোরো নদীর পারে রঙিন বুকের পালক কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। আমরা চার সাবালক পেলাম কিছু রঙিন নুড়ি। সময়ের হাত থেকে ফসকে পড়েছিল কাশীদার জলাশয়ে, দোকাটার তালাবে, কুজুর চরে গজিয়ে ওঠা কাশফুলে, নদীর বুকে তৈরি সাঁকো থেকে বাচ্চাগুলোর ঝাঁপ দেওয়ার জায়গায়, শিল্পাঞ্চলের বাইরে গুটি গুটি পায়ে এগনো গ্রামজীবনে। আর রোরো নদীর নির্বিকার বয়ে চলায়।

‘কুড়িয়ে পেয়ে ছড়িয়ে দিলুম…/ আসছো কবে? আসছো কবে? আসছো কবে?

কভারের ছবি- লুপুংগুটুতে রোরো নদী

ছবি— দীপশেখর দাস, বিভাস বাগ, ইন্দ্রজিৎ সাউ

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *