দীপক দাস

বিশেষণ হিসাবে মোটেও মিষ্ট নয় খাজা। ক্রিকেট মাঠে ক্যাচ ফসকালে, খাজা ফিল্ডার। হেব্বি পিট্টি খেলে খাজা বোলার। আরও অনেক রকম খাজা আছে। ব্যক্তিজীবনে তার স্বাদ অনেকেই পেয়েছেন। খাজা কিছু গ্রহণে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু খাজা কাঁঠাল আর মিষ্টান্ন খাজায় আপত্তি তেমন উঠবে না বলেই মনে হয়।
মিষ্টি খেতে খাজা। দেব-দেবীর প্রসাদে বেশ চলে। দীর্ঘ জীবনের কারণে। খাজা বহুস্তরীয় ময়দার মিষ্টান্ন। শব্দটা এসেছে খাদ্য থেকে। খাদ্য থেকে খজ্জ, তা থেকে খাজা। পুরীর প্রসাদে, মেলার মাঠে বহুবার খাওয়া। তেমন বিশেষ কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। দোকান বিশেষে স্বাদের ফারাক ছাড়া। তবে খাজার রকমফের রয়েছে। যেমন চাঁদসাই খাজা। বাঁকুড়ার ছাতনায় খেয়েছিলাম। পশ্চিম মেদিনীপুরেও মেলে। খাজার আরেক রকম প্রকার রয়েছে। তা হল মাকু খাজা। সন্ধান পেয়েছিলাম হঠাৎই।
সে ছিল এক খাজা দিন। ভোর রাত থেকে প্রবল বৃষ্টি, বজ্রপাত। সে সবের পরোয়া না করেই ত্রয়ী বেরিয়েছিলাম ট্রেন সফরে। মশাগ্রাম-বাঁকুড়া শাখার ট্রেন সফরে। ইন্দ্র, দীপুর সঙ্গে। টিকিট কাটা বাঁকুড়া পর্যন্ত। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে আর নথি খুঁজে যদি মাঝে কোনও গন্তব্য মেলে তা হলে নেমে যাব। না হলে বাঁকুড়ায় ঘোরাঘুরি। প্রকৃতি সেদিন বিরূপ থাকলেও পুরুষেরা সদয় ছিলেন। ঘোরাঘুরির গন্তব্য পেয়েছিলাম ট্রেনে ওঠা মাছের ব্যবসায়ীদের থেকে। আর খাজার সন্ধান দিলেন প্রণব রায় মহাশয়। তাঁর বই থেকে মিলল একটাই বাক্য, ‘বাঁকুড়া জেলার ইন্দাসের খাজাও খুব উৎকৃষ্ট’।

ট্রেন থেকে নেমে পড়া গেল ইন্দাস। গ্রামীণ এলাকা। এক টোটোচালককে আমাদের অভীষ্ট বুঝিয়ে বলতে তিনি নিয়ে গেলেন নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারে। ইন্দাস সবজি বাজারে দোকানটা। বাজারটায় বেশ পুরনো দিনের ছাপ রয়েছে। দোকানটাও অর্ধ শতবর্ষ পার করেছে। এখন দোকান চালান অশোক ও প্রদীপ আদিত্য।
শুরু হল খোঁজখবর। ইন্দ্র বাইরের দিক থেকে ছবি তুলছে। দীপু দোকানের ভিতরে। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) যেমন শিকড় ধরে টান দেওয়া চলছে আমরাও তেমন মূলে টান দিলাম। কিন্তু তেমন কিছু বেরোল না। মাকু খাজা এখানে কে চালু করেছিলেন বলতে পারলেন না অশোক ও আদিত্যবাবু। বহু বছর ধরেই পাওয়া যায় ইন্দাসে। খাওয়া ও পুজো, দু’টো কারণে খাজা তৈরি হয়।
উপকরণ খুব সহজ। ময়দা, চালের গুঁড়ি, ডালডা আর চিনির রস। প্রথমে ময়দা মেখে রাখতে হয়। এর পর চালের গুঁড়ি অর্থাৎ সবেদা ডালডা দিয়ে মেখে রাখেন কারিগরেরা। সব মিশিয়ে ঘণ্টাদুয়েক রাখা হয়। এই সময়টা লাগে খামি তৈরি হয়ে মিশ্রণ খাজার উপযুক্ত করার জন্য। এর পর মিশ্রণ থেকে কিছুটা নিয়ে বেলতে হয়। বেলা গোলাকার মিশ্রণে কয়েকবার ছুরি চালিয়ে বোল কাটতে হয়। এবার হাতের কায়দায় সেই কাটা অংশগুলোর প্রান্ত একসঙ্গে জুড়ে দিতে হবে। এই নকশাদার মিশ্রণটি ভাজতে হবে ডালডায়। ভাজা হয়ে গেলে তা চিনির মোটা রসে ডুবিয়ে রাখতে হবে। তার পর তুলে নিলেই খাজা তৈরি।
মাকু খাজা কেন বলে? কারণ কাটা অংশগুলো দু’প্রান্তে জোড়ার ফলে তা মাকুর রূপ নেয়। নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারে অল্পই খাজা ছিল। জানালেন, বর্ষাকালে খাজা বেশিদিন রাখা যায় না। মিইয়ে যায়। তাই বেশি হয় না। আমরা অগস্টে সফরে বেরিয়েছিলাম যে!
আমাদের তো ইচ্ছাপূরণ হয়নি তখনও। শিকড়ের সন্ধান করতে হবে। আরেকটু ঘোরা দরকার। অশোকবাবুরাই সন্ধান দিলেন দু’টো দোকানের। ইন্দাস পিরতলায় মহামায়া মিষ্টান্ন ভান্ডার, এটি কালু ময়রার দোকান নামে বেশি পরিচিত। আরেকটি নরেশের মিষ্টির দোকান। যেটি চালান তাঁর ছেলে অমিত দাস। কিন্তু অমিতবাবুর ইন্ডিয়ান সুইটসেও খাজা মিলল না। তিনি বাচ্চু সিংহ নামে একজনের নম্বর দিলেন। এই এলাকায় খাজা তৈরিতে সিদ্ধহস্ত তিনি। বাচ্চুবাবুর বাবা কাশীনাথও ইন্ডিয়ান সুইটসে কাজ করেছেন।

ফোন করা হল বাচ্চুবাবুকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে খাজার বিষয়টি পরিষ্কার হল। আসলে খাজাও অমৃতি, রাবড়ির ইত্যাদি মিষ্টান্নের মতো আউটসোর্সিংয়ে চলে গিয়েছে। সময়সাপেক্ষ বলে মিষ্টির দোকানের মালিকেরা বাঁধা কারিগর রাখেননি। বাচ্চুবাবু দরকার মতো দোকানে দোকানে খাজা ভেজে দিয়ে যান। আমরা খাজার বিপণনের সঙ্গে ইন্দ্রর বেশ মিল পাচ্ছিলাম। আমাদের দলের এই মূর্তিমানটিও কোনও দায়িত্ব পেলে তা আউটসোর্সিং করান। কিছু ক্ষেত্রে ফ্রাঞ্চাইজিও দেন।
আমরা আরেকটি দোকানের খাজা খেতে চাইছিলাম। বাচ্চুবাবুকেই জিজ্ঞাসা করা হল, তিনি অন্য কোনও দোকানে ভেজেছেন কিনা? বাচ্চুবাবু না বললেন। কারণ ওই বর্ষা।
তাঁতযন্ত্রে টানাপড়েনে মাকু এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। তৈরি হয় সুদৃশ্য শাড়ি। ইন্দাসে খাজার শিকড় সন্ধানে আমরাই মাকুর মতো ছুটে বেড়ালাম। কিন্তু মাকু খাজার ইতিহাস মিলল না।
তিন জনে বর্ষার মিয়ানো খাজার মতোই মনোকষ্ট নিয়ে একটা লজে ঢুকলাম। দুপুরের আশ্রয়।
ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ ও দীপশেখর দাস
(সমাপ্ত)




