দীপক দাস

চোখ বোলানোই বলা যায়। পরীক্ষার আগে চোখ বোলানোর একটা অর্থ হয়। আগে পড়া আছে, সেটা আরেকবার দেখা। এই চোখ বোলানো একেবারেই উপর উপর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এগিয়ে নিয়ে চলা পেশার কিছুই ক্ষণিকের দেখায় বোঝা সম্ভব নয়। তবুও গিয়েছিলাম। অন্তত দেখাটা তো থাক। আবার কোনও দিন এ দিকে আসা হবে কিনা জানা নেই তো!
বাঁকুড়ার সোনামুখির কৃষ্ণবাজার দু’টি কারণে পরিচিত। এক শোলা ও জরির কাজে। দ্বিতীয়টি তাঁতে বোনা রেশম বা সিল্কের শাড়ির জন্য। ইন্দ্র আর দীপুর সঙ্গে হঠাৎ এসে পড়েছিলাম সোনামুখি। জঙ্গল দেখব, জঙ্গলে ঢুকব, এ সবই ট্রেনে বসে ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু টোটোয় করে দুপুরে খেতে যাওয়ার সময় সচিত্র দেওয়াল দেখে পরিকল্পনার বিস্তার ঘটতে লাগল। টোটোচালক দাদাকে বলতে তিনি মোটামুটি ঘোরাঘুরির জায়গাগুলো বললেন। আমরা রাজি। প্রথমে জঙ্গল। তার পর এই তন্তুবায় পাড়া। শেষে কুম্ভকার পাড়ায়। এ দিকে আজই সন্ধেয় বাড়ি ফেরার কথা। এতগুলো জায়গা দেখা যাবে কিনা সংশয় ছিল। তবে হাল ছাড়িনি আমরা।

জরির কাজ।
বিকেলের দিকে আমাদের সোনামুখি সফরের বাহন টোটো এসে পৌঁছেছিল কৃষ্ণবাজারে। নামে বাজার থাকলেও এটি তন্তুবায় পাড়া। এখানকার বাসিন্দাদের অনেকে এখনও পারিবারিক জীবিকা নির্ভর। এই পাড়ার সুনাম রয়েছে হস্তচালিত তাঁতে রেশমের কাপড় তৈরি করায়। এঁরা শোলার ও জরির কাজও করেন। প্রতিমা সজ্জায় যে সব অলংকার লাগে তা এখানে তৈরি হয়। প্রাকৃতিক শোলা কেটে নানারকম আকার দেওয়া হয়। তার পর তাতে নানা কাজ করা হয়।

জরির কাজ নিয়ে শম্ভু দাস।
আমরা নেমেছিলাম শম্ভু দাসের বাড়ির সামনে। ইনি এখানকার প্রবীণ শিল্পীদের অন্যতম। তাঁর ঘরে ছেলে রাজেশ আর বৌমা রেবা শোলার কাজ করছিলেন। অসাধারণ কারুকাজ করা নানা শোলার নকশায় কাজ চলছিল। আমাদের দেখালেন রেবা। দেখালেন শম্ভুবাবুও। শোলার কাজ কিন্তু সারা বছরের নয়। কাজ হয় চার মাস। রথযাত্রা থেকে অগ্রহায়ণ মাসের চার তারিখ পর্যন্ত। বাকি আট মাস তাঁতের কাজ চলে। শোলায় জরির কাজ বেশ সময়সাপেক্ষ। জরি আসে বাঁকুড়া এবং বর্ধমানের অন্ডাল থেকে।

রেবা দাস দেখাচ্ছিলেন তাঁদের জরির কাজ।
কৃষ্ণবাজারের জীবিকার নানা ভাগ রয়েছে। কেউ কেউ বছরের কিছু মাস শোলা আর জরির কাজ করেন। বাকি সময়ে তাঁত বোনেন। আবার কেউ কেউ সারা বছরই তাঁতের উপরে নির্ভরশীল। তেমনই একজন শঙ্কর দাস। শঙ্করবাবু বললেন, এই পাড়ায় হাজার তাঁত আছে। একটা তাঁতে কাজ করতে চারজন লাগে। তিনি বললেন, ভরা মরসুমে বাইরে থেকে লোক আনতে হয়। বাড়ির মেয়েরা ফাঁকা সময়ে কাজ করেন।
কৃষ্ণবাজারে নানা পদবির লোকের বাস। লাহা, দাস, গুঁই, মণ্ডল, পাল, দে, দত্ত ইত্যাদি। এঁরা সকলেই তন্তুবায়। আমরা যেমন দেখলাম, অজয় লাহা তাঁত বুনছিলেন। কৃষ্ণবাজারে কটকি, কলাক্ষেত্র, ত্রিডি, ফোর ডি, অল ওভার কটকি শাড়ি হয়। একশো শতাংশ ‘পিওর সিল্কে’র শাড়ি। সবটাই হাতে তৈরি। এখান থেকে শাড়ি কলকাতায় যায়। তাঁতশিল্পীরা বলছিলেন, কলকাতায় চলে বিষ্ণুপুর সিল্ক। ওখানে কিন্তু স্বর্ণচরি, বালুচরি ছাড়া কিছু হয় না। কৃষ্ণবাজারের শাড়ি কলকাতায় বিষ্ণুপুরী সিল্ক হিসেবে বিক্রি হয়।

তাঁত বুনছেন সোমনাথ গুঁই।
তাঁতের উপরে নির্ভর করে আরেক ধরনের জীবিকা গড়ে উঠেছে এখানে। তাঁতিদের থেকে কাপড় কিনে কলকাতার দোকানে সরবরাহ করা। সেই কাজই করেন এ পাড়ার বাসিন্দা সোমনাথ গুঁই। কলকাতার বিখ্যাত দোকানে তিনি সোনামুখির সিল্কের শাড়ি সরবরাহ করেন।
সব জীবিকাতেই কিছু সমস্যা আছে। সোনামুখির শিল্পীদেরও রয়েছে। অনেকটাই মহাজন নির্ভর ব্যবসা। হাতে গোনা কয়েক জন নিজে সুতো কিনে ব্যবসা করেন। মালদহ আর বেঙ্গালুরু থেকে সিল্ক আসে। চরকায় সুতো ববিনে পাকাতে হয়। কাজের সুবিধার জন্য সমবায় তৈরি হয়েছে। নাম সোনামুখি কৃষ্ণবাজার তন্তুবায় সমিতি। শিল্পীদের অভিযোগ, সমবায় হয়ে তাঁদের সুবিধা বিশেষ কিছু হয়নি। আগে ভাল ছিল।

সুনন্দা পাল ও তাঁর চরকা।
এর বেশি কিছু সেদিন জানতে পারিনি আমরা। চলে আসতে হয়েছিল পরের গন্তব্যে। ফিরতে ফিরতে একটা দারুণ দৃশ্য দেখেছিলাম। কৃষ্ণবাজারেই বাড়ির বারান্দায় চরকা ঘোরাচ্ছিলেন প্রবীণা সুনন্দা পাল। চরকা ঘুরিয়ে তাঁত বোনার সুতো ববিনে পাকাচ্ছিলেন। এ দৃশ্য আমার পরিচিত। দেখেছি আমার মামার বাড়িতে। পূর্বস্থলী এলাকা। নদিয়া ঘেঁষা বর্ধমানে পড়ে। ওখানে অনেক বাড়ির মেয়েরা চরকা কেটে কিছু রোজগার করতে পারতেন। নদিয়ায় তখন তাঁতে গামছা, লুঙ্গি, শাড়ি বোনা হত ব্যাপক। তার পর তাঁতে মন্দা দেখায় চরকা কাটাও বন্ধ হয়েছিল। বহু বছর পরে সেই দৃশ্য দেখে মন ভরে গেল।

এগুলোর নাম ববিন। মাকুতে ভরা হয় ববিন। এর সুতোয় তাঁতে শাড়ি বোনা চলে।
মামার বাড়িতে ছিল হস্তচালিত চরকা। সুনন্দার চরকা ঘুরছিল যন্ত্রে। তাতে নিশ্চয় কষ্ট লাঘব হচ্ছিল প্রবীণার। এ রকম করেই গ্রামীণ কুটির শিল্পগুলো টিকে থাকলে আর্থ-সামাজিকের সঙ্গে মানস-সামাজিক লাভও হয়। বাড়ির সকলে মিলে কিছু না কিছু উপার্জন করে জীবন চালিয়ে নেওয়া যায়। একসঙ্গে থাকা যায়। বাড়ির ছেলেদের পরিযায়ী শ্রমিক হতে হয় না।
ঘরে ঘরে বৃদ্ধাশ্রমও তৈরি হয় না।
কভারের ছবি— শোলার কাজ
ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ ও দীপশেখর দাস
(সমাপ্ত)




