দীপক দাস

দেওয়াল লিখন ঠিকঠাক পড়তে না পারলে বিপদ। কথাতেই আছে। না পড়তে পারলে রসাতলে যেতে হয়। যেতে হয়নি আমাদের। তবে খেতে হয়েছিল। অচেনা এক ভদ্রমহিলার মুখের উপর বলে দিয়েছিলেন, ‘‘আপনি ভুল দেখেছেন।’’ ওই দেওয়াল লিখন আর কী। উঁচু স্বর, প্রতিবাদের সামনে আমি বরাবরই ঘাবড়ে যাই। গলা শুকিয়ে যায়। স্বর হয় মিনমিনেতর। ঠোঁটে আপনা থেকেই ঝুলে যায় ক্যাবলা হাসি। সে হাসি রীতিমাফিক এসে গিয়েছিল। তবুও মনটা কেমন যেন খচখচ করছিল। এতটা ভুল পড়লাম! সমর্থন পেতে ইন্দ্র আর দীপুর দিকে তাকালাম। ওরা দেখি, মন দিয়ে ছবি তুলছে। তার মানে লেখাটা খেয়াল করেনি। তাই অমন মন দিয়ে ছবি তোলা!
ঘটনাস্থল বাঁকুড়ার সোনামুখির পুতুলপাড়ায়। জায়গাটার নাম সত্যপিরতলা। এক দিনের বাঁকুড়া সফরে এসেছিলাম তিন জনে। অনেকগুলো জায়গা ঘুরেছি। শেষবেলায় এই পুতুলপাড়ায়। শেষবেলা মানে ট্রেন ধরার আগে আরকী। সে দিনই বাড়ি ফেরার কথা। যেটুকু সময় আছে একবার ঢুঁ মেরে যাওয়া শিল্পীদের পাড়ায়।

কাঁচা মাটির জিনিসপত্র।
সময়ের অভাবে তেমন খোঁজখবর করার সুযোগ মেলেনি। টোটোচালক দাদাকে বলা ছিল। তিনি পাড়ার যে বাড়িটি সামনে পেয়েছিলেন তার সামনেই টোটো দাঁড় করিয়েছিলেন। বাড়িটি উৎপল খাঁয়ের। বাড়ির সামনে দাওয়ার মতো এক চিলতে জায়গায় নানা মাটির জিনিসপত্র রাখা। হাতি ঘোড়াও রাখা ছিল। দুই ক্রেতাও ছিলেন।
আমরা কথাবার্তা শুরু করলাম। সত্যপিরতলায় শ’খানেক ঘর রয়েছে। এঁদের মধ্যে ৩০-৩৫টি ঘরে এখনও মাটির কাজ হয়। রাজ্যের অন্য সব কুমোরপাড়ার মতো এখানেও মাটির কাজ কমছে। বংশ পরম্পরাগত জীবিকাগুলো যে কারণে ধুঁকছে, লোপ পাচ্ছে বা বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যাচ্ছে সেই পথেই হাঁটছে সত্যপিরতলা। পরবর্তী প্রজন্ম আগ্রহী নন বাপ-পিতেমোর জীবিকায়। চাহিদাও তো কমেছে মাটির জিনিসের।

কাজ করছেন উৎপলবাবু।
উৎপলবাবুদের পরিবারও মাটির কাজের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা সংশয় রয়েছে। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে মাটির কাজ করেন। কাজ করেন দাদা মধুসূদন ও বৌদি মিঠুও। বাবা সাধন ও মা মীরারানিও কাজ করেন। উৎপলবাবুর এক ছেলে এক মেয়ে। দাদারও এক ছেলে এক মেয়ে। কিন্তু তাঁরা কেউই কাজে আগ্রহ দেখাননি। তাঁরা পড়াশোনা করছেন। উৎপলবাবু কিন্তু পারিবারিক কাজ আরও ভাল করতে আগ্রহী। সে জন্য প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন ছান্দারের ‘অভিব্যক্তি’তে। বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে ছান্দার গ্রাম। এ গ্রামে ১৯৭৮ সালে ‘অভিব্যক্তি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উৎপল চক্রবর্তী মহাশয়। কলকাতার মানুষ। স্থানীয় এক বিএড কলেজের শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন। আর ফিরে যাননি। স্থাপন করেছেন অনন্য এক কীর্তি। স্থানীয় আদিবাসী শিল্প সংস্কৃতি চর্চা ও প্রসারে কাজ করে ‘অভিব্যক্তি’।
২০১৪ সালে আমরা গিয়েছিলাম ছান্দারে। দেখা হয়েছিল উৎপলবাবুর সঙ্গে। খুব ভাল মানুষ। সেই সাক্ষাৎপর্ব এখনও মনে আছে আমাদের। ২০১৭ সালে মারা গিয়েছেন উৎপলবাবু। তাঁর মৃত্যুর পরে বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় ‘অভিব্যক্তি’র দায়িত্ব নিয়েছে। জেনে ভাল লাগল সেই উৎপলবাবুর প্রতিষ্ঠানে আরেক উৎপল প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
সত্যপিরতলার মৃৎশিল্পীরা মাটির নানা জিনিসপত্র তৈরি করেন। যা কিছু সাধারণ ভাবে তৈরি হয় কুমোরপাড়াগুলোতে। মৃৎশিল্পীরা পুতুলও তৈরি করে থাকেন। সেই পুতুল হয় নির্দিষ্ট ছাঁচের। তবে সোনামুখির মৃৎশিল্পীদের হাতি-ঘোড়া অন্য ধরনের। কিন্তু তা এই বাঁকুড়ারই বিষ্ণুপুরের ঘোড়ার মতো নয়। বিষ্ণুপুরের ঘোড়ার কান অনেকখানি লম্বা হয়। দীপককুমার বড় পণ্ডার ‘বাংলার পুতুল শিল্প ও শিল্পীদের কথা’ বইয়ে সোনামুখির পুতুলের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, সোনামুখির পুতুলের গড়ন অনেকটা গোল। সোনামুখির ঘোড়ার কান রিয়েলিস্টিক ধরনের। দেখলাম, মনসার মূর্তিও তৈরি করেছেন উৎপলবাবু। হাতি ঘোড়ার মতোই সেগুলো রং করা।

সোনামুখীর হাতি ঘোড়া।
সোনামুখির পুতুলপাড়ায় আসাই হত না। স্টেশনের কাছ থেকে টোটোয় কিছুটা আসার পরে রাস্তার পাশে পাঁচিল ঘেরা একটা চত্বর দেখতে পেয়েছিলাম। পাঁচিলে নানা ছবি আঁকা ও পরিচয় দেওয়া। কী কী ছিল মনে নেই। বাঁকুড়ার নানা বিষয় ছিল। দু’টো ছবি মনে আছে এখনও। একটা রামলাল নামে এক রেসিডেন্ট হাতির ছবি। আর ‘সোনামনির হাতি ঘোড়া’। টোটোচালক দাদাকে বলতে তিনি জানিয়েছিলেন, সোনামণির হাতি ঘোড়ার কথা জানেন না। তবে কুমোরপাড়ায় হাতি ঘোড়া তৈরি হয়। উৎপলবাবুর কাছে তথ্যটা আরেকবার ঝালিয়ে নিতে বলেছিলাম। তখন তাঁর কাছে মাটির জিনিসপত্র কিনছিলেন এক ভদ্রমহিলা ও তাঁর স্বামী। বাড়িতে কালীপুজো আছে। তাই মাটির জিনিসপত্র লাগবে। আমাদের জিজ্ঞাাসা শুনে ওই ভদ্রমহিলাই বলে উঠেছিলেন, ‘আপনি ভুল দেখেছেন। সোনামুখি লেখা রয়েছে।’’
তর্ক বাড়াইনি। স্বামী-স্ত্রী চলেও গিয়েছিলেন। আমরা আবার শুরু করেছিলাম মৃৎশিল্পীদের সমস্যা জানতে। এখানেও উপকরণের নানা ঘাটতি রয়েছে। মাটির অভাব। আগে এঁরা মাটি সংগ্রহ করতেন শালী নদী থেকে। কিন্তু নদী থেকে মাটি নেওয়ায় এখন নানা নিষেধ রয়েছে। তাই কিনতে হয় মাটি। জঙ্গল থেকে জ্বালানি নেওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মৃৎশিল্পীরা তলিপাতা সংগ্রহ করতেন। অর্থাৎ যে সব পাতা ঝরে তলায় পড়ে যেত। এখন বিধিনিষেধের কারণে তলি পাতা নিতে পারেন না। মিলের কাঠগুঁড়ো ব্যবহার করেন মাটির জিনিসপত্র পোড়াতে।
সময় প্রায় শেষ। বারবার ঘড়ি দেখতে হচ্ছিল। ফলে তথ্য সংগ্রহ থামাতে হল। লেখার সময়ে নোট ঘাঁটতে দেখি, উৎপলবাবুর স্ত্রীয়ের নামটা লিখতে ভুলে গিয়েছি। নির্দশন হিসেবে ছোট ও বড় দু’রকম আকারের হাতি-ঘোড়া কিনে নিলাম। এক জোড়া কম পড়ছিল। উৎপলবাবু প্রতিবেশী কোনও শিল্পীর বাড়ি থেকে এনে দিলেন। নিয়ে যাওয়ার সমস্যা আর ভেঙে যাওয়ার ভয় ছিল। অভয় দিয়েছিলেন উৎপলবাবু। প্যাকিং বাক্সে ভাল করে মুড়ে দিয়েছিলেন।
টোটোয় উঠে সঙ্গীদের বলে দিয়েছিলাম, সেই ছবিটা দেখার কথা মনে করাবি। আমার মনে ছিল না। দীপু দেখতে পেয়েছিল। জানাল, ‘সোনামনির হাতি ঘোড়া’ই লেখা রয়েছে। হয়তো শিল্পীর শোনার ভুল। আমাদের দেখার ভুল ছিল না।
শুধু শুধু বকুনি খেলাম!
ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ ও দীপশেখর দাস
(সমাপ্ত)




