দীপক দাস

রেল কোম্পানির ভারী একটা বদভ্যাস আছে। একটা নয়, হয়তো অনেক আছে। আমি স্টেশনের কথা বলতে চাইছি। কোনও কোনও সময়ে যেখানে খুশি স্টেশন খাড়া করে দেয়। সেখান থেকে অভীষ্ট গন্তব্যের হদিশ মেলে না। আমরা বেগুনকোদর স্টেশন যেতে গিয়ে বুঝেছিলাম। বেগুনকোদর বলে যে জায়গা পরিচিত সেখানে স্টেশন তো দূরের কথা, রেললাইনই নেই।
স্টেশনে নেমে ভারী বুরবক হয়ে গেলাম। ‘বাংলার মহাকবি’র জন্মভিটেয় যাব। আন্তর্জালে দেখে নিয়েছিলাম স্টেশন। কৃত্তিবাস ওঝার নামেই স্টেশন, বাথনা কৃত্তিবাস। স্টেশন থেকে বেরিয়ে এক টোটোচালক দাদাকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি জানালেন, এই স্টেশন নয়। কৃত্তিবাসের বাড়িতে যেতে হলে ফুলিয়ায় নামতে হত। ফুলিয়া ফেলে বাথনা কৃত্তিবাস। আবার ফিরতে হবে। ট্রেনের অনেকটা দেরি। কী করি!

কিছু ভাল লোক সবসময়েই আমাদের সাহায্য করেন। আমরা দল বেঁধে বেরিয়ে বারবার এর প্রমাণ পেয়েছি। এবার দল নেই। আমি একা। তাও এক ‘গুড সামারিটান’কে পেয়ে গেলাম। তিনি বাথনা কৃত্তিবাস স্টেশনের কাছের টোটোচালক। প্রথমে ফুলিয়া যেতে অন্য টোটোচালককে অনুরোধ করেছিলেন। নিজে উল্টো দিকে যাবেন বলে এই অনুরোধ। সেই চালক একা নিয়ে যেতে চাইছিলেন না। আমার ‘গুড সামারিটান’ বিপাকতারণ হলেন। তুলে নিলেন তাঁর টোটোয়। ঘুরপথে যেতে হলেও পৌঁছে দেবেন কবি কৃত্তিবাসের গ্রামে।

ভাগ্যিস তুলে নিয়েছিলেন। ওই সফরে দারুণ সুবিধা হয়েছিল। যেতে যেতে অনেক কথা হল। বাথনা কৃত্তিবাস স্টেশন রহস্যও তাঁর কাছে জানা গেল। কবির নামে একটা স্টেশনের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। রেল কর্তৃপক্ষ দাবি মেনেছিলেন। কিন্তু স্টেশন করার সময়ে কাছাকাছি জায়গা মিলল না। যেখানে মিলল সেখানেই তৈরি হল বাথনা কৃত্তিবাস। যাঁরা কৃত্তিবাসের ভিটেয় আসতে চান তাঁরা না জেনে এই স্টেশনে নামলে অসুবিধায় পড়বেন। ভালমানুষ টোটোচালক না পেলে ঘুরপাক খেতে হবে তাঁকে।
নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কৃত্তিবাসের ভিটেয়। টোটোচালক দাদা আমাকে গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত দেখিয়ে আনলেন। তার পর কৃত্তিবাসের কুয়ো দেখিয়ে গ্রন্থাগারের সামনে নামিয়ে দিলেন। অনেক ধন্যবাদ দিয়ে দাদাকে বিদায় জানালাম। আমি শুরু করলাম খোঁজখবর।

কবির জন্মভিটেয় ঢোকার মুখে একটা তোরণ রয়েছে। কৃত্তিবাস স্মৃতিতোরণ। কবির নামাঙ্কিত স্কুলের পাঁচিলের গাঁ ঘেষেই তোরণটি। গঙ্গার দিকের রাস্তাটি ছেড়ে বাঁ দিকে ঢুকতে হয়। এই রাস্তাটি কৃত্তিবাস রোড নামে পরিচিত। তোরণ পার করে স্কুল চত্বরে ঢুকলে তিনটি নির্মাণ পড়বে। প্রথমটি কৃত্তিবাসী কুয়ো। পাঁচিলের ভিতর দিকে। একটি ফ্লেক্স টাঙানো। তাতে লেখা, এই কুয়োটি কবি কৃত্তিবাস ওঝা নিজেই খুঁড়েছিলেন। পবিত্র স্থানটিকে রক্ষা করা যে সকলের কর্তব্য তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুয়োতে উঁকি মেরে অবশ্য মনে হয়েছিল, সংস্কারের অভাব রয়েছে। ১৩৩৩ সালে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় ‘গ্রামরত্ন ফুলিয়া’ শীর্ষক সৃজননাথ মুস্তাফির লেখায় এই কুয়োর উল্লেখ রয়েছে। কুয়োর ভিতরে একটি শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা ছিল, ‘কৃত্তিবাস-কূপ’ ১৩২০’।

কুয়োর ঠিক পাশেই একটা ছোট্ট ঘর। কবির ধ্যানে বসা মূর্তি রয়েছে তাতে। রয়েছে রাম-সীতা-লক্ষ্মণের মূর্তিও। ঘরের সামনে কবির স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেখা, মহাকবি কৃত্তিবাসের আবির্ভাব কাল এবং ত্রিপদীতে লেখা একটি কবিতা। কবিতাটি এরকম, হেথা দ্বিজোত্তম/ আদি কবি বাঙ্গালার ভাষা রামায়ণকার/ কৃত্তিবাস লভিলা জনম।/ সুরভিত সুকবিত্বে ফুলিয়ার পুণ্যতীর্থে/ হে পথিক, সম্ভ্রমে প্রণম’। স্মৃতিস্তম্ভ, কুয়ো ও মূর্তি, তিনটিই একটি বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায়। বৃক্ষটির গোড়ায় রয়েছে একটি ফলক। সেই ফলকে দাবি করা হয়েছে, ‘এই বট বৃক্ষের শীতল ছায়ায় বসিয়া কবি কৃত্তিবাস তাহার প্রসিদ্ধ রামায়ণ রচনা করিয়াছিলেন’। আর লেখা কুমার প্রমথনাথ রায় এই ফলকটি স্থাপন করেছেন।

এই সব স্মারক ও স্কুল পার করলে কৃত্তিবাস মেমোরিয়াল লাইব্রেরি কাম মিউজিয়াম। এটি ১৯৬০ সালে স্থাপন করা হয়েছিল। গ্রন্থাগারে ছিলেন পতিতপাবন মিশ্র আর বাণীব্রত ইন্দ্রের সঙ্গে। বাণীব্রতবাবু গ্রন্থাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী। পতিতপাবনবাবু একসময়ে কর্মী ছিলেন। এখন সংগ্রহশালার দায়িত্বে। তিনিই ঘুরে দেখালেন সংগ্রহশালা। সেখানে একটি কক্ষে রয়েছে রামায়ণের ঘটনা অবলম্বনে নানা অঙ্কনচিত্র। ছবিগুলো এঁকেছেন শিল্পী মৃদুল চট্টোপাধ্যায়। এই ঘরেই রয়েছে ‘ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় পতাকা’। জাতীয় পতাকাটি ২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ফুলিয়া বাসস্ট্যান্ড ময়দানে উত্তোলন করা হয়েছিল। দৈর্ঘ্যে ৮১ ফুট, প্রস্থে ১২১.৫ ফুটের পতাকাটি ১৮১.৬ ফুট স্তম্ভে উড়েছিল সে দিন।

অন্য একটি ঘরে রামায়ণ সংক্রান্ত বই ও পুথি সংগ্রহ করে রাখা আছে। ঘরের বাইরে কবি কৃত্তিবাসের একটি লম্বা বাঁধানো ছবি। অবশ্যই কল্পিত। স্থানীয় শিল্পীকে দিয়ে আঁকানো। পতিতপাবনবাবু জানালেন, এই সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার গড়ে তোলার পিছনে কেশবলাল চক্রবর্তীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। গ্রন্থাগারে তিনি ৪২ বছর কাজ করেছেন। মাঝে কিছুদিন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গিয়েছিলেন।

মাঘ মাসের শেষ রবিবার ফুলিয়ায় কবি কৃত্তিবাসের স্মরণসভা হয়। আগে সাত দিন ধরে অনুষ্ঠান হত। এখন একদিন হয়। কৃত্তিবাস স্মৃতি সমিতি বহু বছর ধরে সভার আয়োজন করে আসছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একবার আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমন্ত্রণ রক্ষা তাঁর পক্ষ সম্ভব হয়নি। নিজের অপারগতার কথা জানিয়ে কবি একটি চিঠি দিয়েছিলেন স্মৃতি সমিতির সম্পাদক নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে। সুরুল থেকে ১৩২২ বঙ্গাব্দে লেখা সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে কবির রসবোধের পরিচয় মেলে। নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করেই তিনি আসতে পারবেন না জানিয়েছিলেন। চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘এখন আমার মেরুদণ্ড আমার অধীন নয়, আমিই তার অধীন’। চিঠির শেষে সই ছিল, ‘জরাজীর্ণ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।

মাঘ মাসে কবি কৃত্তিবাসের স্মরণসভায় বহু খ্যাতনামা এসেছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সনৎকুমার মিত্র, পূর্ণদাস বাউল।
ফুলিয়ার আদিবাসিন্দা কিন্তু নন কৃত্তিবাস। তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ নরসিংহ ওঝা ছিলেন বেদানুজ নামে এক রাজার মন্ত্রী। কিন্তু কোনও যুদ্ধবিগ্রহের সময়ে তাঁকে চলে আসতে হয়েছিল ফুলিয়ায়। তাঁর নিম্নতন পঞ্চম পুরুষ কৃত্তিবাস। বাবার নাম বনমালী। মা মালিনী। ১২ বছরে পা দিয়ে কৃত্তিবাস বড় গঙ্গা পেরিয়ে উত্তর দেশে পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন। এই বড় গঙ্গা আর উত্তরদেশ নিয়ে পণ্ডিতদের মতভেদ আছে। দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, বড় গঙ্গা যশোর জেলায়। তাই তিনি যশোরে পড়তে গিয়েছিলেন। নয়নচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সচিত্র কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ অনুযায়ী কৃত্তিবাস নবদ্বীপে পড়তে গিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে কৃত্তিবাস গিয়েছিলেন গৌড়েশ্বরের কাছে। ইচ্ছে ছিল রাজপণ্ডিত হওয়ার। গৌড়েশ্বরের পরিচয় নিয়েও নানা মত রয়েছে। তবে গৌড়েশ্বর যে কেউ হন না কেন কৃত্তিবাসের রচিত পাঁচটি শ্লোকে তিনি পণ্ডিত যুবাকে চিনতে পেরেছিলেন। তাঁকে যথোচিত সংবর্ধনা দিয়ে বাংলায় রামায়ণ রচনা করতে অনুরোধ করেন।
ফুলিয়া নাম নিয়ে আগ্রহ ছিল। সে আগ্রহও মিটিয়েছেন কৃত্তিবাস স্বয়ং। তাঁর পদ, ‘মালীজাতি ছিল পূর্ব্বে মালঞ্চ এখানা।/ ফুলিয়া বলিয়া কৈনু তাহার ঘোষণা’। অর্থাৎ মালি জাতির বসবাসের জায়গায় ছিল মালঞ্চ অর্থাৎ বাগান। মালি মানে ফুল। তা থেকেই ফুলিয়া। ফুলিয়ার সঙ্গে উচ্চারণ বয়ড়া গ্রামটিও। সেটি লাগোয়া গ্রাম।
এখন ফুলিয়া গ্রামে যেতে গেলে বাস ও রেল দু’পথেই আসা যায়। ট্রেনে শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুর শাখা। একসময়ে জলপথেও আসা যেত। কলিকাতা স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি কলকাতার হাটখোলা ঘাট থেকে সকালে স্টিমার ছাড়ত। তা সন্ধের আগে এসে পৌঁছত ফুলিয়ায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও জলপথে আসার কথাই চিঠিতে লিখেছিলেন। লিখেছিলেন, ‘যদি দক্ষিণ হাওয়ায় পাল তুলিয়া আপনাদের চূর্ণী নদী বাহিয়া বাংলার মহাকবির ভিটায় এই ক্ষুদ্র গীতিকারের নৌকা ভিড়িতে পারিত তবে আমি সেখানে দুই তিন ঘণ্টা রসনা চালনা করিলেও কাবু হইতাম না’।

ফুলিয়া গ্রামে আরেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। সেটি হল হরিদাস ঠাকুরের শ্রীপাট। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হরিদাস বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল শ্রীচৈতন্যদেবের।
কভারের ছবি— কৃত্তিবাস স্মৃতি তোরণ
(সমাপ্ত)




