কোলোরিয়াং, অরুণাচলপ্রদেশ।
পাহাড়িয়া বাঁশি বিশেষ ভ্রমণ

সারলির সেই সুন্দর ভোর

দীপশেখর দাস

২০১৯ সালের শেষ রাত। গুয়াহাটি স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়লাম নাহারলাগুনের উদ্দেশ্যে। সঙ্গী বোটানিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সহ-গবেষক শুভজিতদা, রোহন আর মোনালিসাদি। সারা বিশ্ব তখন রাত জাগছে বর্ষবরণের অপেক্ষায়। আমরা চারজনে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ট্রেনের কামরায়।

পাহাড় আমার বরাবরই প্রিয়। পাহাড় যাওয়ার একটা সুবিধা আছে। পাহাড়ে এক সঙ্গে জল-জঙ্গল-পাহাড় সবই পাওয়া যায়। পাহাড়, জঙ্গল আর নদী সবসময়ই এক অসম্ভব রোমান্টিকতা তৈরি করে। উত্তর-পূর্ব ভারতের জল-জঙ্গল-পাহাড়ের সেই রোমান্টিক রূপ দর্শনে তাই ছুটে চলেছি অরুণাচলপ্রদেশের কুরুং কুমে জেলার সাংগ্রাম, কোলোরিয়াং আর সারলির উদ্দেশ্যে। বর্ষবরণের রাতের কালো নিকষ আকাশে তখন শত শত আতশবাজির হাজার ওয়াটের রোশনাই।

চলার পথে অচেনা গ্রাম।

গুয়াহাটি থেকে নাহারলাগুন পৌঁছলুম ভোর ৫টা নাগাদ। স্টেশন থেকে ‘ইনার লাইন পারমিট’ নিয়ে সেখান থেকে বাসে ইটানগর। ইটানগরে একদিনের বিশ্রাম আর ভ্রমণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ। পরদিন গাড়ি রিজার্ভ করে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লুম সাংগ্রামের উদ্দেশ্যে। শহর ছেড়ে কিছুটা যেতেই প্রকৃতি তার রূপ উন্মুক্ত করে দিল। পাহাড়ি রাস্তা। একের পর এক বাঁক। প্রতি বাঁকে দৃশ্যপট বদল। চারপাশে নিবিড় অরণ্য, মাঝে মাঝে মেঘে ঢাকা ছোট ছোট পর্বতচূড়া। রাস্তার পাশের পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ছোট ছোট ঝরণা। সেইসব  প্রকৃতি অসাধারণ এক মুগ্ধতা আর মায়া এনেছে মনে। সেই রূপ দেখতে দেখতেই আমরা ছুটে চললুম। ঘণ্টা পাঁচেক পর পৌঁছলুম সাংগ্রাম। সাংগ্রাম যাওয়ার রাস্তা তখন মেরামত চলছে। তাই রাস্তা বেশ খারাপ। পৌঁছতে অনেকটাই বেশি সময় লাগল।

সুন্দরের মাঝে ভয়ঙ্কর। এমনই ছিল পথ।

সাংগ্রাম ছবির মতো সাজানো ছোট এক পাহাড়ি শহর। অরুণাচলে প্রধানত মিশমি ও নিশি জনজাতির বাস। আমাদের থাকা জন্য ফরেস্ট ইনস্পেকশন বাংলো বরাদ্দ ছিল। বাংলোর কেয়ারটেকার আমাদের খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন। চিকেন কষা, ভাত আর শশা-পেঁয়াজের স্যালাড। খিদে পেটে সব উজাড় হয়ে গেল। খেয়ে একটু বিশ্রাম। তার পর শহর ঘুরতে বেরিয়ে পড়া।

পাহাড় কেটে তৈরি করা আঁকা বাঁকা রাস্তা। সেই পথ বেয়ে আমরা চড়তে থাকলুম পাহাড়। সবুজ পাহাড় আর তাতে নানারকম উদ্ভিদের সমাহার। উদ্ভিদ গবেষকদের স্বর্গরাজ্য। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সাদা মেঘের ভেলা। পাহাড়ের উপর থেকে সাংগ্রাম শহর যেন কোনও এক শিল্পীর আঁকা নিখুঁত এক ল্যান্ডস্কেপ। সাংগ্রাম ঘুরে সন্ধ্যেয় ফিরলুম বাংলোয়। রাতটুকু বিশ্রাম। পরদিন সকালে বেরোনো হবে পরের গন্তব্যে-কোলোরিয়াং।

বৃষ্টি ভেজা দিনে রামধনু।

কুরুং কুমে জেলার বিখ্যাত হিল স্টেশন কোলোরিয়াং। জেলার সব থেকে বড় শহরও এটা। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নান্দনিকতা ভ্রমণপিপাসুদের চিরকাল আকৃষ্ট করে। পাহাড়ের কোলে প্রায় ৩৩০০ ফুট উচ্চতায় কুরুং নদীর তীরে অবস্থিত এই হিল স্টেশনে পৌঁছেই মন ভরে গেল। পাহাড়গুলো সব সবুজ জঙ্গলে পরিপূর্ণ। হালকা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেরাচ্ছে পাহাড়ের গা বেয়ে। তার সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি সেই দৃশ্যপটের রোমান্টিকতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। রোমান্টিকতায় তাল কাটছে বেহাল রাস্তা। খারাপ রাস্তা ভুগিয়েছে সকাল থেকেই। সাংগ্রাম থেকে কোলোরিয়াং প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতেই আমাদের সময় লেগেছিল প্রায় ৪ ঘণ্টা। শহরের প্রধান রাস্তাটা ছিল পাকা। বাকি অলিগলির রাস্তা তখনও কাঁচা। চলতে গেলে পা দেবে যায় বেশ কিছুটা। প্রাণপণ শক্তি খরচে পা কাদা থেকে তুলে তুলে এগিয়ে যেতে হয়। চলতে চলতে ধন্যবাদ দিই আমাদের সকালের ড্রাইভার দাদাকে। কোলোরিয়াং যাচ্ছি আর সেখানে গিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরব শুনে আমাদের একপ্রকার জোর করেই গামবুট কিনিয়েছিলেন। না হলে আমাদের কেতাদুরস্ত জুতোর বোধহয় এখানেই পাঁক সমাধি ঘটত।

কোলোরিয়াংয়ের একটা দৃশ্য।

সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় ফিরলুম বাংলোয়। কেয়ারটেকার রান্না বন্দোবস্ত করছিলেন। শুভজিতদা মেনু বলে দিল। রুটি আর মুরগি কষা। কেয়ারটেকার দাদা গম্ভীর হয়ে গেলেন। “আপ লোগ শুয়ার নেহি খাও গে?”- জিজ্ঞাসা করলেন তিনি। আমি নতুন খাদ্যের আশায় লাফিয়ে উঠলুম। কিন্তু, বাকিদের কাছে ও খাদ্য ‘অখাদ্য’। তাই আশা ত্যাগ করতে হল। আসলে অরুণাচলের এ দিকটায় শুয়োর প্রায় সব বাড়িতেই থাকে। মুরগিই এখানে বিরল। স্থানীয়দের স্বাভাবিক খাদ্য শুয়োর। অন্য ট্যুরিস্টরা এসে হয়তো শুয়োরই খোঁজেন। আমাদের মেনু তাই বোধহয় কেয়ারটেকার দাদাকে অবাক করে।  

মেঘের ভেলার উপরে দাঁড়িয়ে।

পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লুম আমাদের শেষ গন্তব্য সারলির দিকে। এখানে আসার রাস্তা আরও দুর্গম। কোলোরিয়াং একটু শহুরে হলেও এদিকটা অনেকটাই প্রত্যন্ত। এখানে প্রকৃতি আরও শান্ত, আরও নিবিড়। জায়গাটা প্রায় ৫০০০ ফুট উপরে। তিব্বত সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত এই সারলি। মাঝে মাঝে কর্দমাক্ত রাস্তায় আওয়াজ তুলে চলে যাচ্ছে সেনার ট্রাক। এখানকার বাজারটা ছোট। ইনস্পেকশন বাংলোটাও। এখানে কোনও কেয়ারটেকার নেই। ফরেস্ট বিট অফিসে যোগাযোগ করে বাংলোর চাবি আনা হল। চাল, ডাল আর সামান্য কিছু মশলাপাতি কিনে এনে নিজেরাই রান্না করলুম। রোহন এ ব্যাপারে এক্সপার্ট। কাঠ ছিল। কেরোসিন ছিল না। চুল্লির আগুন কিছুতেই জ্বলছিল না। স্থানীয় দুই মহিলা এসে আগুন জ্বেলে দিয়ে গেলেন। আমাদের পেটের আগুন জুড়োলো তাতেই।

বৃষ্টি ঝরছিল অবিরাম। তার উপর এই ক’দিনের দুর্বিষহ যাত্রা। সকলে বেশ এলিয়ে পড়েছিলুম। এখানে দু’রাত কাটাব। তাই সে দিন আর বাংলো ছেড়ে বেরোলাম না। পরদিন বেশ সকালেই ঘুম থেকে উঠেছিলুম আমি। অন্যরা ওঠেনি তখনও। জানালা দিয়ে দেখলুম সবে পুবদিক রাঙা হয়েছে। ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লুম একাই। যা দৃশ্য দেখলুম তা বঙ্কিমবাবুর ভাষায় বললে “জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না।“ উদিত সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে দূরের বরফ ঢাকা পাহাড় থেকে। সামনের সবুজ পাহাড়। সে পাহাড় আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি তার থেকে সামান্য উঁচু। আমার আর সেই পাহাড়ের মাঝের ভ্যালি সাদা মেঘের চাদরে ঢাকা। আকাশে না থেকেও আমি তখন মেঘের উপরে। আমার হাতের কাছেই মেঘ। আমি ছুটে বাংলোয় ফিরলুম। ডাক দিলুম সতীর্থদের সেই ঐশ্বরিক দৃশ্যের সাক্ষী হতে। আমার হাঁকডাকে তিনজনেই পাশ ফিরল শুধু। ঘুম থেকে উঠল না।

কুরুং নদীর দৃশ্যপট।

সেই সারাদিন সারলির বনে জঙ্গলে ঘুরে বেরুলুম। চষে ফেললুম এ পাহাড় থেকে ও পাহাড় । অনেক অনেক দৃশ্যপট সামনে এল। কিন্তু, ভোরের দেখা সেই ল্যান্ডস্কেপ অন্যগুলোকে আর ভাল লাগতে দিল না।

কুরুং কুমে জেলার তিন জায়গা দেখতে এসেছিলুম। দেখা শেষ এবার ফেরার পালা। পরদিন সকালে গাড়ি রিজার্ভ করে ইটানগরের রাস্তা ধরলুম। ফিরতে অনেক সময় লাগবে। হয়তো সন্ধ্যে হয়ে যাবে। কিন্তু যাত্রার শেষদিন যে দৃশ্যপট আমার চোখের সামনে তুলে ধরল তা আমার কাছে চির ‘ভোর’ হয়ে থেকে যাবে।

সেই ভোর।

কভারের ছবি— কোলোরিয়াংয়ের কাছের দৃশ্যপট

ছবি— লেখক

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *