দীপক দাস

বৈষ্ণব সাহিত্যে কৃষ্ণপ্রিয় নানা মিষ্টি ও মিষ্টান্নের উল্লেখ রয়েছে। সাহিত্যের বাইরে বাজারে এবং রাধাবল্লভের সেবার ইতিহাসে খুঁজলে কৃষ্ণের নামে মিষ্টিও মিলবে। যেমন, বর্ধমানের ভাতারে গোপালভোগ বা মুর্শিদাবাদের কান্দির হরিবল্লভ। কিন্তু কৃষ্ণ বা হরির ভক্ত শ্রীচৈতন্যের নামে কোনও মিষ্টির খোঁজ তেমন পাইনি। শুধু একটা মিষ্টি ছাড়া। সে মিষ্টি আবার মেলে হাওড়া জেলাতেই। নামটি তার চৈতন্যভোগ।
‘এবং জলঘড়ি’ পত্রিকা মিষ্টি নিয়ে একটি ক্রোড়পত্র করেছিল ২০২০ সালে। তাতে হাওড়ার মিষ্টি নিয়ে লেখায় উল্লেখ ছিল চৈতন্যভোগের। দোকানটা শিবপুর বাজারে। আমাদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। সেই কারণেই বোধহয় দোকানের সন্ধানে যেতে বছর ছয়েক লেগে গেল। তাতে ক্ষতিই হল স্বাদ-সফরের। কথাতেই আছে না, ‘শুভস্য শীঘ্রম’!

বড় রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা ভিতরে শ্রী দুর্গা মিষ্টান্ন ভান্ডার। জিজ্ঞাসা করে করে যাচ্ছিলাম। এক দোকানদার প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন, ‘‘দোকানটা পুরনো ছাঁদের। আলাদা করে চিনতে পারবেন না। বাঁ দিকে দেখতে দেখতে যান।’’ দেখতে দেখতে গেলাম বটে। কিন্তু আরও একাধিকবার জিজ্ঞাসা করতে হল বাজারওয়ালা ও দোকানদারদের। অবশেষে পৌঁছনো গেল দোকানে। কাঠের দোকান। রাস্তার দিকের অংশে কাঠের কাঠামোয় কাচ লাগানো। কাঠের শোকেসে মিষ্টি সাজানো। একপাশে কাঠের বেঞ্চ। ভিতর দিকে ভিয়েন। কাঠের বেঞ্চে বসে এক প্রৌঢ়া মিষ্টির প্যাকেট ভাঁজ করছিলেন। তিনি শিপ্রা মল্লিক। দোকানের অন্যতম মালিক শ্রীকান্ত মল্লিকের স্ত্রী। অন্যতম কারণ, এই মল্লিকেরা চিরকালই যৌথ পরিবার। তাঁর শ্বশুর প্রভাকরেরা ছয় ভাই ছিলেন। অনেকে নানা কাজ করলেও দোকানে আসতেন সকলেই। শ্রীকান্ত ২০২৩ সালে মারা গিয়েছেন। দেওর গোপালচন্দ্রও বর্তমানে অসুস্থ। ফলে শিপ্রাদেবীকেই দোকানে আসতে হচ্ছে।
আসার কারণ বললাম। আর হতাশ হতে হল। চৈতন্যভোগ শুধু শীতকালে তৈরি হয়। যাহ! কী করি? পুরনো ছাঁদের দোকানে কিছু গল্প থাকে। বসে বসে সেগুলোই শোনার চেষ্টা করলাম। দোকান খুলেছিলেন সত্যচরণ মল্লিক। অনেক রকম ব্যবসা করেছিলেন। শেষে থিতু হন মিষ্টির দোকানে। শ্রীকান্ত-শিপ্রাদের ছেলেকে ধরলে এখন দোকান চার পুরুষে পড়েছে। এলাকায় দোকানটির বেশ নাম ছিল। এখনও রয়েছে। এই দোকানের মিষ্টি খেয়েছেন সাহিত্যিক শংকর। পাণ্ডব গোয়েন্দার স্রষ্টা ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায় বা রসসাহিত্যিক গণশা, কে গুপ্ত, ঘোঁৎনাদের ‘বরযাত্রী’র বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ও আসতেন। আরও সব বিখ্যাত নামেরাও আসতেন। শিপ্রা সেই সব গল্পটা ততটা জানেন না। জানালেন, দেওর দোকানে থাকলে হয়তো আরও কিছু তথ্য দিতে পারতেন।
শ্রী দুর্গার বৈশিষ্ট্য কী? শুধু চৈতন্যভোগের সুনাম দিয়ে তো কোনও দোকান চার পুরুষে গড়াতে পারে না! শিপ্রাদেবী, দোকানে আসা এক খদ্দের এবং কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হল, গুণমান একটা কারণ অবশ্যই। সেই সঙ্গে প্রাচীনত্বকে ধরে রাখা। এ দোকানে রসের মিষ্টি হয় কম। রঙের মিষ্টিও কম। বেশির ভাগই সাদা মিষ্টি। সন্দেশের ভাগ বেশি। এখন দোকানে দিলখুশ, কাঁচাগোল্লা, ছানার মুড়কি, রসগোল্লা, ল্যাংচা, গুজিয়া ইত্যাদি হয়। আগে হত আবার খাব, বাবু সন্দেশ, স্ট্রবেরি সন্দেশ, চন্দ্রপুলি। স্ট্রবেরি সন্দেশকে গোলাপখাসও বলেন তাঁরা। এই দোকানের নারকেলের চন্দ্রপুলি হলুদ হয় না। নারকেলের মতোই সাদা। তবে তাঁদের দোকানে কখনও গুড়ের জিলিপ হত না। স্পষ্ট জানালেন শিপ্রাদেবী ও কর্মীরা।

গোপালচন্দ্র দোকানে আসতে না পারায় মিষ্টির বৈচিত্র কমেছে। কারিগরের সমস্যাও রয়েছে। একসময়ে দোকানে ১৪-১৫ জন কর্মচারী ছিলেন বলেন জানালেন শিপ্রা। এখন তিন জন। ছাঁদের মতো পুরনো কর্মীদের ধরে রাখতে জানেন শ্রী দুর্গার মালিকেরা। ভাল মালিকের গুণের বিষয়টি জানালেন দোকানে আসা এক খদ্দের। এবং দেখাও হল স্বপন সিংহ নামে এক কর্মীর। বাড়ি বাঁকুড়ায়। মাত্র ১০ বছর বয়সে এসেছিলেন মল্লিকবাড়িতে। পরে দোকানে চলে আসেন। এখনও মিষ্টি তৈরির অন্যতম সহায়।
যতক্ষণ দোকানে ছিলাম একটা বিষয় লক্ষ্য করছিলাম। ভিড় হয়তো জমছে না। কিন্তু একটা দু’টো করে খদ্দেরের আনাগোনা লেগেই রয়েছে। তাঁরা নানা বয়সি। অর্থাৎ প্রজন্মান্তরে দোকানের কথা এগিয়েছে। কথা বলতে বলতে খদ্দেরদের চাহিদার দিকে কান খাড়া রাখছিলাম। তাতে মনে হল, দরবেশের বেশ চাহিদা রয়েছে। শিপ্রাদেবীও জানালেন, সারা বছরই দরবেশের চাহিদা থাকে। বেলায় ফুরিয়ে যায়। আবার তৈরি হওয়ার আগে পর্যন্ত কিছু খদ্দের ফিরেও যান। আমি বাড়ির জন্য কিনে নেওয়ায় ফুরিয়েই গিয়েছিল। না পেয়ে দু’একজন খদ্দেরকে আক্ষেপ করতেও দেখা গেল।
শ্রী দুর্গার দরবেশের বৈশিষ্ট্য কী? বেশ জমাট। বোঁদের বিন্দুগুলো গায়ে গায়ে ঠাসা। উপরে ক্ষীরের গুঁড়ো ছড়ানো থাকে। আর থাকে সুগন্ধি। ক্ষীরের গুঁড়ো ছড়ানো দরবেশ আমি খাইনি আগে। ভালই লাগল। বিজনবিহারী ভট্টাচার্য ‘বাঙালির মিষ্টান্ন: সংস্কৃতির একদিক’ প্রবন্ধে দরবেশ নিয়ে খানিক মজা করেছিলেন। তাঁর মতে, এই মিষ্টির জন্ম বাংলাদেশে নয়। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হতে পারে। আর নামটি ফরাসি। কিন্তু দরবেশ নাম দেওয়া কেন? বিজনবিহারীর রসোক্তি, নামটি কি দরবেশের চিত্রবিচিত্র রঙের আলখাল্লার কারণে? হতেও পারে। কারণ দরবেশে বোঁদেগুলো থাকে লাল-হলুদ রঙের। তিনি দরবেশ তৈরির উপকরণ হিসেবে বোঁদে ছাড়াও খোয়া ক্ষীর, বাদাম, কিসমিস ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। জানিয়েছেন কিছু গন্ধদ্রব্যও দেওয়া হয়। আগে নাকি জয়িত্রী দেওয়া হত। কিন্তু ভীষণ দামের কারণে বোধহয় দেওয়া হয় না। দরবেশকে বোঁদের মিঠাই বলেও এটির মান উঁচু বলেই মত বিজনবিহারীর। কিন্তু তাঁর দেওয়া উপকরণে ক্ষীরের গুঁড়ো নেই। যেটা মিলল শ্রী দুর্গায়। লাল-হলুদ বোঁদের সঙ্গে সাদা ক্ষীরের গুঁড়োয় দরবেশের আলখাল্লা আরও বিচিত্র হল কিন্তু।

দোকানে আসার লক্ষ্য তো চৈতন্যভোগ! দরবেশ নয়। স্বাদ না মিললেও উপকরণ কি মিলবে না? শিপ্রাদেবীকে অনুরোধ করতে তিনি বললেন। চৈতন্যভোগ তৈরিতে লাগে ছানা, নলেন গুড়, চিনি। ক্ষীর, নারকেল এবং সুগন্ধি দেওয়া হয়। কিন্তু সুগন্ধির নামটা বলতে চাইলেন না। এটাই গোপন ও বিশেষ উপকরণ। চৈতন্যভোগ নাম কেন? সেটা জানেন না শিপ্রাদেবী। কবে দোকানে প্রথম তৈরি হয়েছিল সেটাও জানেন না। ওই ‘শুভস্য শীঘ্রম’। তাঁরা কি বৈষ্ণব? বা কেউ আগে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন? মাথা নাড়লেন। বুঝলাম, নামকরণের ইতিহাস দোকান মালিকদের সঙ্গেই অন্তর্হিত হয়েছে।
ইতিহাস মিলল না। উপকরণ মিলল। বাকি রইল স্বাদ। শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা… চৈতন্যভোগের স্বাদ নেব!
কভারের ছবি— দোকানের দরবেশ
ছবি- লেখক
(সমাপ্ত)




