গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া
ইতিহাস ছুঁয়ে বিশেষ ভ্রমণ

গঙ্গাটিকুরি জমিদারবাড়িতে খোঁজ ‘হেলির ধূমকেতু’র

সপ্তপর্ণা ভট্টাচার্য্য

শামুকের খোলস থেকে নিজেকে মুক্ত করে কোনও দিন একা নিরুদ্দেশে পাড়ি দেব, এই ভাবনাটা মনে প্রশ্রয় দিইনি। অজানাকে জানার নেশা মনের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল। সেই ইচ্ছেটুকুকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহসটুকু কোনও দিন করে উঠতে পারিনি। কিন্তু কী হল জানি না, হঠাৎ এ বছর নিজের জন্মদিনে নতুন করে জন্মাতে ইচ্ছে করল। ইচ্ছেডানায় ভর করে উড়ে যেতে ইচ্ছে করল এমন এক জায়গায় যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না। কেউ আমার এই দিনটাকে ‘স্পেশাল’ বানাতে চাইবে না।

আমার পছন্দ মানেই সেখানে ইতিহাসের গন্ধ থাকবেই। খোঁজখবর নিলাম। ঠিক করলাম সোনারুন্দি রাজবাড়ি দেখতে যাব। ট্রেনের যোগাযোগ ভাল। খুব বেশি সময়ও লাগবে না। বাড়িও সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে আসতে পারব। ভিড় থেকে দূরে গিয়ে নিজের মনের সঙ্গে দিনটা কাটিয়ে আসার চরম উত্তেজনা নিয়ে এই পরিকল্পনা যখন করছিলাম তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি ভগবান এত সুন্দর একটা উপহার আমার জন্য সাজিয়ে রেখেছেন।

সোনারুন্দি যাওয়ার পথে আগে একটা জমিদারবাড়ি পড়ে। গঙ্গাটিকুরি জমিদার বাড়ি। স্টেশনের নামও গঙ্গাটিকুরি। এই জায়গাটা পূর্ব বর্ধমানের মধ্যে পড়ে। আর সোনারুন্দি মুর্শিদাবাদ জেলায়। দুই জেলায় হওয়া সত্ত্বেও গঙ্গাটিকুরি থেকে সোনারুন্দি টোটোতে আধঘণ্টারও কম সময় নেয়। তাই আগে জমিদারবাড়ি দেখব বলে ঠিক করলাম।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান
গঙ্গাটিকুরি জমিদার বাড়ি।

গন্তব্যে যাওয়ার আরও সহজ পথ আছে। তাও একা ঘুরে বেড়ানোর খুব একটা অভিজ্ঞতা না থাকায় চেনা পথ ধরলাম। খুব সকালবেলা মুর্শিদাবাদ স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে বসলাম বহরমপুরের উদ্দেশ্যে। ট্রেনে বহরমপুর যেতে লাগে ২০ মিনিট। বহরমপুর স্টেশন থেকে টোটো করে বাসস্ট্যান্ড এলাম। সেখান থেকে অটো করে পৌঁছলাম খাগড়াঘাট রেল স্টেশন।

সকাল ৭.৪৬টার ট্রেন ছিল। টিকিট কেটে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে। হাতে মিনিট কয়েক সময় ছিল। একটু চারপাশটা চোখ বোলাচ্ছিলাম। ওইটুকু সময়ের মধ্যেই স্টেশনটার প্রতি অদ্ভুত একটা টান অনুভব করলাম। একটা শান্ত কোলাহলহীন অথচ গম্ভীর পরিবেশ। যা ভীষণ ভাবে আমাকে আকর্ষিত করল। স্টেশনটার একটা নিজস্বতা আছে। নির্জনতায় আরও একটু ডুবে যাওয়ার আগেই ট্রেন চলে এল। পুরো ট্রেন প্রায় ফাঁকা। জানালার পাশে নিজের পছন্দের একটা সিট দখল করে নিলাম।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া।
বিশাল প্রাঙ্গণেই বিস্ময় জাগে।

চমক শুরু হল এর পর থেকে। নিজের মনের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ একটু একটু করে উপলব্ধি করতে শুরু করলাম। একটা স্টেশনও আমার চেনা নয়। একটা মানুষকেও আমি চিনি না। অথচ কী অদ্ভুত এক প্রশান্তি, অপূর্ব চোখ জুড়ানো পরিবেশ আর অসীম নিরাপত্তা। ট্রেনের জানলা থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। বাইরে মাঠের পর মাঠ বিস্তৃত সবুজ ধান খেত, সদ্য সকাল ফোটার গন্ধ, কুয়াশায় ছেয়ে থাকা মানুষজনের অবয়ব, যারা নিঃশব্দে নিজেদের জমির তদারকি করছে, যত্ন নিচ্ছে, হয়তো ভোরের আলো ফোটার আগেই নিজেদের রুজিরুটির দেখভালের জন্য এসে গিয়েছে মাঠে। পাখির দল বেঁধে উড়ে যাওয়া খাবারের খোঁজে, গরু ছাগলের মাঠে চরা, কুয়াশা ঢাকা নদীর বয়ে যাওয়া, এই সব কিছুই আমাকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল ছেলেবেলার হারিয়ে যাওয়া অতীতে, সমস্ত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডুবে যাচ্ছিলাম ভাললাগার অতল গহ্বরে।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া
এগুলোকেই বোধহয় অলিন্দ বলে।

মাঝে মাঝে স্টেশন এলে ফিরে আসছিলাম পার্থিব জগতে। সেখানেও এক অন্য অনুভূতি। যারা ট্রেনের মধ্যে বসে ছিল বা যারা প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিল, কারও মধ্যে কোনও তাড়া নেই, উদ্বেগ নেই, চিৎকার চেঁচামেচি নেই, ধীরে ধীরে ট্রেনে উঠছে বা নামছে। সবাই যেন আমার মতোই নিরুদ্দেশের যাত্রী, অন্য জগতের বাসিন্দা। মিনিট পঞ্চাশের যাত্রা মনে হল এক যুগ পার করে এলাম।

পৌঁছলাম গঙ্গাটিকুরি স্টেশন। স্টেশনের বাইরে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা টোটোগুলোকে জিজ্ঞেস করতেই একজন দাদা টোটো করে ২০ মিনিটের মধ্যে জমিদার বাড়ি পৌঁছে দিলেন। একটা অচেনা সন্দেহ মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল আসতে আসতে। আদৌ জমিদার বাড়ির ভেতরটা দেখতে পাব তো? কিন্তু পৌঁছে দেখলাম, জমিদার বাড়ির দরজা সকলের জন্য সব সময় খোলা। বাইরে থেকে বাড়ির চেহারা দেখে অনায়াসে আন্দাজ করা যায় ভেতরটা কতটা বড় হতে পারে। দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা বড় খোলা উঠোন। ঢোকার সময় একজন নিরস্ত্র প্রহরী বললেন, একটু অপেক্ষা করলে বাড়ির কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। অপেক্ষা করতে লাগলাম বারান্দায় বসে। বারান্দার একপ্রান্তে একটি দুর্গা মন্দির।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন ভেতর থেকে। আমি এগিয়ে গিয়ে একটু সঙ্কোচ নিয়ে কথা বললাম। দেখলাম ওঁর মধ্যে কোনও বিরক্তি নেই। সাতসকালের আমি রূপী এই উপদ্রবকে তিনি সাগ্রহে স্বীকার করলেন। সকাল ৯টা নাগাদ সকলের অনেক কাজ থাকে। ভীষণ ব্যস্ততার সময় এটা। কিন্তু তিনি আমাকে সময় দিলেন। তাঁর নিজের পরিচয়, বাড়ির ইতিহাস সব কিছু বলে চললেন অত্যন্ত আগ্রহ ভরে। উপরি পাওনা হিসেবে নিজে বাড়িটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। বুঝলাম ওঁকে আমার মতো এ রকম অযাচিত অতিথিদের অহরহ সম্মুখীন হতে হয়।

ভদ্রলোকের নাম শুভ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই জমিদারবাড়িটি তৈরি করেছিলেন ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুভ্রনাথবাবু হলেন ইন্দ্রনাথবাবুর ষষ্ঠ প্রজন্ম। ইন্দ্রনাথবাবুর দাদু প্রথম পরিবার সমেত এই গ্রামে এসেছিলেন। তিনি পেশায় ছিলেন উকিল।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া
শুভ্রনাথবাবুর থেকে তথ্য সংগ্রহ।

বাড়িটি একটি সাধারণ ছোটবাড়ি ছিল। জন্মলগ্ন থেকে এটি জমিদার বাড়ি ছিল না। জমিদার বাড়ি হয়ে ওঠার গল্পটা নিঃসন্দেহে ভীষণ চমকপ্রদ। ইন্দ্রনাথবাবুর দুই ছেলে। অতীন্দ্রনাথ এবং সতীন্দ্রনাথ। অতীন্দ্রনাথের বিয়ে হয় গুসকরা জমিদারবাড়িতে। কিন্তু জমিদার বাড়ির মেয়ের এই ছোটবাড়িতে থাকতে যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছিল। পুত্রবধূর কষ্টের কথা ভেবে ইন্দ্রনাথবাবু স্থির করেন, বাড়িটিকে নতুন রূপ দিতে হবে। সাড়ে ছ’বছরের প্রচেষ্টায় তিনি গুসকরা জমিদারবাড়ির মতো করেই পুত্রবধূর জন্য এই বাড়িটি তৈরি করে দেন। উকিল ছিলেন, টাকার বা জায়গার অভাব তাঁর ছিল না। কিন্তু পুত্রবধূর জন্য এত টাকা ব্যয় করে একটা প্রাসাদ নির্মাণ, তাও আবার পুত্রবধূর বাবার বাড়ির আদলে, এই ঘটনা সত্যিই এই জমিদার বাড়ি তৈরির ইতিহাসকে অন্য এক মর্যাদা দিয়েছে।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া।
জমিদার বাড়ি সাজানোর জন্য কাঠের প্যাঁচা।

দরজায় ঢোকার সময় দেখলাম, উপরের কড়ি বরগায় বাংলায় ১৩০৭ বঙ্গাব্দ খোদাই করা রয়েছে। অনুমান করা যায় বাড়িটি সেই সময়কার। অর্থাৎ প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। শুভ্রনাথবাবু জানালেন, মোট সাতটি উঠোন আছে বাড়ির মধ্যে। দোতলা বাড়িটির উপর নীচ মিলিয়ে মোট ১০৮টি ঘর। নীচের ঘরগুলোতে বাড়ির চাকরবাকর এবং অন্য সহায়কদের রাখা হতো। ভাঁড়ার ঘর হিসেবেও বেশ কিছু ঘর ব্যবহার করা হত। আর উপরের ঘরগুলোতে থাকতেন বাড়ির সদস্যরা। থাকতেন বলছি, তার কারণ এখন শুভ্রনাথবাবু এবং তাঁর পরিবার ছাড়া আর কেউ এখানে থাকেন না। বাকি সদস্যরা দেশে ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। দুর্গাপুজোর সময় সবাই একত্রিত হন এই বাড়িতে। বাড়িটি তখন জমজমাট হয়ে ওঠে।

বাড়ির ভেতর দিয়ে গিয়ে বাঁধানো একটা বড় পুকুর দেখলাম। পাড়ে সারি সারি আম গাছ, খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে আছে। বাঁধানো ঘাটটি এখন জরাজীর্ণ হলেও কল্পনার ডানায় ভর করে অতীতে ভেসে গিয়ে দেখতে পেলাম পুকুরে বাড়ির মেয়েরা স্নান করছে, কাজের মেয়ে বাসন মাজছে, হইহুল্লোড়, গল্প কোলাহলে মুখরিত হয়ে আছে প্রাচীন এই পুকুর ঘাট।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া
শান বাঁধানো পুকুরঘাট।

ভদ্রলোকের ডাকে বাস্তবে ফিরে এলাম। উনি সঙ্গে করে বাড়ির বেশ কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখালেন। ভেতরের একটা অংশে লক্ষ্মীর মন্দির ও সংলগ্ন বেশ কিছু ঘর আছে। ওই অংশে একটা উঠোন আছে। যেখানে বাড়ির ছেলেদের পৈতে দেওয়ার অনুষ্ঠান করা হয়। এই বাড়ির ছেলেদের পৈতে ১২ দিন ধরে হয়। এটি এই জমিদার বাড়ির বিশেষ নিয়ম। ছাদে যাওয়া গেল না। কারণ ভদ্রলোক সেই মুহূর্তে চাবি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সব জায়গা ঘুরে দেখা সম্ভব হয়নি। তবে যেটুকু দেখলাম তাতেই মন জুড়িয়ে গেল।

এর পর এলাম মন্দিরে। বাইরে থেকে লোহার গ্রিল দিয়ে আটকানো মন্দির প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে আরও একদফা অবাক হওয়ার পালা। ভীষণ সুন্দর কারুকাজ করা আছে প্রতিটি দেওয়ালে, ছাদে। বেলজিয়াম কাচের কারুকার্য খচিত দেওয়ালগুলো এখনও জ্বলজ্বল করছে। সময় তার উজ্জ্বলতা মলিন করতে পারেনি। বাইরে থেকে কারিগর নিয়ে এসে খুব শৌখিন ভাবে সাজানো হয়েছিল পুরো মন্দিরটিকে। আর রয়েছে পঙ্খের কাজ।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া
দেখেছিলাম এই পালকিটাও।

এর সঙ্গে আরও একটি ব্যাপার দেখলাম। যেখানে প্রতিমা বসানো হয় সেই জায়গাটিকে দোতলার একটি জানালা থেকে সরাসরি দেখা যায়। বাইরের লোকজনের সামনে না এসে বাড়ির মেয়েদের পুজো দেখার জন্যই নাকি এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই মন্দিরে দুর্গাপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো এবং দোলযাত্রা হয় খুব বড় করে। বনেদি বাড়ির পুজোর মর্যাদা বজায় রেখে এখনও দুর্গাপুজো করা হয়। দুর্গাপুজোর সময় ছাগল বলি প্রথার চল ছিল। চারদিন চারটি ছাগল বলি দেওয়া হতো। সেই বলির মাংসই বাড়ির সদস্যরা খেতেন। পুজো ছাড়া অন্য সময়ে মাংস খেতে হলে সেই মাংস আগে দেবীর কাছে উৎসর্গ করা হত। এ ছাড়া পুকুরের মাছ তো সারা বছর আসত বাড়িতে। পুজোর চারদিন জনসাধারণকে প্রসাদ খাওয়ানো রীতি এখনও চলে আসছে। প্রতিমা তৈরি করার জন্য কারিগর সেই পুরোনো আমল থেকে বংশ পরম্পরায় এখনও চলে আসছে।

উঠোনের যে অংশ দিয়ে মন্দিরে গেলাম সেখানে সার সার দিয়ে পুরনো চেয়ার রাখা ছিল। উল্টো প্রান্তে বারান্দায় বেশ কিছু কাঠের মূর্তি রাখা। সেগুলো কোনও একসময় বাড়ির শোভাবর্ধনের জন্য ব্যবহৃত হত। এখন হয়তো তারা অন্তিম যাত্রার প্রহর গুনছে।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া
সুন্দর করে সাজানো কেদারা। পায়ায় রয়েছে শিল্পকর্মও। এখন ব্যবহার হয় না।

গঙ্গাটিকুরি জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উনিশ শতকের প্রতিথযশা সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি আইন পাশের পরে পূর্ণিয়ায় ওকালতি শুরু করেন। তাঁর বাবা বামাচরণও পূর্ণিয়ার উকিল ছিলেন। ইন্দ্রনাথ দিনাজপুর, কলকাতা হাইকোর্ট এবং শেষ বয়সে বর্ধমান আদালতে ওকালিত করেন। তিনি আসলে একজন ব্যঙ্গ সাহিত্যিক। পাঁচু ঠাকুর বা পঞ্চানন নামে পরিচিতি ছিলেন। তাঁর ব্যঙ্গকাব্য হল ‘উৎকৃষ্ট কাব্যম’, ‘ভারত উদ্ধার’। লিখেছিলেন ‘কল্পতরু’ ও ‘ক্ষুদিরাম’ নামে দু’টি উপন্যাসও। ‘ভারত উদ্ধার’কে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ব্যঙ্গকাব্য বলা হয়। ‘পঞ্চানন’ নামে একটি ব্যঙ্গ পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘বাংলার জীবন ও সাহিত্যাকাশে’ ‘হেলির ধূমকেতু’ বলে উল্লেখ করেছেন। ১৯১১ সালে মৃত্যু হয়েছিল ইন্দ্রনাথের।

গঙ্গাটিকুরি রাজবাড়ি, কাটোয়া।
মন্দিরে অসাধারণ কারুকাজ।

সাহিত্যিক তথা উকিল ইন্দ্রনাথ একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। ওকালতি করে প্রচুর স্থাবর সম্পত্তি করেছিলেন। কিন্তু নিজের জীবন কালেই সমস্ত সম্পত্তি ট্রাস্টের আওতায় করে দিয়েছিলেন। আর সেই সব ট্রাস্ট ছিল মা দুর্গার নামে। ট্রাস্টের আওতায় থাকার ফলে এই সময়ে এসেও সেই সব সম্পত্তি থেকে একটা বড় আয় হয়। যা এত বড় জমিদার বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। এটা না হলে হয়তো কালের করাল গ্রাস এখানেও থাবা বসাত। অন্য অনেক জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়ির মতো এই বাড়িটিও ভগ্নপ্রায় দশায় ধ্বংস হওয়ার দরজায় কড়া নাড়ত।

শুভ্রনাথবাবু আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা গিয়ে নিজেদের একটা বিশাল পুকুর সমেত বাগান দেখিয়ে আনলেন। সদর দরজার উল্টো দিকে আরও একটা বাড়ি দেখতে পেলাম। যেটা এই জমিদার বাড়িরই অংশ। এখন সেখানে বাচ্চাদের স্কুল আছে। আর আছে একটা পালকি। প্রাচীনের গন্ধ এখনও যার গায়ে লেগে আছে।

গঙ্গাটিকুরি, কাটোয়া।
মন্দিরের সৌন্দর্য ও কারুকাজ এখনও অটুট।

জমিদার বাড়ি, বাগান, পুকুর দেখে ভীষণ ভাল লাগল। রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। তবে সব জমিদার বা রাজবাড়ির মতো এ বাড়িতেও অনুভব করতে পারলাম, একসময়ের জমজমাট কোলাহল পূর্ণ বাড়ির প্রতিটা দেওয়াল নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলেছে।

ছবি— লেখিকা

(সমাপ্ত)

2 thoughts on “গঙ্গাটিকুরি জমিদারবাড়িতে খোঁজ ‘হেলির ধূমকেতু’র

  1. এই বাড়িরই পুত্রবধূ অঞ্জনা বন্দ্যোপাধ্যায় নৃত্যশিল্পী। অভিনয় করেছিলেন উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর ‘ছন্দনীড়’ ছবিতে, নৃত্যশিল্পী হিসেবেই।
    সম্ভবত ১৯৯১-৯২ সালে পুজোর সময় কাটোয়া থেকে সোমেন গুহ’র সঙ্গে আমরা এঁদের এই বাড়িতে গিয়েছিলাম। সোমেনদা তখন ‘দেশ’ পত্রিকার গ্রন্থ সমালোচক। আমাদের সঙ্গে ছিল স্থানীয় সাংবাদিক রণদেব মুখোপাধ্যায় ও চিত্রসাংবাদিক অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় (এখন আনন্দবাজার পত্রিকায়)। সোমেনদার সঙ্গে অঞ্জনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগাযোগের সূত্রেই আমরা জমিদারবাড়ির পুজো দেখব বলে গিয়েছিলাম, মনে আছে। তবে ওখানে গিয়ে ওই পরিবারের অতিথি হিসেবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখা পেয়েছিলাম।

    1. নতুন তথ্য যোগ হল লেখায়। ধন্যবাদ আপনাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *