দীপক দাস

‘‘মিষ্টিটা কী ভাবে প্রথম তৈরি হল, জানেন?’’ সবে মুখ খুলেছিলেন ভদ্রলোক, ‘‘একটা গল্প আছে…’। তার পর কী হল, মোড়ের দিকে তাকিয়ে ‘আসছি আসছি’ বলে দুদ্দাড়িয়ে ছুট লাগালেন। এ আবার কী ব্যাপার! কঠিন প্রশ্ন তো ছিল না? উত্তরও জানা ছিল বলে মনে হল। উত্তর দিতে দিতে ছুট লাগালেন কেন?
বন্ধ দোকানের সামনে জিজ্ঞাসার উত্তর হাতড়াচ্ছি মনে মনে। তখনই খুলল দোকানের দরজা। এক মহিলা মুখ বাড়িয়ে বললেন, ‘‘একটু দাঁড়ান।’’ দোকান খুলিয়ে মিষ্টি খাওয়ার অভিজ্ঞতা তেমন নেই। মিষ্টির দোকান একটা ব্যবসা যা অন্য দোকানের মতো সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখা যায় না। এমনকি দুপুরে ঝাঁপ ফেলে দোকানদার একটু গড়িয়ে নেবেন সে সুযোগ কম। কারণ বেশির ভাগ মিষ্টি দিনের দিন বিক্রি হয়ে গেলে ভাল।
বন্ধ দোকান একদম যে মেলেনি, তা নয়। বাঁকুড়া বেলিয়াতোড়ে মেচা খেতে গিয়েছিলাম। হরিদাস মোদকের দোকান দুপুরে ছিল বন্ধ। সে দোকান অবশ্য বাড়ির লাগোয়া। হরিদাস দে মোদক তখন চান করতে গিয়েছিলেন। তার পর পেলাম শান্তিপুরের কাশ্যপ পাড়ায়। পশুপতি ইন্দ্রের দোকানের সামনে।
গিয়েছিলাম নদিয়ার ফুলিয়ায়। কবি কৃত্তিবাস ওঝার জন্মভিটের পরশ পেতে। একদিনের ঝটিকা সফর। এতটা কাছে যখন এসে পড়েছি তখন শান্তিপুরের বিখ্যাত নিখুঁতি না খেলে কি চলে? পুরনো দোকানের খোঁজ দিয়েছিলেন কবি কৃত্তিবাস স্মৃতি গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালার বাণীব্রত ইন্দ্র। ফুলিয়া মোড় থেকে টোটোয় চেপে তাঁর নির্দেশিত কাশ্যপ পাড়া মোড়ে। পশুপতি ইন্দ্রের দোকানের খোঁজ করতে বলেছিলেন বাণীব্রতবাবু। মোড়ে একজনের কাছে সেই খোঁজই করছিলাম। তিনি জানালেন, সামনেই দোকান। কিন্তু এখন তো দোকান বন্ধ। আরেকটু পরে খুলবে।
তখন বিকেল সাড়ে ৪টের মতো বাজে। ফেরার তাড়া রয়েছে। ৫.১০টা নাগাদ শান্তিপুর স্টেশন থেকে শিয়ালদহের ট্রেন ধরতে হবে। ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘কোনও ভাবে দোকান খোলানো যাবে না? মালিকের কি দূরে বাড়ি?’’ উনি বললেন, ‘‘না, না দোকানের সঙ্গেই। চলুন দেখি।’’ চার পা হেঁটে দোকানের সামনে পৌঁছলাম। কাশ্যপ পাড়া মোড় থেকে বাঁক নেওয়া গলিতে দোকানটা। ঠিকানা, ২ নম্বর দত্তপাড়া লেন। পথপ্রদর্শক ভদ্রলোক দোকানের পাশ দিয়ে গিয়ে একটা দরজায় ধাক্কাতে লাগলেন, ‘‘ও অনিতাদি, ও অনিতাদি’’ বলে। ওই হাঁকডাকে প্রমাদ গুনলাম। ঘুম থেকে তুলে মিষ্টির ইতিহাস খোঁজায় আগে বিপাকে পড়তে হয়েছিল।
ভদ্রলোকের হাঁকডাকে এক মহিলা দরজা খুলে অপেক্ষা করতে বললেন। সেই ফাঁকেই এলাকার সমীক্ষাটা সেরে নিতে চেয়েছিলাম। দোকান থেকে ইতিহাস জানার সঙ্গে এলাকায় তথ্য সংগ্রহও জরুরি। সে কারণেই শান্তিপুরের বিখ্যাত নিখুঁতির সৃষ্টিতত্ত্ব জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু উনি মোড়ের মাথায় কিছু দেখে ছুট লাগালেন।

দোকান খুলল। সেই অনিতাদিই। নিখুঁতি কিনলাম বাড়ির জন্য। কেনার পরে দোকানেই স্বাদ নেওয়া। খেতে খেতে গল্প জুড়লাম টুকটাক। কথায় কথায় জানা গেল, পশুপতি ইন্দ্রের ছেলে নৃসিংহপ্রসাদ তাঁর ছেলে অরবিন্দের দোকান এটি। অরবিন্দবাবুর মেয়ে অনিতা। দোকানের বয়স ১২০ বছর। আগে খড়ের চালের দোকান ছিল। এখন পাকা হয়েছে। তবে ছাঁদ এখনও পুরনোই রয়েছে। অনিতাদি জানালেন, অনেক পুরনো দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে তাঁদের দোকানটা।
বাংলার মিষ্টিমহলে নিখুঁতি এক আশ্চর্য সৃষ্টি। ঘুরতে ঘুরতে কত জেলায় যে কত স্বাদের আর আকারের নিখুঁতি খেয়েছি! শান্তিপুরের নিখুঁতি একেবারেই আলাদা। এখানকার নিখুঁতি লম্বাটে, কিন্তু মসৃণ গায়ের নয়। সব নিখুঁতির আকারও একরকম নয়। কোনওটা খানিক চ্যাপ্টা। কোনওটা আঙুলের মতো। মূল উপকরণ ছানা। সঙ্গে ময়দা থাকে। খদ্দেরকে দেওয়ার সময়ে মিষ্টির উপরে ছড়িয়ে দেওয়া হয় গোলমরিচ ছোট এলাচের গুঁড়ো।
কথা বলার সময়ে দোকানে এসেছিলেন পশুপতিবাবুর নাতনি রমা দাস। তিনি জানালেন, শীতকালে আরেক রকম নিখুঁতি হয়। সেটাকে তাঁরা বাঁধা নিখুঁতি বলেন। নিখুঁতি যেমন ভাজার ভেজে নেওয়া হয়। তার পর রসে দেওয়া। এর পর কয়েকটি নিখুঁতি একসঙ্গে নিয়ে তার উপর ঘি আর মশলা ছড়িয়ে হাতে গোল করে পাকিয়ে নিতে হয়। বাঁধা নিখুঁতি শীতকালে হওয়ার একটাই কারণ, গরমে ঘি গলে যায়। আমাদের বন্ধু দীপ্তেন্দুবিকাশ জানা একটা ভিডিয়ো পাঠিয়েছিল। ওর বন্ধু অসীম আদক দিয়েছিল ওকে। ভিডিয়োতে বাঁধা নিখুঁতিকে অনেকটা পক্বান্নর মতো লাগছিল। পক্বান্ন অবশ্য ছোলার বেসনের কাঠিভাজাকে গুড় দিয়ে পাকানো। নিখুঁতির সঙ্গে তফাৎ হল, পক্বান্ন সরু আর খোঁচা খোঁচা এবং শক্ত। বাঁধা নিখুঁতি নরম, মোটায় বাঁধা।

অনিতা ও রমা জানালেন, তাঁদের দোকানের নিখুঁতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি যেত। মান্না দে এলে নিয়ে যেতেন শান্তিপুরের বিখ্যাত মিষ্টান্নটি। দু’জনের দাবি, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কী ভাবে শান্তিপুরের নিখুঁতির জন্ম? এ বিষয়ে কিছু জানাতে পারলেন না তাঁরা। নিখুঁতির সঙ্গে জুড়ে থাকা কোনও গল্পও তাঁরা শোনেননি বলে জানালেন।
বাজারে কিন্তু শান্তিপুরের নিখুঁতি নিয়ে একটা গল্প বেশ প্রচলিত। গল্পটি এরকম, পশুপতি ইন্দ্রের মেয়ের নাম নাকি নিখুঁতি ছিল। খুব সুন্দর দেখতে ছিল তাঁকে। একেবারে নিখুঁত। তখন নিখুঁতি নাবালিকা। বাবা একদিন তাঁকে দোকানে বসিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন। বাচ্চা মেয়ে কী করে! দোকানে ছানার মণ্ড মাখা ছিল। নিখুঁতি সে সব লম্বা করে তেলে ছাড়তে থাকে। আমরা যেমন মায়ের অলক্ষে ফুটন্ত দুধে খেলার ছলে চা পাতা ছড়িয়ে দিই। নিখুঁতি দেখল, তার ছাড়া মিশ্রণ লাল হয়ে ভাজা হয়ে গিয়েছে। সে ঝটপট সে সব তুলে রসের কড়াইয়ে ফেলে দেয়।
বাবা দোকান থেকে ফিরে মেয়ের কাণ্ড দেখে রেগে গিয়েছিলেন। কিন্তু লম্বাটে মিষ্টি ফেলে দেননি। বিক্রি করেছিলেন। পরের দিন নাকি এক খদ্দের এসে নতুন মিষ্টির নাম জানতে চেয়েছিলেন। পশুপতি ইন্দ্র কানে কম শুনতেন। তিনি নাকি শুনেছিলেন, খদ্দের তাঁর মেয়ের নাম জানতে চাইছেন। তিনি বলে দেন, নিখুঁতি। নতুন মিষ্টি নাম পেয়ে যায়। এই গল্পে ফাঁক রয়েছে। মস্ত ফাঁক হল, কোনও দোকানদার তাঁর বাচ্চা মেয়েকে ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ের সামনে রেখে বাজারে যাবেন না। দরকারে স্ত্রীকে ডেকে নেবেন। অনেকে বলতে পারেন, ১২০ বছর আগে বাড়ির বউয়েরা দোকানে বসতেন না। তা হলে বাড়ির মেয়েকেও বসানো সম্ভব হত কি?
নিখুঁতি সৃষ্টিতে পশুপতি ইন্দ্রের মেয়ের খেয়াল কি ইতিহাস সমর্থন করে? কুমুদনাথ মল্লিকের ‘নদীয়া কাহিনী’তে নিখুঁতির উল্লেখ রয়েছে। শুধু উল্লেখই রয়েছে। কিন্তু নামের উৎস নিয়ে কোনও গল্প নেই। তিনি লিখেছেন, শান্তিপুরে ‘আহার্য্য দ্রব্যাদির মধ্যে, খৈচুর ও নিখুতি বিশেষ প্রসিদ্ধ’। এইটুকুই উল্লেখ। নিবেদন অংশ থেকে জানা যায়, বইটির প্রকাশকাল ১৩১৭ বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ আজ থেকে ১১৫ বছর আগের তথ্য। প্রথম প্রকাশ তার বছর দুই আগে ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায়। তথ্য সংগ্রহ হয়েছিল দ্বিতীয় সংস্করণ থেকে, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ লেখাটি পশুপতি ইন্দ্রের সমসাময়িক। তা হলে গল্পটির উল্লেখ থাকা উচিত ছিল। এই তথ্য থেকে মনে করা যেতেই পারে, নিখুঁতি সৃষ্টিতে পশুপতি ইন্দ্র বা তাঁর মেয়ের কোনও ভূমিকা ছিল না। শান্তিপুরে নিখুঁতি আগে থেকেই তৈরি হত।
মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল সম্পাদিত ‘নদিয়া চর্চা’ বইয়ে ‘নদিয়ার মিষ্টান্ন’ শীর্ষক একটি লেখা রয়েছে। লেখক পূর্ণেন্দুনাথ নাথ। তিনি শান্তিপুরের নিখুঁতির উল্লেখ করেছেন। জানাচ্ছেন, খুঁতহীন মিষ্টি। তাই এমন নাম। তাঁর দেওয়া প্রস্তুত প্রণালী হল, জলবিহীন ছানাকে ভাল করে টিপে টিপে তৈরি করার পর তাতে মেশানো হয় অল্প ময়দা, চিনি আর চালের গুঁড়ো। প্রতিটি নিখুঁতির মধ্যে বড় এলাচের দানা থাকে। নিখুঁতি প্রায় দু’ইঞ্চি লম্বা করে ভাজা হয়। তার পর রসে ডোবানো হয়। খদ্দেরকে দেওয়ার সময়ে অল্প গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে বিক্রি করা হয়। পূর্ণেন্দুনাথ জানিয়েছেন, আগে নিখুঁতি কাপড়ের গায়ে ফুটো করে ছানার মিশ্রণটিকে তেলে ছাড়া হত। কাপড়ের ফুটোর মধ্যে দিয়ে কড়াইয়ের তেলে পড়ার সময়ে নিখুঁতির গায়ে সুন্দর দাগ হত। খেতেও ভাল লাগত।

প্রণব রায় ‘বাংলার খাবার’ বইয়ে নিখুঁতির কথা আছে। দু’টি বাক্যে। লেখা ‘নদীয়া জেলার শান্তিপুরের নিখুঁতি বিখ্যাত। এটি লম্বা পান্তুয়া বিশেষ’। কুমুদনাথে বানান নিখুতি, প্রণব রায়ে নিখুঁতি। অবশ্য নিখুতির চন্দ্রবিন্দু বিলোপ ছাপাখানার ভূতের কারসাজিতেও হতে পারে।
তা হলে নিখুঁতির সঙ্গে পশুপতি ইন্দ্র ও তাঁর মেয়ের যোগ হল কী ভাবে? ময়রার খেয়ালে অনেক মিষ্টি তৈরি হয়েছে। শান্তিপুরের নিখুঁতিতে এই খেয়ালের ব্যাপারটা থাকতে পারে। মিষ্টিমহলে নির্দিষ্ট কোনও মিষ্টি রকমারি হয় না। গড়নে সামঞ্জস্য থাকে। রসগোল্লা, দানাদার গুঁজিয়া পর্যন্ত। কিন্তু শান্তিপুরের নিখুঁতি যেন এই কুলে ব্যতিক্রম। এগুলোর পরস্পরের সঙ্গে মিল নেই। কোনওটা এবড়োখেবড়ো, কোনওটা মসৃণ। আকারেও ছোট বড় রয়েছে। যেন আপন মনে কেউ ছানার মিশ্রণ যেমন খুশি করে তেলে ছেড়েছেন। কিন্তু সেই খেয়ালখুশি পশুপতি ইন্দ্রের ছিল কি? ইতিহাসের নথি তা বলছে না।
তা হলে? ফেরার সময়ে কাশ্যপ পাড়া মোড়ে দেখা হল সেই পথপ্রদর্শক ভদ্রলোকের সঙ্গে। একটা টোটোতে বসে আছেন। টোটোয় খদ্দের এসেছিল দেখেই তখন ছুটে পালিয়ে এসেছিলেন। ভাবলাম, তাঁকে নিয়েই স্টেশনে যাই। যেতে যেতে গল্পটা জেনে নেওয়া যাবে। কিন্তু ওঁর টোটো সেই দিকের নয়। তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গল্পটা শুনতে চাইলেন।
পথপ্রদর্শক শুরু করলেন, পশুপতি ইন্দ্রের এক মেয়ে ছিল। তার নাম…।
ছবি- লেখক
(সমাপ্ত)




