বরবিল জনশতাব্দী ট্রেন থেকে তোলা।
পাহাড়িয়া বাঁশি বিশেষ ভ্রমণ

চললাম তবে চাইবাসা— অনন্ত যাত্রা পর্ব

দীপক দাস

ট্রেনের টিকিটে ‘হ্যাপি জার্নি’ লেখা থাকে। হিন্দিতে যতই ‘শুভ যাত্রা’ লেখা থাক না কেন হ্যাপি মানে বাংলায় খুশি, আনন্দময়। এ বার লেখাটা বদলের সময় এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের ক্ষেত্রে বদলটা জরুরি। লেখা উচিত, ‘আনন্দময় অনন্ত যাত্রা’। ট্রেনের হ্যাপি জার্নির ঠেলায় তো বন্ধু বিচ্ছেদ হওয়ার জোগাড়!

বারকয়েক চকিত সাক্ষাতের ক্ষণিকের আলোচনা, দু’দিনের ম্যারাথন বৈঠকের পরে এ বারের পুজোয় গন্তব্য ঠিক হয়েছিল। এত টানাপড়েনের কারণ, তিন জনের পথ তিন দিকে গিয়েছিল বেঁকে। বাবলা মানে ছোটা ডন যেতে চায় ওড়িশা। ইন্দ্রর শখ গিরিডি। দীপু অন্য কোথাও খুঁজছিল। আগেরবার আমরা মধুপুর-শিমুলতলা গিয়েছিলাম। একই রাস্তা পরপর দু’বছর যেতে নারাজ সে। যদিও ঝাঁঝার নাম কয়েকবার করেছিল। আমি কোনও মন্তব্য করিনি। ইন্দ্র আগেই অভিযোগ করে রেখেছে, আমি নাকি দাদাগিরি করি। তাই বৈঠকের শুরুতে রেখাচিত্র এঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, আলোচনায় তিন জনের পথ যেখানে এসে মিলবে আমি সে দিকেই যাব।

শরতের শোভা।

যদিও অসাধারণ ঠান্ডা মাথার রাজনীতিক দীপু বন্দুক আমার ঘাড়েই রেখেছিল। গত বছর চাইবাসার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তা বাতিল হয়ে মধুপুর-শিমুলতলা হয়েছিল। দীপু সেই সূত্র তুলে ধরে প্রস্তাব দিল, চলো চাইবাসা। আমরা যে সময়ে বেরোব যে দিন ফিরব সেই অনুযায়ী ট্রেনও মিলছে। ইন্দ্র মুখে না বললেও মনে মনে খারিজ হওয়ার রাগে ফুঁসছিল। বারকয়েক চক্রান্ত শব্দটা তুলেছিল। শব্দটার খুব প্রাধান্য আমাদের রাজ্যে। সেই অনুপ্রেরণায় নাকি কে জানে! পরদিন আমি অফিস চলে গেলাম। দীপু ইন্দ্রর বাড়ি গিয়ে কম্পিউটারে টিকিট কাটার ব্যবস্থা করেছিল। টিকিট কাটার সময়ে ইন্দ্রকে নজরদারিতে রাখতে হয়। না হলে দিনের গোলমাল করে। নজরদারিতে রেখেছিল বটে, কিন্তু চরম একটা ভুলও করে বসেছিল দীপু। সেটা টের পাওয়া গেল হাওড়া স্টেশনে পা দিয়ে।

আমাদের সঙ্গে ছুটে চলেছে রেললাইন, মাঠঘাট, পাহাড়।

সকাল ৬.২০তে ট্রেন। আমাদের ভোর ৩টের সময়ে উঠে আসতে হয়েছে। কিলোমিটার দুয়েক হেঁটে। তার পর বাস। হাওড়া স্টেশনে ঢুকতে প্রথম বৈদ্যুতিন সময়সারণি দেখেই দীপু বলে উঠল, ‘‘জনশতাব্দী রিশিডিউল করেছে ৮.৪৫।’’ শুনেই রক্ত চলকে উঠল মাথায়। রাতের অফিস সেরে তাড়াতাড়িই ঘুমোতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে চলতে চলতে আমার শরীরের জৈবিক ঘড়ি প্যাঁচার মতো হয়ে গিয়েছে। দিনের বেলা ঝিমিয়েই থাকি। বাসে ঘুম ট্রেনে ঘুম। আর রাত যত বাড়ে প্যাঁচার মতো চোখ বড় বড় হয়। তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েও লাভ কিছু হয়নি। তার উপরে ৩টের সময়ে উঠে পড়া। তাড়াতাড়ি ট্রেনে উঠে একটু ঘুম দেব ভাবছিলাম। এখন কতক্ষণ বসে থাকতে হবে প্ল্যাটফর্মের স্টিলের চেয়ারে!

বিলম্বিত ট্রেন যাত্রায় শান্তি দিয়েছিল এমন প্রকৃতি।

কিন্তু রেলের তো মেসেজ দেওয়ার কথা! তা হলে তো একটু দেরি করে বেরনো যেত। দীপুকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘মেসেজ দেয়নি?’’ দেখি ইন্দ্র ফোন বার করে মেসেজ ঘাঁটছে। তার পর বলল, ‘‘দিয়েছে আড়াইটের সময়ে।’’ মানে ও মেসেজ দেখেনি। বেরনোর জন্য সকলকে ফোনাফুনি করেছে, ওকে ফোন করা হয়েছে কিন্তু মেসেজ দেখেনি। আমার রাগ গিয়ে পড়ল দীপুর উপরে। কেন নিজের ফোন নম্বরটা দেয়নি? বছর দুয়েক আগের টাটকা অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও। সে বছর তুলিন যাওয়ার কথা পুজো স্পেশালে। রাত ১টায় ট্রেন। ৯টার সময়ে ফোন করে সকলে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল, ট্রেন নাকি এক ঘণ্টা এগিয়ে দিয়েছে। তখন অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। ওর থেকে মেসেজটা চেয়ে দেখা হয়নি। বাবলাও ব্যবসার কাজ গুছিয়ে রাখতে হুটোপাটি করছিল। হাজার টাকা গচ্চা দিয়ে সাঁতরাগাছি আসতে হয়েছিল।

এমন কাণ্ডের পরে ফের টিকিট কাটতে ইন্দ্রর নম্বর দেওয়া হয়েছে? দীপু তা হলে কী নজরদারি রাখছিল? দীপুর সাফাই, ইন্দ্রর অ্যাকাউন্ট থেকে টিকিট কাটা হয়েছে। তাই ওর নম্বর গিয়েছে। ইন্দ্রকে বললাম, আর কত রকম ভাবে গুবলেট করতে পারিস তুই? এক বছর বেশি দেখবি, এক বছর মেসেজ দেখবিই না?’’ ও একটা কথাই বলে গেল, ‘‘অত ভোরে কে মেসেজ দেখে!’’ আশ্চর্য কথা! ওর এমনিতেই ঘুরতে বেরোলে হাজারটা ব্যারাম। সকালে মেসেজ দেখায় কী ব্যারাম কে জানে!

রেলের দরজা থেকে দেখা দুনিয়া।

সেদিন সপ্তমী। প্ল্যাটফর্মের স্টিলের বেঞ্চে বসে ঠাকুর দেখা ফেরত, ট্রেন ধরার চলমান, ঝিমন্ত, ঘুমন্ত জনতা আর পায়ের কাছে জাঁদরেল আকারের ইঁদুর দেখতে দেখতেও সময় কাটছিল না। ইন্দ্র দু’চারবার পাক খেয়ে এল। কখনও চা, কখনও বিস্কুট, সকালের টানও। ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ কানে এল বাঁশির আওয়াজ। কেউ মহাফূর্তিতে ফুররর করে বাজিয়ে চলেছে। আরপিএফ। স্টেশন চত্বরে ইতিউতি ঘুমিয়ে থাকা লোকজনকে তুলছেন দু’জন কনস্টেবল। বাবলাকে বললাম, ‘‘বলটা বার কর। খেলতে ডাকছে মনে হয়।’’ যে ভাবে বাঁশি বাজিয়ে চলেছিলেন আরপিএফ দু’জন বাড়িতে হলে মারামারি হয়ে যেত। কাঁচা ঘুম থেকে তোলারও নির্দিষ্ট সহবত আছে। কিন্তু এঁদের তো মনে হচ্ছে, বাঁশি বাজানোতেই আনন্দ। একজনের ঘুম বোধহয় বেশি গাঢ় ছিল। তাঁর কাছে গিয়ে টানা ফুররর…। যেন ‘ধন্যি মেয়ে’ সিনেমার রেফারিরূপী রবি ঘোষ।

অবশেষে ট্রেনের ঘোষণা ধীরে ধীরে ঝিমন্ত শরীরটাকে নিয়ে ট্রেনের কামরায় তুললাম। আধঘণ্টার মধ্যে ছাড়বে। আমাদের সেই রকমই আশা ছিল। ইন্দ্র ট্রেনে ওঠার আগে বলছিল, এই হল ভারতীয় রেল। গাড়ি সাফাই না করেই আবার চলবে। রেলের লোকজন আশপাশে ছিল কিনা কে জানে! দেখলাম বিস্তর সাফসাফাই চলছে। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। কিছু লোক দেখলাম, সময় কাটাতে পাশের প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেনে ইঞ্জিন জোড়া দেখছে। এদিকে কামরায় বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন আমাদের মতো সব যাত্রী। ট্রেন ছাড়ল ১০টা নাগাদ। এত খুশি হল দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে শুরু করেছিলাম। আমাদের দলের সকলে তাল মেলাল। দু’টো বাচ্চা ছেলে পরিবারের সঙ্গে পুজোর ছুটিতে ঘুরতে যাচ্ছিল। তারাও আমাদের দেখে হাততালি দিয়ে উঠল। কতটা বিরক্ত ছিল ওরা!

ছুটে চলেছে কোনও নাম না জানা গন্তব্যে।

এর পর দীর্ঘক্ষণের গল্প সাদামাটা। খানিকক্ষণ ঝিমোলাম। কিছুক্ষণ পরস্পরের পা টানাটানি। তার পর খাওয়াদাওয়া। ট্রেনের আলু সর্বস্ব আহার। স্যান্ডউইচে আলু চটকানো। বার্গারের ভিতর আলু। আলুর কাটলেট। স্বাদ বদলের জন্য চার জনে চাররকম নিয়েছিলাম। ইন্দ্র বোধহয় বিরিয়ানির তাল করছিল। কিন্তু আন্ডা না আলু বুঝে উঠতে না পেরে চুপ করে গিয়েছিল।

জনশতাব্দী তার সুনামকে চ্যালেঞ্জ করতে করতেই এগোচ্ছিল। বিরক্তির একশেষ। যেখানে সেখানে দাঁড় করাচ্ছে। আর ঝড়াং ঝড়াং করে মালগাড়ি পালিয়ে যাচ্ছে। ইন্দ্র আর দীপু রেলকে যুক্ত করে একটা টুইটও (এখন এক্স) করেছে। তাতে নাকি দক্ষিণ-পূর্ব রেলের কিছু যায় আসে না। অমন রোজ টুইট হয়। আর বসে থাকা যাচ্ছিল না। উঠে দরজার কাছে এলাম। দীপু আর বাবলা আগেই ছিল। ওদিকে সময় দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে চলেছে। ট্রেন শেষ পর্যন্ত পৌঁছবে কিনা সন্দেহ হল। মাঝে এক টিটিই-র সঙ্গে খানি কথা হয়েছিল। আমাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে টিটিই বলেছিলেন, ‘‘গরমের জন্য?’’ আমরা ভোর ৩টেয় উঠে এসেছি শুনে বললেন, তিনি সারা রাত ঘুমোননি। ট্রেনের সঙ্গে এসেছেন। এখন টাটানগরে পৌঁছলে ছুটি মিলবে।

প্রকৃতির মাঝে গড়ে ওঠা গ্রাম।

ভাগ্যিস দরজার কাছে গিয়েছিলাম। ট্রেনের বাইরে কী অসাধারণ প্রকৃতি। দূরে পাহাড়ের সারি। শরতের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আর নীল আকাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সঙ্গে দৌড়ে চলেছে। রেললাইনের কাছে ধানজমি। কোথাও এক টুকরো জলাশয়। তাতে আকাশ আর মেঘের ভালবাসা ভাসছে। হঠাৎ চোখে পড়ে গেল এক জলস্রোত। ঝোপজঙ্গলের মাঝে পাথরের খণ্ডের উপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলেছে। দূরে আরেকটা রেললাইন। সেখানে মাঠের মাঝে একটা মালট্রেন আটকে সিগন্যালের অপেক্ষা করছে। এ সবই নাম না জানা জায়গা। টুকরো টুকরো প্রকৃতি প্রতিনিধি হয়ে সেই জায়গাগুলো আমাদের মনে গেঁথে যাচ্ছিল।

একসময়ে ট্রেন গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকল সিনি জংশন। নামটা চেনা মনে হচ্ছিল। কোথায় যেন পড়েছি! মনে পড়েনি তখন। লেখার সময়ে ইন্টারনেট ঘেঁটে বেরলো, সত্যজিৎ রায়ের ‘রতনবাবু আর সেই লোকটা’।  রতনবাবুর উদ্ভট নাম না-জানা জায়গায় ঘোরার শখ ছিল। তিনি একা এসে পড়েছিলেন সিনি জংশনে।

সিনি জংশন। মহালিমারূপ স্টেশনের ছবি তোলা হয়নি।

সিনি জংশনের পরে মহালিমারূপ স্টেশন। আবার মনে পড়ার চমক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ নাকি! সেই যে গাছপাগল যুগলপ্রসাদকে সত্যচরণ একদিন প্রস্তাব দিলেন, মহালিখারূপ পাহাড়ে নতুন গাছপালার সন্ধানের! খুশি হয়ে যুগলপ্রসাদ জানাল, চীহড় নামে এক লতানে গাছ আছে পাহাড়ের জঙ্গলে। যা অন্য কোথাও নেই। ম্যানেজার সত্যচরণের অফিসের জানলা থেকে ন’মাইল দূরের মহালিখারূপ পাহাড় ধোঁয়া ধোঁয়া দেখা যেত। যুগলপ্রসাদকে নিয়ে সত্যচরণ গিয়েছিলেন সেই পাহাড়ে। খুঁজে পেয়েছিলেন চীহড় গাছ। স্থলপদ্মের মতো পাতা। ফলগুলো শিমের মতো। শক্ত খোলার ভিতরে গোল বীজ। লতাপাতা জ্বালিয়ে সেই বীজ খেয়েছিলেন সত্যচরণেরা। গোল আলুর মতো স্বাদ।

মাঝে মাঝে সামনে চলে আসা এমন দৃশ্য ভুলিয়ে দিচ্ছিল ধিকিয়ে চলা ট্রেন সফরের কষ্ট।

আমাদের সামনে এই স্টেশনের সঙ্গে কি ‘আরণ্যক’ মহালিখারূপের মিল আছে? কিন্তু ‘আরণ্যক’ এর পটভূমি তো ভাগলপুর। লবটুলিয়া বইহার। এই মহালিমারূপ তো সরাইকেলা খরসাওয়ান জেলায়! ভাগলপুর থেকে সরাইকেলার দূরত্ব ১০ ঘণ্টার বেশি। রেল সংক্রান্ত বিভিন্ন সাইটে ইংরেজিতে স্টেশনের নামটা মহালি মারূপ লেখা। আলাদাই। তবে ‘আরণ্যক’এর না হলেও সিনি আর মহালিমারূপের চারপাশটা বেশ সুন্দর। নেমে যেতে ইচ্ছে করছিল।

ইন্দ্রর যদিও আরও চলার ইচ্ছা। ও একবার বায়না ধরেছিল, ‘‘চলো, বরবিল চলে যাই।’’ ওকে বোঝানো হল, চাইবাসা পৌঁছতেই তো দম বেরিয়ে যাচ্ছে। তার পরেও তোর ট্রেনে চড়ার শখ। তবে খানিক পরেই জানা গেল, ট্রেন নিজেও বরবিল যাবে না। বড়াজামদায় যাত্রা শেষ করবে। মাঝে মাঝেই নাকি এই স্টেশনে দম ছেড়ে দিচ্ছে জনশতাব্দী।

আদিম প্রকৃতি আর যন্ত্র সভ্যতার একত্র অবস্থান।

অবশেষে চাইবাসা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের চাইবাসা। স্টেশন দেখে তেমন মন ভরল না। মালগাড়ির ছড়াছড়ি। কেমন যেন বদ্ধ। হয়তো বাইরের দিকটা ভাল। আপাতত একটা আস্তানা খোঁজা যাক। স্টেশনের বাইরের একটা টোটোয় চেপে বসা হল। বুঝিয়ে দেওয়া হল, মোটামুটি ধরনের হোটেলে নিয়ে যেতে। তখন ৪টের বেশি বাজে। (চলবে)

ছবি— দীপশেখর দাস, বিভাস বাগ

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *