ক্ষীরমোহন
খাদ্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

চ্যাপ্টা রসগোল্লার রহস্য সন্ধানে

দীপক দাস

সমস্যাটা জিভের নয়। জ্যামিতির। তার মানে অঙ্কের। আর সেখানেই ভয়। আমি তো অঙ্কে বারো। ইন্দ্র হয়তো কুড়ি-বাইশ আরেকটু বেশি পঁচিশ। মানে কাঁচাই। ঘাসপুসের মানে বটানির ডক্টর হয়েও দীপু অঙ্কে ভাল। কিন্তু তাকে পাওয়া মুশকিল। সায়েন্স কলেজে কী পরীক্ষায় ব্যস্ত। কালীঘাট মেট্রো স্টেশনে নেমে স্কাইওয়াকে ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে ফোন করল ইন্দ্র। ডক্টর ঘাসপুস জানিয়ে দিল, ‘‘তোমরা চলে যাও। আমি পরে যোগ দিচ্ছি।’’ তার মানে আসা নিয়ে বেশ সংশয়।

আমরা চলেছি এক মিষ্টির নামকরণের সার্থকতার খোঁজে। সমাজমাধ্যম কাঁপাচ্ছে ‘চ্যাপ্টা রসগোল্লা’ নামে মিষ্টিটা। আচ্ছা, যা চ্যাপ্টা তা গোল্লা হয় কী করে! নতুন ধরনের নামকরণ দেখে অনেকে মিষ্টির ছবি, লেখার লিঙ্ক পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের কাছেও এই প্রশ্নই রেখেছিলাম, ‘‘চ্যাপ্টা হলে গোল্লা হয় কী করে?’’ উত্তর মেলেনি। তবে দু’একটা নামকরণ মিলেছে। যেমন একপর্ণিকা প্রকাশনীর রাজীবকুমার সাহা নাম দিলেন ‘রসলুচি’। তবুও কিছুটা মেনে নেওয়া যায়। রসের সঙ্গে লুচির সম্পর্ক রয়েছে। আগে ক্ষীরের লুচির প্রচলন ছিল। ক্যালোরি-আতঙ্কের এই যুগে স্বাভাবিক ভাবেই ভারী খাবারটি লুপ্ত হয়েছে। তবে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়ায় চাঁদশাহি খাজা নামে যে মিষ্টিটি মেলে তা প্রথম দর্শনে লুচি বলেই মনে হবে।

দোকানে হারান মাজি (ডান দিকে) এবং তাঁর ভাইপোর ছবি।

কালীঘাট মন্দিরের কাছে হারান মাজির দোকানে মেলে ‘চ্যাপ্টা রসগোল্লা’। সেই অভিযানেই বেরনো। বর্ষাকাল। বাড়ি থেকে বেরনোর সময়ে আকাশ পরিষ্কারই ছিল। কিন্তু কালীঘাট মেট্রো স্টেশনের পাতাল থেকে উঠেই ইন্দ্র আঁতকে উঠল। ঠিক মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ির মুখ থেকে রাস্তা পর্যন্ত হাত ১০-১২ জায়গা জল থইথই। অন্য দিকের গলিঘুঁজিও জলবন্দি। যে দিকেই যাও না কেন, জল পার করতেই হবে। খানদুয়েক রিকশা সিঁড়ির কাছে চলে এসেছে। যাঁরা জলে পা দিতে অনিচ্ছুক তাঁদের পার করে দেবেন। ভেবেছিলাম ইন্দ্রও হয়তো রিকশায় চেপে বসবে। ও গরমে গলে যায়। বৃষ্টি গায়ে পড়লে মিইয়ে। এই সব সময়ে আমাদের ঘোরাঘুরি স্থগিত থাকে। এই নোংরা জল গায়ে লাগলে হয়তো ইন্দ্র অজ্ঞান হয়ে যাবে। আমার ধারণা ভুল করে বুটটুট খুলে হাতে নিয়ে প্যান্ট গুটিয়ে জলে নেমে পড়ল। ছেলের শক্ত হয়েছে দেখি!

স্কাইওয়াক পার করে মন্দিরের দিকে নামলাম। ঠিকানাটা আগেই জোগাড় করে নিয়েছিলাম বাপ্পাদিত্য বালির থেকে। ও ইন্দ্রর বন্ধু। বাপ্পাদিত্যের দাদু হারান মাজির দোকানে কাজ করতেন। ঠিকানা ছিল ২ দেবনারায়ণ ব্যানার্জি লেন। প্রথমে একটু ভুল দিকে চলে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে এক সদয়ের সাহায্য মিলল। তিনি সঙ্গে নিয়ে দেখিয়ে দিলেন গলিটা।

দোকান সামলাচ্ছেন লক্ষ্মণবাবু। সর্বত্র পুরনো দিনের ছাপ।

পুরনো ছাঁদের দোকান হারান মাজির। দেখেই দু’টো দোকানের কথা মনে পড়ে গেল। একটা শ্রীরামপুরে গুটকে সন্দেশের আদি দোকান মহেন্দ্র দত্ত। দ্বিতীয়টা বাগনানের বামাচরণ। পাটায় বসে দোকানদারি। নিচু কাচের শোকেসে মিষ্টি রাখা। ধীরে ধীরে জানতে পারব, এই দোকানের অনেক কিছু অবিকৃত। তার কারণও রয়েছে। দোকানে ছিলেন লক্ষ্মণ নায়েক। বছর ৫৭ বয়স। হাওড়ার শ্যামপুরে বাড়ি। ইন্দ্র বাপ্পাদিত্যের দাদু আর বাবার নাম বলল। লক্ষ্মণবাবু চিনতে পারলেন না। জানালেন, তিনি ১২ বছর হল এই দোকানে কাজ করছেন। আমরা যাঁদের নাম বলছি তাঁরা অনেক আগের।

সুপারিশ কাজে না লাগলেও অসুবিধা হয়নি। আমরা মালিক পক্ষের কাউকে খুঁজছিলাম। লক্ষ্মণবাবু জানালেন, মালিকেরা আছেন। কিন্তু তাঁরা আর খোঁজখবরওয়ালাদের সঙ্গে কথা বলতে চান না। প্রথম প্রথম কয়েক জনকে বলেছেন। বুঝলাম, সাক্ষাৎকার দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন। লক্ষ্মণবাবু অবশ্য আশ্বাস দিলেন, তাতে অসুবিধা কিছু হবে না। তাঁর আশ্বাসে শুরু যাক শুরুর গল্প।

আমাদের সাহায্য করা আশিসবাবু।

শুরুতেই চমক। হারান মাজি হাওড়ার লোক। আমরাও হাওড়ার। বিখ্যাত কারও সঙ্গে জেলাতুতো সম্পর্ক জেনে বেশ গর্ব হচ্ছিল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি দেউলটির কাছে রয়েছে মেল্লক গ্রাম। এ গ্রাম প্রাচীন এক মন্দিরের কারণেও বিখ্যাত। মেল্লক থেকে শ’দেড়েক বছর আগে কালীঘাটে এসে মিষ্টির দোকান খুলেছিলেন হারান মাজি। তাঁরা ছিলেন তিন ভাই। তিন জনেই দোকানে থাকতেন। হারান মাজি বিয়ে করেননি। তাঁর ভাইপোর বংশধরেরাই দোকানের পরম্পরা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। দোকানে হারান মাজি ও তাঁর ভাইপোর ছবি রয়েছে। এখন চলছে চতুর্থ প্রজন্ম। দোকান চালান বুবাই ও হারাধন মাজি। শিকড় ছিন্ন করেননি মালিকেরা। এখনও মেল্লক যান। আরেকটি বিষয়, এই দোকানের কর্মীরা সকলেই হাওড়ার। লক্ষ্মণবাবুর যেমন শ্যামপুরে বাড়ি।

চ্যাপ্টা রসগোল্লা হারান মাজির দোকানে প্রথম থেকেই তৈরি হয়। তবে দোকানের বা স্থানীয়েরা কেউ চ্যাপ্টা রসগোল্লা বলেন না। আমরা দোকানে ঢোকার সময়ে এক বৃদ্ধাকে মিষ্টি খেতে দেখেছিলাম। নাম গৌরী সাউ। বছর ষাটেকের স্থানীয় বৃদ্ধা জানালেন, তাঁরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছেন, এটা ক্ষীরমোহন। কে ক্ষীরমোহন তৈরি করেছিলেন, মালিক নিজে নাকি কোনও কারিগর, সেটা জানা যায় না। লক্ষ্মণবাবু ক্ষীরমোহন তৈরির পদ্ধতি বললেন। মণ্ডটা রসগোল্লার মতোই ছানার। তবে তা হাতের বিশেষ কায়দায় চ্যাপ্টা করে নিতে হয়। চ্যাপ্টা করার কায়দাটা সকলে পারেন না। পাকা হাতের কারিগর লাগে। একটু এদিক ওদিক হলেও ফেটে যেতে পারে ছানার চাকতি। এই চাকতিগুলো ফোটানোতেও সতর্ক থাকতে হয়। ফোটানো হয় হালকা চিনির রসে। কিন্তু নাড়াচাড়া করা হয় সাবধানে। না হলে শক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। রসে ছাড়ার আগে ছানার চাকতিগুলো খুবই পাতলা হয়। এই পাতলা করাটাই কারিগরের কায়দা। ফোটানোর সময়ে রস ও উত্তাপে চাকতি কিছুটা ফোলে।

আরেক সাহায্যকারী রামকৃষ্ণবাবু।

কেউ কেউ ক্ষীরমোহনকে বাতাসাভোগ বলেন। এর একটা কারণ, বাতাসার মতো চাকতি আকার। ভোগ শব্দটা সম্ভবত কালীঘাটের মন্দিরের সুবাদে। হারান মাজির দোকান থেকে কিছু মিষ্টি কালীঘাটের মন্দিরে কালীর ভোগে যায়। আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন স্থানীয় দু’জন মিষ্টি কিনতে এসেছিলেন। একজন আশিস দাস। তাঁদের আদিবাড়ি হুগলি জেলায়। কালীঘাটের ১৭৫ বছরের বাসিন্দা। তিনি জানালেন, ১৯০১ সালে বিয়ের পর তাঁর ঠাকুমা কালীঘাটে আসেন। তখন থেকেই তিনি হারান মাজির ক্ষীরমোহন দেখেছেন। অন্যজন অশীতিপর রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী। দু’জনেই জানালেন, মন্দিরে ভোরে মঙ্গল আরতির সময় দেবীকে ক্ষীরমোহন ভোগ দেওয়া হয়। আর রাতে দেবীকে রাজবেশে শয়ানের সময়েও দেওয়া হয় ক্ষীরমোহন। তা যেত হারান মাজির দোকান থেকেই। এখনও যায়। তবে সেবায়েতদের ভাগাভাগিতে তা নিয়মিত নয়। সেবায়েতরা যে যাঁর পছন্দের দোকান থেকে ক্ষীরমোহন ও অন্য মিষ্টি নেন। এখন অন্য দোকানেও ক্ষীরমোহন হয়।

তা হলেও মন্দিরের সঙ্গে হারান মাজির সম্পর্ক এখনও রয়েছে। এই দোকানে আস্থা রাখা সেবায়েতের যখন পালা আসে তখন ক্ষীরমোহন যায়। লক্ষ্মণবাবু বলছিলেন, সেই সেবায়েতদের পালার সময়ে দোকান থেকে আরও কিছু মিষ্টি যায়। গুলি সন্দেশ যায় চারটি। গুলি সন্দেশ অনেকটা পরিচিত চিনির সন্দেশের মতো। এই দোকানে ছানা দিয়ে তৈরি গুলি সন্দেশে চিনির ভাগ বেশি থাকে। মন্দিরে যায় কড়া ও নরম পাকের সন্দেশ। একটা বড় তালশাঁস যায়। যায় দু’টি ২০ টাকা দামের রসগোল্লা। সব আলাদা আলাদা ভাঁড়ে যায়। আর যায় দই। রামকৃষ্ণবাবু জানালেন, মন্দিরের সেবায়েতরা নিজেদের খাওয়ার জন্য এখনও প্রতিদিন এই দোকান থেকেই দই নেন।

হারান মাজির সেই চ্যাপ্টা রসগোল্লা বা ক্ষীরমোহন।

দোকানের সারা শরীরে প্রাচীনত্বের ছাপ স্পষ্ট। আশিসবাবু একটা চ্যাটালো বড়সড় হাঁড়ি দেখিয়ে বলছিলেন, সেটির বয়স ১০০ বছর হতে পারে। তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে ওই হাঁড়ি দেখছেন। আগে ওতে চন্দ্রপুলি রাখা হত। এখন মিষ্টির ভাঁড় মোড়ার কাগজ থাকে। দোকানদারিরও নিয়ম রয়েছে। দোকানদারকে বসে বিক্রি করতে হয়। তখন পরতে হয় ধুতি আর গেঞ্জি। লক্ষ্মণবাবু তা-ই পরেছিলেন। রামকৃষ্ণবাবু বলছিলেন, উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবার কালীঘাটে এলে এখনও এই দোকান থেকে মিষ্টি নেন।

দোকানে কোনও পরিবর্তন না আসার একটা কারণ আছে। বলছিলেন লক্ষ্মণবাবু। সে কারণ দৈবী। আমরা মিষ্টিমহলে ঘোরাঘুরির সূত্রে এ রকম কাহিনি শুনেছি। লক্ষ্মণবাবুর কথায়, কালীঘাট মন্দিরের কালী নাকি একবার বালিকার ছদ্মবেশে মিষ্টি খেয়ে গিয়েছিলেন। দোকানদার বুঝতে পারেননি। রাতে মালিক স্বপ্নাদেশ পান। দেবী জানান, দোকানের মিষ্টি তাঁর ভাল লেগেছে। দোকানের কোনও পরিবর্তন যেন না করা হয়। তাই আর কোনও ছাঁদ বদলায়নি। এই দোকানে কোনও ফ্রিজ নেই।

আমরা কথা বলার সময়েই দীপু এসে হাজির হয়েছিল। সকলে মিষ্টি চাখলাম। তিন ধরনের মিষ্টি, ক্ষীরমোহন, তোতাপুলি আর কড়াপাকের রসগোল্লা। এই দোকানের তিনটি মিষ্টি খুব পুরনো— গুলি সন্দেশ, ক্ষীরমোহন আর তোতাপুলি। কথা বলা ও খাওয়ার সময়ে বহুজন দোকানে এসেছেন। অনেকে নানা ধরনের মিষ্টি কিনলেন। চ্যাপ্টা রসগোল্লার খোঁজও ছিল যথেষ্ট। এই যে একটা মিষ্টির এত খোঁজ তাতে কি অন্য মিষ্টির বিক্রিতে ভাটা পড়ছে? লক্ষ্মণবাবু জানালেন, উল্টো ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের দোকান মূলত ছিল স্থানীয় খদ্দের নির্ভর। এখন দূরদূরান্ত থেকে খদ্দের আসছেন। তাঁরা চ্যাপ্টা রসগোল্লার সঙ্গে অন্য মিষ্টিও নিচ্ছেন। আগে ক্ষীরমোহন হত দিনে ২০০টি। এখন ৪০০-৫০০টি হয়।

সেই প্রাচীন হাঁড়ি। বিড়ের উপরে যত্ন করে রাখা।

কিন্তু ক্ষীরমোহন হঠাৎ সারা রাজ্যে চ্যাপ্টা রসগোল্লা নামে পরিচিত হয়ে গেল কী করে? লক্ষ্মণবাবু জানালেন, বছরখানেক ধরে এই পরিবর্তন এসেছে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাদাগিরি’ অনুষ্ঠানে হারান মাজির দোকানের ক্ষীরমোহনকে চ্যাপ্টা রসগোল্লা বলা হয়েছিল। তার পর থেকে সমাজমাধ্যমের জনতা ক্ষেপে উঠে, ক্ষীরমোহনের নাম বদলে দিয়েছে।

প্রশ্ন হল, চ্যাপ্টাকে গোল্লা বলা যায় কিনা? জ্যামিতির হিসেবে বলা যায় না। তবে ক্ষীরমোহনের সঙ্গে উপকরণ ও প্রকরণে রসগোল্লার মিল রয়েছে। হারান মাজির দোকানের ক্ষীরমোহনে সে মিল দেখা যায়। বিজনবিহারী ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাঙালির মিষ্টান্ন: সংস্কৃতির একদিক’ নিবন্ধে বলছেন, ক্ষীরমোহন রসগোল্লা জাতীয় মিষ্টান্ন। তবে একসময়ে ক্ষীরমোহনে ক্ষীরের পুর দেওয়া হত। তবে ক্ষীরের পুরের কোনও সুযোগ নেই হারান মাজির ক্ষীরমোহনে। তা এতই পাতলা যে তাতে পুর দেওয়া সম্ভব নয়। আবার কাটোয়া লোকালে একধরনের ক্ষীরমোহন পাওয়া যায়। তা রসগোল্লাই। রসে ফুটিয়ে গাঢ় ও কড়া করে তাতে ক্ষীরের গুঁড়ো ছড়ানো হয়। এটা শুকনো ধরনের। গোলাকার চমচমে অনেক সময়ে ক্ষীরের গুঁড়ো দেওয়া হয়। হারান মাজির মিষ্টিতে সেটাও নেই।

তা হলে? মিষ্টিমহলের এমন অনেক মিষ্টি রয়েছে যার নামকরণের সঙ্গে অন্যের মিল রয়েছে। তাই নাম যাই হোক, স্বাদোত্তম হলেই গ্রহণযোগ্য।

কভারের ছবি— কতটা পাতলা হয় হারান মাজির ক্ষীরমোহন

ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ ও দীপশেখর দাস

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *