কাঁকড়াঝোর, বেলপাহাড়ি, ঝাড়গ্রাম।
জঙ্গল যাপন বিশেষ ভ্রমণ

ময়ূর…মহুয়া আর বসন্তের বেলপাহাড়ি

অনিতা দাস

ভোর ৫.৪৩ মিনিট। হঠাৎ দরজায় ঠুক ঠুক আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। দাদা ডাকছে। মনে পড়ে গেল, আজ ১০ মার্চ, বুধবার। আমাদের বেলপাহাড়ি যাওয়ার দিন। ৬.৩০ মিনিটে গাড়ি আসার কথা। তাড়াতাড়ি বিছানা ছাড়লাম। দ্রুত তৈরি হতে হবে। বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্যও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে গেল। খাওয়াদাওয়ার বালাই নেই। তৈরি হয়ে শুধু একটুখানি চা খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়া।

গাড়ি অবশ্য একটু দেরিতেই এল। দলে নানা বয়সের সদস্য। কচিকাঁচা, মাঝবয়সি, বৃদ্ধ। ড্রাইভারদাদাকে নিয়ে আমাদের ভ্রমণসঙ্গী মোট আট জন। হইহই করতে করতে সকলে গাড়ি চেপে ঝাড়গ্রাম শহর টপকে এসে পৌঁছলাম বেলপাহাড়ি বাজার। দহিজুড়ি থেকে যত বেলপাহাড়ির দিকে আসছিলাম চারদিকের পরিবেশ দেখে মনে মনে গাইছিলাম, ‘লালপাহাড়ির দেশে যা রাঙামাটির দেশে যা হেথায় তোরে মানাইছে না রে…’। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। ড্রাইভারদাদাকে বলে সুস্মিতা ব্লুটুথে যোগ করে গানটা চালিয়ে দিল। সুস্মিতা আমার এক বোন। ওর বর সাগেন আর ভাইপো সনাতনও এই সফর দলের সদস্য। গান তো চালালাম। কিন্তু আমাদের মাতৃদেবী, মানে আমার শাশুড়িমাতা, ভয় পাচ্ছিল। বেলপাহাড়ি ঘোরা হবে বলেই শাশুড়ি ও ভাসুর হাওড়ার বাড়ি থেকে ঝাড়গ্রামের বাড়িতে এসেছে। শাশুড়িমাতার ভয়, চলন্ত গাড়িতে গান চালালে পুলিশে ধরতে পারে।

ঘাঘরা, ঝাড়গ্রাম।
ঘাঘরায় প্রবাহ আসছে ওই দিক থেকে। দুই খুদে ভ্রমণসঙ্গীকে নিয়ে সুস্মিতা।

এই ভাবেই নানা হাসি মজায় এগোচ্ছিলাম। ৯টা নাগাদ পৌঁছলাম বেলপাহাড়ি বাজার। ইন্দিরা চক জায়গাটার নাম। মনে মনে ভাবছিলাম পেটাই পরোটা খাব। ভগবান তা দিয়েও দিলেন। একটা মিষ্টির দোকানে গিয়ে টিফিন করলাম। আমাদের সবচেয়ে খুদে ভ্রমণসঙ্গী দীপ্ত অবশ্য বলছিল, ‘‘পরোটা পেটা খাব।’’ পেটাই পরোটা আর ঘুগনি সে নিজের হাতেই খেল। সেই দোকানে রসমালাইও ভাল খেতে। খাওয়াদাওয়া সেরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। কিন্তু বড়দা মানে, ভাসুর আর আসে না। আমরা অপেক্ষা করছি। দীপ্ত বলল, জেঠুকে ওরা ধরে রেখেছে।

ঘাঘরা, ঝাড়গ্রাম।
ঘাঘরায় চলছে জোর ফটোসেশন।

আবার গাড়ি ছুটল। আমাদের এবারের গন্তব্য, ঘাঘরা। রাস্তা জুড়ে সে কী দারুণ প্রকৃতি। একটা কথা বলে রাখি। বছর সাতেক হল ঝাড়গ্রাম শহরের বাসিন্দা। কিন্তু বেলপাহাড়ি আসা হয়নি। প্রকৃতি থেকে আফশোস হচ্ছে, এতদিন কেন যে আসিনি!

ঘাঘরাও খুব সুন্দর। চারিদিকে জঙ্গল। আর বড় বড় পাথরের বুক ক্ষয় করে কলকলিয়ে বয়ে চলেছে ছোট সরু জলের স্রোত। সেখানে গিয়ে জানলাম, বর্ষার সময়ে এই প্রবাহ পায় নবযৌবন। দুর্গাপুজো পর্যন্ত প্রবাহ আরও গতিময় থাকে। বড় বড় পাথরগুলোকে এখানে কারা যেন শান দিয়ে রেখেছে। ঘাঘরার টিলা থেকে নামার সময়ে দীপ্ত ধুম করে ধপাস। ব্যথা লেগেছিল। কিন্তু ঘোরার আনন্দে কোনও কান্নাকাটি হয়নি।

খাঁদারানি জলাধার, ঝাড়গ্রাম।
খাঁদারানি মুগ্ধ করেছিল।

তার পর ঘাঘরা থেকে বেরিয়ে পড়া। অন্য আরেকটি নতুন জায়গার দিকে। রাস্তায় দিক নির্দেশক বোর্ড দেখে বড়দা হঠাৎ করে বলে উঠল, ‘‘দাদা, খাঁদারানি চলুন।’’ প্রায় চার-পাঁচ কিমি যাওয়ার পর যা দেখলাম তাতে চোখ শান্ত হয়ে গেল। বিশাল এক জলাধার। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে নেমে গেলাম জলে। আহ! কী ঠান্ডা জল। আর চারদিকে শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। দুই দাদা মাছ ধরছিলেন জলাধারে গাড়ির টিউব ভাসিয়ে। আর কোনও জনমানব নেই। একটা ছোট সেতু পেরিয়ে আমরা ওপারে গেলাম। সেতু থেকে নীচের দিকে তাকাতেই আমার মাথা ঘুরে গেল। আমার খুদে ছেলে হাত ধরে বলল, মা ভয়ের কিছু নেই। তার হাত ধরে ভয়কে জয় করে সেতু থেকে নীচের দিকে তাকালাম। সেতুর নীচে বাঁধের বাঁধানো অংশে ছোট ছোট গর্তে অনেক টিয়ে পাখি। সে বড় সুন্দর দৃশ্য। চারিদিকটা নিরিবিলি পরিবেশ। শুধু পাখির কলতান। খুব ভাল লাগছিল।

খাঁদারানি, ঝাড়গ্রাম।
জলাধারের পাশে ছিল এমনই সুন্দর দৃশ্য।

কিছুটা হেঁটে গিয়ে উঠলাম ছোট্ট একটা টিলায়। তাতেই আমি ক্লান্ত। ওই জায়গাটা জঙ্গল। বড় বড় গাছ। নীচে শুকনো পাতা পড়ে রয়েছে। জলাধারের কাছে কতকগুলো সিমেন্টের বেঞ্চ করা রয়েছে। সনাতন আর দীপ্তর বসার ইচ্ছা হল সেখানে। আমরা টিলার জঙ্গল থেকে নেমে সেখানে কিছু বসলাম। ফেরার সময়ে বাঁধ থেকে জলাধারের জলে ঢিল ছোড়ার প্রতিযোগিতা লেগে গেল। দীপ্তর ঢিল তো জলে পড়ছে না। ও বাচ্চা। এদিকে সুস্মিতার ভাইপো সনাতনের ঢিল জলে গিয়ে পড়ছে। ঢিল জলে না ফেলা পর্যন্ত দীপ্ত বাঁধ থেকে নড়বে না। মুশকিল! একটা কায়দা করা হল। দীপ্ত ঢিল ছুড়ল আর পিছন থেকে বড়দাও ছুড়ল। বড়দার ঢিল জলে পড়ল। দীপ্ত ভাবল ওর ঢিলই জলে পড়েছে। খাঁদারানির টিলা থেকে কয়েকটা সাদা পাথর সংগ্রহ করেছিলাম।

খাঁদারানি জলাধার।
জলাধারের সেতুতে দুই খুদে সফরসঙ্গী।

খাঁদারানি থেকে আমাদের গন্তব্য কাঁকড়াঝোর। যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এ দিকে আমাকে আড়াইটের মধ্যে ঝাড়গ্রাম শহরে ফিরতেই হবে। এত কম সময়ে বেলপাহাড়ির সমস্ত জায়গার রূপদর্শন সম্ভব নয়। কিন্তু নিরুপায়। যাওয়াই ঠিক হল।

যেতে যেতে প্রায় এক কিলোমিটার অন্তর অন্তর দেখি, হাতি পারাপারের রাস্তা। বোর্ডে লেখা রয়েছে। রাস্তার দু’পাশে ঘন জঙ্গল। কুসুম, মহুয়া, পলাশ আর বিভিন্ন বাহারি গাছ। চারিদিকটায় মহুয়া ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা। আঁকাবাঁকা রাস্তা। অনেক চড়াই উৎরাই রয়েছে। কাঁকড়াঝোর যাওয়ার পথে অনেক জায়গায় ‘দুয়ারে রেশন’ দেওয়া হচ্ছে দেখলাম। কোথাও কোনও টোটো দেখলাম না। দু’একটা বাইক মাঝে মাঝে ভোঁ করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। এখানে প্রকৃতিদেবী যেমন নিজের মতো করে নিজেকে সাজিয়েছেন তেমনই মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের জন্য সত্যি এলাকাটি একটা স্বর্গরাজ্য।

খাঁদারানি, ঝাড়গ্রাম।
জলাধারের ওপারের টিলার জঙ্গলে। চলছে জোর আলোচনা।

ময়ূরঝর্না নামে একটা জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে বড়দা বলল, এখানে হয়তো একসময়ে ময়ূর ছিল। এখন বোধহয় নেই। আমাদের গাড়ি চলছে। আর সকলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ করে আমি নীল-সবুজের মিলিত রঙের কিছু একটা দেখতে পেলাম। আর চিৎকার করে উঠলাম, ময়ূর! ময়ূর! গাড়ি থেমে গেল। কিন্তু গাড়ি থেকে নামলে ময়ূর উড়ে যাবে। তাই গাড়িটা আস্তে আস্তে পিছনে গেল। জঙ্গলে ময়ূরটা তখন আপন মনে হাঁটছে। প্রকৃতির রূপটা আরও বহুগুণ বেড়ে গেল। এমন দৃশ্য শুধু টিভিতে দেখেছিলাম। কাঁকড়াঝোর আসা সার্থক হল। তার পর থেকে আমি যে দিকে তাকাচ্ছি যেন শুধু ময়ূরই দেখছি।

কাঁকড়াঝোর, বেলপাহাড়ি।
কাঁকড়াঝোরের পথে ছিল এমন সব মন ভাল করা দৃশ্য।

হাসি মজা করতে করতে পৌঁছলাম কাঁকড়াঝোর। এখানে টেনিদার ‘চারমূর্তি’ সিনেমার শ্যুটিং হয়েছিল। সেই গোপী মাহাতো সেই সিনেমায় একটা ছোট্ট দৃশ্যে ছিলেন। তাঁর মাটির হোম স্টে এখানকার সবচেয়ে পুরনো। সেটা এখনও রয়েছে। রাস্তায় এগোতে দু’টো গাছবাড়ি দেখলাম। কেন রয়েছে? হাতির নজরদারির জন্য?

কাঁকড়াঝোরে পাহাড়ে ওঠার সময়ে জঙ্গলে পেলাম আমলাশোল গ্রাম। সেখানে শ্যুটিং হচ্ছিল। গাড়ি করে পাকা রাস্তায় পাক খেতে খেতে আমরা চলে এলাম একটা পাহাড়ের প্রায় মাথার উপরে। ঘন জঙ্গল। গাড়ি থেকে নামলাম সকলে। রাস্তার উপরে অনেক মহুয়া ফুল পড়ে আছে। হাতে নিয়ে দেখলাম। গন্ধটায় মাদকতা আছে।

কাঁকড়াঝোর, বেলপাহাড়ি, ঝাড়গ্রাম।
ময়ূরের নীলের আভা দেখা যাচ্ছে গাছের আড়ালে। ছবি এইটুকুই তোলা গিয়েছে।

এবার ফেরার পালা। অন্য রাস্তা ধরলাম কাঁকড়াঝোর থেকে। এই রাস্তায় বাস চলাচল করে। এটা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে রাস্তা নয়। এখানে অনেক বসতি রয়েছে। প্রতিটি বাড়ির দেওয়ালে আলপনা আঁকা। বাড়ির সামনে হয় বোগেনভিলিয়া নয়তো জবা ফুলের গাছ। ফুলগুলোর এত উজ্জ্বল রং! ওখানকার পরিবেশের জন্য মনে হয়। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা এর ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

ওদলচুয়া পাহাড়ে মোড়া এক সুন্দর সবুজ গ্রাম। সবুজের মাঝে কুসুমের লাল মাথা অন্যরকম সৌন্দর্য তৈরি করেছে। আর মহুয়া ফুলের মাতাল করা গন্ধ। ওদলচুয়া পেরিয়ে পাঁচ-ছ’কিলোমিটার আসার পর হঠাৎ করে দেখছি, ছোট ছোট গাছে পলাশ ফুল। সুন্দর লাগছিল।

কাঁকড়াঝোর, বেলপাহাড়ি, ঝাড়গ্রাম।
কাঁকড়াঝোরের গাছবাড়ি।

আমাদের ঝাড়গ্রামে আড়াইটের মধ্যে আসার কারণ হল, আজ আমার বিদ্যালয়ে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে চলে এলাম বেলপাহাড়ি। দ্বিপ্রহরে খাওয়াদাওয়া করার জন্য এলাম বিডিও অফিসের ক্যান্টিন ‘খাদ্যছায়া’তে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর দিদিরা চালান। বিডিও অফিসে কোনও প্রশিক্ষণ চলছিল। তাই প্রচুর ভিড়। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর এল ভাত। সঙ্গে পেঁয়াজ, লেবু, পাঁপড়, কাঁচালঙ্কা, ডাল, পোস্ট আর আলু ভাজা। মাছ ডিম যে যার পছন্দ মতো। খেতে খেতে হঠাৎ ধুম করে শব্দ হল। মাথা তুলে দেখি, আমাদের আরেকজন খুদে ভ্রমণসঙ্গী সনাতন খেতে খেতে চেয়ার থেকে মেঝেয় পড়ে গেল। তুলে বসানো হল। কিন্তু আবার পড়ার ভয়ে আর ভাল করে খেতে পারল না। হাসি মজা করে খাওয়া পর্ব গুছিয়ে উঠলাম। একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার। শৌচালয়ে যাওয়া হল। আমি ভাবছিলাম ১.৪৫ মতো বাজে। হঠাৎ সুস্মিতা বলল, ২.২০ বাজে। আমি ওখানেই শেষ। তাড়াতাড়ি ছুটে এসে বড়দাকে বললাম, এবার ফিরতে হবে। গাড়ি ছুটল।

বেলপাহাড়ি, ঝাড়গ্রাম।
ফেরার পথে চোখে পড়ছিল এমন সব দৃশ্য। মন ভাল হয়ে যাচ্ছিল।

ড্রাইভারদাদাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ৩.১৫টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম ঝাড়গ্রাম শহরে। সকলেই ক্লান্ত।

আমি ছুটলাম স্কুলে।

ছবি— সুস্মিতা মান্ডি, সাগেন মুর্মু

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *