বেনাগ্রাম, কুলটি।
অন্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

একটি ভূতুড়ে গ্রামে আবার তিন শঙ্কর

দীপক দাস

রাত তখন ৩টে। দ্রুত দাঁত মাজছিল শঙ্কর। ট্রেন ধরতে হবে হাওড়া থেকে। অনেক দিন পরে আবার অভিযানের সুযোগ এসেছে। ঠিক তখনই কানে এল শব্দটা… গুড় গুড় গুড়…। একটানা শব্দ। ও কীসের আওয়াজ? বাথরুম থেকে বেরিয়ে বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে শঙ্কর। কী আশ্চর্য মেঘ ডাকছে! বিদ্যুৎ চমকও দিল। ফাগুন মাসে আগুন লাগার কথা বনে এবং কারও কারও মনে। বসন্তের এমন ভরা ভোরে আকাশ চমকাচ্ছে! তবে কি তারা জেনে গেল তিন শঙ্কর আবার বেরোচ্ছে অভিযানে? আটকাতে চাইছে ঝড়-বিদ্যুৎ দিয়ে!

ভূতের গল্প বা সিনেমায় তো এমনই হয়। অন্তর না থাকলেও অন্তর্যামীর মতো ক্ষমতা ধরে ভূতেরা। তাদের বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্রের কথা মনে মনে ভাবলেই, ঘসঘসে গলায় বলে ওঠে, ‘‘আমাকে পেড়ে ফেলবি ভাবছিস? আমি কি গাছের ফল? সাহস তো তোর কম নয়?’’

ভূত খোঁজার অভিযানের সিক্যুয়েলের তৈরির সুযোগ হয়েছে অনেক দিন পর। পুরুলিয়ার বেগুনকোদর স্টেশনে অভিযান হয়েছিল ২০১৬ সালে। তার পর সব বিউটি স্পট। ‘বিস্ট হান্টিং’ কিছু ছিল না। তখন ডার্ক টুরিজ়মের এত রমরমা হয়নি। এ দিকে একটি ভূতুড়ে গ্রামের সন্ধান মিলেছিল বছর দুয়েক আগে। কিন্তু যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। শঙ্কর, আলভারেজ সকলেই ভারী ব্যস্ত। এই ফেব্রুয়ারিতে শুভ মহরত ঠিক করা গিয়েছিল। তবে সিক্যুয়েলে কাস্টিংয়ে পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

বেনাগ্রাম, কুলটি।
এমনই নির্জন গ্রামটি।

যাঁরা নতুন পাঠক তাঁদের জন্য একটু ফ্ল্যাশব্যাকের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। সিনেমার মতোই। বেগুনকোদর সফরে ট্রেনের দৃশ্যের চিত্রনাট্যটি ছিল এরকম—

‘আমি বিভূতিভূষণের শঙ্কর, শুভ তুই দেবুর শঙ্কর আর ইন্দ্র তুই ফেবুর শঙ্কর।’ ওরা বাকি দুই শঙ্করের অস্তিত্ব নিয়ে একটু সংশয়ে পড়ে গেল। শুভ বলল, ‘কাঁচরাপাড়ার দেবুর শোনপাপড়ি হয়। শঙ্করও হয় নাকি?’ ব্যাখ্যা দিলাম, ‘দেবু মানে মহানায়ক দেব। কাছের মানুষ তো। তাই আদর করে দেবু বললুম।’ ইন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ করে বলে উঠল, ‘ফেবুর মানে ফেসবুকের শঙ্কর।’ আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। কিন্তু শুভ আমাকে চেপে ধরল, ‘নিজে বেশ ভাল শঙ্করটা নিয়ে নিলে?’

শুভ থামতে চেপে ধরে ইন্দ্র, ‘ফেবুর শঙ্করকে তুমি কোথায় পেলে?’

কেন ফেসবুকে! সবসময় ফেসবুকে পড়ে থাকিস আর এটা দেখিসনি! ‘চাঁদের পাহাড়’-এর সিক্যোয়েল তৈরির খবরে নেটিজেনরা সাংঘাতিক একটা চিত্রনাট্য লিখেছিল। সেই ছবির থিম সং ছিল, ‘বাপরে বাপ কী ঢ্যামনা সাপ…ইত্যাদি। ফেবুর শঙ্কর আফ্রিকা নয় আমাজনে অভিযান করবে। তার সঙ্গে অ্যানাকোন্ডার লড়াইয়ের একটা দৃশ্য আছে। সে ভয়ঙ্কর লড়াই। অ্যানাকোন্ডা বধের পরে আমাজোনাসেরা শঙ্করকে ঘিরে সাপের দেহটা নিয়ে ওই গানটা গাইবে…‘বাপরে বাপ…’। চিত্রনাট্য প্রকাশের পরেরদিন আরেকটি মেমে ফেবুতে ছড়িয়েছিল, একটা অ্যানাকোন্ডাকে তিনজন মিলে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাতে ক্যাপশন, দেবের সঙ্গে লড়তে হবে শুনে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করা অ্যানাকোন্ডাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মনে পড়ে?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। লড়াই জেতার পরে আদিবাসীদের রাজা শঙ্করের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দেবে…

একদম। ওই জন্যই তো। তুই অর্ধেক রাজত্ব, রাজকন্যে সবই তো পাবি’।— নতুন অভিযানে গার্ডবাবু অর্থাৎ শুভ বাদ পড়েছে। ডেট দিতে পারছে না গার্ডবাবু। নতুন মুখ ডক্টর ঘাসপুস অর্থাৎ দীপু।

বেনাগ্রাম, কুলটি।
পুনুড়ি দিয়ে গ্রামে ঢোকার মুখে কালীমন্দিরটি ও বাঁধানো অশ্বত্থ গাছ।

ঠিক হয়েছিল হাওড়া থেকে ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেসে কুলটি যাব। সেখান থেকে বেনাগ্রাম। এটাই নাকি ভূতুড়ে গ্রাম। ভোর সাড়ে ৩টেয় বাড়ি থেকে বেরনো হবে। কিন্তু বেরনোর সময়েই মেঘ গজরাতে শুরু করল। তার পর হালকা ঝড়। জমির মাঝের রাস্তা দিয়ে আমি তখন দৌড়চ্ছি। ইন্দ্র দীপুদের বাড়িতে উপস্থিত। দীপু তৈরিই ছিল। জুতোটা গলানো বাকি ছিল। তার মধ্যেই বৃষ্টি নামল। ইন্দ্রর রোদ, জল, বৃষ্টি, গরম সবেতেই কষ্ট। সেই জন্যই ওকে ফেবুর শঙ্করের চরিত্রে দেওয়া হয়েছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় রাজা উজির মারুক। ইন্দ্র জানতে চাইল যাত্রা শুরু করা হবে কিনা। দীপুদের বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়েও বাইক পিছিয়ে এনেছিল গাছতলায়। দীপুর মা মানে আমাদের জেঠিমা বললেন, ‘‘বেরিয়ে পড়েছ যখন চলে যাও।’’ ছাতা মাথায় বাইকে ভূত ধরতে যাওয়ার যাত্রা শুরু হল। ছাতাটা অবশ্য দীপু ইন্দ্রর মাথাতেই ধরেছিল। বাইক ও চালাচ্ছিল কিনা।

অন্ধকার বাসস্টপ। বৃষ্টি আরও ঝমঝমিয়ে। মাঝে মাঝে মেঘ গুড়গুড়। ভয় হচ্ছিল, অত ভোরে কেউ যাত্রী নেই ভেবে বাস যদি না থেমে চলে যায়! দীপু বাসচালককে সেই সুযোগ দেয়নি। বাসের আলো দেখা দিতেই ‘দাদা আছি আছি’ চিৎকারের সঙ্গে মোবাইলের আলো নাচিয়ে সঙ্কেত দিতে শুরু করেছিল। না থামিয়ে উপায় ছিল না বাসচালকের। বাসে উঠে দেখি, আমাদের প্রত্যেকের জামায় কালো কালো নোংরা ছোপ। কাদা ছিটকেছে নাকি পুরো গরমের ধুলো জমা দোকানের চাল থেকে গড়িয়েছে, কে জানে! বৃষ্টি মাথায়, জল জমা রাস্তায় ছুটতে শুরু করল বাস। ভাগ্যিস জেঠিমার কথা মেনে চলে এসেছিলাম। না হলে বাস ধরতে পারা যেত না। বাস ফসকালে ট্রেনও স্টেশন ছাড়ত।

ট্রেন-বাসের দৃশ্য তেমনটা কিছু নয়। সিনেমায় শুধু রহস্য বাড়ানোর জন্য একটা বর্ষাতি পরা লোককে শঙ্করদের পাশে উঠতে দেখা যাবে। ট্রেনে বসে লোকটা মাঝে মাঝে আমাদের দিকে রাগত চোখে তাকাবে। ট্রেনে মজা করতে করতে, খাবার চাখতে চাখতে চলার ফাঁকে বেনাগ্রামের গল্পটা বলে নেওয়া যাক।

বেনাগ্রাম, কুলটি।
বেনাগ্রামের সেই ঝকঝকে লক্ষ্মীমন্দির। পিছনে রেললাইনের পাঁচিল।

বেনাগ্রামের নামটা প্রথম পড়েছিলাম কোনও একটা খবরে। গার্ডবাবুকে দিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল গ্রামের অবস্থান। তার পর আরও খোঁজখবর নেওয়া হয়েছিল। সমাজমাধ্যম, ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদি থেকে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলো থেকে মেলা নির্যাসটা হল, একটা পরিত্যক্ত গ্রাম। বছর ৪০ আগে নাকি রাতারাতি গ্রাম ছেড়ে বাসিন্দারা চলে গিয়েছিলেন। ভূতের উৎপাত বেড়েছিল। উৎপাত বলতে তেমন কিছু নয়, ওই রাতে দরজায় ধাক্কা দেওয়া বা কড়া নাড়া। ভূতেরাও কি কোনও অবনীকে খুঁজত? বাড়ি আছে কিনা জানতে চাইত? তাতে অবনীর ভয়। গোটা গ্রাম ভয় পাবে কেন? শোনা যায়, ভয় পাওয়ার কারণ নাকি খুনখারাপি। খুন নাকি হয়েছিল কয়েকটা। কেউ কেউ বলেন, কয়লা মাফিয়ার অত্যাচার ছিল। বাসিন্দারা আর সহ্য করতে না পেরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিলেন।

ভূতে আমাদের বিশ্বাস নেই। কোনও ভূতের ক্ষমতা নেই রাতারাতি গোটা গ্রামকে খালি করে দেওয়ার। সর্বময় নিকৃষ্ট সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়। দু’একটা বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে হয়তো সাময়িক শক্তি প্রদর্শন করতে পারে। তা হলে কেন পরিত্যক্ত হল গ্রাম?

ঘুরতে গেলে আমরা বরাবর ভাল সারথি পাই। ভাল লোকেরা সাহায্য করতে যেন আমাদের জন্য বসে থাকেন। এবারেও তাই হল। কুলটি স্টেশনে ছবিটবি তুলে বাইরে এসে এক লটারি বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বেনাগ্রাম শুনে হিন্দিতে বললেন, ‘‘ওখানে তো কেউ থাকে না।’’ আমরা জানালাম, সেই জন্যই যাওয়ার আগ্রহ। উনি একটা টোটোচালককে হাঁক দিলেন। প্রবীণ চালকের নাম আলম। তিনিও ভারী ভাল লোক। এ দিকে তখন রেলের গেট পড়ে গিয়েছে। খুলতে অনেকক্ষণ দেরি হবে। আলমদা আমাদের একটা পরিত্যক্ত খাদান ঘুরিয়ে আনলেন। পরিত্যক্ত পরিদর্শন আমাদের।

বেনাগ্রাম, কুলটি।
ফেলে চলে যাওয়া বাড়িঘর।

খাদান থেকে ঘুরিয়ে একটা বাঁধানো বটগাছের নীচে টোটো থামালেন আলমদা। গ্রামের নাম পুনুড়ি। গাছতলাটা বেশ সুন্দর। দু’টো কিশোর বসেছিল। ইন্দ্র আর দীপু ক্যামেরা বাগাতেই ছেলে দু’টো চাতাল থেকে উঠে পড়ল। আমরা ঘোরাপোড়া পর্যটক। অনিচ্ছার সিঁদুরে মেঘ দেখলে চমকাই। রিলসবালোদের অহেতুক উৎপাতে গ্রাম বিরক্ত নয় তো! শেষের দিকে বেগুনকোদরে ভূতের সন্ধানে গেলে এলাকার লোকজন মারধর করতেন। বেনাগ্রামেও কি উৎপাত? সাহস করে ছেলে দু’টোকে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা রাস্তা দেখিয়ে দিল।

রাস্তা বুঝতে ভুল করেছিলেন আলমদা। অন্য গ্রামের দিকে এগোচ্ছিলেন। কেমন যেন সন্দেহ হওয়ায় নাতির হাত ধরে আসা একজনকে জিজ্ঞাসা করা গেল। তিনি জানালেন, পুনুড়ি থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকের বদলে ডানের রাস্তা ধরে ফেলেছি। ফেরা হল। বেনাগ্রামের ঢোকার রাস্তার পাশেই একটা মন্দির। লেখা গ্রামেশ্বরী মন্দির। এটা পুনুড়ির রক্ষাকর্ত্রী। বেনাগ্রাম হয়তো তাঁর এলাকার বাইরে। ঢালাই রাস্তা ধরে এগনো শুরু। প্রচুর গাছপালা, ঝোপজঙ্গলে ভরা নির্জন রাস্তা। নতুন লোকেদের কাছে শুরুতেই ভূতের গ্রামের গা ছমছমে অনুভূতি মিলতে পারে। কিছুটা এগোতেই দেখি, একটা ছেলে আর মেয়ে ওই রাস্তায় হেঁটে চলেছে। ভূতের ভয় থাকলে এ সাহস হত না।

আরেকটু এগোতে কিছু গরুর দেখা মিলল। আপন মনে রাস্তার উপরে, জঙ্গলে চরছে। কিছু দূরে আরেকটা বাঁধানো গাছ। এটা অশ্বত্থ। এখানে অনেক গাছের তলাই বাঁধানো দেখেছি। এখানেও চাতালে বসে দু’টো ছেলে। তারা জানাল, এটাই বেনাগ্রাম। আমরা এগোলাম। এবার গরু চরানো এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা। বাইরের লোক বলেই মনে হয়। আরেকটি এগোতে একটা মন্দির। কতগুলো ভাঙাচোরা বাড়ি। মন্দির বেশ ঝকঝকে। স্পষ্ট বোঝা যায়, নিয়মিত পরিচর্যা হয়। ভূতুড়ে পরিত্যক্ত গ্রামে ঝকঝকে মন্দির!

বেনাগ্রাম, কুলটি।
গোটা গ্রাম যেন খণ্ডহর।

যেতে যেতে এক সময়ে বড় রাস্তায় এসে পড়লাম। একদিকে গ্যারাজ। রাস্তার ধারে একটা দোকান। হোটেল কাম জলখাবারের জায়গা। দোকানের সামনে রাস্তার পাশে একজন চেয়ারে বসেছিলেন। তাঁকে বেনাগ্রাম, ভূত ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাওয়া হল। উনি হোটেলের মালিককে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি এত কম কথা বলেন! আমরা আমাদের কার্যকর পদ্ধতি প্রয়োগ করলাম। ঠিক হল, এখানেই জলখাবার খাওয়া হবে। কিনলে ব্যবসায়ীদের মুখ খোলাতে সহজ হয়। কিন্তু তেমন কিছু মিলল না। চা বিস্কুট খেলাম। খেতে খেতে বারবার বেনাগ্রামের কথা জানতে চাইছিলাম। হিন্দিতে কথা বলছিলাম আমরা। দোকানের পাশের লোকটি হিন্দিতেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন হোটেল মালিককে। অনেক জিজ্ঞাসাতেও মুখটি তাঁর বন্ধ। রান্না করছেন, চা দিচ্ছেন, বিস্কুট বার করছেন। টুকরো টুকরো হিন্দিতে কথা বলছেন। কিন্তু বেনাগ্রাম নিয়ে স্পিকটি নট। দাম দেওয়ার সময়ে হঠাৎ পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠলেন, ‘‘আমার তখন জন্মই হয়নি বেনাগ্রামের ঘটনার সময়ে।’’ যাব্বাবা! এতক্ষণ ধরে এত কষ্টের হিন্দিগুলো সব অপচয় হল!

হোটেল মালিকের কাছ থেকে কিছু মিলবে না। সেই শোনা কথাই বেনাগ্রামে এসে শুনতে হবে। এঁদের বাড়িটাও বেনাগ্রাম থেকে দূরে। গ্যারাজেও নিশ্চয় বাইরেরই লোকজন। আবার গ্রামে ঢোকা হল। আর তখনই ঘটল, সেই পুরি সিদ্দত আর কায়নাতের কারনামা। তিন জন ঝকঝকে মন্দিরের কাছে দাঁড়িয়ে। কথা বলে জানা গেল, তাঁরা ইউটিউবার। সকলেই কাছাকাছির গ্রাম কুলতোড়ার বাসিন্দা। এখানে শ্যুটিং করতে এসেছেন। ভাব জমে গেল। নম্বর আদানপ্রদান, গ্রুপ ছবি তোলা হল। গ্রাম সম্পর্কেও কিছু তথ্য মিলল।

ইউটিউবারদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাইরের লোকজন এসে ভয় দেখাত বাসিন্দাদের। রাতবিরেত দরজায় ঢোকা মারত। এই গ্রাম ঘেঁষে চলে গিয়েছে ধানবাদগামী রেললাইন। এখন লাইনের দিকটা পাঁচিলের আড়াল। তখন পাঁচিল ছিল না। ফলে সিগন্যাল নামিয়ে ট্রেনে ডাকাতি হত। ট্রেন থেকে নেমে নাকি গ্রামে অত্যাচার করত দুষ্কৃতীরা। তাই বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়েছেন। এই গ্রাম ছাড়ার সঙ্গে ট্রেনের কিছু একটা যোগসূত্র রয়েছে। সেটা দীপু অনেকক্ষণ ধরে বলছিল।

কিন্তু একটা গ্রাম পুরোপুরি খালি হয় না কখনই। বিভিন্ন জায়গাতেই নানা দুর্বিপাকে ভিটেমাটি ছাড়েন বহুজন। কিন্তু পুরো গ্রাম খালি হয় কি? আমার জানা নেই। তা ছাড়া গ্রাম ছেড়ে তাঁরা গেলেনই বা কোথায়? নতুন সঙ্গীরাও কিছু বলতে পারলেন না। আমরা মন্দিরের বিষয়টি জানতে চাইলাম। কেন ঝকঝকে? ওঁরা বললেন, এক পুরোহিত প্রতিদিন সকাল-বিকেল পুজো করতে আসেন। আজও বিকেল ৫টার সময় আসবেন। একটা সূত্র মিলল। পুরোহিতকে নিশ্চয় কেউ নিয়োগ করেছেন। বা তাঁদেরই মন্দির হতে পারে। ৫টায় ট্রেন ফেরার ট্রেন আমাদের। অপেক্ষা করার সময় নেই। কিন্তু পুরোহিতের বাড়িটা তো জেনে নেওয়া যেতে পারে? ইউটিউবারেরা বললেন, পাশের গ্রাম চলবলপুরে বাড়ি। গ্রামটি আলমদা চেনেন। চলো চলবলপুর।

বেনাগ্রাম, কুলটি।
বাঁধানো ঘাটের সেই পুকুর।

আবার বড় রাস্তা ধরে সেই হোটেলের পাশ দিয়ে চলবলপুরে। দু’চারজনকে জিজ্ঞাসা করেও সন্ধান মিলল না। তখনই চোখে পড়ল একটা সেলুনের। এইখানে সকলকেই আসতে হয়। সন্ধান মিলতে পারে। সেলুনওয়ালা জানালেন, পুরোহিতের বাড়ি পুনুড়ি। আবার অন্য পথ ধরে পুনুড়ি পৌঁছনো। সেই বাঁধানো বটের ছায়ায়। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল, পুরোহিতের নাম শ্যামাচরণ মিশ্র। একটু এগিয়েই বাড়ি। দীপু ওইটুকু যেতেই চরণ আর পদ-র মাঝে নামটা গুলিয়ে ফেলেছিল। এক ভদ্রমহিলা দেখিয়ে দিলেন।

রাস্তার পাশেই বাড়ি। বন্ধ দরজার কাছে ডাকাডাকিতে এলেন শ্যামাচরণবাবু। আমাদের আগ্রহের বিষয়টি খুলে বলা হল। কথায় কথায় জানা গেল, ঝকঝকে মন্দিরটি লক্ষ্মীমন্দির। আর বাঁধানো অশ্বত্থ গাছের উল্টোদিকের ছোটমন্দিরটির কালীর। উনি দু’টো মন্দিরের সেবায়েত মাত্র। কিন্তু গ্রামের লোক কেন সব ছেড়ে চলে গিয়েছিল তা জানেন না। আমরা মন্দিরের মালিকদের ফোন নম্বর চাইলাম। উনি আনতে ঘরে গেলেন। ফিরে এলেন মোবাইল নিয়ে। কী প্যাড মোবাইল। শ্যামাচরণবাবু ফোনে ধরিয়ে দিলেন সন্দীপ মাজি নামের একজনকে। মন্দিরগুলো এই মাজি পরিবারেরই। বছর তিপান্নর সন্দীপবাবু এখন কুলটির নিউ কলোনিতে থাকেন। আমি কথা বলতে শুরু করলাম। আর দীপু নোট নিতে। ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল একটি গ্রাম পরিত্যক্ত হওয়ার রহস্য।

বেনাগ্রামটি বেশ পুরনো। লক্ষ্মীমন্দিরটাই দেড়শো বছরের পুরনো। গ্রামে ৩০-৪০ ঘর বাসিন্দা ছিলেন। তাঁরা বেশির ভাগই মাজি আর বাউড়ি। চাষবাসই ছিল মূল জীবিকা। সন্দীপবাবুরা গ্রামের বহু পুরুষের বাসিন্দা। সন্দীপবাবুর দাদুর দাদু কুলতোড়া থেকে বেনাগ্রামে আসেন। লোকজনের হাতে টাকাপয়সা ছিল। সে ওই এলাকায় পরিত্যক্ত বা ভেঙে পড়া বাড়িঘর দেখে বোঝা যায়। কিন্তু এলাকাটিতে পরিকাঠামোর অভাব ছিল। বর্ষায় রাস্তা কাদায় হাঁটু ডোবা হয়ে যেত। ছিল না বিদ্যুৎ। আর গ্রামটি ছিল নির্জন। এই দিকটায় কেউ তেমন যেত না। গ্রামের নামের উৎপত্তি সন্দীপবাবু বলতে পারেননি। তবে নাম শুনে আন্দাজ, বেনাঘাসে ভরা জায়গা বলেই এমন নাম। ফলে ঝোপঝাড় কেটে বসত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখনই যথেষ্ট নির্জন চারপাশটা। তখন নিশ্চয় আরও ছিল।

কিন্তু এরকম গ্রাম বাংলায় এখনও প্রচুর। গ্রাম ছাড়তে হল কেন? সন্দীপবাবু বললেন, কাজের খোঁজে লোকে বাইরে যেতে শুরু করলেন। তাঁরা কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকতে লাগলেন। প্রথম বেনাগ্রাম ছেড়েছিলেন সন্দীপবাবুর জেঠু রবীন্দ্রনাথ মাজি। তিনি কুলটির ইসকো কারখানায় কাজ পান। চলে আসেন কারখানার আবাসনে। সে বছর ৪০ আগের কথা। বেনাগ্রাম শেষজন ছেড়েছিলেন সুখময় মাজি। সন্দীপবাবুর কাকা। তিনি কুলটি পুরসভার পিছনে বিষ্ণুবিহারে চলে যান। এরকম আরও লোকজন কাজের খোঁজে এবং কিছুটা সুবিধাযুক্ত এলাকায় চলে যেতে শুরু করেন। গ্রাম মোটামুটি খালি হয়ে যায়, বছর তিরিশের আগে।

তা হলে এত যে ভূতের ভয়ের রটনা? দুষ্কৃতীদের ভয় দেখানোর কথা? সন্দীপবাবু জানালেন, ভয় পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু তা সরাসরি বাসিন্দাদের উপরে নয়। তা ভূতের ভয়ও নয়। বাইরে থেকে খুন করে এনে গ্রামে ফেলে যেত দুষ্কৃতীরা। সন্দীপবাবুরা তখন ছোট। সকালে উঠে দেখলেন, গ্রামে জমিতে কারও দেহ পড়ে রয়েছে। এ রকম তিন-চারটে খুন হয়েছিল। পুলিশের আনাগোনা বাড়ল। সন্দীপবাবু জানালেন, তাঁরা দু’ভাইবোন। বাবা বাইরে কাজ করতেন। তিনি টিউশন পড়তে গেলে বাড়িতে মা আর বোন। ওই নির্জন জায়গায় নিরাপত্তার চিন্তা যে কোনও লোকেরই হবে। ফলে তাঁরাও গ্রাম ছাড়েন। ফাঁকা হতে থাকে গ্রাম। লোকজন কুলটি কলোনি, পুনুড়ি, এমনকি কলকাতাতেও ছড়িয়ে পড়েন।

কুলটির বেনাগ্রাম।
পরিত্যক্ত বাড়ির উঠোনের সেই তুলসীমঞ্চ।

সন্দীপবাবুও কুলটির ইসকোয় কাজ করতেন। গ্রামের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ রয়েছে তাঁদের। লক্ষ্মীমন্দিরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সময়ে জাঁকজমক করে পুজো হয়। আয়োজন করেন তাঁরাই। আবার কৌশিকী অমাবস্যায় হয় কালীমন্দিরের পুজো। হাজার দেড়েক লোকের খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকে। যাঁরা ভূতের গুজবে বিশ্বাস করেন তাঁদের বিরুদ্ধে এই দুই মন্দিরের পুজোর জাঁকই যথেষ্ট।

এখন ডার্কের খুব রমরমা। ডার্ক কমেডি, ডার্ক সিনেমা এমনকি ডার্ক চকলেটও। ডার্ক টুরিজ়মের রমরমাও কম নয়। অভিযানের সিক্যুয়েল থেকে বাদ পড়া গার্ডবাবু নাকি কোথা থেকে খবর পেয়েছিল, এই গ্রামটিকে ডার্ক টুরিজ়মের আখড়া করা হবে। তাতে অবশ্য ডার্কের মজার থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বেশি ছিল। সেই সময়ের সরকারের বিরুদ্ধে অনুন্নয়ন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারার অভিযোগ তোলা। মজার ব্যাপার হল, পুনুড়ি আর বেনাগ্রামের দূরত্ব বেশি নয়। সেটিও রেললাইনের ধারের গ্রাম। ভূত বা অনুন্নয়নের সীমা এতটুকু কেন? সে বিষয়ে প্রশ্ন জাগে বৈকী!

যাত্রা শুরু হয়েছিল গ্রাম পরিত্যক্ত হওয়ার কারণ খোঁজার উত্তেজনায়। যাত্রা শেষ হল একটুখানিক মনখারাপ নিয়ে। ইউটিউবারদের থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বেনাগ্রাম ঘুরে দেখছিলাম। একটা বাঁধানো ঘাটের পুকুর দেখেছিলাম। ভাঙাচোরা বাড়ির ভিতর ঢুকে ইন্দ্র খুঁজে পেয়েছিল একটা তুলসীমঞ্চ। লক্ষ্মীমন্দিরের পাশে ছিল নষ্ট জলের ইঁদারা। পাকা বাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর, উঠোনের তুলসীগাছ ছেড়ে যেতে এঁদের নিশ্চয় খুব কষ্ট হয়েছিল!

এও তো এক ধরনের শিকড় ছেঁড়ার কষ্ট। লোকের ভূতের আনন্দে নাচলে নিশ্চয় এঁদের কষ্ট হয়? সে কথা আর সন্দীপবাবুকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ ও দীপশেখর দাস

(সমাপ্ত)

One thought on “একটি ভূতুড়ে গ্রামে আবার তিন শঙ্কর

Leave a Reply to দীপক দাস Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *