ইতিহাস ছুঁয়ে বিশেষ ভ্রমণ

দরিয়ার পির বদর সাহেবের সন্ধানে

দীপক দাস

যখন ‘নোনাজল’ পড়েছিলাম তখন গল্পের করুণ পরিণতিই ধাক্কা দিয়েছিল। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতা। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী তো শুধু গল্প পড়ান না। তিনি ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্যের এক বড়সড় ভাণ্ডার গল্পে ছড়িয়ে দেন। ওই ‘নোনাজল’ গল্প থেকে শিখেছিলাম অনেক কিছু। ‘রূপদর্শী’ নামে এক উঠতি লেখকের কথা। যখন গল্পটি পড়েছি তখন ‘রূপদর্শী’ অর্থাৎ গৌরকিশোর ঘোষ মারা গিয়েছেন। জেনেছিলাম বারুণীর পুতুলের কথাও। পুতুল নিয়ে কিছু খোঁজখবর করা গিয়েছিল। তমলুকে বারুণী মেলা ও ঘাটের সন্ধান মিলেছে। কিন্তু পুতুল নয়। আর জেনেছিলাম বদর পিরের নাম। ‘নোনাজল’ ভারত-বাংলাদেশ-আমেরিকা জোড়া এক সফর। সেই জলে ভেসেই ২০০৫ সালে আমার এক সফর শুরু হয়েছিল। বদর সাহেবের খোঁজ।

বদর সাহেব বা বদর পির কে? দরিয়ার পাঁচ পির রয়েছেন। বদর, আলি, কালু, গাজি আর একদালি। নামগুলোর হেরফেরও হয়। বাংলার মাঝিমাল্লারা নৌকা ছাড়ার আগে পাঁচ পিরের সঙ্গে বদরের নাম স্মরণ করেন। বোঝাই যাচ্ছে, জলের নানা বিপদআপদ থেকে রক্ষা করেন বদর। গল্পে তেমন দাগ কাটেননি বদর সাহেব। একটা তথ্য হিসেবেই মনে ছিল।

বদর সাহেবের থান।

একদিন হঠাৎ বদর পিরের থানের খোঁজ মিলল। আর সেটা আমাদেরই গ্রাম, পাতিহালে। ২০০৫ সাল। তখন হাওড়া জেলার পত্রিকা ‘যুগের খবর’এর সাংবাদিক। পাতিহালের ইতিহাস লিখছি। একজন খোঁজ দিলেন সেই থানের। বাড়ি থেকে দু’কিলোমিটারের মধ্যেই হবে সেই থান। একদিন চলে গেলাম। নিজবালিয়া যাওয়ার পথে পড়ে। জায়গাটার নাম নোলোর খটি। সেখানকার বিশাল পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একটা নিমগাছের তলায় পিরের থান। গাছতলায় একটি উঁচু মাটির ঢিবি। তাতে দু’টো ঘট বসানো। লৌকিক দেব-দেবীদের মতোই। সব মিলিয়ে পিরের রূপকল্প। নিমগাছটি অতি প্রাচীন। তার বিশালত্বেই সেই প্রমাণ মেলে।

পাতিহালে বদর পিরের থান থাকাটা একটু আশ্চর্য ঘটনা বইকী। কেন আশ্চর্যের তা ব্যাখ্যার আগে বদর পির সম্পর্কে একটু তথ্য জানা যেতে পারে। নিজের অজ্ঞানতার কারণে খুব বেশি তথ্য জোগাড় করতে পারিনি। সেই ইতিহাস লেখার সময়েও। এবং এখন এই লেখার সময়েও। কোনও দিন চোখে না দেখা মেদিনীপুরের লোকসংস্কৃতির গবেষক তরুণ সিংহ মহাপাত্র একটি বইয়ের সন্ধান দিয়েছিলেন। বইটির নাম ‘পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ’ (১ম ভাগ)। লেখক জেমস ওয়াইজ। ভূমিকা, সম্পাদনা ও টীকা মুনতাসীর মামুনের। মূল ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফওজুল করিম। বইয়ে বদর পিরকে নদ-নদীর অধিপতি বলা হয়েছে। জেলে ও নাবিকেরা জলে নৌকা ভাসানোর সময়ে বদরের নাম করেন। তাঁরা কখনও বলেন, ‘আল্লা, নবী, পাঁচ পীর, বদর রক্ষা কর’। অথবা বলেন, ‘হামরা আছি পোলাপান/গাজি আছে নেগাবান/সুর গঙ্গা, পাঁচ পীর, বদর! বদর! বদর’! কিন্তু তাঁর পরিচয় এবং কেন তাঁকে জল-অধিপতি বলা হয় তার কোনও ব্যাখ্যা বইয়ে নেই।

পালা গায়ক মাজুর বাসিন্দা দিবাকর চক্রবর্তী।

বাংলাদেশের চট্টগ্রামে বদর পিরের দরগা রয়েছে। শহরবাসী সকলেই সেই দরগায় শ্রদ্ধা জানান। স্থানীয়দের বিশ্বাস, তিনি চট্টগ্রামেরই লোক ছিলেন। আবার অন্য একটি সূত্র বলছে, তিনি একজন পর্তুগিজ নাবিক। নাম পাস গুয়াল পেরেক বোথিলো। বোথিলোর জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়েছিল। তিনি জাহাজের ভাঙা কাঠ ধরে ভাসতে ভাসতে চট্টগ্রামে পৌঁছেছিলেন। অনেকে বলেন, তিনি শিলাখণ্ড ধরে ভাসতে ভাসতে চট্টগ্রামে আসেন। আরেকটি অলৌকিক ঘটনাও শোনা যায়। সেই সময়ে চট্টগ্রামে নাকি অদৃশ্য জিনেদের আনাগোনা ছিল। তাদের তাড়িয়ে চট্টগ্রামে আস্তানা গাড়েন বদর পির। এখন সারা দেশ থেকে চট্টগ্রামে ভক্তরা আসেন। হিন্দু জেলেরাও পিরের দরগায় শিরনি চড়ান। রমজানে বার্ষিক উরস হয়। জেমস ওয়াইজের মত, পির বদর হলেন বদরুদ্দিন বদরে আলম। বিহারের ছোট দরগায় তাঁর সমাধি রয়েছে।

বদর পিরের এই পরিচয়ের মধ্যেই রয়েছে আমার বিস্ময়। বদর পির নদীর দেবতা। কিন্তু পাতিহালে কোনও নদী নেই। তিনি জেলে এবং মাঝিমাল্লাদের উপাস্য। নদী না থাকলে মাঝি থাকারও কথা নয়। আর পাতিহালে মুসলিমও নেই। তাহলে এখানে বদর পিরের থান এল কোথা থেকে?

এই পাড়াতেই বদর পিরের থান।

এর উত্তর খুঁজতে হবে পরোক্ষ কিছু নিদর্শনের ভিত্তিতে। পিরের থান রয়েছে নোলোর খটি এলাকায়। খটি মানে আড়ত বা গঞ্জ। ‘নোলো’ নলিনী শব্দের অপভ্রংশ হতে পারে। সেই নলিনীকান্ত, নলিনীরঞ্জন বা এরকম নামের কেউ সেই খটির মালিক ছিলেন, হয়তো। সেই খটিতে পণ্য সম্ভবত সড়ক পথে আসত না। কারণ এখন ওই এলাকার সঙ্গে গ্রামের অন্য অংশের যোগ করা বড়গাছিয়া ফিডার রোডটি অনেক পরের তৈরি। সম্ভবত এই খটিতে মালপত্র আসত নৌকা করে। এই এলাকার সঙ্গে, বলা যায় পাতিহাল গ্রামের অনেকটা অংশের সঙ্গেই, একসময়ে জলপথে যোগাযোগ ছিল। সেই যোগাযোগের একটি চিহ্ন এখনও রয়ে গিয়েছে। সেটা হল নাজরের হানা। অর্থাৎ একটা খাল। খালের সঙ্গে গঙ্গার যোগ রয়েছে। সেই খালে একসময়ে জোয়ারের জল ঢুকত। এখনও চাষের সময়ে জোয়ারের জল ঢোকে বলে জানালেন থানের কাছে বসবাসকারীরা। আর নোলোর খটি এলাকার পাশে রয়েছে ধূ-ধূ চাষের জমি। এই এলাকাটি বাদা নামে পরিচিত। বাদা মানেও জলাভূমি। অর্থাৎ জলের একটা যোগ মিলছে।

পালাগানের এই বই দেখিয়েছিলেন দিবাকর চক্রবর্তী।

গ্রামের পুরনো বাসিন্দারা এখনও বলেন, জমিদার এ টি দেবদের (আশুতোষ দেব, দেবসাহিত্য কুটীর) বাড়ির দুর্গাঠাকুর জলপথেই কুমোরটুলি থেকে আসত। আর তা আসত নোলোর খটির এই এলাকায়। সেখান থেকে ঠাকুর দুর্গাদালানে পৌঁছে দিতেন জমিদারদের এই এলাকার পাইক-প্রজারা। আবার গ্রামের বিখ্যাত কুমোরেরা তাঁদের হাঁড়ি-সহ নানা মাটির পাত্র নৌকা করেই কলকাতায় নিয়ে যেতেন। পাতিহালের প্রথম এবং প্রধান খ্যাতি ছিল মাটির জিনিসপত্রের জন্যই। এই গ্রামের কুম্ভকারদের অনেকের কালীঘাট অঞ্চলে মাটির জিনিসপত্রের দোকানও ছিল। অর্থাৎ গ্রামের সঙ্গে নৌকা যোগ ছিলই। তাহলে কি যাঁরা নিয়মিত নৌকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁদের কেউ বদর পিরের থানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? বা যাঁরা খটিতে নিয়মিত মালপত্র আনতেন? এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ কোনও প্রমাণ মেলে না।

থানটির আশেপাশে মালিক, দাস, বাগ পদবিধারীদের বাস। আমরা ওই এলাকায় বারতিনেক গিয়েছি। এই সেদিনেও গেলাম। কিন্তু বিশেষ কিছু জানতে পারিনি। থানের কাছের বাসিন্দারাও এই এলাকায় বদর পিরের আগমন বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি। এখন তাঁরা নিত্য পুজো দেন থানে। বৈশাখ মাসে বদর পিরের গান হয়। মাজুর বাসিন্দা দিবাকর চক্রবর্তী একসময়ে গান করতে আসতেন এখানে। এখন আসেন তাঁর ছেলেরা। ২০১৫ সাল নাগাদ দিবাকর চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম আমি আর ইন্দ্র। তাঁর বাড়ির সামনের মন্দিরে বসে সন্ধেবেলায় অনেক কথা হয়েছিল। আমাদের আগ্রহ ছিল বদর পিরের গানে। যদিও এলাকা থেকেই শুনে গিয়েছিলাম, বদর পিরের নয়, উনি নোলোর খটিতে এসে মানিক পিরের গান করেন। দিবাকরবাবু সেই গানের বই দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা ছিল বনবিবির পালা। বদর সাহেবকে নিয়ে কি কোনও পালাগান রচিত হয়েছে? আমার জানা নেই। কেউ সাহায্য করলে ইতিহাস সমৃদ্ধ হবে।

আগমনের ইতিহাস জানা যায় না। এলাকায় পাওয়া যায় না পালাগানের হদিসও। তবুও বদর সাহেব বা বদর পির সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের এক বড় থান। চট্টগ্রামের, পাতিহালেরও।

ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *