অন্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

ইস্টিশন ইস্টিশন

দীপক দাস

রাজপাট হারানো এক স্টেশন

‘কাল ছিল ডাল খালি আজ ফুলে যায় ভরে’। রবি কবির আশাবাদী ছড়া। কিন্তু স্টেশনের ইতিহাসে ছড়াটা পুরো উল্টো। ‘কাল ছিল যাত্রী ভরা, আজ সবাই যায় চলে’। দক্ষিণ-পূ্র্ব রেলের হাওড়া-আমতা রুটের স্টেশন ডোমজুড়। কী ভাবে একটা স্টেশন গুরুত্ব হারিয়ে প্রায় পরিত্যক্ত, নির্জন হয়ে যায়, তার বড় উদাহরণ।

রেল রুটের নাম হাওড়া-আমতা বটে, কিন্তু রেল আমতা পর্যন্ত পৌঁছতে বহু বছর লেগেছে। রেলপথ মঞ্জুর হয়েছিল আমতা পর্যন্ত। কিন্তু প্রথম ট্রেন চালু হয়েছিল এই ডোমজুড় পর্যন্তই। আশির দশকে। ১৯৮৪ সালে। পরের বছর আরও দু’টো স্টেশন বেড়ে লোকাল ট্রেন যেত বড়গাছিয়া পর্যন্ত। তার পর হল মুন্সিরহাট। তার পর আরও একটা স্টেশন বেড়ে হল মহেন্দ্রলাল নগর। ২০০৪ সাল নাগাদ ট্রেন গেল আমতা। রুট হল হাওড়া- আমতা। শোনা যায়, এই রুট বাগনানে হাওড়া-খড়্গপুর রুটের সঙ্গে মেশার কথা। কিন্তু জমি জটে কাজ আটকে রয়েছে।

দু’নম্বর প্ল্যাটফর্ম। হাওড়া যেতে বাঁদিকে। সেই আদিগন্ত চাষ জমি।

ডোমজুড় স্টেশনটা জমজমাট জায়গায় নয় মোটেই। যাকে লোকে মূল ডোমজুড় বলে চেনেন তার থেকে বেশ কিছুটা বাইরের দিকে। খুব সুন্দর স্টেশন। প্রচুর গাছপালা রয়েছে। কিছু ফলের গাছও আছে। কাঁঠাল, জামরুল। মনে আছে, একবার ঝড়ে ওভারহেডের তার ছিঁড়ে গিয়েছিল। ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন। রাতের শেষ ট্রেন সাংঘাতিক বিলম্ব। ডোমজুড়ে আমরা দীর্ঘক্ষণ আটকে। একটা লোকাল রেকও সেদিন মাজুর কাছে খারাপ হয়েছিল। কারশেড থেকে ডিজেল ইঞ্জিন পাঠানো হয়েছে ওই লোকালকে টেনে আনার জন্য। সেই গভীর রাতে সে এক দেখার মতো দৃশ্য। ইলেকট্রিক ট্রেনকে টেনে নিয়ে আসছে একটা ডিজেল ইঞ্জিন। এই ঘটনার সঙ্গে কোন প্রবাদ সুপ্রযুক্ত হবে জানি না। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো? নাকি পুরনো চাল ভাতে বাড়ে? তো ওই রাতে কাজ ফেরত যাত্রীরা প্রবল খিদেই কাতর। কিন্তু খাবার কোথায়? এমনিতেই এই লাইনে হকার কম। তায় আবার শেষ ট্রেন। হকারেরা সাঁতরাগাছির বেশি আসেন না। তো খিদে মেটাতে কয়েকজন যাত্রী সেই রাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জামরুল গাছটার ওপরে। মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা গাছ।

এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম।

স্টেশনের চারপাশটাও বেশ সুন্দর। আমতার দিকে এগোলে দু’পাশে সবুজ, চাষবাসের আদিগন্ত মাঠ। ডান পাশে সেই মাঠ হুগলি জেলার বুক পর্যন্ত বিস্তৃত। আরেকটু এগোলে রাজাপুর খাল। বামদিকে একটা জলা জায়গা। শীতকালে লোকে ওই জায়গায় ফিস্ট করে। কয়েক বছর হল স্টেশন ছাড়িয়ে বামদিকে একটা পার্ক হয়েছে। তারাপদ দে উদ্যান। একটা বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলও হয়েছে। স্কুলের সামনে শ্মশানটার শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। লোকে সেখানে ফিস্ট করে। পার্কের ভিতরেও ফিস্ট করা যায়। ফলে ওই জলায় ফিস্ট করার লোক কমেছে। জলা ভরে যায় শরবনে।

আশপাশটা একটু একুট করে উন্নত হচ্ছে। কিন্তু স্টেশনেরা রাজপাট ফিরে আসার কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি। ও হ্যাঁ, কী করে রাজপাট হারাল সেই কথাই তো বলা হয়নি। তার আগে রাজপাট তৈরির গল্পটা বলি। ডোমজুড় পর্যন্ত ট্রেন চালু হল। আশির দশকে এই রুটে ডোমজুড়ই ছিল শেষ স্টেশন। ফলে ডাবল প্ল্যাটফর্মের স্টেশন। দুই প্ল্যাটফর্মের সংযোগে ওভারব্রিজ। ডোমজুড় জমজমাট এলাকা। অনায়াসে পুরসভা ঘোষণা করা যায়। সে কথা উঠেও ছিল কিছুদিন আগে। ট্রেন চালু হতে বহু যাত্রীর আগমন শুরু হল। আশপাশের এলাকা থেকেও লোক আসতেন। তাঁদের সাইকেল রাখার জন্য দোকান তৈরি হল। দু’চারটে দোকানদানিও হল। স্টেশন তখন গমগম করত।

মতিঝিলের কাছে সেই শুকনো শরবন।

কিন্তু কিছু যাত্রী এবং ডোমজুড়বাসী দাবি তুললেন, মূল জনপদের কাছে একটা স্টেশন করতে হবে। ডোমজুড় স্টেশনটি একেবারে নির্জন জায়গায়। যাতায়াতের অসুবিধে। একমাত্র ভরসা সাইকেল। আশির দশকে কতজনের আর বাইক ছিল! তখন অটো, টোটোই বা কোথায়? বাকি ভরসা বাস।

লোকজনের দাবি মেনে তৈরি হল নতুন স্টেশন। ডোমজুড় রোড। জনপদের একেবারে বুকের উপরে। যাত্রীরা রাতারাতি ডোমজুড় ছেড়ে চলে এলেন রোডে। যাত্রী নির্ভর দোকানগুলো বন্ধ হল। স্টেশন হয়ে গেল পরিত্যক্ত। লোক উঠত দু’চারজন। স্টেশনটা শুধু যাত্রী হারাল তাই নয়, পরিচয়হীনতাতেও ভুগতে শুরু করল। দু’টো ডোমজুড় স্টেশন। লোকে বোঝার সুবিধের জন্য পুরনো স্টেশনকে বলতে শুরু করল মতিঝিল। ওই তারাপদ দে উদ্যানের কাছে একটা ঝিলের নামে নামকরণ। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে আমরা কলেজ যাত্রী। রেলের গল্প শুনতে শুনতে যেতাম।

লোকমুখে মতিঝিল।

এখন রুট বেড়েছে। লাইনে যাত্রী বেড়েছে। ট্রেন বেড়েছে। এলাকাটা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। কিন্তু ডোমজুড় স্টেশনের সুদিন আর ফেরেনি। তবে স্টেশনটার একটা গুরুত্ব আছে। সেটা রেল কর্তৃপক্ষের দিক থেকে। এখানে ক্রসিং হয়। কারণ বালিটিকুরির পরে আমতার দিকে এটাই প্রথম ক্রসিং।

স্টেশনের গৌরব তো যাত্রী। তাঁরাই না থাকলে ক্রসিং ধুয়ে জল খেয়ে কী হবে!

আমতা লাইনের মালগুড়ি

স্টেশনটায় দু’বার থামত ট্রেনগুলো। থামতে বাধ্য হতো। ট্রেনের মাপের থেকে প্ল্যাটফর্ম যে লম্বায় দু’এক কামরা ছোট! তাই আরেক বার থেমে শেষ কামরার যাত্রীদের নামিয়ে দিতেন ট্রেনের চালক-গার্ডেরা। কতজন আর নামত! এক বা দু’জন। তবুও থামত দু’বার। কলেজে যাওয়ার সময়ে ভারী আমোদ পেতুম আমরা, বন্ধু, বান্ধবীরা।

হাওড়া-আমতা রেল রুটের ঝালুয়ারবেড়। ভারী অদ্ভুত স্টেশন। এরকম অদ্ভুত স্টেশন এই রুটে আরও রয়েছে। এগুলো কেন করা হয়েছিল তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে রেলের কর্তাব্যক্তিদের মাথাটা ফুটোস্কোপ দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে। যেমন দক্ষিণবাড়ি। মাঠের মাঝে স্টেশন। দু’দিকে চাষের জমি। তার মাঝে বুরবকের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্টেশন করেছেন কর্তারা। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর জন্য রাস্তা করতে ভুলে গিয়েছেন। কাছাকাছি জনপদও নেই যে লোকে ট্রেন ধরতে আলপথ, খালপথ ধরে হাঁটবে। স্টেশনের সবচেয়ে কাছের পাড়ার খুব কাছেই বাসরাস্তা। তাই ট্রেন ধরতে লোকজন তেমন আসত না। এখন দু’চারজন যাত্রী মান রক্ষা করছেন।

যেন কোনও বনপথের ট্রেন।

আরেকটি স্টেশন মহেন্দ্রলাল নগর। রামকৃষ্ণের চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকারের নামাঙ্কিত। মুন্সিরহাট স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে পুরো গতি নিলেই চালকের কামরা মহেন্দ্রলালে গিয়ে ঠেকে। এত কম দূরত্বে দু’টো স্টেশন, দু’টো পরিকাঠামো চালানোর খরচ। রেল নাকি লোকসানে চলে!

এই তিনটি অদ্ভুত স্টেশনের মধ্যে ঝালুয়ারবেড়কেই ভাল লাগে। দু’বার থামে বলে নয়। স্টেশনের নির্জনতার জন্য। আপ ট্রেনে গেলে প্রথমে বিশাল একটা বাঁশবন পড়বে। সেই বনের ভিতরে দেখা যাবে একটা দু’টো বাড়িও। সেগুলো দেখে শহুরে মানুষের স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগবে, থাকে কী করে এরা! রাতে ঘরে সাপখোপ ঢুকে পড়ে না? জন্তুজানোয়ারও তো থাকতে পারে! বাঁশবন আর জঙ্গল পার হয়ে স্টেশন। তার দু’প্রান্তে দু’টো রাস্তা। দু’টো রাস্তার পাশেই গাছপালা ভর্তি। প্ল্যাটফর্ম ছাড়ালেই টিকিট ঘর। তার পাশে একটা শিব মন্দির। মন্দির মানে একটা বিশাল শিবলিঙ্গ। মন্দির আর শিবলিঙ্গ অভেদ। প্ল্যাটফর্মের উল্টো দিকেও জঙ্গল। বেশ ঘন। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া কোনও বাঙালি ছোট খোকা সেই জঙ্গল দেখে বলে উঠতেই পারে, মাম্মা, জাঙ্গলে কি টাইগার লিভ করে?

বাহারি নাম। বাহারি স্টেশন।

বহুদিন হল কলেজ ছেড়েছি। শহরে আসতে হয় রুজির টানে। প্রায় দিনই পার হই ওই স্টেশনটা।ট্রেনে বাসে ঘুম এখন আমার কাছে অত্যাবশ্যক। তবুও ঝালুয়ারবেড় পর্যন্ত জেগে থাকার চেষ্টা করি। একাবার দেখে নিলে ভাল লাগে। এই তো সেদিন স্টেশনের উল্টোদিকের জঙ্গলে দেখলুম, অনেক মাকাল ফল হয়ে রয়েছে। লাল টুকটুকে। কিন্তু কোনও কাজে লাগে না। খুব একটা বদল দেখিনি ঝালুয়ারবেড়ের। যাত্রী সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু আহামরি কিছু নয়। প্ল্যাটফর্ম লম্বা হয়েছে। ফলে ট্রেন একবারই থামে। একটা যাত্রী শেড হয়েছে। ক্ষয়াটে সিমেন্টের বেঞ্চের বদলে চকচকে বসার জায়গা। বাদ বাকি সব একই রকম। এখনও বাঁশবাগান, লতাগুল্ম, গাছে, ঝোপে নির্জন। নিঝুম, একাকী। কলেজ কালে নেমে পড়তে ইচ্ছে হতো প্রতিদিন। কিন্তু ট্রেন কম। পরের ট্রেন ছিল ঘণ্টা দুয়েক পর। তাছাড়া এক বান্ধবীর বাড়িতে খুব কড়াকড়ি ছিল। জেঠু স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতেন মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সব কার্যকারণের যোগফল? নামা হতো না।

স্টেশনের উল্টোদিকে। বাঘও থাকা অসম্ভব নয়।

মালগুড়ি স্টেশনের মতো মনে হয় ঝালুয়ারবেড়কে। কিংবা তার থেকেও নির্জন। মালগুড়ি ডেজ’এর মালগুড়ি। স্বামী আর তার বন্ধুদের মালগুড়ি। লেখক-স্বামীর বন্ধুরা এখন কেউ বা মাস্টার, কেউ ঘোর সংসারী। কিন্তু এখনও ট্রেন থামলে রোজ নেমে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, দুপুরটা যদি স্টেশনে কাটানো যেত! নিঝুম, একাকী স্টেশনে একক যাত্রী। কিন্তু সেই কার্যকারণ। সিমেন্টের বেঞ্চ, ঝোপঝাড়, বাঁশবাগান পেরিয়ে ট্রেন শহরের দিকে ছোটে। দায়বদ্ধ সে ছুটে চলা।

অনাবশ্যক ভাবনা এড়াতে চোখ বুজি।

যে জন রয়েছে মাঝখানে

স্টেশনটার নামের অর্থ জানি না। তাই উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ নিয়ে নীরবতা হিরন্ময় ধরতে পারেন। বা কাঁসা-পিতল। বলতে না পারার অগৌরবে। তবে নামের কাছাকাছি একটা শব্দ জানি। ডাঁসা। তা থেকেই হয়তো ডাঁসি। ডাঁসার আবার দু’টো অর্থ হয়। এক, আধ কাঁচা, আধ পাকা। দুই, দেওয়াল বা খাটের ধারক দণ্ড। এই লেখায় প্রথম অর্থটি সুপ্রযুক্ত হবে। ডাঁসা থেকে ডাঁসি। আধ পাকা এক এলাকা।

নামফলক।

স্টেশন হাওড়া-আমতা লাইনে। হাওড়ার দিক থেকে গেলে সাঁতরাগাছির পরে বাঁকড়া নয়াবাজ, কোনার পরের স্টেশন। এই স্টেশনটি গ্রাম আর শহরের অদ্ভুত ‘বাফার জোন’। এর একদিকে শহর ঠেলে ঠেলে আসছে। একেবারেই কাছেই ‘কলকাতা ওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল সিটি’। সালিম গোষ্ঠীর সেই অর্ধসমাপ্ত আবাসন প্রকল্প। জমি আন্দোলনের সময়ে যে জায়গা নিয়েও গন্ডগোল বেধেছিল। দাবি উঠেছিল, এই জায়গাটিও নাকি দোফসলি। যদিও ছোটবেলা থেকেই জায়গাটিকে জঙ্গলাকীর্ণ দেখেছি। এখনও তার ছাপ রয়েছে অর্ধসমাপ্ত সালিম প্রকল্পের চারপাশে। তবে জায়গাটি এখন হাতবদল হয়েছে। অন্য কোনও শিল্পগোষ্ঠী আবাসন তৈরি করছে। আবার কাজ শুরু হয়েছে। রেললাইন আর জলার পাশ দিয়ে রাস্তা তৈরি হচ্ছে।

কাছাকাছির বসতি।

আবাসনের প্রায় পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দিল্লি রোড। বড় রাস্তা তৈরি হলে পাশের অঞ্চলগুলোর পরিবর্তন হয়। রাস্তা তৈরিই উন্নয়নের মাপকাঠি ধরেন কেউ কেউ। কিন্তু সেই উন্নয়ন এগোতে পারেনি ডাঁসির দিকে। তবে চেষ্টা যে হয়নি, তা কিন্তু নয়। সড়ক পেরিয়েই, স্টেশন আর সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় তৈরি হয়েছে কারখানা। বেশ বড়। অবাঙালি মালিকাধীন কারখানা। সে কারখানার ভিতরের মন্দির দেখলেই মালুম হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। শহর গিয়েছে থমকে।

হাওড়া যেতে স্টেশনের বাঁদিকে।

ডাঁসির আরেক দিকের, মানে আমতার দিকের, স্টেশন হল ঝালুয়াড়বেড়। বড় সুন্দর স্টেশন। আমার মনে হয়, হাওড়া-আমতা লাইনের মালগুড়ি। নির্জন-সুন্দরী বা সুন্দর। ঝালুয়াড়বেড় থেকে ডাঁসির দিকে এগোলে বাঁশঝাড়, জঙ্গল, বাগান, বসত, চাষের মাঠ। একেবারে জীবনানন্দের রূপসী বাংলা। ভাটফুল, ডুমুর গাছের বড় পাতাটির নীচে ভোরের দয়েল পাখি, সব মিলবে।

সেই কারখানা।

শহরকে ঠেকিয়ে রেখে, গ্রামের সৌন্দর্য শরীরে মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ডাঁসি। সে-ও প্রতিবেশী ঝালুয়াড়বেড়ের মতো খুব একটা স্মার্ট নয়। গাঁইয়াই বলা যায়। প্ল্যাটফর্মের গায়েই ঝোপঝাড়, গাছপালায় ভরা। টিকিট কাউন্টারের সামনে একটা আমগাছ। প্রতি বছর নিয়ম করে ঝেঁকে বউল আসে। বসন্তের আগমন ঘোষণা করে। সেই কলেজে যাতায়াতের সময় থেকে দেখছি। একটা আমড়া গাছও আছে কী? টিকিট খিড়কির পাশেই জলা জমি। তাতে হোগলা, বর্মা শাকের সঙ্গে কত জলজ উদ্ভিদ। জলা জমির পাশ দিয়ে রাস্তাটা স্টেশন আর বসতকে যোগ করেছে। ভারী বর্ষায় মাঝে মাঝেই জল উঠে যায় রাস্তায়। একবার টিকিট কাউন্টারের সামনেও জল থইথই দেখেছি।

আন্তর্জাতিক শহর।

প্ল্যাটফর্মের উল্টোদিকে পুরো জলা জমি। নাম না জানা জলজ উদ্ভিদ। সেসব পেরিয়ে পাড়ার আভাস। যাত্রী খুব বেশি ওঠা-নামা করে না। দিনে পাঁচ জোড়া ট্রেনের যাতায়াতেই যা একটু মুখর হয় স্টেশন।

আর গরম কালে কিছু লোক প্ল্যাটফর্মে, টিকিট খিড়কির সিমেন্টের বেঞ্চে দিবানিদ্রা দেয়। চারপাশ খোলা। উজাড় করা দখিনা বাতাস। গাঁয়ের বাতাস।

হোগলা বন। স্টেশনের কাছেই।

শহরকে এগিয়ে আসতে না দেওয়ার বাতাস।

একাকী স্টেশন

জমিদারদের কিছু কিছু কাজ বোঝা মুশকিল ছিল। সেসব টাকার গরমে খেয়ালি খেলা। যেমন দুম করে মেয়ের পুতুলের বিয়েতে যগ্যিবাড়ির আয়োজন। রেল কোম্পানির কিছু কিছু কাজও বোঝা খুব মুশকিল। স্টেশনে নতুন পাতা টালি। বয়স এক বছরও হয়নি। হঠাৎ একদিন দেখলেন, খুঁড়তে লেগেছে। অন্যরকম টালি বসাবে। তাতে নাকি যাত্রী হড়কাবে কম। জমিদার আর রেল, দু’জনেরই এমন খেয়ালখুশির ক্লাবের মোচ্ছবের উৎস কিন্তু এক। জনগণের টাকা।

হাওড়া-আমতা রুটে রেল কোম্পানির এমন খেয়ালি নিদর্শন মেলে। দক্ষিণবাড়ি স্টেশন। ডোমজুড়ের পরে, বড়গাছিয়ার আগে। এই জায়গায় কেন যে স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল তার কোনও ব্যাখ্যা নকশা প্রস্তুতকারক বাস্তুকার দিতে পারবেন না। নিশ্চিত। নামে দক্ষিণবাড়ি। দক্ষিণ তো দূরের কথা, উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম, নৈঋত, বায়ু, কোনও কোণেই বাড়ি দেখতে পাবেন না। দু’দিকেই ধূ ধূ ফাঁকা মাঠ। জনবসতি বলতে সেই বাদামপুর। নয়তো রাজাপুর-দক্ষিণবাড়ি বাস স্টপের কাছে। সে সব অনেকটাই দূরে।

নামফলকের মতোই অবস্থা স্টেশনের।

এমনিতে দক্ষিণবাড়ি জায়গাটাই একটু কম বসতি পূর্ণ। ডোমজুড় ঘনবসতি। একবার পুরসভা হবে বলেও খবর হয়েছিল। আরেক দিকে বড়গাছিয়াতেও যথেষ্ট লোকের বাস। কিন্তু বাস স্টপ ছাড়িয়ে গেলেই রাস্তার দু’ধার ফাঁকা। এখন তো তবু কিছু কারখানা হয়েছে। আগে তা-ও ছিল না। ফলে ডোমজুড় থানা এলাকায় অবস্থিত হয়েও শহরটাকে বাড়তে দেয়নি দক্ষিণবাড়ির বাফার জোন। এই জায়গায় সেই আশির দশকে স্টেশন তৈরির কথা ভেবেছিলেন কোন উর্বর মস্তিষ্ক? কে জানে!

স্টেশনের উল্টোদিকে।

ও হ্যাঁ, রেল কোম্পানি স্টেশন তৈরি করেছে বটে, কিন্তু রাস্তা তৈরি করতে ভুলে গিয়েছে। আলপথ, রেল বাঁধের পাশ দিয়ে কোনও রকমে যাতায়াত। ফলে যাত্রী কম। ১৯৯৬ সাল নাগাদ কলেজ যাওয়ার সময় দেখতাম, দু’জন ট্রেনে উঠতেন। এখন অফিস যাওয়ার সময়ে দেখি, ছ’জন ট্রেনে উঠছেন।

যাত্রী বৃদ্ধির হার মোদী সরকারের জিডিপি বৃদ্ধির হারের থেকেও খারাপ।

(সমাপ্ত)

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *