অন্য সফর বিশেষ ভ্রমণ

এক রাতে তিন জেলার পুজো

বিভাস বাগ

পুজোর সময়ে বাড়ি থেকে পালাই, প্রতি বছর। প্রতি বছর মানে বেশ কয়েক বছর ধরে এটাই চলছে আমাদের। আমাদের মানে ‘যথা ইচ্ছা তথা যা’ গ্রুপের। ওহ্! আমাকে তো চিনতে পারছেন না? ওই যে দীপু, ইন্দ্রদা, গার্ডবাবু, বড়দার লেখায় যাকে ‘ছোটা ডন’ বলে লেখা হয়, আমিই সেই ডন। অনেক সময়ে বাবলা বলেও লেখা হয়। ওটা আমার ডাকনাম।

এ বছরও পালিয়ে যাওয়ার রীতি বজায় রেখেছি আমরা। সপ্তমীর দিন ভোরে রাজ্যরানি ধরে বাঁকুড়া। সেখান থেকে ঝিলিমিলি। জঙ্গলের মাঝে, তবে রাস্তার ওপরে একটা ঘর জোগাড় করা হয়েছিল কোনও মতে। সন্ধের পরে জঙ্গলে ঢোকা যায় না। ঘরে বসে একটানা আড্ডাও দেওয়া যায় না। আমরা ছিলাম ঝিলিমিলি বাজার থেকে এক কিলোমিটারের বেশি দূরে পোড়াডি নামে একটা জায়গায়। সন্ধের পরে সেখানে জায়গায় জায়গায় আলো। বাকিটা অন্ধকার। জায়গায় জায়গায় বলতে আমরা যে হোটেলটায় আশ্রয় নিয়েছি তার পাশে দু’তিনটে দোকান। পোড়াডি মোড়ে কয়েকটা দোকান। আর হোটেল থেকে কিছুটা দূরে আরেকটা মোড়। সেখানেও দোকান আছে দু’তিনটে। ওই জায়গাগুলোতেই যা একটু আলো। কিন্তু সে আলো রাস্তা পর্যন্ত ছিটকে এলেও অন্ধকার খুব একটা কাটে না। আলো-ছায়ার মতো দেখায়।

বাঁশডিহার পুজো।

প্রথমে ঠিক হল, হেঁটে হেঁটে জঙ্গলময় গ্রামের অন্ধকার বোঝা হবে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাব ঝিলিমিলি বাজারে। বেরনোর সময়ে দীপু প্রস্তাব দিল, ‘জঙ্গলমহলে পুজো কেমন হয় সেটা তো দেখা যেতে পারে?’ ভাল প্রস্তাব। বড়দা লুফে নিল। জিজ্ঞাসা করা হল আমাদের ঘরের মালিক মনোরঞ্জনদাকে। উনি জানালেন, এই এলাকায় চারটে পুজো হয়। কোনও টেম্পো বা অটো ভাড়া করে আমরা ঘুরতে পারি। উনিই এক অটোচালককে ফোন করলেন। কিন্তু তিনি দর হাঁকলেন ৪০০ টাকা। চারটে পুজো দেখতে অটোয় এত টাকা খরচের কোনও মানে নেই। আমরা হেঁটে যতটা পারি ঘুরব বলে ঠিক হল।

হাঁটতে হাঁটতে মোড়ের মাথায় চলে এসেছি। তখন ইন্দ্রদার খেয়াল হল, সকালে যাঁর গাড়িতে ঝিলিমিলি বাজার থেকে পোড়াডি এসেছিলাম তাঁকে একবার ফোন করে দেখা যেতে পারে। ইন্দ্রদা ফোন করল। দর কষাকষিতে তো ও সেরা। কিন্তু ওপার থেকে দর এল হাজার টাকা। আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। মোড় থেকে কিছুটা এগিয়েছি। ফিরতি ফোন এল। আমাদের ৪০০ টাকা দরেই তিনি রাজি।

আনন্দ তো এদেরই।

পোড়াডি মোড়ে অপেক্ষা করছিলাম গাড়ির জন্য। তখনই দীপুর নজরে এল আধুনিক মাইল-বোর্ডটি। মোড়ের দু’মাথায় দু’টো। একটাতে লেখা বাঁশপাহাড়ি পাঁচ কিলোমিটার। আরেকটাতে সাড়ে তিন কিলোমিটার। ব্যাপারটা কী! চার পা ফেলার পরেই দেড় কিলোমিটার কমে যাচ্ছে কেন? বড়দা বলল, একটা শীতকালে মেপেছিল। আরেকটা গরমকালে। তাপমাত্রার কম বেশিতে স্কেলের মাপ কমেছে-বেড়েছে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরে গাড়ি এল। চালকের নাম শিবু হেমব্রম। কাছেই রাউতোড়া গ্রামে বাড়ি। বাচ্চা ছেলে। শিবু প্রথমে নিয়ে গেল বাঁশডিহা গ্রামে। আমরা যেখানে উঠেছি সেই জায়গা থেকে বেশি দূরে নয়। তা-ও দেড় কিলোমিটার তো হবেই। রাস্তা থেকে একটু ভিতরে পুজো মণ্ডপ। রাস্তার পাশে টিউব লাইট লাগানো। কিন্তু একটা আবছা অন্ধকার রয়েছে। বাঁশডিহার পুজোমণ্ডপ মোটামুটি ভালই। রংচং আছে। লোকজন রয়েছে। একচালায় সপরিবারে দুর্গা। আলো দিয়ে বেশ সাজানো। এ রকম পুজো আমাদের গ্রামেও হয়।

গাছতলার সেই আড্ডা। বসে পড়েছিলাম আমরাও।

বাঁশডিহা থেকে বেরনোর সময়ে বড়দা শিবুকে বলল, রাস্তার পাশে যেখানে অনেক লোক বসে আছে সেখানে যেন একবার গাড়ি থামায়। ও অনেকক্ষণ ধরে বড়দা বলছি, চিনতে পারছেন না তো? ইনি আমাদের ক্যাপ্টেন, দীপক দাস। ইন্দ্র আর দীপু অবশ্য বড়দা বলে না। বুড়োটা বলে। আসলে ওদের ক্যাপ্টেন্সির দিকে নজর। তাই ক্যাপ্টেনকে বুড়ো প্রমাণ করে নেতা হতে চায়। আমি বুড়ো বলি না। এক  সময় বড়দার কাছে পড়তাম। অঙ্ক করাতে গিয়ে যা পিটিয়েছে! সেসব কথা মনে করে বুড়োটা বলার সাহস নেই। দীপুও বড়দার কাছে পড়েছে। তবে সে অনেক পরে। তখন বড়দা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

গাড়ি থামল গাছতলায়। একটা অশত্থ গাছ। গোড়াটা একসময়ে বাঁধানো ছিল। এখন পাঁজরা বেরিয়ে পড়েছে। গাছের দিকে পাকা রাস্তা। যে রাস্তাটা পুজো মণ্ডপের দিকে গেছে সেটা ঢালাই করা। গাছের নীচে ঢালাই রাস্তার ওপর বসে অনেক লোক আড্ডা মারছেন। আমরা ছবি তুলতে শুরু করলাম। একটা লোক খালি গায়ে বসেছিলেন। ছবি তোলা হচ্ছে দেখে তড়িঘড়ি গেঞ্জি গলিয়ে নিলেন। আমরাও গাছতলায় বসলাম। দীপু কথা বলছিল লোকগুলোর সঙ্গে। ওঁরা রোজই রাত ১১টা পর্যন্ত আড্ডা মারেন। শুনে খুব ভাল লাগল। আড্ডা তো এখন উঠেই গেছে। কিন্তু দারুণ জিনিস। আমাদের খুব প্রিয়। কিন্তু মঙ্গলবার ছাড়া সুযোগ হয় না। এখানে আড্ডার পরিবেশটাও বেশ রোমাঞ্চকরই হবে। এখন পুজো বলে আলো জ্বলছে। অন্য সময়ে ল্যাম্পপোস্টে একটা কমজোরি আলো জ্বলে। সেটার আলো গাছতলা পর্যন্ত খুব একটা এসে পৌঁছয় না। আড্ডা মারতে বেশ ভালই লাগে।

জবলা সর্বজনীন।

এর পর গাড়ি গেল জবলা সর্বজনীনে। এই পুজোটা একেবারেই ছিমছাম। আলোগুলো অনুজ্জ্বল। লোকজন তেমন নেই। এখানেই দেখা হয়ে গেল সমরেশ মণ্ডলের সঙ্গে। গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য। সমরেশবাবু অকপটে স্বীকার করলেন, গরিব গ্রামের পুজো। আমরাই কোনও মতে চাঁদা তুলে পুজোটা করি। পাশে একটা কাঁচা উনুন দেখলাম। সদ্য কাদা দিয়ে তৈরি। কী হবে এখানে? সমরেশবাবু বললেন, দশমীর দিন জিলিপির দোকান বসবে। দেখলাম মণ্ডপের কাছাকাছি আর কোনও অস্থায়ী ছাউনি বা কাঁচা উনুন নেই। তার মানে একটাই দোকান হবে। এটাই পুজোর বিনোদন গ্রামবাসীদের। জবলা আর বাঁশডিহা, দু’টোই বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকের মধ্যে পড়ে।

গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। শিবু বলল, ‘‘এবার আমরা যাচ্ছি কুইলাপাল। কুইলপাল বান্দোয়ান থানার মধ্যে পড়ে। জেলা পুরুলিয়া।’’ শুনেই বড়দা বলল, ‘‘বলো কী শিবু! এক রাতে দুই জেলার ঠাকুর দেখে নেব?’’ শিবু বলল, ‘‘বাঁশপাহাড়ি ঝাড়গ্রাম জেলায় পড়ে।’’ শুনে তো আমাদের কী আনন্দ। তিন জেলার ঠাকুর এক রাতে। ওহ, পুজোর অভিযান যে জমে গেল।

কুইলাপাল অভিযান।

জবলা থেকে কুইলপাল যাওয়ার রাস্তা দারুণ রোমাঞ্চকর। চারিদিক অন্ধকার। দু’পাশে রোড মার্কারের আলোগুলো গাড়ির হেডলাইটের আলোয় শুধু জ্বলছে। ভিডিও করা হল। অন্ধকার দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম কুইলাপাল। এখানের পুজোটা বেশ বড়ই বলে মনে হল। বড় গেট। আলোর কায়দা। চণ্ডীমণ্ডপটাও বেশ ঝকঝকে। মণ্ডপের সামনে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেওয়া আছে। বার্তায় ছবি এঁকেছেন চণ্ডী লাহিড়ী, বড়দা বলল। এটা বাজার এলাকা। মণ্ডপে ঢোকার আগে মাঠে দু’তিনটে সিমেন্টের ছাউনি করা। ছাউনির মধ্যে সিমেন্টের নিচু নিচু পাটাতন। একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, এখানে হাট বসে। মণ্ডপের সামনে কয়েকটা বাচ্চা খেলছিল। বেশির ভাগেরই পরনে নতুন পোশাক নেই। ছবি তোলা হচ্ছে দেখে ওরা দীপুকে ধরেছিল। আমরা তখন ঘটনাস্থলে ছিলাম না। বাচ্চাগুলো দীপুকে বলেছিল, ছবিগুলো ছাইড়ে দিতে। কিসে ছাড়তে হবে তা বলেনি। মনে হয় ফেসবুকের কথাই বলেছিল। কুইলাপাল বাজার এলাকায় পুজো। তাই বোধহয় একটু বেশি জমকালো। আলোর কায়দা আছে অনেক।

কুইলাপালের পরে ঢুকে পড়লাম বাঁশপাহাড়ি। এটা ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুর ২ ব্লকে পড়ে। এই পুজোটাও ভাল। প্রতিমা ছিমছাম একচালা। আলোর জোর আছে পুজোতলায়। আর জোর আছে মাইকের। তাতে নানা রকম প্রতিযোগিতার কথা ঘোষণা করা চলছে। সুন্দর চাঁদ উঠেছিল সেদিন। ইন্দ্রদা নতুন ক্যামেরা কিনেছে। অনেক দামি ক্যামেরা। হঠাৎ দেখি মণ্ডপের পাশে দাঁড়িয়ে একটা গাছের ডালের উপরে আটকে থাকা চাঁদের দিকে তাক করেছে। করেই আছে। সবাই মিলে খোঁচাতে শুরু করলাম, “কি গো বিক্রমকে খুঁজছো নাকি? তোমার থেকে ইসরোর ক্যামেরার অনেক দাম। ওরা পায়নি। তুমি পাবে!”…

কুইলাপালের পুজো।

ঠাকুর দেখে ফুচকা খেতে লাইন দিয়েছিলাম। রাস্তার পাশেই স্টল। হঠাৎ একজন এসে বড়দার কাঁধে টোকা দিয়ে বলল, “কেমন আছেন?” আমরা তো অবাক। এখানেও বড়দার চেনাজানা! কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। তখনই নজর পড়ল লোকটার কোমরের দিকে। একটা রাইফেলের বাট দেখা যাচ্ছে। কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। তাদেরই কেউ? বড়দা বলল, “আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।” সাদা পোশাকের লোকটা বলল, সে নাকি কোনও এক বাহিনীর কম্যান্ডান্ট। দুর্গাপুর থেকে আসছে রাস্তায় বারবার গাড়ি খারাপ হচ্ছে। এখানেও হয়েছে। লোকটা বারবার বড়দাকে বলছিল, “বলুনই না কেমন আছেন?” বুঝলুম উৎসবের মরসুমে লোকটা জোশে আছে। আমাদের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে লোকটা চলে গেল। আমরা বলছিলাম, বড়দা তোমাকে নিশ্চয়ই মাওবাদী কোনও কমান্ডারের মতো দেখতে। এখখুনি তুলে নিয়ে গেলেই হয়েছিল। ফুচকা খাওয়ার শেষে দেখলাম, সেই কম্যান্ডান্ট একটা দোকানের সামনে চেয়ারে বসে ঘুমোচ্ছে। তরলের জোস শেষ।

কুইলাপালে দীপুর সেই মডেলরা।

বাঁশপাহাড়ি থেকে ফিরে এলাম ঝিলিমিলি। ওখানেও একটা পুজো হয়। পুজো উপলক্ষে একটা মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। সেখানে ভক্তিমূলক কিছু অনুষ্ঠান চলছে। এই এলাকায় পুজোর একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রায় প্রতিটি মণ্ডপের পাশে একটা গোল মতো চারিদিক খোলা ছাউনি রয়েছে। সেটা পাকাপোক্ত। ওখানে বোধহয় মিটিংটিটিং হয়।

বাঁশপাহাড়ির পুজো।

আজ সারাদিন বাস যাত্রা করেছি। রাত সাড়ে আটটার মধ্যেই শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার উপর সারা সন্ধে এই তিন জেলা জুড়ে ঠাকুর দেখা। ঝিলিমিলিতে গাড়ির মালিকের দোকান থেকে ডিম সেদ্ধ খেয়ে ঘরে ঢুকে পড়লাম।

ঝিলিমিলির পুজো ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

ছবি- ইন্দ্রজিৎ সাউ ও দীপশেখর দাস

কভারের ছবি- কুইলাপালের পুজো।

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *