অন্য সফর ইতিহাস ছুঁয়ে বিশেষ ভ্রমণ

ক্ষুদিরামের গুহার সন্ধানে

পার্থ দে

কথায় বলে, যেখানে দেখিবে ছাই…উড়াইয়া দেখো তাই…।

ঘর হতে দুই পা ফেললে আশেপাশে কত কী দেখা ও জানা যায়। আমরা পাঁচ বন্ধু বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম সেই অমূল্যরতনের সন্ধানে।

বারিকুল-ঝিলিমিলি রাস্তার পাশে শাল-পলাশ-মহুয়ার জঙ্গলে ঘেরা গ্রাম ছেঁদাপাথর। শহিদ ক্ষুদিরামের স্মৃতি বিজড়িত বাঁকুড়া জেলার বারিকুল থানার অন্তর্গত এই গ্রাম। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি সূত্র অনুযায়ী, স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরাম বসু ১৯০৮ সালে এই গ্রামেই কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। স্থানীয় মতে, ছেঁদাপাথরের গভীর জঙ্গলের মধ্যে এই পাহাড়ের গুহায় এসে তিনি কিছুদিন লুকিয়ে ছিলেন। সেই গুহার ভিতরে বসে তিনি বোমা বাঁধতেন এবং গোপন বৈপ্লবিক কাজকর্ম করতেন। ইতিহাস গবেষক সুদর্শন সেনের মতে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মুগবেড়িয়ার সুবিখ্যাত ‘নন্দ’ পরিবারের জমিদারি ছিল বাঁকুড়ার ওই ছেঁদাপাথর গ্ৰামে। এই নন্দ পরিবারের সঙ্গে বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাই এই নন্দ পরিবারই আত্মগোপন করে নিভৃতে সশস্ত্র কাজকর্ম চালানোর জন্য ক্ষুদিরামকে ওখানে পাঠান।

ফুলকুসুমা থেকে ছেঁদাপাথর যাওয়ার পথ।

ফুলকুসুমা থেকে ছেঁদাপাথর যাওয়ার জঙ্গল পথটি বড়ই সুন্দর ও নির্জন। ছেন্দাপাথর হাইস্কুলের কাছেই রাস্তার ওপরে ত্রিপুরা মাহাতোর বাড়ি ও দোকান। ওঁকে বলতেই এক কথায় রাজি। আমাদের বাইকের পেছনে বসে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন গাইড ত্রিপুরাবাবু। কিছুটা পিচ রাস্তা তারপর বাইক রেখে আরও কিছুটা হাঁটা পথে বনবাদাড় সরিয়ে এসে পৌঁছলাম সেই পরিত্যক্ত গুহার সামনে। গাইডবাবু তাঁর শীর্ণকায় শরীর নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়লেন একটা গুহার মধ্যে। আমাদের ভেতরে ঢুকতে বললেন। কিন্তু আমাদের ‘ফ্যামিলি প্যাক বডি’। তাই আর কারও পক্ষে ওই ভাবে গুহার মধ্যে ঢোকা সম্ভব ছিল না। না এখানে ক্ষুদিরামের কোনও স্মৃতিচিহ্ন নেই। তাছাড়া সাপখোপ থাকতে পারে। আমরা তাই ভেতরে ঢুকলাম না। খাদানে বৃষ্টির জল জমে নীলাভ বর্ণ ধারণ করেছে।

গাইডবাবু আমাদের কিছু অজানা তথ্য জানালেন…

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে, ভারতের একটি কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে এই জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলটি কিনে নেয়। তারা ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটিয়ে গুহার মধ্যে তন্নতন্ন করে কোনও কিছুর সন্ধান চালায়। কিন্তু তেমন কিছুই পাওয়া যায় নি। হতাশ হয়ে তারা অন্য একটি কোম্পানিকে বিক্রি করে দেয়। সেই কোম্পানি ভাঙা পাথর বা স্টোন চিপসের ব্যবসা শুরু করে। বর্তমানে জায়গাটি একটি পরিত্যক্ত পাথর খাদানে পরিণত হয়েছে। বর্ষার জল জমলে লেকের মতো দেখতে লাগে।

সেই গুহা। এখন পাদর খাদান।

ক্ষুদিরামের স্মৃতিতে ২০০১ সালে রানিবাঁধ পঞ্চায়েত সমিতির তরফে ছেঁদাপাথরে তৈরি করা হয় শহিদ ক্ষুদিরাম উদ্যান। সেখানেই একটি দ্বিতল পর্যটক আবাস নির্মাণ করা হয়। উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের তৎকালীন অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী উপেন কিস্কু। চালু হওয়ার পর এই পর্যটক আবাসের দেখাশোনা করতেন ছেঁদাপাথর গ্রামের বাসিন্দা ত্রিপুরা মাহাতো। প্রায় বিনা বেতনে বেশ কিছুদিন তিনি আবাসের কেয়ারটেকারের কাজ করেছেন। উদ্বোধনের পর কিছুদিন পর্যটক আবাসটি খোলা ছিল। তারপর থেকেই বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের এই এলাকার পরিবেশ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ দেখে ভ্রমণ পিপাসু বাঙালি পর্যটকরা আর জঙ্গলমুখো হননি। ক্ষুদিরামের স্মৃতি বিজড়িত ছেঁদাপাথরেও তাই পর্যটকদের পা পড়েনি বললেই চলে। তার জেরেই উদ্বোধনের এক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় পর্যটক আবাসটি। টাকা পয়সা না পেয়ে ত্রিপুরা মাহাতো পর্যটক আবাসের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। তারপর থেকে বন্ধই রয়েছে এই আবাস। পরিবেশ বদলালেও এখনও খোলেনি পর্যটক নিবাস।

গুহার ভিতরে গাইডবাবু।

শেষে একটা কথা বলি…

অনেকে হয়তো ছবিগুলো ভাবেন, এটাকে আবার ট্যুরিস্ট স্পট বলে নাকি। আমি বলি কী ভাল ভাল জায়গায় তো সবাই যায়, একবার ঘুরে আসুন না সেইসব জায়গায় যেখানে পর্যটন অবহেলিত। হয়তো সেখানে আপনারা ফটোগ্রাফির ভাল লোকেশন পাবেন না, ছবি পোস্ট করলে 1K লাইক পাবেন না। কিন্তু আপনার একটা পোস্টের মাধ্যমেই ওই সব জায়গা প্রচারের আলোয় আসবে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষেরা কিছু উপার্জন করতে পারবে। ধীরে ধীরে যায়গাটির উন্নয়ন ঘটবে।

জানিয়ে রাখি:-

কলকাতা থেকে ঝিলিমিলি বা বাঁকুড়ার বাসে (ভায়া – শিলদা) প্রায় ৬ ঘণ্টায় ফুলকুসুমা নেমে গাড়ি ভাড়া করে জঙ্গলের রাস্তায় ১৫ কিমি দূরে ছেঁদাপাথর হাইস্কুল। ওখানে পৌঁছে থেকে ত্রিপুরা মাহাতোর সঙ্গে দেখা করুন। উনিই আপনাকে রাস্তা দেখিয়ে নির্দিষ্ট গুহায় পৌঁছে দেবেন। ওঁকে না পেলেও গ্রামের যে কোনও মানুষের সাহায্য নিতে পারেন। তবে নিজস্ব গাড়ি বা বাইক থাকলে সবচেয়ে সুবিধা।

ক্ষুদিরামের মূর্তি।

ছেঁদাপাথর থেকে ২০ কিমি দূরে ঝিলিমিলিতে লজ আছে। (ফোন – ৯৫৯৩০৩৯৬৮৮),

ওখান থেকে তালবেড়িয়া ড্যাম আরও ৮ কিমি।

রানিবাঁধ -২০ কিমি।

বারিকুল থানা– ৭ কিমি (ফোন – ৯০৮৩২৬৯৩৩২)

সুতান ফরেস্ট– ৭ কিমি।

লালজল গুহা– মূল রাস্তায় ৩৫ কিমি। গ্রামের ভিতরের রাস্তায় ১৫ কিমি।

বেলপাহাড়ি – ২৫ কিমি।

 

 

ছবি- লেখক

 

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *