বিশেষ ভ্রমণ ভিনদেশি ভ্রমণ

শরৎ উৎসবে অগ্নিবর্ষী পোকোনো

রাখী নাথ কর্মকার

অক্টোবরের হিমেল হাওয়ার তীক্ষ্ণ চাবুক খেতে খেতে এই মুহূর্তে আমরা ছুটে চলেছি পোকোনো মাউন্টেইন্সের ‘লেক ওয়ালেনপৌপকে’র উদ্দেশ্যে।

তা এই কনকনে ঠান্ডায় বাপু পাহাড় ঠেঙিয়ে লেক দর্শনের শখ জাগল কেন শুনি? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই— এই অক্টোবরের শীতার্ত বেলায় পোকোনো পাহাড়ের ঢাল-উপঢাল যে কী অসামান্য রঙের বিস্তারে নিজেকে সাজিয়ে তোলে-তা নিজের চোখে দেখে চক্ষু সার্থক করার এর চেয়ে মোক্ষম সময় বোধহয় আর হয় না!

রংবিসারি পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া সঙ্কীর্ণ রাস্তার একপাশ। একদিকের ঢালাও খাদে লাল হলুদের নিঝুম অভিসার আর আরেক পাশে সুউচ্চ পাহাড়ের শরীর জুড়ে লাল হলুদের উড়নি! আঁকাবাঁকা পথ জুড়ে ঝরে পড়া রঙিন ফুলেল পাতার রাশি আমাদের গাড়ির চাকার গতিতে ডানা মেলে হঠাৎই পাক খেতে খেতে আকাশ রাঙিয়ে দিতে শুরু করেছে!

‘লেক ওয়ালেনপৌপক’

পেনসিলভানিয়ার উত্তর-পূর্বের প্রশান্ত এক ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নামই হল পোকোনো মাউন্টেন্স। পোকোনো অঞ্চলে আসলে দুটি স্বতন্ত্র গিরিশ্রেণীর রাজ্যপাট চলছে -ব্লু (কিট্টাটিনি পর্বতমালা) আর পোকোনো পর্বতমালা। কাম্ব্রিয়ান যুগে তৈরি সুবিস্তৃত অ্যালেঘেনি মালভূমির ক্ষয়প্রাপ্ত, উঁচু, পার্বত্য এলাকা এই পোকোনো। যার পূর্বে ডেলাওয়র নদী উপত্যকা, ডেলাওয়র ওয়াটার গ্যাপ এবং পশ্চিমে রয়েছে ওয়োমিং উপত্যকা। আর উত্তরে যা লেক ওয়ালেনপৌপক থেকে শুরু করে দক্ষিণে লেহাই উপত্যকা পর্যন্ত প্রসারিত। এই পর্বতমালা বিখ্যাত ডেলাওয়র ওয়াটারগ্যাপে উন্মুক্ত হয়েছে যেখান দিয়ে বয়ে চলেছে ডেলাওয়র রিভার।

নেটিভ আমেরিকান ভাষায় পোকোনো শব্দের অর্থ ‘দুই পর্বতের মাঝে বহমান নদী’। যা এই ভৌগোলিক ও ভূতাত্বিক আবহমণ্ডলেরই ব্যঞ্জনা তুলে ধরে। কার্বন, ওয়েন, মনরো ও পাইক—এই চারটি কাউন্টি নিয়ে গঠিত, উদ্ধত অরণ্যের অনাস্বাদিত বন্যতায় উদ্বেল পোকোনো পার্বত্য এলাকার মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে অজানা রোমাঞ্চের হাতছানি। সারা বছরই পোকোনোর নির্মল বাতাসে পর্যটক আহ্বানের সুর। তবে শুনেছি, শরতের পোকোনোর রূপই আলাদা!

লেকের কাছে ভিজিটর সেন্টার।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা যাত্রার শেষে আমাদের গাড়ি যখন পোকোনোর ‘লেক ওয়ালেনপৌপক ভিজিটর সেন্টারে’ এসে পৌঁছল, মাথার ওপরে তখন চোখ রাঙাচ্ছে মধ্যাহ্নের সূর্য-তা বলে কিন্তু ফুরিয়ে আসা অক্টোবরের উদাসীন হু-হু বাতাসের নিষ্ঠুর দৌরাত্ম্য এতটুকুও কমেনি। ভিজিটর সেন্টার থেকে পায়ে হেঁটেই পেনসিলভানিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম লেক ওয়ালেনপৌপক। যার তটরেখা প্রায় ৫২ মাইলের কাছাকাছি। প্রায় ৫৭০০ একর বিস্তৃত যার পৃষ্ঠতল। লেনাপে ইন্ডিয়ানদের উপভাষায় ‘ওয়ালেনপৌপক’ শব্দের মানে- ‘দ্রুতগামী ও মন্থর গতির জলস্রোত’। ১৯২৬ সালে ‘পেনসিলভানিয়া পাওয়ার অ্যান্ড লাইট কোম্পানি’র তৈরি এই লেকটি সারা গরমকাল জুড়েই ব্যস্ত থাকে বোটিং, ফিশিং, সুইমিংয়ে। তবে শরতের ওয়ালেনপৌপক এখন একাকী ধ্যানমগ্ন!

ঝুরঝুরে বেলেমাটিতে পা ডুবিয়ে দেখি– লেকের তীরজুড়ে সার দেওয়া সবুজ বনানীর শরীরে জড়িয়ে আছে উজ্জ্বল রঙের ছটা। হিমেল হাওয়ার ছোঁয়া সবুজ গাছের পাতায় রাঙিয়ে দিয়েছে বার্ধক্যের রঙ- অথচ এই বয়স্ক বর্ণোজ্জ্বলতা যেন সবুজ যৌবনের প্রফুল্লতাকেও ম্লান করে দেয়। কোনও এক শিল্পী যেন লেকের জলে গুলে দিয়েছে তার হরেক রঙের প্যালেট! বিজ্ঞানের ভাষায়- শীত বরফে ডুবে যাওয়ার আগে পর্ণমোচী গাছের দল এক স্বল্পস্থায়ী রঙের উৎসবে মাতিয়ে দিয়ে যায় শরতের বিষণ্নতাকে! দিন যত খোলস ছাড়ে, বাতাস হতে থাকে নীরস, গাছেরা তাদের রান্নাঘরে শিকল তুলে দেয়। ক্লোরোফিল তৈরি করা বন্ধ হয়ে যায়। পাতার সবুজের আড়ালে থাকা ক্যারোটিনস ও জ্যান্থোফিলের উপস্থিতি প্রকট হয়ে ওঠে। লাল অ্যান্থোসায়ানিনের বিকাশ ঘটে। যার পরিণতিতে শরৎ সবুজের রূপান্তর ঘটে লাল, হলুদ, ব্রাউন, পার্পলের বর্ণচ্ছটায়। এ যেন ক্ষণস্থায়ী গ্রীষ্মের চোখ ঝলসানো বিদায় অনুষ্ঠান। প্রাণরসহীন পাতার শিরা-উপশিরাগুলির গতিও স্তব্ধ হয়ে গিয়ে শুরু হয়ে যায় পাতাঝরার খেলা।

প্রায় ১২৭ রকমের বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ, গুল্মের অসীম উন্মাদনায় ২৪০০ স্কোয়ার মাইল বিস্তৃত পোকোনো অঞ্চল এই সময় রঙের উৎসবে মেতে ওঠে। একদিকে বার্চের হলুদ চোখে ঠিকরে ওঠে ওকের তামাটে সাবেকিয়ানা, তো অন্যদিকে ডগউডের রক্তিম খুশি ছাপিয়ে ওঠে ম্যাপলের লাল-কমলার গর্বিত ভ্রুকুটি!

ক্যামেলব্যাক মাউন্টেন।

লেক দর্শন শেষে এরপর আবার আমাদের যাত্রা শুরু ক্যামেল ব্যাকমাউন্টেনের উদ্দেশ্যে। আমাদের নিঝুম পথের বাঁকে, পাথুরে ঢালে হঠাৎই আবিষ্কার করি- তিরতিরে ঝরণার আদিম লাবণ্য। এই বন্যতাকেই সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হয় এখানে। পথের ধারে নাম না জানা বুনো ফুলের সারি- শিরশিরে হাওয়ায় আপনমনে দুলে চলেছে! অবশেষে এসে পৌঁছলাম ‘ক্যামেলব্যাক মাউন্টেনে’র চূড়ায়। পোকোনো মালভূমির পূর্বপ্রান্তে প্রায় ২১০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ‘বিগ পোকোনো স্টেটপার্ক’। সেখান যখন আমরা এসে পৌঁছলাম, বিকেলের রোদ্দুর তখন অলস হয়ে শুয়েছিল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ‘ক্যামেলব্যাক মাউন্টেন’ বা ‘বিগ পোকোনো’ আসলে পোকোনো মালভূমির এক অনন্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। পোকোনো মালভূমির এই উপদ্বীপাকৃতি অংশটিকে তিনদিক থেকে দেখলে পর্বত বলে মনে হলেও পোকোনো মালভূমি আসলে একটি ‘গ্লেসিয়েটেড’ মালভূমি যা তৈরি হয়েছিল নিদেন পক্ষে তিনটি গ্লেসিয়াল আলোড়নের ফলে।

দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে ‘বিগ পোকোনো’র উচ্চতা প্রায় ১০০০ ফুটের কাছাকাছি। এখান থেকে চারপাশের প্যানোরামিক ভিউ সত্যি অসাধারণ। ‘ক্যামেলব্যাক মাউন্টেনের’ উন্নত চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের বিস্মিত চোখের তারায় তখন দূর সুদূরের দিগন্তরেখার অন্তহীন অস্তিত্ব, সেই দিগবলয় যেখানে সবকিছুই শুধুমাত্র নির্মল নীলিমায় ব্যাপ্ত। প্রকৃতি, পর্বত আর সুমহান নৈঃশব্দ্যের অনবদ্য সিম্ফনি অজান্তেই অবশ করে দেয় আমাদের সমগ্র চেতনা। এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে কখন যেন নিজেদের মনে হতে থাকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ!

সুগার মেপল ট্রি।

বুনো পাহাড়ের ঢালে, একদল লাজুক হরিণকে চকিতে ছুটে যেতে দেখলাম জঙ্গলের গভীরে! যেদিকেই তাকাই–লাল হলুদের শেড! নীচের দিকে তাকালে চোখে পড়ে-সরু, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তাটা ছুঁয়ে গেছে সোনালি পর্বতের ব্যাকগ্রাউন্ডে- নির্বিরোধী ছোট্ট ছবির মতো পাহাড়ি গ্রাম। একেই কি তৃপ্তি বলে? যদি তাই হয় – তাহলে এই অপার্থিব তৃপ্তির বুনো আস্বাদে আমাদের বিষে ঝাঁঝরা শহুরে মন আজ পরিতৃপ্ত! পাহাড়িয়া রংবাহারি সাজঘরের দরজা খুলে উঁকি মেরেছে আদিম সুন্দরীর আথিতেয়তা!

অপরূপা প্রকৃতি ও উচ্ছল বন্যতার সঙ্গে একান্ত গল্পগাথায় কখন যেন দেখলাম ফুরিয়ে এসেছে আমাদের অবসরের বেলা। পলাতকা বিকেলের খবর দিয়ে গেল একঝাঁক পাখিদের কলকাকলি-টুকটুকে লাল ‘নর্দার্ন কার্ডিনাল ‘ব্লুজে’, ‘রেড বেলিড উডপেকার, ‘ইয়েলো ওয়ার্বলার’, কিংবা ছটপটে ‘আমেরিকান রবিনে’র ডানায় তখন তড়িঘড়ি বাড়ি ফেরার টান! ফুরিয়ে আসা দিনের রঙটুকু চোখে বুলিয়ে নিয়ে ডানা মেললাম আমরাও।

এবার সভ্যতার ঘেরাটোপে প্রত্যাবর্তনের পালা !

ভিজিটর সেন্টার।

প্রয়োজনীয়তথ্য—

কীভাবে যাবেন— ফ্লাইটে নিউইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্ট থেকেই ক্যাব নিয়ে নিউইয়র্ক পোর্ট অথরিটি (৮ অ্যাভিনিউ অ্যান্ড ৪১ স্ট্রিট)। সেখান থেকে পোকোনো যাওয়ার বাস ছাড়ছে। মোটামুটি দেড় ঘণ্টা লাগে স্ট্রাউডসবার্গ পৌঁছতে। সেখান থেকে ক্যাবে করে ঘুরে নিতে পারেন পোকোনোর দর্শনীয় স্থানগুলি। লগ ইন করতে পারেন http://martztrailways.com  এবং www.poconobest.com ।

কোথায় থাকবেন— লেকওয়ালেনপৌপকের কাছে রয়েছে পোকোনো পাইনস মোটর ইন অ্যান্ড কটেজ, কম্ফর্ট ইন পোকোনো লেক সরিজিয়ন ইত্যাদি। ‘বিগ পোকোনো স্টেট পার্কে’র কাছে রয়েছে গ্রেট উল্ফ লজ, ডে’জ ইন ট্যানারসভিল ইত্যাদি। নেট থেকেই বিশদ জেনে বুক করে নেওয়ার জন্য রয়েছে পোকোনোর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট  www.800poconos.com।

সমাপ্ত

Please follow and like us:

2 thoughts on “শরৎ উৎসবে অগ্নিবর্ষী পোকোনো”

  1. প্রকৃতির রূপ তো সাংঘাতিক। লেক, গাছপালা, পর্বতশ্রেণি সবকিছুই চোখ জুড়নো। সুগার মেপলতে তো সত্যিও আগুন লেগেছে মনে হচ্ছে। কিন্তু এত ভাললাগার কমেন্ট বক্সেই সমাপ্তি। যেতে কি আর পারব?

  2. Pingback: Milana Travis

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *