পাহাড়িয়া বাঁশি বিশেষ ভ্রমণ

হাম্পতা পাস ট্রেক

দীপাঞ্জন মাহাত

সকাল ৯টার এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটটা রানওয়ে থেকে টুক করে ঝাঁপ দিয়ে হাওয়ায় ভাসতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছিল। একটাই কথা মাথায় এসেছিল, যাক, এবার তাহলে সত্যি সত্যি রওনা হলাম!

আসলে যতবার বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাব বলে ঠিক করেছি। ভেস্তে গিয়েছে। কখনও কারও দিদির বিয়ে, কখনও কারও অফিসে ছুটি মেলেনি। আবার কখনও তো বন্ধুর দাদাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়েছে। মোদ্দা কথা, বন্ধুদের সঙ্গে আমার ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছাটা প্রতিবার দমিয়ে রাখতে হয়েছে।শেষমেশ গত বছর একাই নেপাল যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু তাতেও বাধা। যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে ভূমিকম্পে সে দেশটাই অর্ধেক গুড়িয়ে গেল। তাই এ বছর হিমাচলে হাম্পতা পাস ট্রেকিং করতে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ঘোর সন্দেহে ছিলাম। আদৌও হবে তো? ১৪ সেপ্টেম্বর দিল্লিগামী বিমানটা ওড়ার পরে সেই সন্দেহ অনেকটাই কেটেছিল।

দিল্লি থেকে সারারাত বাস জার্নি করে মানালি পৌঁছেছিলাম পরের দিন। কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সকালে মানালির নীল আকাশ দেখে সেই কষ্ট একবারেই উবে গিয়েছিল। সাররাত ভাল করে ঘুম নেই। তবুও হোটেলের রুমে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার বদলে জামাকাপড় পাল্টে বেরিয়ে পড়েছিলাম বিয়াস নদীর ধারে হাঁটতে। ট্রেকিংটা ছিল ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে।তার আগে দু’দিন কী করব, কোথায় ঘুরব, কোনও ঠিক নেই। ঘুরতে ঘুরতে রাস্তার পাশের একটা মোটরবাইক ভাড়ার দোকান দেখে ঢুকে পড়েছিলাম। বেরিয়েছিলাম বাইকের চাবি নিয়ে। দু’দিন সেই বাইকে করেই গোটা মানালি আর তার আশপাশটা চষে ফেলা গেল। শহরের মধ্যে হিড়িম্বা মন্দির, মনু মন্দির, বশিষ্ঠ মন্দির, বন বিহার শহরের বাইরে সোলাং ভ্যালি, নগর— সবঅঅঅ। কিছু বাদ পড়েনি।

তবে ঘোরার আসল আনন্দটা শুরু হয়েছিল ১৭ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকে। সকালে মানালির রামবাগ পার্কে আমাদের ট্রেকিং গ্রুপের লিডার ভূপেন্দ্র শর্মা প্রায় আধঘণ্টা ধরে একগুচ্ছ নিয়ম, বিধিনিষেধ সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছিল (গালে দাড়িগোঁফের জঙ্গল থাকায় ভূপেন্দ্রকে দেখতে বড় মনে হলেও পরে জেনেছিলাম ও আমার থেকে চার বছরের ছোট। তাই ওকে তুমি করেই ডাকতাম)। তখন মনে হচ্ছিল, আরে ব্যাটা এত জ্ঞান না দিয়ে ট্রেকিংটা শুরু কর না। ভূপেন্দ্র বোধহয় সেটা বুঝেছিল। এর পরে মিনিট পনেরোর মধ্যে সব কিছু বুঝিয়ে আমাদের লটবহরগুলো একটা টাটা সুমোর মধ্যে ভরতে শুরু করেছিল।

মানালি থেকে গাড়িতে করে পৌঁছেছিলাম জোবরাতে। সাড়ে ১২টার কিছু পরে সেখান থেকে কুলু ভ্যালির জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রাকস্যাক কাঁধে শুরু হয়েছিল হাঁটা। আমাদের দলে ছিল মাত্র চারজন। এর মধ্যে আবার দু’জন কলকাতারই। ফলে চলতে চলতে ভালই গল্প হচ্ছিল। দু’আড়াই কিলোমিটার হাঁটার পরে একটা দোকানে মিনিট পনেরোর বিশ্রাম। বলা যায় ম্যাগি ব্রেক। ৫০ টাকা দিয়ে দোকানের ছোট্ট তাঁবুর ভিতরে বসে ম্যাগি খাওয়া, দোকানদারের সঙ্গে তাঁদের সুখদুখের গল্প করা— সবই হয়েছিল।

ভূপেন্দ্রর তাড়ায় অবশ্য বেশিক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া যায়নি। বিকেল ৫টার মধ্যে চিকায় আমাদের প্রথম ক্যাম্প সাইটে পৌঁছতে হতো। তাই ফের হাঁটা। এবার রাস্তা একটু একটু করে দুর্গম হচ্ছিল। চড়াই বাড়ছিল। তবে টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে ৫টার মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিলাম চিকায়। আকাশে এক কোণে তখন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। অন্ধকারও দ্রুত নামছিল। তবে আমাদের উৎসাহ তো প্রবল। এত তাড়াতাড়ি তাঁবুর ভিতরে ঢুকে যাব! মানতে পারছিলাম না। তাই স্যুপ খেয়েই ক্যাম্পের একটু দূরের একটা ঝরনা দেখতে চলে গিয়েছিলাম।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা-৭টা নাগাদ ক্যাম্পে ফিরতেই নৈশভোজের ডাক। খাবার সময় ফের ভূপেন্দ্রর আরও একপ্রস্থ উপদেশ। রাতে তাঁবুর বাইরে যাবেন না। বার হলেও সঙ্গীকে জানিয়ে যাবেন। প্রথম রাতে স্লিপিং ব্যাগে ঘুমতে কষ্ট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেদিন রাতে হঠাৎই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তাঁবুর বাইরে আলো দেখে ভেবেছিলাম সকাল হয়ে গিয়েছে। উঠে তাঁবুর চেনটা খুলেছিলাম। যে দৃশ্য দেখেছিলাম, তা আজীবন মনে থাকবে। পাহাড়ের মাথায় পূর্ণিমার চাঁদ। গোটা ভ্যালি ধুয়ে যাচ্ছে জোৎস্নায়। আমার তাঁবু-সঙ্গী ছিল বিনয়। বেঙ্গালুরুর ছেলে। ওকে ধাক্কা দিয়ে তুললাম। কিন্তু ওই দৃশ্য দেখেও ও নির্বিকার। (আসলে ব্যাটা এতটাই অলস যে, স্লিপিং ব্যাগ থেকে বেরোতেও ওর কষ্ট। এক একদিন তো আমাকে দিয়ে স্লিপিং ব্যাগের চেনও লাগাতো) অগত্যা তাঁবু থেকে একাই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন, টর্চ জ্বালানোর প্রয়োজন পর্যন্ত হয়নি। সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল চাঁদের আলোয়। সমতলের পূর্ণিমা দেখার থেকে এ একেবারেই অন্যরকম অনুভূতি। পাশে বয়ে চলা জোবরা নালার জল জোৎস্নায় দুধ সাদা। এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, একবারের জন্য মনে হয়নি তা ক্যামেরাবন্দি করে রাখি।

পরের দিন সকাল ৮টা ২০তে ফের হাঁটা শুরু হয়েছিল। গন্তব্য, বালু কা ঘেরা। ডানদিকে নীচে বয়ে চলেছে জোবরি নালা। আর উপরে পাথরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে হাঁটছি আমারা। ঘণ্টাতিনেক পরে আমাদের নালা পেরোতে হয়েছিল। জলে পা রাখতেই ঠান্ডার চোটে মুখ দিয়ে অদ্ভূত সব আওয়াজ বার হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, হাঁটুর নীচ থেকে পা দু’টো কেউ কেটে নিয়েছে। নালার পেরিয়ে একটা পাথরের উপরে বসে পায়ে হাত ঘষে কোনও রকমে নিজেকে গরম রাখার চেষ্টা করছি, হঠাৎ নালার ওপাশ থেকে জলে একটা বড় পাথর ছুড়েছিল ভূপেন্দ্র। ব্যস, পুরো ভিজে একসা। হিন্দি ভুলে বাংলাতেই গালাগালি দেওয়া শুরু করেছিলাম। আর তা শুনে ভূপেন্দ্রর সে কী হাসি। নালা থেকে কয়েকশো মিটার দূরে একটা খাবারের দোকান ছিল (সাধারণত এই দোকানগুলো ট্রেকিংয়ের কয়েকমাস ওখানেই থাকে। পরে ঠান্ডা বাড়লে দোকানদারেরা নীচে নেমে যান)। সেখানেই সারা হল মধ্যাহ্নভোজন। ওখানে আবার ম্যাগির দাম আরও বেশি— ১০০ টাকা।

আধঘণ্টার বিশ্রামের পরেই ফের বস্তা কাঁধে। হাঁটা শুরু। যত এগোচ্ছি রাস্তা তত খারাপ হচ্ছে। বড় বড় বোল্ডারের সংখ্যা বাড়ছে। আকারও বাড়ছে। বিকেলর দিকে পৌঁছে গিয়েছিলাম বালু কা ঘেরার লোয়ার ক্যাম্পে। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফের রওনা আপার ক্যাম্পের দিকে। ঘণ্টা তিনেকের হাঁটা ছিল। তাঁবুতে যখন পৌঁছেছিলাম, শরীর আর দিচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পড়ি। কিন্তু তাতেও বাধা। ভূপেন্দ্রর সাফ নির্দেশ, আমরা ১২ হাজার ফুট উপরে পৌঁছে গিয়েছি। এখনই তাঁবুতে ঢুকে পড়লে চলবে না। অক্লেটামাইজড হতে হবে। বাইরে ঠান্ডায় ঘুরতে হবে। অগত্যা ৭-৮ ডিগ্রি ঠান্ডার মধ্যেই তাঁবুর বাইরে আরও ঘণ্টাখানেক থাকতে হয়েছিল। তাতে অবশ্য লাভই হয়েছিল। শরীর তো আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খেলই। উপরি পাওনা ইন্দ্রাসন পর্বতের দর্শন। মেঘ-কুয়াশার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝেই উঁকি দিচ্ছিল পর্বতের শিখর।

তৃতীয় দিন ছিল সবচেয়ে কঠিন পথ। প্রায় ৬-৭ ঘণ্টার রাস্তা। পাহাড়ের ঢালও একধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। একের পর এক বোল্ডার পেরিয়ে আমরা চড়ছি। আর পিছন ফিরে দেখছি, কতটা উঁচুতে এলাম। নিজের শরীরে যে, এতটা ক্ষমতা রয়েছে, সে দিনই তা বুঝতে পেরেছিলাম। আমাদের সঙ্গে আরও অন্য দলের ট্রেকাররা ছিলেন। সত্যি বলতে, ওঁদের দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম। হাম্পতা পাস কুলু ভ্যালি থেকে স্পিতি ভ্যালি যাওয়ার রাস্তা। সেই পাস পৌঁছতে কত সময় লাগবে, আধঘণ্টা পর পর আমাদের গাইড নবীনকে সে কথা জিজ্ঞাসা করছিলাম। আর নবীনেরও হাসি মুখে জবাব, ‘ভাইয়া, উয়ো দেখাই দে রাহা হ্যা পাস। একঘণ্টে মে পহচ যায়েঙ্গে’। সকাল ৮টাতে তাঁবু থেকে বার হয়ে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট নাগাদ শেষ হয়েছিল নবীনের সেই ‘একঘণ্টা’র রাস্তা।

১৪ হাজার ১০০ ফুট উঁচু পাসে পৌঁছে গিয়েছি। প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। নবীনকে বার বার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘ভাই এহি পাস হ্যায় ক্যায়া? সচ বলো’। পাস থেকে মনে হচ্ছিল হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলব হিমবাহ-ইন্দ্রসন পর্বত। ৩০-৪০ মিনিট মতো ছিলাম ওখানে। তার পরে স্পিতি ভ্যালির দিকে নামা শুরু করেছিলাম। এটা আরও কঠিন কাজ। অন্তত ৮০-৮৫ ডিগ্রির ঢাল। রাস্তা বলতে কিছু নেই। কাঁধে ওই ওজন নিয়ে প্রতি পদক্ষেপে পিছলে পড়ার ভয়। তবুও নামতে তো হবে। একটু নামার পরেই অনেক নীচে আমাদের ছোট্ট ছোট্ট তাঁবুগুলো দেখতে পেয়েছিলাম। ওই উপর থেকে স্পিতি ভ্যালিকে আসাধারণ দেখতে লাগছিল। এ দৃশ্য বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

সাড়ে তিনটের দিকে স্পিতি ভ্যালির ক্যাম্প সাইট শিয়াগুরুতে পৌঁছেছিলাম। অসম্ভব ঠান্ডা ছিল ওখানে (স্থানীয় ভাষায় শিয়া মানে ঠান্ডা)। আর ঝড়ো হাওয়া। দু’বার তো তাঁবুর পিন উপড়ে গেল। তবুও তিন চারটে জামা-জ্যাকেট চাপিয়ে এলাকা রেকি করতে শুরু করেছিলাম। ওখানে রাতটা একটু দেরি করেই নামে। প্রায় পৌনে ৭টা নাগাদ অন্ধকার নেমেছিল। আর আমরা চারজন জড়ো হয়েছিলাম ‘কিচেন টেন্টে’। গত কয়েকদিন ধরে ওই তাঁবুটাই ছিল আমাদের আড্ডার জায়গা। রাজ্যের ভূতুড়ে গল্প থেকে অন্য গ্রুপের ট্রেকারদের হাঁটার খুঁত ধরা, সব চলত ওখানে।

সাধারণত আড্ডার শুরুটা করত ট্রেক লিডার ধর্মেন্দ্র। সেদিনও নৈশভোজের সময় ও-ই শুরু করেছিল। তবে চেনা আড্ডার মেজাজে নয়। গম্ভীরভাবে আমাদের বলেছিল, ‘‘দুসরে গ্রুপ মে ক্যাজুয়েলটি হো গ্যায়া।’’ স্বাভাবিকভাবেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, ‘‘ক্যাজুয়েলটি! মতলব?’’ ধর্মেন্দ্রর জবাব দেওয়ার আগেই পাশ থেকে নবীন বলেছিল, ‘‘হা ভাইয়া। ইয়ুথ হস্টেল গ্রুপকা কোই বান্দা আজ শুভা মর গ্যায়া।’’ মুহূর্তের নিঃস্তব্ধতা।

ধীরে ধীরে জানলাম ব্যাপারটা। ইয়ুথ হস্টেলের দলের সঙ্গে ছিলেন কেরলের এক ট্রেকার। আমাদের একদিন আগেই ওঁরা শিয়াগুরু ক্যাম্পসাইটে পৌঁছেছিলেন। হাম্পতা পাস পার হয়ে আসার সময়েই উচ্চতাজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। রাতে অক্সিজেনও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সকালের প্রাতঃকৃত্য করতে গিয়ে ওঁর হার্ট অ্যাটাক হয়। মাত্র ৩৬ বছর বয়স ছিল ওই ট্রেকারের। গত তিনদিনের ‘কিচেন টেন্টে’র হাসি-ঠাট্টার পরিবেশটা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত ছিল সেদিন। চুপচাপ খেয়ে, কিছু দরকারি কথা সেরে ফিরে গিয়েছিলাম নিজেদের তাঁবুতে।

পরের দিন সকাল ৬টার সময় ‘বেড-টি’ নিয়ে তাঁবুতে এসেছিল নবীন। অন্য দিনের মতোই। ফের হাসিখুশি। দেখলে বোঝা যাবে না আগেরদিন রাতে এই নবীনই ট্রেকারের মৃত্যুর খবর শোনানোর সময় কতটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। নিয়ম মতো ৮টা নগাদ আমাদের চতুর্থ দিনের হাঁটা শুরু হয়েছিল। হাঁটার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আরও একটা নদী পার হতে হয়েছিল। এটা আগের থেকেও চওড়া আর আগের থেকেও ঠান্ডা জল।

ওই যে দূরে জটলা। ওখানে সেবা শুশ্রূষা চলছে অসুস্থ হয়ে পড়া ট্রেকারের।

এই প্রথমবার নদী পার হতে গিয়ে ভয় লাগছিল। জুতো-মোজা খুলে খালি পা হতেই ঠান্ডাটা চেপে ধরেছিল। মাটিই এত ঠান্ডা তো জল কতটা ঠান্ডা হবে! জুতো খুলতে গিয়ে বিনয় আবার এক কাণ্ড ঘটাল। আমরা সকলে জুতো ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছিলাম। বিনয়ের মাথায় কী বুদ্ধি হল, ও সোজা জুতো খুলে তা অন্য পাড়ের দিকে ছুড়ল। একপাটি ও প্রান্তের মাটি ছুঁলেও আরেক পাটি পড়ল গিয়ে জলে।আমরা সবাই হায় হায় করে উঠলাম। ট্রেকের মাঝপথে জুতো খোয়া যাওয়া মানে বেচারাকে খচ্চরের পিঠে চেপে বাকি রাস্তাটা যেতে হবে। কারণ, খালি পায়ে ওই পাথুরে রাস্তায় হাঁটা হবে নিতান্তই বোকামি।

তবে ঈশ্বর বোধহয় ছিলেন। ও প্রান্তে অন্য দলের গাইডের রূপ নিয়ে। ওই গাইড জলে নেমে বিনয়ের জুতো উদ্ধার করলেন। সে সময় বিনয়ের মুখের অবস্থা ছিল দেখার মতো। বেচারাকে দোষ দেওয়া যায় না। আসলে দ্বিতীয় দিন নদী পার হওয়ার সময় ট্রেক লিডার ধর্মেন্দ্র নিজের জুতো খুলে এভাবেই ছুড়ে দিয়েছিল। বিনয়ের বোধহয় ওটা ভাল লেগেছিল। তাই এবার ও ওটা অনুকরণ করতে গিয়েছিল। তবে বিনয় ঠিকমতো খেয়াল করেনি যে, এ নদীটা আগের থেকে দ্বিগুণ চওড়া।

জুতো-কাণ্ড মিটতে দেখলাম ধর্মেন্দ্র পায়ে কিছু একটা মাখতে শুরু করেছে। জিজ্ঞাসা করতে জানাল, ওটা সরষের তেল। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল, যখন বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ফিরলে রাতে ঘুমতে যাওয়ার আগে মা পায়ে সরষের তেল মালিশ করে দিত। যাতে ঠান্ডা না লাগে। ধর্মেন্দ্রর কাছ থেকে তেল নিয়ে ভাল করে পায়ে লাগিয়ে একে অপরের হাত ধরে লাইন দিয়ে জলে নেমেছিলাম। তার আগে ধর্মেন্দ্র পইপই করে বলে দিয়েছিল, নদীতে হাত না ছাড়তে। হাত ছাড়লে ও আমাদের মাঝনদীতেই ছেড়ে চলে যাবে।

ধর্মেন্দ্র কথাটা কিছুটা স্বার্থপরের মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু নদী পার হওয়ার পরে বুঝেছিলাম কেন ও ওমনটা বলেছিল। বরফ গলা জলের নদী। পা রাখতেই হাঁটুর নীচের অংশটা অসাড় হতে শুরু করেছিল। ওই জলে কারও বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই সম্ভব নয়। এক হাঁটুর বেশি জল, তাড়াতাড়ি পা ফেলে যে অন্য প্রান্তে যাব, তারও উপায় নেই। নদীতে এত পাথর, একটু বেকায়দায় পা পড়লেই মচকে যাবে। দাঁতে দাঁত কামড়ে নদী পার হয়েছিলাম। প্রায় মিনিট পাঁচেক পায়ে কোনও অনুভূতি ছিল না।

নদী পার হয়ে হাঁটা শুরু করেছি। হঠাৎ দেখি অন্য দলের এক ট্রেকার ধপ করে বসে পড়লেন। অন্যরা ছুটে গিয়ে ধরাধরি করে ওঁকে তুললেন। কিন্তু উনি সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছিলেন না। অন্যদের কাঁধে ভর দিয়ে দু’পা হাঁটেন, ফের পড়ে যান। উনিও উচ্চতাজনিত (এএমএস) অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পরে শুনেছিলাম ওঁনাকে অক্সিজেন দিয়ে খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে নীচে নামিয়ে আনা হয়েছিল।

নীচে চন্দ্রা নদী। আর দূরে ফিতের মতো মানালি-কাজা রোড।

তিন ঘণ্টা পরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বোল্ডার ডিঙিয়ে বেশ কিছুটা নীচে নেমে এসেছিলাম। ওখান থেকে দূরে আমাদের শেষ ক্যাম্প সাইট ছাতরু দেখা যাচ্ছিল। আর সরু ফিতের মতো দেখা যাচ্ছিল চন্দ্রা নদী এবং মানালি-কাজা হাইওয়ে। টিফিনবক্সে রাখা খিচুড়ি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারলাম ওখানেই। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ফটোসেশনও হলো বেশ কিছুক্ষণ। তার পরে ফের হাঁটা। ডানদিকে চন্দ্রা নদীকে রেখে হাঁটতে হাঁটতে দুপুর সওয়া ১২টা নাগাদ পৌঁছেছিলাম ছাতরু। ধর্মেন্দ্র বলেছিল, ওখানে আমাদের দুপুর দেড়টার মধ্যে পৌঁছতেই হবে। তা না হলে সেদিন আর চন্দ্রতাল দেখতে যাওয়া হবে না।

দলের সকলে সাড়ে ১২টার মধ্যেই ছাতরু ক্যাম্প সাইটে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ওকানে আমাদের জন্য একটা টাটা সুমো অপেক্ষা করছিল। কোনও রকম বিশ্রাম না নিয়ে সাড়ে ১২টার সময়ই তাতে চড়ে চন্দ্রতালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। ছাতরু থেকে চন্দ্রতাল প্রায় ৬০ কিলোমিটার মতো। স্পিতি ভ্যালির রাস্তায় ওই দুরত্ব যেতেই সময় লাগল প্রায় তিন ঘণ্টা মতো। অবশ্য রাস্তা বললে ভুল হবে, বলা ভাল রাস্তার কঙ্কাল। গাড়ির মধ্যে মনে হচ্ছিল আমরা যেন দোলনায় দুলছি।

চন্দ্রতাল পৌঁছেছিলাম সাড়ে ৩টের দিকে। তালের দৃশ্য লিখে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। শুধু একুটু বলতে পারি, কিছুক্ষণ অন্তর জলের রঙ পরিবর্তন হচ্ছিল। কখনও নীল, কখনও সবজে নীল, কখনও বা সম্পূর্ণ সবুজ। ফেরার পথে বাতালাতে চাচা-চাচি ধাবায় এক দম্পতির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। এঁদের কথা (চাচা-চাচি ধাবা লিখে সার্চ করুন) গুগলেও পাবেন। দু’জনেই খুব মজাদার। ২০০ টাকার বিল হলে মজা করে বলবেন ২০০০ টাকা। প্রথমে শুনে যে কেউ চমকে যেতে পারেন। আমিও গিয়েছিলাম।

চাচা-চাচি ধাবা। ইনি চাচি।

ধাবা চালান বলে ভাববেন না এঁরা গরিব। ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত। ওই দুর্গম রাস্তায় যাত্রীরা যাতে সুবিধা পান, সে জন্য মানালি থেকে গিয়ে চার-পাঁচমাস ওখানে দোকান দেন। সাথে থাকে তাঁদের বউমা। এঁরা সব সময় অন্যকে সাহায্য করেন। গাড়ি খারাপ!! এঁরা সারাতে সাহায্য করবেন। টাকা নেই!! তবু খাবার পাবেন। দোকানে কোনও দামি জিনিস ভুলে ফেলে এসেছেন!! দু’বছর পরে গেলেও সেই জিনিস ফেরত পাবেন। আর হ্যাঁ, এঁদের ধাবা ওখানে একটা ছোটখাটো শপিং মল।

রাতে ছাতরুতে ফিরে মনটা খারাপ হতে শুরু করেছিল। ট্রেক শেষ। পরের দিন গাড়িতে করে মানালি ফিরে যাব। রাতে প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়ে থাকা, ঘুম পাড়ানি গান হিসাবে ঝড়ো হাওয়া, নদীর জলের তোড়ের শব্দ— এ সব তো আর পাব না ওখানে।

ছাতরু থেকে মানালি লম্বা যাত্রা। প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। সকাল সাড়ে ৮টায় ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ মানালি পৌঁছেছিলাম। রাস্তায় মিনিট দশেকের জন্য দাঁড়ানো হয়েছিল রোটাং পাসে। ওখানে যেন মাছের হাট বসেছে। পর্যটক আর গাড়ির ছাড়াছড়ি। বরফহীন ন্যাড়া রোটাং পাসে এক দম্পতিকে বলতে শুনেছিলাম, তাঁরা এমন সৌন্দর্য না কি কখনও দেখেননি। হেসেছিলাম। মনে হয়েছিল, ‘হায় রে, এঁরা যদি একটি বার আমাদের সঙ্গে হাম্পতা পাসে যেতেন’। মানালি পৌঁছে ধর্মেন্দ্র আমাদের ট্রেক শেষ করার জন্য একটা শংসাপত্র দিয়েছিল। ওটার মূল্য কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় পাস হওয়ার পরে পাওয়া শংসাপত্রের থেকে কোনও অংশ কম নয়।

স্পিতি ভ্যালি আর চন্দ্রা নদী।

ট্রেক চলাকালীন সবচেয়ে কষ্ট হতো প্রাতঃকৃত্য করতে গিয়ে। ওই সময় বুঝেছিলাম টয়লেট পেপারের মাহাত্ম্যটা ঠিক কোথায়। ট্রেকে দিনের ওই একটা সময় মনে হতো, কবে বাড়ি ফিরে কমোডে বসব। ২৫ সেপ্টেম্বর কলকাতায় ফিরে সেই আশা মিটিয়ে নিয়েছি।

কিন্তু এখন যখন কেউ জিজ্ঞাসা করেন, ‘হ্যাঁরে, এত কষ্টের পরেও আবার যাবি ট্রেকে?’’ উত্তরটা দিতে আমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না। কারণ, এটুকু বুঝেছি ভাল কিছু পেতে হলে কষ্ট তোমায় করতেই হবে বস!

সমাপ্ত

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *