খাদ্য সফর

খোয়া গেলাম খোয়া মান্ডিতে

সৌগত পাল

তিন ঘণ্টা লেট! একবার ইন্দ্রদার দিকে চাইলাম। তিনি ফোনে ব্যস্ত। দাবার চাল যেমন পরপর কয়েকটা ভেবে রাখতে হয় সেরকম বেশ অনেকগুলো ব্যাপার চিন্তা করে নিলাম। তারপর দুঃসংবাদটা দিলাম ইন্দ্রবাবুকে। শুনেই ওর মুখ দিয়ে আর্তনাদের মতো বেরোল, ‘রাতে কি খাবো?’ শুনে আমারও পেটে হাত। রাতের খাবার তো বর্ধমানে।

গোড়া থেকেই ব্যাপারটা বলি। আমি আর ইন্দ্রদা কালকা মেল ধরে যাবো মোগলসরাই। কালকা হাওড়া থেকে ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে। সেদিন প্রবল বৃষ্টি। ভিজে চুপচুপে হয়ে হাওড়ায় ঢুকেছিলাম সাড়ে ছ’টায়। স্টেশনে ঢুকেই শুনি এই দুঃসংবাদ। আমার মামা বর্ধমানে থাকে। তাই রাতের খাবার মামা নিয়ে আসবেন বলে বাড়ি থেকে খাবার নিইনি। ট্রেন সময়ে ছাড়লে ৯টায় বর্ধমান ঢোকার কথা। কিন্ত এখন বর্ধমান ঢুকবে মাঝরাতে। তাই ট্রেন লেটের খবরে ইন্দ্রদার আর্তনাদ আর আমার  মাথায় হাত।

যাক হাহুতাশ এর পালা শেষ করে আমরা একটা বসার জায়গা দেখে খুঁটি গাড়লাম। আপাতত এখানেই তিন ঘণ্টা কাটাতে হবে। ইতিমধ্যে মামাকে ট্রেন লেটের খবর জানিয়ে দিয়েছি। এবার শুকনো খাবার দিয়েই মুখ চালানো হলো। তারপর আর সময় কাটে না। পাশে বসে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক দেখলাম একমনে তাঁর সপ্রতিভ ফোনে মন্দিরে মন্দিরে ছুটছেন। আমরা দুজনের কেউই এখনও স্মার্ট হইনি। এর জন্য দীপকদা মাঝে মাঝে আমাদের খোঁটা দেয়। দীপকদা হালে স্মার্ট হয়েছে। তাই আমাদের নিজের দলে নিতে চাপ দেয়। কিন্ত আমরা চাপের মুখে মাথা নোয়াইনি। আজ এই পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছিল দীপকদার দলে থাকলে এই সময় পাশের লোকের দিকে চাইতে হতো না। আমরা নিজেরাই মন্দিরে ছুট লাগাতাম। ইন্দ্রদা অবশ্য নাস্তিক। মানে ওর দাবি ও নাস্তিক। ও হয়তো রাগী পাখিদের মোকাবিলা করত।

বসে বসে এইসব সাতপাঁচ ভাবছি। বিভূতি এক্সপ্রেস বাই বাই জানাল। তারপর পূর্বা। সাড়ে ন’টা নাগাদ জন আহারে গিয়ে রাতের খাওয়া সেরে নিলাম। ফিরে এসে দেখি বসার জায়গা ফাঁকা। সকলের ট্রেন রওনা দিয়েছে গন্তব্যে। পড়ে শুধু আমরাই। ১০টা ২০মিনিটে তাঁর আগমন বার্তা ফুকরে দিলেন ঘোষক। সিট খুঁজে বসলাম। ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি গা তুললেন। ইন্দ্রদাকে বললাম, ‘টাইমেই ছাড়ল, কী বল?’ ইন্দ্রদা কটমট করে আমার দিকে তাকাল। ও যদি সত্যি সত্যি দেবরাজ হতো তাহলে হয়তো আমাকে পরজন্মে ব্যাধ কালকেতু হয়ে স্মার্ট তিরধনুক নিয়ে শিকারে বেরোতে হতো। ওর পুরো নাম আসলে ইন্দ্রজিৎ। মানে রাবণপুত্র। যদিও দীপকদা ওকে রাবণের মধ্যম ভ্রাতা বলেই মনে করে। খাওয়াদাওয়া আর আকারআকৃতির জন্য। মন ভাল করতে বললাম, বর্ধমান পৌঁছলেই তো খাবার আসছে।’ তাতে তেমন প্রভাব পড়ল না। ও বলল, “এত রাতে খাবার কি আর গরম থাকবে?’’ বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল ইন্দ্রদাকে। আরেক দফা উৎসাহ দিতে বললাম, ‘তাতে কী আছে। ঠান্ডা খাবার আর শেষপাতে মিহিদানা, সীতাভোগ।’’ এবার যেন চোখে একটু উজ্জ্বলতা এল ওর।

দুজনে বসে বাইরের অন্ধকার দেখতে লাগলাম। ট্রেনের আওয়াজ আর দুলুনি উপভোগ করতে পেরিয়ে গেলাম ডানকুনি, কামারকুণ্ডু, পোড়াবাজার, মির্জাপুর-বাঁকিপুর। অন্ধকারে নাম না পড়তে পারা আরও অনেক স্টেশন।

প্রায় বারোটায় ট্রেন এল বর্ধমান। মামা খাবার তুলে দিল। লুচি, আলুর দম। সঙ্গে মিহিদানা আর রসগোল্লা। খাওয়াদাওয়া সেরে দু’জনে লম্বা হলাম। মাঝে থামল দুর্গাপুর, আসানসোল। তারপর ধানবাদ। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঝাড়খণ্ডে প্রবেশ করলাম। রাত ২টো নাগাদ ট্রেন থামল গোমো স্টেশনে। সেই গোমো। যেখান থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারত ত্যাগের সময়ে কালকা মেল ধরেছিলেন। সেই কালকা, সেই গোমো। আমিও তো ‘দেশ’ ছাড়ার ব্যবস্থা করতেই মোগলসরাই যাচ্ছি। নিজেকে নেতাজির সঙ্গে তুলনা করে একটু লজ্জাই পেলাম। লজ্জায় কুঁকড়ে থাকতে থাকতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।

এত জল কোথা থেকে আসছে! ঘুমটা ভেঙে গেল। ভোর হয়ে গেছে আর বাইরে তুমুল বৃষ্টি। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করলাম। মুখ হাত ধুয়ে জানালার ধারে বসলাম। ইতিমধ্যে বৃষ্টি কমে এসেছে তাই জানলা খুলে প্রকৃতির শোভা দেখতে বসলাম। মাঠের পর মাঠ শুধু সবুজ। চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। তখন দেখতে পেলাম ওদের। মানে নীলগাই। একটা গোটা পরিবার নিয়ে প্রাতরাশের খোঁজে বেরিয়েছে। উত্তেজিত হয়ে বললাম, ‘ছবি তোলো ইন্দ্রদা।’ কিন্ত কোনও সাড়া নেই। ঘুরে দেখি ইন্দ্রদা বিস্কুটের প্যাকেটটা কোন দিক দিয়ে খুললে সুবিধে হবে তা নিয়ে গবেষণা করছে। হতাশ হয়ে আমিও বিস্কুট খেতে শুরু করলাম। আবারও ছবি নেই। আবার দীপকদার বকুনি শুনতে হবে।

কিছুক্ষণ পর ফোনে বার্তা এল, ‘ওয়েলকাম টু উত্তরপ্রদেশ’।

আর সঙ্গে সঙ্গে আবার শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। জলের তোড়ে চারদিক ঝাপসা। এদিকে ট্রেন আস্তে আস্তে মোগলসরাই স্টেশনে ঢুকছে। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাওড়ায় ঢুকেছিলাম। আর নামছিও বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। স্টেশনে নেমে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা। কিন্ত বরুণদেবের কৃপা আর থামে না। অপেক্ষা করলে খিদে পায়। এখন সেটা আরও বেশি পাচ্ছিল। ব্যাগে যে মামার দেওয়া লুচি আর মিহিদানা এখনও রয়েছে। খাওয়া শুরু করলাম। এক ঘণ্টা অপেক্ষা পরেও যখন বৃস্টি কমলো না তখন ভিজে ভিজেই বাইরে বেরোব ঠিক করলাম।

ঠিক তখনই হয়ে গেলাম নজরবন্দি। হঠাৎ দেখি, এক ভদ্রলোক হ্যান্ডিক্যামে আমাদের ভেজার দৃশ্য তুলতে শুরু করেছেন। পিছনে বুম হাতে একজন। স্থানীয় এক টিভি চ্যানেল বারিষ কভার করছে। ইন্দ্রদাকে বললাম, ‘মোগলসরাইয়ে পা দিতে না দিতেই তো মোগলাই হয়ে উঠলাম। পরে কী হব!’

পরে যে কী, কী অপেক্ষা করে আছে যদি জানতাম!

নেতাজির আপন দেশে, খাবারদাবার সর্বনেশে। এটা দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে বুঝতে পারলাম। এই নেতাজি অবশ্য সমাজবাদী পার্টির প্রধান মুলায়ম সিংহ যাদব। ভক্তেরা তাঁকে নেতাজি বলেই ডাকেন। আমাদের দেশে কচি-বুড়ো, ছোট-মাঝারি-বড় নানা মাপের নেতা। জি’য়েরই বা অভাব থাকবে কেন?

তার আগে স্টেশন থেকে বেরোবার পর কী হল একটু বলি। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে একটা হোটেল ঠিক করে ঘরে ঢুকলাম। ঘরে আলো, পাখা, টিভি ইত্যাদির সাথে যেটা চোখে পড়ল তা হল কুলার। শুনলাম এখানে প্রতিটা হোটেলে কিছু না থাকলেও কুলার থাকতেই হবে। এবার প্রথম কাজ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। প্রথমেই হোঁচট। কল চালিয়ে দেখি জল পড়ছে না। আমার তো মাথায় হাত। হোটেল মালিক জানালেন, সকাল থেকে বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ নেই। তাই জলও নেই। তাহলে উপায়? মালিকের পরামর্শ, ‘একটু চেপে থাকুন। কারেন্ট এলেই জলের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’ চেপে? রাতে অন্তস্থ হওয়া লুচি-মিহিদানারা এখন বহিস্থ হতে চাইছে। তার প্রচণ্ড চাপ। তারপরেও চেপে! সে ব্যথা যে কী ব্যথা!

দুপুরে স্নান করার পর খাবারের দোকান খুঁজে ভাতের অর্ডার দেওয়া হল। ছোটো সরু চালের ভাত, ডাল আর আলু দিয়ে একটা ঝোল মতো। সঙ্গে আচার। খুব খিদে পেয়েছিল। কিন্তু এক গ্রাস মুখে তুলেই ইন্দ্রদার দিকে তাকালাম। দেখি, ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আসলে ভাতটা ঠিকমতো সিদ্ধ হয়নি। ওকে প্রবোধ দিলাম, ‘সব্জি দিয়ে খেলে ম্যানেজ হয়ে যাবে।’ কিন্ত সব্জিও ভাতের গ্রাসকে গলা-পথ দিয়ে পেটের দিকে এগিয়ে দিতে পারছিল না। খেতে ঢুকেই শুনে নিয়েছি, আমিষ পাব না। কিন্ত সব্জি? হিন্দিবলয়ে আলুও সব্জি। কোনও রকমে খাবার শেষ করে বাইরে বেরোলাম। আর দু’জনে প্রতিজ্ঞা করলাম, যাই হোক, এই দোকানে আর ঢুকব না।…

ঘুম যখন ভাঙল তখন অন্ধকার নেমেছে। অন্ধকার দেখেই পেটের কথা মনে পড়ল। সেখানে তো ফিউশন-কীর্তন হচ্ছে। মানে ইঁদুর, বেড়াল, ছুঁচো সবাই কীর্তন শুরু করেছে। হাত মুখ ধুয়েই ব্যাগ খুললাম। বিস্কুট, চিঁড়েভাজা সিধে দিয়ে ইঁদুর, বেড়ালদের মুখ বন্ধ করা হল। এবার কী হবে? ইন্দ্রদা বলল, ‘ভাল খাবার দোকান খুঁজতে হবে। নয়তো দুপুরের মতো ভুখা থাকতে হবে।’

চারপাশে প্রচুর দোকান। হাঁটতে হাঁটতে তাকাচ্ছিলাম। প্রতি দোকানে রেকাবিতে তাল তাল আটার মতো কিছু। আর একটা বোঁটকা গন্ধ। নিশ্চয় খাবার জিনিস নয়। তারপর যেতে যেতে হঠাৎ ইন্দ্রদার ডাক। একটা কাচঘেরা ঠেলাগাড়িতে মোমো বিক্রি হচ্ছে। ভেজ মোমো আর পনির মোমো। ভাজা আর সিদ্ধ। পনির মোমো শেষ। তাই ভেজ মোমোই খেতে হবে। ইন্দ্রদা পরামর্শ দিল, অল্প করে টেস্ট করা যাক। ভালো লাগলে বেশি করে খাওয়া যাবে। কিন্ত খাবে কোনটা? সিদ্ধ দিয়েই শুরু হোক। এক প্লেট নিলাম। ৬টা মোমো আর টম্যাটো সস। ভয়ে ভয়েই কামড় বসালাম। খেতে বেশ ভালোই। আমাদের এখানের মতো নয়। ভিতরের মশলাটা ছাতু, আদা আরও কীসব দিয়ে তৈরি। ইন্দ্রদাকেও খুশি মনে হচ্ছিল। এবার সসে ডুবিয়ে কামড় দিলাম। তারপরই ব্রহ্মতালু পর্যন্ত চমক। টম্যাটো সস বলে যেটা ভেবেছিলাম সেটা লঙ্কাবাটার সস। মন্দ লাগছিল না। তাই আরও এক প্লেট।

এবার রাতের খাবারের খোঁজ। কিন্ত খানিক ঘোরার পর খটকা লাগলো। বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। হরতাল নাকি। একজনকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, ‘আজ সোমবার, শিবপুজোর দিন। তাই সবাই দোকান বন্ধ রেখেছে। কাল সব খোলা থাকবে।’ দু’জনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। সেই দোকানেই এবার যেতে হবে নাকি? প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে হবে? তারপর ভাবলাম, আমরা কেউ সল্লুমিয়া নই। একবার কমিটমেন্ট করেছি বলে নিজের মনের কথাও শোনা যাবে না! গুটি গুটি পায়ে সেই দোকানের সামনে। এখন দেখলাম উল্টোদিকে আরও একটা দোকান আছে। সেটাই বাছলাম। সেই দোকানের মেনু রুটি, মটর পনির, চানা। দু’জনে রুটি আর দু’রকম তরকারি নিলাম।

তরকারি মুখে দিতেই সেই বোঁটকা গন্ধ। তরকারিতে কী দেওয়া? দোকানদার জানালেন, খোয়া। জিনিসটা নাকি এখানে বিখ্যাত। তাই সব রান্নাতেই খোয়া। খেতে ভালোই লাগছিল। কিন্ত দুটো রুটি খাবার পর আর গলা দিলে নামছিল না। অবাক হয়ে ভাবলাম, খোয়ায় কি খিদে খোয়ালাম নাকি! খাবার ব্যাপারে দু’জনেরই রীতিমত সুনাম। বেড়াতে গেলে আমাকে আর ইন্দ্রদাকে কম জ্বালায় বাকিরা? কারনটা আবিষ্কার করা গেল। সেই মোমো। ছাতুর মশলা পেটে চারিয়ে গিয়ে জায়গা দখল করে নিয়েছে।

সারাদিন ঘুমিয়ে কেটে গেছে। খেলার খবর নেওয়া হয়নি। ঘরে ফিরে ভারতের টেস্ট ম্যাচ দেখব বলে চ্যানেলে চ্যানেলে ঘুরছিলাম। কিন্তু খেলার চ্যানেল খুঁজে পেলাম না। তাহলে একটু সিনেমা হোক। কিন্ত আমাদের চেনা কোনও চ্যানেল পেলাম না। সবই স্থানীয় চ্যানেল। তাতে সিনেমা চলছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেসবই দেখছিলাম। কিছুক্ষণ পর একটা জিনিস বুঝতে পারলাম। সিনেমার লোকেশন হিসেবে উত্তরপ্রদেশ আছে এরকম সিনেমাই চ্যানেলগুলোতে চলছে। একটু খবর দেখলাম। এখানে প্রবল বৃষ্টির খবর দেখাচ্ছে। আমাদের কি দেখাবে? দেখালো না। মনে রাগ নিয়েই ঘুমতে গেলাম।

পরদিন সকালে হইচইয়ে শব্দে ঘুম ভাঙল। বারান্দায় গিয়ে দেখি, সেই খোয়ার দোকানের সামনে প্রচুর লোক। তাল তাল খোয়া ওজন হচ্ছে আর গাড়ি করে চলে যাচ্ছে। কেউ বাইকে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর দোকানের সামনে একটা বিশাল কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। জলে ডোবানো পনিরও রাখা আছে। হাত মুখ ধুয়ে বাইরে বেরোলাম। একটা দোকানে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, এত খোয়াখুয়ি কীসের? উনি বললেন, এগুলো থেকে মিষ্টি তৈরি হবে। রান্নাতেও কাজে লাগে। আর একটি জিনিস উনি দেখালেন। ক্রিমের মত দেখতে। বললেন, এটা ননী। এটা ফোটালে ঘি পাওয়া যাবে। এই এলাকার এটাই মূল ব্যবসা। জায়গাটার নামও খোয়া মান্ডি।

ননী শুনে বেশ খুশি খুশি লাগছিল। এই সেই ননী! যা কেষ্টঠাকুর ব্রজধামে বাড়ি বাড়ি থেকে চুরি করে খেতেন। ঠাকুরের পাকস্থলীকে চার সেলাম। এ জিনিস দিনের পর দিন খেয়ে সহ্য করা চারটিখানি কথা নয়। সহ্য করার ক্ষমতা না থাকলে কী আর গোপীবল্লভ হওয়া যায়! হজম করতে পারব না বলেই তো আর ননীচোরা হতে পারলাম না! এখন ননী কিনেই খাই। ইন্দ্রদাও উৎসাহিত। জিজ্ঞেস করল, কতক্ষণ ভাল থাকে। একবেলা। উত্তর শুনে কাঁধ ঝুলে গেল ওর।

আশাহত হলেই আমাদের খিদে পায়। হারার রাগটা খাবার দিয়ে পোষানোর চেষ্টা করি। তাই খাবার দোকান। দিনের বেলা দেখলাম অনেক রকম খাবার পাওয়া যায়। চপ, কচুরি-সহ নানারকম নোনতা। এক পাঞ্জাবি দোকানদার ঠেলাগাড়িতে কচুরি বিক্রি করছিলেন। তাঁর কাছেই গেলাম। পাঁচটা কচুরি এবং তরকারি। মুখে দিলাম এবং মুগ্ধ হলাম। সকালেই এরকম খাবারে মন খুশ। তরকারিটা চেটেপুটে খেলাম। সয়াবিন, মটর, ছোলা, পনির এবং অবশ্যই খোয়া। এখন তো পেট ভরল। কিন্তু দুপুরে? আমিষ হোটেল খুঁজে বের করা দরকার। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। কিন্ত তাঁর উত্তরে পেটে আঁধার নেমে এল। এটা শ্রাবণ মাস, শিবের মাস। পুরো মাস আমিষ খাওয়া বন্ধ। খদ্দের থাকবে না। তাই আমিষ হোটেলগুলো সব বন্ধ। স্টেশনে নেমে প্রচুর লাল চেলি পরা শিবভক্ত দেখেছিলাম অবশ্য। মানে তাঁদের জন্যই আবার সেই ‘সব্জি’ ভাত!

দুপুরে খাবার পর টিভি চালিয়ে বসলাম। ব্রেকিং নিউজে নরসিং যাদব। তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে। উনি অলিম্পিক্স কুস্তিতে অংশ নিতে পারবেন। অন্য চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ বাংলা চ্যানেল খুঁজে পেলাম। ২৪ ঘণ্টা। তাতে ব্রেকিং নিউজ, পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টানো হবে। ইন্দ্রদা দেখে বলল, ‘আমরা ফিরলে আর ঢুকতে দেবে তো? বলতে পারে যে তোমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে গেছিলে। কিন্ত এটা বঙ্গ বা বাংলা।’

সন্ধেবেলা আমরা ঘুরতে বেরনো। আবার সেই মোমোর গাড়ি। ইন্দ্রদার ফ্রায়েড মোমো টেস্টের ইচ্ছে। আজও পনির মোমো নেই। বুঝলাম, এটি এখানে বেশ জনপ্রিয়। ফ্রায়েড মোমো তেমন ভাল লাগল না। আবার এক প্লেট সিদ্ধ মোমো। আজ দেখি, রাস্তার ধারে ডিম বিক্রি হচ্ছে। রাতে রুটি, তরকারি আর ডিম ভাজা হল।

রাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। গা-হাত খুব চুলকাচ্ছে, জ্বালা করছে। কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্ত আবার সেই চুলকানি। কানের কাছে গান শোনানো। মশককুল কাল হয়তো বুঝতে পারেনি। আজ প্রবল উৎসাহে লোকলস্কর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সকালে ইন্দ্রদা বলল, ‘আগের দিন নিরামিষ খেয়েছিলাম। তাই দয়া করে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্ত ডিম খাবার পর আর মায়াদয়া দেখায়নি।’ আমি বললাম, ‘হয়তো এখানকার মানুষের মতো মশারাও শিবভক্ত। শ্রাবণ মাসে আমাদের অনাচার সহ্য হয়নি তাই উচিত শিক্ষা দিল।’

সেদিন সন্ধ্যার ট্রেনে ফিরে যাব। এবার বিভূতি এক্সপ্রেসে। বেরিয়ে স্টেশনে এলাম। ইন্দ্রদা আমাকে অপেক্ষা করতে বলে রাতের খাবার কিনতে গেল। ফিরে এসে কীসের একটা টিউব দিল। দেখি ওডোমস। ‘এটা কী হবে? তুমি তো গেলে রাতের খাবার কিনতে!’ ইন্দ্রদার জবাব, ‘কাল আমিষ খেয়ে যা ভুগলাম তাই আজ কোনও রিস্ক নেওয়া যাবে না। আগেভাগে ব্যবস্থা করে নিলাম।’ আমি একটু চিমটি কাটলাম, ‘তুমি তো নাস্তিক? তা-ও এসব নিয়ে ভয় পাচ্ছো!’ তারপর খেয়াল হল, আজও আমিষ বলল না? কী এনেছে? ‘ট্রেনে উঠে দেখাব।’ রহস্যময় হাসি ইন্দ্রদার।

ট্রেন ছাড়ল। আমি ধরে পড়লাম, এবার দেখাও কী আনলে? দেখাতে হল না ব্যাগের চেন খুলতেই সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ল গোটা ট্রেনে। ম্যাজিক নাকি? এখানেও কোথা থেকে দোকান খুঁজে বিরিয়ানি কিনে এনেছে ইন্দ্রদা!!!

পুনশ্চঃ – বিরিয়ানি খেয়ে ট্রেনে রাতটা ভালোই কেটেছিল, মশারাও উৎপাত করেনি। সকালে ট্রেন থেকে নেমে আমতা লোকালও পেয়েছিলাম। মানে যাত্রা শুভই হয়েছিল। শুধু বাধা পড়ল বড়গাছিয়া স্টেশনে।

ট্রেন থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে ইন্দ্রদা হঠাৎ বলল, ‘একটা বেল্ট কিনতে হবে। তিনদিন প্রায় না খেয়ে শরীরটা ভেঙে পড়েছে। প্যান্ট কোমর থেকে নেমে যাচ্ছে।’

সমাপ্ত

 

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *